শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

পরশের দায়

জ্ঞান এক নীরব প্রদীপ—
তার উপকারিতা আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।

গড়পড়তা প্রেম একসময় একঘেয়ে হয়ে যায়,
হৃদয় যে ধুকধুক করা ভুলে যায় তা নয়,
বরং প্রেমিকরা ভুলে যায়—
এখনো কত বিস্তৃতি রয়ে গেছে অপরের ভিতরে।

না-জানা অসীম বাড়ির ভিতরে
ছোট ছোট ঘর বানিয়ে ফেলে।
অথচ
সময় ধৈর্যশীল নদীর মতো দীর্ঘ,
হাত যখন শিখছে ত্বকের ধীর বর্ণমালা,
এক দেহ আরেক দেহকে পড়ছে
যেন কোনও প্রাচীন পাণ্ডুলিপি
উষ্ণতার কালি দিয়ে লেখা।

ধৈর্য আর যত্নে দেওয়া এক ম্যাসাজ
শুধু পেশির ক্লান্তি মোচন নয়—
এ এক তীর্থযাত্রা দুই তালুর,
ব্যাকরণহীন এক আলাপ,
যেখানে নীরবতা পেকে ওঠে বিশ্বাসে।
তারপরই প্রেম ঘন হয়ে আসে—
তাড়াহুড়োহীন, ভঙ্গুর নয়—
বরং দীপ্ত, সঘন,
হরিদ্বারের কিংবদন্তি রাবড়ির মতো,
ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাড়া দুধ
হঠাৎ মনে করে—
সে একসময় মেঘ ছিল।

যে শুধু নিজের ক্ষুদ্র তৃপ্তির তীরে
দৌড়ে পৌঁছতে চায়,
সে প্রায়ই একাই পৌঁছে যায়—
অন্য কাউকে আনন্দের কাঁপা জলে
পার করে দিতে অক্ষম,
আর নিজের কাজের বীজ
কোথায় পড়ে থাকে তাও ভুলে যায়।

কিন্তু পৌরুষের দৃঢ়তার ধারণ
যখন হয়ে ওঠে নারীর প্রতিষ্ঠিত ভূমি,
যখন ধৈর্য নির্মাণ করে এক আশ্রয়,
নারী তখন খুঁজে পায় অন্তত একটি আকাশের স্বাধীনতা—
আর সেই আকাশে প্রায়শই
একটির পর একটি শিখরসুখ
তুষারচূড়ার মতো জ্বলে ওঠে।
সেখানে জন্ম নেয় এক পার্থক্য—
সুগন্ধের মতো সূক্ষ্ম,
বর্ষার বিদ্যুতের মতো তীব্র—
সাধারণ পথিকের সঙ্গে
তার, যে জানে কীভাবে হতে হয়।

সম্ভবত এখানেই আকর্ষণ
কিংবদন্তিতে ধার পায়,
বিশেষ এক উপস্থিতি আলাদা হয়ে ওঠে
নামহীন পুরুষদের ভিড় থেকে।
রাধা অপেক্ষা করেছিলেন
কোনও বিজেতার জন্য নয়,
বরং সেই বাঁশিওয়ালার জন্য
যে বিরতির মানে জানত—
যে বুঝত, আকাঙ্ক্ষাও এক ধরনের সুর।

তাই প্রেম টিকে থাকে
শুধু কামনায় নয়,
বরং জানার সাধনায়—
কখন থামতে হয়,
কখন শুনতে হয়,
কখন জোয়ারের মতো এগোতে হয়
যে কখনো চাঁদকে ভোলে না।
কারণ আমরা যত বেশি জানি একে অপরকে,
প্রেম তত কম সাধারণ হয়ে ওঠে—
যতক্ষণ না দুই সত্তা বিস্ময়ে দাঁড়ায়,
দেখে তারা পুনরাবৃত্তিতে পড়েনি,
বরং স্পর্শের নিচে
এক ক্রমবর্ধমান মহাবিশ্বে প্রবেশ করেছে,
যে অপরিসীম অনবরত উন্মোচিত হয়।

বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

অবাধ্য বাতাস

তোমার ভালবাসার অবাধ্য বাতাসে
যে একবারও এসে দাঁড়িয়েছে,
সে-ই শুধু জানে—
ডানা না মেলে, ভেসে না গিয়ে,
নিজের পায়ের উপর শরীরের ভারসাম্য রেখে
স্থির থাকা কত প্রবল কঠিন।

কারণ সেই বাতাস
শুধু হাওয়া নয়—
সে এক অদৃশ্য সাগর,
যেখানে মাধ্যাকর্ষণ মাঝেমধ্যে ছুটি নেয়,
আর হৃদয় হয়ে ওঠে এক ভাসমান দ্বীপ।

প্রথম স্পর্শেই মনে হয়,
হাড়গুলো হালকা হয়ে যাচ্ছে,
রক্তে জন্ম নিচ্ছে ছোট ছোট ঘূর্ণিঝড়,
চোখের ভেতর খুলে যাচ্ছে
অপরিচিত আকাশের জানালা।

অনেকে ভাবে প্রেম মানেই উড়ে যাওয়া—
আসলে প্রেম শেখায় দাঁড়াতে,
ঝড়ের মধ্যেও শিকড়ের মতো গভীরে নামতে,
যেন পৃথিবী সরে গেলেও
তুমি না সরো।

তোমার ভালবাসা এমন এক দমকা হাওয়া
যে দিক জিজ্ঞেস করে না,
মানচিত্র মানে না,
সমস্ত যুক্তিকে উড়িয়ে দিয়ে
মনের শহরে বালির টিলা বানায়।
সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে—
প্রতিটি মুহূর্তে পতনের সঙ্গে চুক্তি করা,
প্রতিটি শ্বাসে স্বীকার করা
যে নিজেকে হারানোর ভয়ই
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

আমি দেখেছি,
কিছু মানুষ সেই বাতাসে
পাতার মতো উড়ে যায়—
তারা আকাশ দেখে,
কিন্তু মাটি ভুলে যায়।

আবার কেউ কেউ
পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে—
তাদের পায়ের নিচে জন্ম নেয় শিকড়,
আর শিকড়ের নিচে আরেক পৃথিবী।

হয়তো ভালবাসার সবচেয়ে গোপন অলৌকিকতা এই—
সে তোমাকে উড়তেও শেখায়,
আবার একই সঙ্গে
মাধ্যাকর্ষণের ভাষাও নতুন করে পড়ায়।
তাই যে একবার তোমার অবাধ্য হাওয়ায় শ্বাস নিয়েছে,
সে আর আগের মানুষ থাকে না।
তার হাঁটা বদলে যায়,
তার ছায়াও যেন একটু দুলে ওঠে।
কারণ সে জানে—
ঝড়ের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা
উড়ে যাওয়ার চেয়েও বড় সাহস,
আর ভালবাসা কখনো কখনো
ডানা নয়,
বরং এক অদৃশ্য ভার—
যা বহন করতেই
মানুষ ধীরে ধীরে
আকাশের সমান হয়ে ওঠে।

মানব যন্ত্র

পৃথিবী ভরে আছে প্রতিভাধর ভূতদের ভিড়ে—
হাতে বিদ্যুতের মুঠো, কিন্তু অলস,
ফলতঃ প্রয়োগহীন।
পকেটে তাই 
সেলাই করা অপূর্ণ নক্ষত্রমালা।

তারা নীরবে জ্বলে ওঠে দরজাহীন ঘরগুলোর ভেতর,
নিজেদের ডাকে— প্রায়।

প্রতিভা, দেখো, এক বুনো জন্তু।
সে জল খায় এমন নদী থেকে যার কোনও মালিক নেই,
প্রতিটি শিশুর চামড়ার নিচে ঘুমিয়ে থাকে,
অনুমতি ছাড়াই শ্বাস নেয়।
তবু সে নিজের পায়ে হাঁটে না,
আর কোনও অনুপ্রেরণাই বেশিদিন স্থায়ী হয় না।

শক্তি বাস করে সর্বত্র—
দুই চিন্তার মাঝখানের বিরতিতে,
ভোরের আগে না-ঘুমোনো সেই ঘণ্টায়,
চোখের পেছনের উত্তাপে
যেখানে ধারণাগুলো বুনো পাখির মতো চক্কর কাটে।

শক্তি মুক্ত।
সে প্রাচুর্যময়।
তবু লাগাম ছাড়া সে নিরর্থক।
শৃঙ্খলা কোনও খাঁচা নয়—
সে এক আহ্বান।
মনের দরজায় কঠোর এক ধাক্কা,
যা বলে, “উঠে দাঁড়াও। এখনই।”
সে জিজ্ঞেস করে না তোমার কেমন লাগছে,
ভয়ের সঙ্গে দরকষাকষিও করে না।

প্রতিটি সকালেই সে ঘণ্টা বাজায়
যতক্ষণ না অলসতাও তোমার নাম শিখে ফেলে।
অনেকে অনুপ্রেরণার জন্য অপেক্ষা করে
যেন সে ভদ্র কোনও অতিথি।
কিন্তু অনুপ্রেরণা আসলে এক পলাতক সৈনিক—
সে তাদেরই অনুসরণ করে
যারা তাকে ছাড়াই মিছিল শুরু করে।

শৃঙ্খলিত মন এক ভাটিখানা:
সে আগে সন্দেহ পোড়ায়,
তারপর অজুহাত,
তারপর সময়কেও।
একই চিন্তার কয়লা দিয়ে
অন্যরা হাত গরম করে—
আর এ মন গড়ে তোলে সরঞ্জাম।

কোনও শর্টকাট নেই,
প্রতিভার আড়ালে লুকোনো কোনও সিঁড়িও নয়।
আছে শুধু একঘেয়েমির মুখোশ পরা পুনরাবৃত্তি,
আছে অন্তর্লীন এক ঘড়ির প্রতি আনুগত্য
যার টিকটিক শব্দ কামনার চেয়েও জোরে বাজে।

সাফল্য পৃথিবী থেকে চুরি করা কিছু নয়।
তা আত্মা থেকেই উত্তোলিত—
দিনের পর দিন,
আদেশের পর আদেশ,
যতক্ষণ না ধূলোর মতো ছড়িয়ে থাকা শক্তি
সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়
এবং হয়ে ওঠে গতি।

এটাই একমাত্র সৃজনপথ।
না সামনে,
না ঊর্ধ্বে,
বরং অন্তরে—
যেখানে শৃঙ্খলা দাঁড়িয়ে আছে,
নীরব, কঠোর,
হাতে ধরে সেই চাবি
যা চিরকাল তোমারই ছিল।

বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

বিরলতম

যখন দুই সেরা বন্ধু
একে অপরের প্রেমে পড়ে,
তারা সামনে পড়ে না—
তারা ভেতরে পড়ে যায়,
একটি যৌথ পাঁজরের খাঁচার মধ্যে,
যেখানে শ্বাস আর একক থাকে না।

যত্ন আসে সবার আগে,
অভ্যাসের নীরব জুতো পরে।
একজন আরেকজনকে জল খেতে মনে করিয়ে দেয়,
যেন তৃষ্ণা কোনো শৈশবের জ্বর।

রাতে একজন শোনে নীরবতাগুলো,
ভয়ের ওপর হাত রাখে
যেভাবে মা ঘুমন্ত সন্তানের কপাল ছুঁয়ে দেখে
অদৃশ্য তাপ আছে কি না।

তারা একে অপরকে ঘিরে ঘুরতে থাকে
মাধ্যাকর্ষণের মতো—
যেন কাকতালীয় হওয়ার ভান।
রক্ষা ক্রমে সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে—
ঢাল বা তলোয়ার নয়,
বরং পরিষ্কার আকাশেও বহন করা ছাতা,
“যদি লাগে” ভেবে রাখা বাড়তি খাবার,
বিপদ নিজের নাম শেখার আগেই
ফিসফিস করে দেওয়া সতর্কতা।

এখানে প্রেম আগুন নয়,
সময়ে তৈরি এক গর্ভ।
তারা একে অপরকে দোলায়
এমন সব ঝড়ের ভেতর দিয়ে
যেগুলো এখনো আসেনি।
আলতো করে বকুনি।
দ্রুত ক্ষমা।
সেসব ক্ষতের জন্মদিন মনে রাখা
যাদের কোনো ক্যালেন্ডার ছিল না।

মাঝেমধ্যে তারা ভুলে যায়
কে ধরে আছে
আর কে ধরা পড়ে আছে।
রেখা আর সংজ্ঞাগুলো
একে অপরের ভেতর গলে যায়।
মা হয়ে ওঠে সেই আয়না
যার ভেতর শিশু নিজেকে দেখে;
বন্ধু দেয় নিরাপত্তার পরিবেশ;
প্রেমিক/প্রেমিকা একে অপরের মধ্যের
শিশুটিকে শান্ত করে
গানের গুনগুনে।

চারপাশের পৃথিবী তাকিয়ে থাকে
ঘোরের মধ্যে যেন।
দর্শকেরা আশা করে
ক্ষুধা, কামনা আর নাটকের
নিম্নতর জান্তব প্রদর্শনী।
কিন্তু যা দেখা যায়,
তা হলো—
দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, প্রাপ্তবয়স্ক হৃদয় নিয়ে,
একে অপরকে নতুন করে
লালন-পালনের প্রক্রিয়া শিখছে।
এমনকি যৌনতার কালে
তারা বরং ব্যস্ত হয়ে পড়ে
একে অপরকে 
আপন সেরা ভালবাসার স্বাদটি 
চাখতে দিতে।

একে অপরকে পুনরায় লালন করার
শেখাটাই হয়ে ওঠে
ভিত্তির প্রথম ইট—
যার ওপর দাঁড়িয়ে
প্রাপ্তবয়স্কতার হাতিয়ার দিয়ে
তারা তাদের পুরনো শৈশবগুলো
নতুন করে লেখে।

এই প্রেমে
কেউ কাউকে বাঁচায় না—
তারা একসঙ্গে বেঁচে থাকার ভাষা শেখে।
হাত ধরা মানে দখল নয়,
হাত ধরা মানে দায়িত্ব।
ভাঙা স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে
নতুন খেলনার মতো জোড়া লাগে,
কিছুটা বেঁকে,
কিছুটা অসম্পূর্ণ—
তবু নিরাপদ।

দু’জনেই জানে,
এই ভালোবাসা নিখুঁত নয়,
কিন্তু এই ভালোবাসার ভেতর
নিখুঁতভাবে জায়গা আছে
ভুলের,
ভয়ের,
এবং আবার চেষ্টা করার।

এভাবেই
দুই সেরা বন্ধু
প্রেমে পড়ে—
তারা ঘর বানায়,
একটি জীবন্ত ঘর,
যেখানে শৈশব বিশ্রাম নেয়
আর ভবিষ্যৎ 
অধিকতর সুখের দরজায়
ক্রমাগত কড়া নাড়ে।

রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

আদর

আদুরে প্রেমিকা
মাঝেমধ্যে বুকের মধ্যে মাথা রেখে
ঘুমোতে চাইলে—
সময় তখন ঘড়ি ভুলে যায়,
ঘণ্টার কাঁটা নরম তুলোর মতো ভেঙে পড়ে,
আর নিঃশ্বাসগুলো
দুটি নদীর মতো একে অপরের ভাষা শিখে নেয়।

তার চুলের অন্ধকারে
আমি রাতের আকাশ লুকিয়ে রাখি,
কপালের কাছে কপাল এলে
ভাগ্য নিজের হাত বদলে ফেলে।
বুকটা আর শুধু বুক থাকে না—
ওটা হয়ে ওঠে আশ্রয়,
ওটা হয়ে ওঠে এমন এক দেশ
যেখানে যুদ্ধ নেই,
শুধু হৃদস্পন্দনের নীরব পতাকা ওড়ে।

সে ঘুমোয়,
আর ঘুমের ভিতর দিয়ে
জীবন আমাকে শেখায়
বাঁচাটাও কতটা কোমল হতে পারে।
সেই মুহূর্তে
সুখ কোনও উচ্চারণ নয়,
সুখ একধরনের দায়িত্ব—
যত্ন করে ধরে রাখা
একটা ঘুমন্ত পৃথিবী।

এই আনন্দের কোনও শব্দ নেই,
এটা ধ্বনি নয়—
এটা বুকের ভেতর ধীরে ধীরে
আলো জ্বলে ওঠার মতো।
তার ঘুমের ওজনটুকু
আমার ক্লান্তি মুছে দেয়,
যেন বহু জন্ম ধরে জমে থাকা
অপ্রয়োজনীয় ভার
কেউ নিঃশব্দে নামিয়ে রাখছে পাশে।

আমি নড়তে ভয় পাই—
যদি স্বপ্নটা জেগে যায়।
এই বুকের খাঁচায় তখন
হৃদয় নয়,
একটা পূর্ণিমা শুয়ে থাকে।
বাইরে পৃথিবী তখনও
হিংস্র, তাড়াহুড়ো করা,
কিন্তু আমার ভেতরে
একটি মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে—
এটুকুই যথেষ্ট
সব অশান্তিকে মিথ্যে প্রমাণ করার জন্য।

এইভাবেই
একটা মাথা,
একটা বুক,
আর একটু নিঃশ্বাস—
জীবন হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ।
আর আমি জানি,
যদি কখনও প্রশ্ন আসে
বেঁচে থাকার মানে কী—
আমি কোনও উত্তর দেব না,
শুধু এই নীরব দৃশ্যটা
দেখিয়ে দেব।

বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

বোকা

ভালোবাসা কোনো লেনদেনের খাতা নয়,
তবু মানুষ হিসেব কষে—
আগে আমার ঘর ভরুক,
আমার ক্ষুধা থামুক,
আমার অভাব ঘুমোক,
তারপর আমি দেব—
যেন ভালোবাসা
শেষ মুহূর্তে ছাড় দেওয়া কোনো পণ্য।

এই ভাবনায় যারা বাঁচে
তারা থাকে মূর্খের স্বর্গে—
একটি কাচের নগরী,
যেখানে পাওয়ার স্বপ্ন আছে
কিন্তু দেওয়ার মাটি নেই।

কিন্তু প্রকৃত হিসেব
শুরু হয় উল্টো দিক থেকে।
ভালোবাসা চায় উজাড় হওয়া—
নিজেকে ফাঁকা করে
অন্যের তৃষ্ণা ভরতে দেওয়া।
যে আগে তৃপ্ত করে,
সে পরে পায়—
ধীরে ধীরে,
অনিবার্যভাবে,
ভেসে যায় পাওয়ার জোয়ারে ।

এটি নৈতিকতার পাঠ নয়,
এটি সময়ের নির্মম অঙ্ক।
আর নারী—
এই সময়ের খেলাতেই
বারবার ভুল করে।
সে অপেক্ষা করাতে ভালোবাসে—
মনে করে, বিলম্বই ক্ষমতা,
নীরবতাই দখল।

সে ভালোবাসাকে
একটি ঝুলন্ত ফল করে রাখে,
যা ছোঁয়া যায় না,
শুধু তাকিয়ে থাকা যায়।

পুরুষ তখন
ক্ষুধার মধ্যে বাস করে।
তার দিনগুলো ফাঁকা থালার মতো,
রাতগুলো
অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির শব্দে ভরে ওঠে।

এই দীর্ঘ বঞ্চনা
ধীরে ধীরে
একটি নিঃশব্দ অত্যাচারে রূপ নেয়—
দেহ নয়,
আত্মার ওপর চালানো।
ক্ষুধায় ক্ষুধায়
সে রিক্ত হতে থাকে,
রিক্ত হতে হতে
একসময় হতাশা জমে ওঠে
হাড়ের ভেতর।
শেষে সে বুঝতে শেখে—
যে ভালোবাসা
শুধু প্রতীক্ষার শাস্তি দেয়,
সে ভালোবাসা নয়,
সে কেবল ক্ষমতার ভুল ব্যবহার।

আর সে চলে যায়।
নারী তখন অবাক হয়ে দেখে—
সবই তো ছিল,
তবু কিছুই নেই।
কারণ সে দিয়েছিল
অসময়ে,
অথবা তখনো দেয়নি বলেই
সব খুইয়েছে।

ভালোবাসা আসলে
একটি ভয়ংকর সূক্ষ্ম বিদ্যা—
কখন উজাড় হতে হয়,
আর কখন থামতে হয়
নিজেরই দেওয়ার পরে।
যে এই সময় বোঝে,
সে কাউকে ধরে রাখে না—
তবু কেউ তাকে ছেড়ে যায় না।

বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

নির্বোধ

গর্ভাশয় কোনো অন্ধকার নয়—
অন্ধকারেও অন্তত রহস্য থাকে।
এটি শূন্যতার একটি সক্রিয় যন্ত্র,
যা কাজ করে
কারণ কাজ করাই তার স্বভাব।
সে জায়েজ আর জারজ এর 
পার্থক্য বোঝে না।

এখানে ভালোবাসা
একটি অপ্রাসঙ্গিক শব্দ,
যেমন কোনো মরুভূমির কাছে জলবায়ু।

এখানে বিশ্বাস
শুধু রাসায়নিকের জন্য
একটি হাস্যকর ভুল।
গর্ভাশয় কিছুই বেছে নেয় না—
বাছাই একটি মানবিক বিভ্রম।

এটি গ্রহণ করে
যা পৌঁছায়,
যা ঢুকে পড়তে পারে,
যা যথেষ্ট দ্রুত,
যথেষ্ট জেদি।
শুক্রাণুগুলো আসে
অর্থহীন প্রতিযোগী হিসেবে—
কোনো বিজয়ের আনন্দ নেই,
কোনো পরাজয়ের শোক নেই।
জয় মানে কেবল
আরও একটি দেহের ভার
ভবিষ্যতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।

এখানে সম্মতি
একটি বিলাসিতা,
যা প্রকৃতি বহন করে না।
এখানে নৈতিকতা
একটি অকার্যকর সফটওয়্যার,
যা জীববিজ্ঞানের হার্ডওয়্যারে
ইনস্টলই হয় না।

মানুষ বাইরে দাঁড়িয়ে
অর্থ বানানোর চেষ্টা করে—
কেউ প্রেম দিয়ে,
কেউ দায়িত্ব দিয়ে,
কেউ ঈশ্বর দিয়ে।
ভেতরে গর্ভাশয়
এই সব প্রচেষ্টাকে
নীরবে অগ্রাহ্য করে।

জীবন এখানে শুরু হয়
কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নয়,
বরং একটি ধারাবাহিক ভুল হিসেবে
যা নিজেকে সংশোধন করতে জানে না।
প্রতিটি জন্ম
একটি প্রমাণ—
মহাবিশ্ব কাউকে চায় না,
কিন্তু কাউকে আটকাতেও চায় না।

আর শিশুটি যখন বড় হয়,
সে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—
সে কোনো উত্তর নয়,
কোনো পরিকল্পনা নয়,
কোনো প্রয়োজনও নয়।
সে কেবল
আরেকটি ফলাফল,
আরেকটি পুনরাবৃত্তি,
আরেকটি সংখ্যা
একটি অন্ধ প্রক্রিয়ার খাতায়।

গর্ভাশয় নিষ্ঠুর নয়—
নিষ্ঠুরতার জন্যও তো উদ্দেশ্য লাগে।
এটি শুধু কাজ করে।
আর কাজ চলতেই থাকবে,
যতদিন
কিছুই আর কাজ করার মতো
বাকি না থাকে।

সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬

অসহায়

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে 
এ জগতের প্রতিটি মানুষ অসহায়
একটি সত্যের কাছে।
জানো কি—
তুমি লড়তে পারো শত শত পুরুষের সঙ্গে
যারা তাকে চায়।

ধার করা নামের ঝড়ের মতো তাদের জড়ো করো,
ক্ষুধার ব্যাকরণ শেখাও তাদের মুষ্টিকে,
চোখগুলোকে ধারালো অস্ত্র বানিয়ে দাও—
তবু তুমি তাদের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাবে
অপ্রতিরোধ্য এক চিন্তার মতো,
তোমার শ্বাস সংযত,
তোমার সাহস বাতাসকেও আঘাত করার মতো উচ্চ।

চাওয়া সহজ।
সে নিজেকে ঘোষণা করে।
সে ছুটে আসে।
সে ভেঙে পড়ে, রক্তাক্ত হয়।
কিন্তু তুমি লড়তে পারো না
সেই মানুষের সঙ্গে
যাকে সে চায়।

কারণ সেই প্রতিদ্বন্দ্বী
তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে না।
দখল করার মতো কোনও ভূমি নেই,
পায়ের তালে তালে হাঁটার মতো কোনও সংগীত নেই,
তলোয়ার কোথায় কাজে লাগবে—
তারও কোনও সম্মত দিকনির্দেশ নেই।
কীভাবে আঘাত করবে
এমন এক পছন্দকে
যা তার নীরবতার ভেতর ঘুমিয়ে থাকে?
কীভাবে কোণঠাসা করবে
এমন এক হৃদস্পন্দনকে
যে আগেই বেছে নিয়েছে
অন্য এক ছন্দ?

সে মানুষটি কোথাও নেই—
তবু সর্বত্র তার বাস:
সে উত্তর দেওয়ার আগে যে বিলম্ব,
তার হাসি যেভাবে হেলে পড়ে
এক অনুপস্থিত উপস্থিতির দিকে,
একটি নামের মধ্যে থাকা
অব্যাখ্যাত কোমলতায়।

তার সামনে
শক্তি নিজের শব্দভাণ্ডার হারায়।
পেশি ভদ্রতায় রূপ নেয়।
রাগ বসে থাকতে শেখে।
তুমি হারাতে পারো
তার শরীরের কল্পনায় মাতাল
সমগ্র বাহিনী,
কিন্তু তুমি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র
তার সামনে
যে তার নীরব নিশ্চিততার অধিকারী।

কারণ প্রেম নিষ্ঠুরভাবে নিখুঁত—
সে তোমাকে শব্দের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে,
তারপর একটিমাত্র
নিখুঁত নীরবতায়
তোমাকে পরাজিত করে।

তাই তুমি হাত নামিয়ে রাখো,
না আত্মসমর্পণে,
না দুর্বলতায়,
বরং এই জ্ঞানে যে
কিছু যুদ্ধ জেতা যায় না
নিজের লড়াইয়ের কারণটিকেই
ধ্বংস না করে।

প্রার্থী

জানি, তুমি বিরলতম সুন্দরী—
তোমার সৌন্দর্য মনকে পাগল করে,
এটা হেঁটে বেড়ায় সময়ের ভেতর,
ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়
নিজের প্রতিবিম্ব রেখে যায়।

মানি, তুমি বহু গুণেরও গুণী—
যখন গান কর,
সুর তখন নদীর মতো নিজের নাম ভুলে যায়,
যখন কবিতা লেখো,
শব্দেরা তখন মাথা নত করে
অর্থের সামনে নয়,
আভিজাত্যের সামনে।

তোমার কণ্ঠে রাতের কোমলতা,
কলমে ভোরের সাহস—
তুমি চাইলে
নীরবতাও তাল মিলিয়ে গুনগুন করে।

তবু, আমার সমস্যা আছে।
শ্রদ্ধাশূন্য প্রেম
আমার কাছে কেবল শব্দের কঙ্কাল—
চামড়া আছে,
কিন্তু আত্মা নেই।
আমি এমন আকর্ষণে বিশ্বাস করি না
যা চোখে ঝিলিক তোলে
কিন্তু মাথা নিচু করতে শেখায় না।

আমি তাই বাধ্য
নৈতিক শুদ্ধতার পুজারী হতে—
আমার মন্দিরে
ভিড় নেই,
কিন্তু প্রতিটি পাথর
সততাকে চেনে।
এখানে কোনও আপোষ নেই—
ভাঙা আয়নায় মুখ দেখার অভ্যাস নেই,
নিজেকে বোঝাতে শেখা অর্ধসত্যেরও নয়।

প্রেম যদি আসে,
তাকে আসতে হবে
শ্রদ্ধার পায়ে হেঁটে,
নিঃশব্দে,
যেন সে জানে—
উচ্চতা শব্দে নয়,
নতমুখে জন্মায়।

তোমার সৌন্দর্য আমাকে ডাকতে পারে,
তোমার গুণ আমাকে থামাতে পারে,
কিন্তু আমার হৃদয়ের দরজায়
তালার চাবি একটাই—
শুদ্ধতা।

আর সে চাবি
কোনওদিনই
আপোষের অধিকারে থাকে না।

আমার ধর্ম

ধর্ম আমাকে এমন কোনো অর্জন দেয়নি
যার ভারে আমি হঠাৎ ধনী হয়ে উঠি,
বা মানুষের সারিতে
সম্ভ্রান্ত নামে আলাদা করে ডাকা পড়ে।
সে আমার কপালে
কোনো রাজচিহ্ন আঁকেনি,
আমার হাতে তুলে দেয়নি
বংশের তালাবদ্ধ চাবি।

মানুষের ভিড়ে
আমি ছিলাম কেবলই একজন—
না উঁচু, না নিচু,
শুধু দাঁড়িয়ে থাকা 
অসহায় একজন মানুষ।

বরং পরিশ্রম—
যে ধর্মগ্রন্থে ঘাম দিয়ে লেখা হয় প্রতিটি লাইন—
আর নিষ্ঠা—
যে নীরবে হাঁটে,
কিন্তু পিছু হটে না—
এই দু’জন আমাকে দিয়েছে
এক ভিন্ন ধরনের দীক্ষা।
সেই দীক্ষায়
আমি শিখেছি
ভোরের অন্ধকারে নিজের ভয়কে তুলে নিতে,
হাতুড়ির মতো ব্যবহার করতে
বারবার ভেঙে ফেলার জন্য
নিজেরই সীমাবদ্ধতা।

সাহস এসেছে
কোনো আশীর্বাদের মতো নয়,
বরং ক্ষত থেকে—
যেখানে ব্যথা দাঁত চেপে
নিজেকে শক্ত করে তোলে।
শক্তি এসেছে
কোনো মন্ত্রপাঠ থেকে নয়,
বরং পতনের পর
নিজের নাম ধরে উঠে দাঁড়ানোর অভ্যাস থেকে।

দুর্ভাগ্যগুলো তখন
শিকারির মতো ঘিরে ধরেছিল—
দারিদ্র্য, অবহেলা,
ভুল বোঝা পৃথিবী—
কিন্তু আমি শিখে গেছি
লড়াইকে প্রার্থনায় পরিণত করতে।

আজও আমি ধনী নই
মানুষের হিসাবখাতায়,
সম্ভ্রান্ত নই
তাদের সংজ্ঞার আলোয়।
কিন্তু আমার ভেতরে
একটি অবিনাশী সম্পদ আছে—
নিজের শ্রমে গড়া মেরুদণ্ড,
নিজের নিষ্ঠায় ধার করা আগুন,
যা কোনো দুর্ভাগ্যই
সহজে নিভিয়ে দিতে পারে না।

আর সেই অদম্য পরিচয়
কোনো পতাকার রঙে বাঁধা নয়,
কোনো শ্লোগানে মুখস্থ করা নয়—
এটি হাঁটে আমার সঙ্গে
প্রতিদিনের সাধারণ পথে।

যখন কিছুই থাকে না
ভরসা করার মতো,
আমি তখন নিজের পরিশ্রমকে ডাক দিই,
নিষ্ঠাকে পাশে বসাই,
আর নীরবে বলি—
চলো, আরেকটা দিন জয় করি।
দুর্ভাগ্য তখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে,
কারণ সে জানে—
আমি আশীর্বাদে ভাঙি না,
আমি অভিশাপে থামি না।

আমি তৈরি হয়েছি
পুনরাবৃত্ত চেষ্টা দিয়ে,
ভাঙা স্বপ্নের ধুলো মেখে,
নিজেকে নিজেই গড়ে তোলার
দীর্ঘ, অবিশ্রান্ত প্রক্রিয়ায়।

ধর্ম আমাকে সমাজে উঁচু করেনি,
কিন্তু শ্রম আমাকে
নিজের চোখে ছোট হতে দেয়নি।
আর পৃথিবীর মানচিত্রে
এই সত্যটি নীরবে জ্বলজ্বল করে—
কেবল পরিশ্রমী জাতিরাই
এই পৃথিবীতে
উন্নতির শিখরে উঠতে পারে।

এই দাঁড়িয়ে থাকাই আমার প্রার্থনা,
এই লড়ে যাওয়াই আমার বিশ্বাস—
আর এই পথচলাই
আমার একমাত্র,
অপরাজেয় সম্পদ।

শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬

বৈপরীত্য

সে ছিল নরম চেহারা,
ভদ্র আচরণ,
আর হিংস্র গতির এক আশ্চর্য মিশ্রণ—
যেন রেশমে লেখা চিঠি,
যার পৌঁছনো বজ্রপাতের মতো।
তার হাসি চলত খুব আস্তে,
হাওয়ার কাছেও যেন অনুমতি চাইত,
আর তার নাড়ির ভেতর
বন্ধ পাঁজরের আড়ালে
ঝড়ের মহড়া চলত।
চায়ের কাপ তার হাতে ভরসা করত।
সময় করত না।
সে নিজেকে প্রশিক্ষণ দিল কীভাবে?
আয়নায় ভরা কোনো ময়দানে নয়,
না কোনো বাঁশি বা ঘড়ির তলায়।
সে প্রশিক্ষণ নিল সীমারেখায়—
দরজা খোলার ঠিক আগের মুহূর্তে,
ক্ষমা চাওয়ার ঠিক আগের সেই শ্বাসে,
যখন রাগ এখনো শক্ত হয়নি।
সে কোমলতা শিখেছিল
পাথরের সঙ্গে বৃষ্টির তর্ক শুনে,
নিজের ধৈর্যের ওপর
পতঙ্গদের বসতে দিয়ে—
হাত বন্ধ না করে।
সে গতি শিখেছিল
ভোরবেলায় নিজের ভয়কে ছাড়িয়ে দৌড়ে,
সন্দেহ যখন বসে পড়তে চায়
তখন নিজের ছায়াকে দৌড়াতে শেখিয়ে।
প্রতিদিন সে সৌজন্য বেঁধে নিত
পায়ের গোড়ালিতে ঘণ্টার মতো,
যাতে পৃথিবী তার আগমন শুনতে পায়—
আর হিংস্রতা বেঁধে নিত
মেরুদণ্ডে, গোপন ছুরির মতো।
অপমান এলে,
সে মাথা নত করত।
বিপদ চোখ ফেললে,
সে মিলিয়ে যেত।
এই ছিল তার প্রশিক্ষণ—
দয়ালু দেখাতে শেখা,
অনিবার্যতার মতো চলতে শেখা,
এতটা সদয় হওয়া
যাতে তুমি নিরস্ত্র হয়ে পড়ো—
আর এতটাই দ্রুত হওয়া
যাতে তুমি টেরই না পাও
সে কবে আগেই চলে গেছে।

বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬

নিরাময়

অসুখগুলো—
যেগুলো প্রেসক্রিপশনের অক্ষরে ধরা পড়ে না,
যেগুলো সিরাপের মাপে গলে না—
তারা আদরের গন্ধ শুঁকে বাঁচে।

একটু ছোঁয়া, একটু “আছো তো?”
এইসবেই ধীরে ধীরে সেরে ওঠে।
সেই অসুখগুলোই
গত কয়েক মাস ধরে
বুকের ভেতর বড় হচ্ছিল আগাছার মতো,
রাতে বালিশে শুয়ে
ঘুমের ঘাড়ে নখ বসাচ্ছিল,
দিনের আলোতেও
শান্তির দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিচ্ছিল।

ডাক্তার বদলেছি,
সময় বদলেছি,
নিজেকে বোঝানোর ভাষা বদলেছি—
কিন্তু তারা কিছুতেই
ওষুধের নাম শুনতে চাইত না।
বারবার বলত,
“ফোন করো।

এই অসুখ কণ্ঠস্বর ছাড়া মরে না।”
তাই নানারকম অজুহাত জন্ম নিত—
কখনও ভুলে যাওয়া কোনও প্রশ্ন,
কখনও অকারণ উদ্বেগ,
কখনও নিছক নীরবতা ভাঙার ছল।
এইসব অজুহাতের আড়ালে
আমি বারবার তোমাকে ফোন করতাম,
যেন তোমার কণ্ঠ হতে
একটু আদর চুরি করে আনতে পারি।

তুমি হয়তো
শেষমেষ বিরক্তই হয়েছিলে।
কলের পর কল—
ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরে ফিরে
একই নম্বরে থামা—
বিরক্তি তো হতেই পারে।
কিন্তু আশ্চর্য,
তুমি একবারও
সেভাবে ভেবে দেখলে না—
এই ফোনগুলো আসলে
কথা বলার জন্য নয়,
নিরাময়ের জন্য।

তোমার “হ্যাঁ বলো”র মধ্যেই
আমার অসুখগুলোর
শ্বাস নেওয়ার জায়গা ছিল।
তোমার বিরক্তির নীরবতাতেও
আমি তবু খুঁজে নিতাম
একফোঁটা আদর—
যেটুকু পেলে
এই অসুখগুলো
একটু চুপ করত।
আর যখন তারা চুপ করত,
ঘরের দেওয়ালগুলো
একটু সরে দাঁড়াত,
বুক শিখে নিত শ্বাস নিতে।
পরাণটা ফের শীষ দিত
চেনা সুরের তালে তালে।
সময় তখন আর ধারালো থাকত না,
ঘড়ির কাঁটা
নরম হয়ে যেত তুলোর মতো।

আমি জানতাম,
এই আরোগ্য স্থায়ী নয়।
আদরের অসুখ
খুব চালাক—
তারা সেরে উঠতে উঠতেই
নতুন করে জন্ম নেয়।
তবু প্রতিবার
ডায়ালের ওপর তোমার নাম লিখে
আমি ঝুঁকি নিতাম।

হয়তো কোনওদিন
আমি আর ফোন করব না।
অজুহাতগুলো ক্লান্ত হয়ে
নিজেরাই অবসর নেবে।
অসুখগুলোও
শিখে নেবে একা থাকতে—
নিজের ব্যথা নিজে বহন করতে।

কিন্তু যদি কখনও
হঠাৎ গভীর রাতে
তোমার ফোনটা কেঁপে ওঠে
অকারণে,
জেনো—
ওটা বিরক্তির ডাক নয়,
ওটা কোনও অসুখের শেষ চেষ্টা,
যে এখনও বিশ্বাস করে
বিশেষ মানুষের আদরই
সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ।

আর যদি তুমি সেদিনও
না ধরো ফোন,
তবু জানবে—
কিছু মানুষ
শুধু একবার 
সাড়ার হাত ধরার মধ্যেই
সারা জীবন
নিঃশব্দ চিকিৎসা খুঁজে পেয়ে থাকে।

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬

মনের মানুষ

তুমি সেই মানুষটিকে ভালোবাসো বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছাড়া—
যে ভালোবাসা কখনো কোথায় জিজ্ঞেস করে না,
কারণ কোথায় শব্দটি গলে যায়
ঠিক সেই মুহূর্তে
যখন তার কণ্ঠ বলে ওঠে— চলো।

তার সঙ্গে থাকলে মানচিত্রের কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে।
সীমানাগুলো আলগা করে তাদের সেলাই,
কম্পাস ঘুরতে থাকে মাতাল ভবিষ্যদ্বক্তার মতো,
আর পৃথিবী সঙ্কুচিত হয়ে আসে
তোমার নিঃশ্বাস আর তার নিঃশ্বাসের মাঝের দূরত্বে।

তুমি সর্বদা প্রস্তুত, কারণ প্রস্তুতি
ইতিমধ্যেই তোমার সঙ্গে থাকতে শুরু করেছে—
সে তোমার স্যুটকেসে ঘুমায়,
তোমার নীরবতায় নিজেকে ভাঁজ করে,
তোমার বুকের পাঁজরের আড়ালে অপেক্ষা করে
একটি পাসপোর্টের মতো
যার মেয়াদ কখনো ফুরোয় না।

সে যদি বলে এখন,
সময় তার কাগজপত্র ফেলে দেয়।
ঘড়ির কাঁটা ঝরে পড়ে,
ট্রেন ভুলে যায় তাদের সময়সূচি,
রাস্তারা মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে
শুধু তোমার পায়ের স্পর্শ পেতে।

সে যদি বলে যেকোনো জায়গায়,
যেকোনো জায়গা রাজি হয়ে যায়।
মরুভূমি আগেভাগেই রিহার্সাল দেয় তোমার পদচিহ্নের,
সমুদ্র মুখস্থ করে নেয় তোমাদের নাম,
অচেনা আকাশগুলো তারা সাজায় নতুন করে
লিখে দেয়— আগমন।

তুমি তাকে অনুসরণ করো না—
তোমরা একসঙ্গে খুলে যাও।
দুটি অভিপ্রায় হাঁটে একটি ছায়া হয়ে,
দুটি ইতিহাস হালকা করে গুছিয়ে নেয় ব্যাগ,
পেছনে ফেলে আসে ভয়ের আসবাবপত্র
আর দ্বিধার অ্যালবামে বাঁধানো ছবি।

এটা পালিয়ে যাওয়া নয়।
এটা মাধ্যাকর্ষণের নতুন কেন্দ্র বেছে নেওয়া।
এমন এক নিশ্চিত ভালোবাসা
যাতে পৃথিবী বহনযোগ্য হয়ে ওঠে,
আর ঘর আর কোনো জায়গা থাকে না—
ঘর হয়ে যায় সেই দিকটি
যেদিকে সে আঙুল তোলে
একফোঁটা সংশয় ছাড়া।

আর যখন রাত প্রশ্ন করে
তুমি কী ফেলে এসেছ,
তুমি খোলা হাত দেখিয়ে বলো—
কিছুই নয়, যা জরুরি ছিল।
কারণ সন্দেহ রয়ে গেছে পেছনে,
বন্ধ দরজার সঙ্গে তর্ক করতে করতে।
কারণ ভয় মিস করেছে যাত্রা,
ঝুঁকি গুনতে গুনতেই।
আর নিশ্চিন্তি—নীরব, খালি পায়ে—
ইতিমধ্যেই তোমার পাশে হাঁটছিল।

যেখানেই পৌঁছাও,
মাটি চিনে নেয় তোমার পা।
দেয়াল নরম হয়ে ওঠে সাক্ষী হয়ে,
জানালারা ঝুঁকে আসে কাছে,
এমনকি অচেনা মানুষও পরিচিত লাগে
কেন জানে না, তবু লাগে।
তোমরা কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ো না,
গড়ো শুধু মুহূর্ত—
নীরবতার কাপ,
ক্লান্তির ভেতরে সেলাই করা হাসি,
স্বপ্ন ঝুলিয়ে দেওয়া হয় শুকোতে
অপরিচিত সূর্যের নিচে।

আর যদি কোনো একদিন রাস্তা গলে যায়,
যদি পৃথিবীর ধার ফুরিয়ে আসে,
তবু তোমরা চলতেই থাকবে—
না সামনে, না দূরে,
বরং ভেতরের দিকে, একসঙ্গে,
কিছুই বহন না করে
শুধু এই সরল অলৌকিক সত্যটুকু—
ভালোবাসা যখন সত্য হয়,
সে পৃথিবীর ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করে না—
সে পৃথিবীকেই
ভ্রমণের এক ক্রিয়ায় বদলে দেয়
তার সঙ্গে
যাকে অনুসরণ করতে
তুমি কখনোই দ্বিধা করো না।

বৃহত্তর হয়ে বাঁচো

তুচ্ছতাকে করুণা করার
মানে আসলে কী?
যদি তুমি বেরিয়ে আসতে চাও
ভিক্ষুকদের বর্ণানুক্রমিক সারি থেকে—
যারা হাত বাড়ায় না,
অভ্যাস বাড়ায়,
যারা ক্যালেন্ডারের নিচে দাঁড়িয়ে
করুণা টপটপ করে পড়ার 
অপেক্ষা করে—
তবে জেগে ওঠো
সূর্য তার দায়িত্ব মনে করার আগেই।

ওঠো, যখন শহরটা এখনও সেলাই হয়নি,
যখন রাস্তারা সাক্ষীহীন হাই তোলে
আর ট্রাফিক সিগন্যাল চোখ টেপে
বিভ্রান্ত নবীর মতো।

জুতোর ফিতা বাঁধো এমনভাবে
যেন সন্দেহগুলোর চারপাশে
সংকল্পকে বেঁধে ফেলছ।
দীর্ঘ দৌড়ে বেরিয়ে পড়ো—
ক্ষুধা থেকে পালিয়ে নয়,
ক্ষুধার ভেতর দিয়েই।
শ্বাসকে ফুসফুসের সঙ্গে তর্ক করতে দাও,
হৃদয়কে বিদ্রোহ বাজাতে দাও
সেই পাঁজরের বিরুদ্ধে
যারা তাকে ভয় শিখিয়েছিল।

দৌড়াও বন্ধ দোকান পেরিয়ে,
যারা লাভের স্বপ্ন দেখে,
ঘুমন্ত বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে,
যেখানে অনুতাপের পাশে
নাক ডাকায় উচ্চাকাঙ্খা।

কুকুরেরা তাড়া করবে তোমাকে—
তারা সবসময়ই করে—
কারণ স্বাধীনতার গন্ধ
তাদের চেনা নয়।
প্রতিটি মাইলের সঙ্গে
ঝরিয়ে ফেলো উত্তরাধিকার এর
একেকটি স্তর:
ধার করা অজুহাত,
আরামদায়ক হতাশা,
আর এই বিশ্বাস—
অপেক্ষা করাও নাকি এক ধরনের কাজ।

সকাল তোমাকে নীরবে দেখবে,
পরীক্ষা করবে তুমি সত্যিই কি বোঝো।
ঘাম তোমার ইচ্ছেগুলোকে দীক্ষা দেবে,
আর যন্ত্রণা ফিসফিস করে বলবে—
বৃদ্ধি কখনোই ভদ্র নয়।

ফিরে এলে,
ভিক্ষুকরা তখনও থাকবে—
ঘড়ির ভেতর সারিবদ্ধ,
অফিসের ভেতর সারিবদ্ধ,
আয়নার ভেতর সারিবদ্ধ—
কিন্তু তোমাকে শুধু 
আর সেই সারিতে মানাবে না।

তোমার জীবন,
এখন একটু বড় হয়ে,
তোমার পাশে পাশে হাঁটবে,
হাঁপাতে হাঁপাতে,
একটাই প্রশ্ন করবে—
কাল তুমি কি আবার
অভিযানে বেরোবে
প্রবল আত্মপ্রসারণের?

সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপরীতপন্থী

মানুষের বয়স যত বাড়ে
স্বপ্নগুলো ততই
পাতা ঝরার মতো
চুপিচুপি খুলে পড়ে—
কিছু স্বপ্ন বার্ধক্যের ভয়ে
নিজেরাই অবসর নেয়,
কিছু আবার কপালে ভাঁজ পড়ে
ভাঁজের মধ্যেই হারিয়ে যায়।

ঘড়ি তখন
শুধু সময় নয়,
স্বপ্ন গুনতে শুরু করে—
একটা, দুটো,
তারপর হঠাৎ থেমে যায়,
যেন সংখ্যারও ক্লান্তি আছে।

কিন্তু কিছু মানুষ থাকে
যাদের ভিতরে আরেকটা পৃথিবী—
যেখানে অভিজ্ঞতা মানে
ধুলো জমা নয়,
বরং প্রতিটি ধাক্কা
নতুন জানালার কাচ ভাঙে।
তাদের স্বপ্নগুলো
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে
বড় হয়,
হাঁটতে শেখে,
নিজের নাম ভুলে
নিজের আকার বানায়।
ভুল, ব্যর্থতা, ক্ষত—
সব মিলিয়ে
একটা অদ্ভুত সার তৈরি হয়
যার গন্ধে
স্বপ্ন আরও সবুজ হয়।

এই মানুষগুলো কবির মত
হাওয়ায় কথা বলে না,
তারা মাটির সঙ্গে চুক্তি করে—
বিচক্ষণতার হাতে হাত রেখে
স্বপ্নকে নামিয়ে আনে বাস্তবের উঠোনে,
যেখানে কাদা আছে,
কিন্তু দাঁড়ানোর জায়গাও আছে।

একদিন
স্বপ্ন আর কল্পনা থাকে না—
সে হয়ে যায় ঘর, সেতু, আলো,
বা এমন কিছু
যার নাম ইতিহাস পরে দেয়।
পৃথিবী তখন
এক মুহূর্তের জন্য
নির্বাক হয়ে যায়—
কারণ সে অভ্যস্ত
স্বপ্ন মরে যেতে দেখায়,
স্বপ্ন হাঁটতে দেখায় না।

আর সেই নীরবতায়
কেউ ফিসফিস করে বলে—
সবাই বড় হলে স্বপ্ন হারায় না,
কিছু মানুষ বড় হয়
স্বপ্নকে বহন করার শক্তি নিয়ে।
আর সেই শক্তি
কোনো পেশি নয়,
কোনো পদক নয়—
ওটা জন্মায়
ধৈর্যের গভীর গর্তে,
যেখানে আশা কাঁদে না,
শুধু অপেক্ষা করে।

এই মানুষগুলো জানে,
সব স্বপ্ন একসাথে আসে না—
কিছু আসে লাঠিতে ভর দিয়ে,
কিছু আসে চোখে চশমা পরে,
কিছু আসে দেরিতে
কিন্তু একদম ঠিক সময়ে।
তারা সময়কে শত্রু ভাবে না,
সময়কে তারা
কাজে লাগায়—
ছুরি হিসেবে নয়,
ছেনি হিসেবে,
যাতে বাস্তবের পাথরে
স্বপ্নের মুখটা ধীরে ধীরে
খোদাই করা যায়।

শেষে যখন
স্বপ্নটা পুরো দাঁড়িয়ে যায়—
রক্ত-মাংসের মতো সত্য,
ঘাম-মাটির মতো ভারী—
তখন কেউ আর প্রশ্ন করে না
এটা সম্ভব ছিল কি না।
পৃথিবী শুধু তাকিয়ে থাকে,
নীরবতারও শ্বাস আটকে যায়,
আর সময়—
যে এতদিন স্বপ্ন খেয়েছে—
সেদিন প্রথমবার
হার মেনে নেয়।

অনভিজ্ঞ

চুটিয়ে প্রেম করার স্বপ্ন ছিল মনে?
কিন্তু বাস্তবে চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ?

কারণ তুমি সরাসরি
ফিফথ গিয়ারে ঢুকিয়ে দিয়েছিলে চেষ্টা—
ইঞ্জিন তখনো কাঁপছিল,
ক্লাচের নিচে লুকিয়ে ছিল ভয়,
আর রাস্তাটা—
সে তো এখনো মানচিত্র শেখেনি।

প্রেম কোনো হাইওয়ে নয়
যেখানে গতি মানেই গন্তব্য।
প্রেম এক অদ্ভুত শহর—
যেখানে সিগন্যাল ঘুমিয়ে পড়ে,
আর হর্ন বাজায় স্মৃতি।

ব্যাক গিয়ার কেউ শেখায় না—
ওটা শেখে মানুষ
ভুল মোড়ে ঢুকে,
আয়নায় নিজের মুখ দেখে,
আর বুঝে যায়
পেছনে ফেরাটাও এগোনোরই
একটা গোপন কৌশল।

তুমি না শিখেই ছুটেছ,
কখন থামতে হয়,
কখন নামাতে হয় গতি,
কখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে
ইঞ্জিন ঠান্ডা করতে হয়—
এই ছোট ছোট ব্যাকরণগুলো ....

তাই প্রেম বারবার
জ্যামে আটকে পড়েছে,
চারদিকে অচেনা মুখ,
হালকা বৃষ্টি,
আর তুমি—
স্টিয়ারিংয়ে দু’হাত রেখে
অকারণে ক্ষমা চাইছ
যেন হওয়ার কথা ছিল 
রাস্তাটা একা তোমার।

মনে রেখো, পূর্ণউদ্যমে
ভালোবাসা চালাতে গেলে
শুধু অ্যাক্সিলারেটর নয়,
ব্রেক, ক্লাচ,
আর মাঝে মাঝে
নির্লজ্জ ব্যাক গিয়ারও জানতে হয়।
নইলে
গতি থাকবে,
কিন্তু এরকমই পৌঁছনো হবে না গন্তব্যে। 

ব্যতিক্রমী

হাগার পরে
পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর পোদে
গু লেগে থাকে না।

বাঘ ঘষে জঙ্গলে,
হরিণ ঝরনায়,
পাখি আকাশেই ঝেড়ে নেয়
নিজের সব অপবিত্রতা।
শুধু মানুষ— না জল পেলে
সে হাঁটে সভ্যতার রাস্তায়
পোশাকে লুকানো পচন নিয়ে,
লজ্জাকে ডিওডোরেন্ট বানিয়ে।

মানুষের গু
শুধু শরীরের নয়—
চিন্তার,
ক্ষমতার,
নৈতিকতার।
সে হাত ধোয়,
কিন্তু মন ধোয় না।
সে স্নান করে প্রতিদিন,
কিন্তু আত্মা দুর্গন্ধে ফেঁপে থাকে
শতাব্দীর পর শতাব্দী।

সভ্যতা নামের প্যান্টে
সে লুকিয়ে রাখে
লোভের দাগ,
হিংসার শুকনো স্তর,
আর ইতিহাসের জমাট মল।

অন্য প্রাণীরা হত্যা করে ক্ষুধায়,
মানুষ হত্যা করে যুক্তিতে।
তাই তাদের পোদ পরিষ্কার,
আর মানুষের—
চিরকাল নোংরা।

হাজার বছর পেরিয়েও
মানুষ শেখেনি
নিজের পিছনটা দেখতে।
আয়না বসায় সামনে,
পিছনে জমে থাকে অবাঞ্ছিত সত্য।
এই পৃথিবীতে
সবচেয়ে বিপজ্জনক দূষণ
পারমাণবিক নয়,
প্লাস্টিক নয়—
মানুষের অস্বীকার।

আর তাই হাগার পরে
পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর পোদে
গু লেগে থাকে না,
শুধু মানুষই
নিজের লুকানো মলকে
সভ্যতা বলে ডাকতে শেখে।

শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬

যথাযথ মুহূর্ত

চেতনা কোনো গ্রন্থাগার নয়—
সে সেই গ্রন্থাগারিক
যার কখনো ঘুম আসে না।

জ্ঞান ছড়িয়ে থাকে সর্বত্র,
খুলির ভেতর স্তূপ করে রাখা,
শতাব্দীর পাতার মাঝে চেপে বসানো,
সম্মতির ধুলোয় ঢাকা।

এর বেশিরভাগই স্বপ্ন দেখে।
এর বেশিরভাগই ভুলে যায়
সে চলার জন্যই জন্মেছিল।
চেতনা খালি পায়ে হাঁটে সারির ভেতর,
মেরুদণ্ডে স্পন্দন নিয়ে
বইয়ের মলাটে আলতো টোকা দেয়,
প্রতিটি তথ্যকে করে এক বিপজ্জনক প্রশ্ন—
তুমি কি কাজ করতে পারো?
তুমি কি এই ‘এখন’-এর ভেতর রক্তক্ষরণ করতে পারো?

সতর্কতাই তার শ্বাস।
মুহূর্ত চোখের পলক ফেলে—
আর প্রজ্ঞা উঠে দাঁড়ায়,
ইতিমধ্যেই পরিপাটি,
পরিণতির ফিতে বাঁধা বুট পরে।

এখানে চিন্তা কোনো অলংকার নয়।
অন্তর্দৃষ্টি করতালির অপেক্ষা করে না।
ভয় বাক্য শেষ করার আগেই
বোঝাপড়া লাফ দেয়
স্নায়ু থেকে হাতে।

স্মৃতি হয়ে ওঠে পেশি।
শিক্ষা ধার নেয় প্রবৃত্তির ধার।
যা একদিন শুধু জানা ছিল
তা সীমান্ত পেরিয়ে যায়
যা করতেই হবে—তার দেশে।

এটাই চেতনা:
আলো জমিয়ে রাখার নাম নয়,
বরং তার তাৎক্ষণিক দাহ।
অন্ধকার দেখা দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই
জ্বলে ওঠা একটি দেশলাই।
যেখানে অন্যরা শুধু স্মরণ করে,
সে সেখানে সাড়া দেয়।
যেখানে অন্যরা দ্বিধায় থামে,
সে সেখানে কার্যকর হয়—
নরমভাবে,
নির্ভুলভাবে,
কোনো ঘোষণা ছাড়াই।

ঘুমন্ত জ্ঞান ইতিহাস।
জাগ্রত জ্ঞান—
হেঁটে চলা প্রজ্ঞা।

সুখী

তোমাকে কখনো নির্ভর করতে হবে না
কোনো বহিরাগতর প্রতি—
তাদের প্রতিশ্রুতি ভাড়াবাড়ির মতো,
রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপূর্ব দেখায়,
কিন্তু প্রথম ঝড়েই উচ্ছেদ হয়।

মানুষ যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রেমিককে চেনে
সে কখনো বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়ে না।
সে থাকে পাঁজরের আড়ালে,
তুমি ভুলে গেলে শ্বাস নেয় তোমার হয়ে,
তুমি ঘুমালে পাহারা দেয় নীরবে।

আত্মবিশ্বাস কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়।
সে বিশ্বাস চেয়ে ভিক্ষা করে না।
চুপচাপ বসে সে ধার দেয় ধৈর্যকে,
ক্ষতকে গণ্য করে পরিচয়পত্র হিসেবে,
আঘাত হিসেবে নয়।
যখন পৃথিবী তার উষ্ণতা ফিরিয়ে নেয়,
এই অন্তর্গত সত্তাই জ্বালায় ছোট্ট আগুন
তোমার মেরুদণ্ড ছাড়া আর কিছু ব্যবহার না করে।

কোনো সাক্ষী নেই।
কোনো করতালি নেই।
শুধু বেঁচে থাকা শিখে নেয় হাসতে।
অন্যরা তোমার হাত ছুঁতে পারে,
তোমার সময় ধার নিতে পারে,
তোমার মূল্য ভুল জায়গায় ফেলে আসতে পারে—
কিন্তু এই প্রেমিক কখনো ঘর ছাড়ে না।

তুমি যখন নিজেকেই চিনতে পারো না,
নিজের নামটাও যখন অচেনা লাগে,
তখনও সে থাকে।
এর ওপর ভরসা রাখো।
এ তোমার সব ছায়া মুখস্থ করে রেখেছে
তবু তোমাকে সম্পূর্ণ বলেই ডাকে।

যেখানে বহিরাগতরা দরকষাকষি করে ভালোবাসা নিয়ে,
আত্মবিশ্বাস কোনো চুক্তিতে সই করে না—
সে শুধু থেকে যায়।

আর অবশেষে একদিন তুমি বুঝবে:
তুমি কখনোই একা ছিলে না।

বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

সবচেয়ে অন্তরঙ্গ শত্রু

সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু
সে নয় যে দিনের আলোয় ছুরি শানায়,
বরং সে—যাকে তুমি ঘরের গাছের মতো
নিয়মিত জল দাও,
যার নাম লতার মতো বেড়ে ওঠে
তোমার পাঁজরের চারপাশে।

তুমি তাকে বলো প্রিয়
ঠিক তখনই, 
যখন সে তোমার ঘর নতুন করে সাজায়
তোমার অজান্তে—
ছবির ফ্রেম সরায়,
একসময় যা পবিত্র ছিল তা ছুঁয়ে যায়,
বংশগত নীরবতায় রেখে যায়
আঙুলের ছাপ।

প্রতিদিন তুমি তাকে আরও বেশি ভালোবাসো
এমন সব কারণে
যার কোনো অনুবাদ নেই।
সে হাসে—আর তোমার মেরুদণ্ড ভুলে যায় তার দায়িত্ব।
সে আঘাত করে—আর তুমি সেই আঘাতের নাম দাও
গভীরতার প্রমাণ।
সে প্রবেশ করে এমন সব স্থানে
যেখানে তোমার প্রার্থনাও
জুতো খুলে ঢোকে।

জোর করে নয়—
এমন এক অনুমতিতে
যেটা তুমি দিয়েছিলে বলে মনে পড়ে না।
তোমার মায়ের কণ্ঠস্বর হয়ে যায় তারই প্রতিধ্বনি,
তোমার প্রেয়সীর ছায়া বেঁকতে থাকে,
তবু তুমি বলো—
দোষটা নিশ্চয়ই আমার।

ভালোবাসার তো এমনই ব্যথা দেওয়ার কথা।
এই শত্রু কখনো হাত তোলে না।
সে তোমাকেই করতে দেয় সব—
নরম করতালিতে
যখন তুমি নিজেই ভেঙে ফেলো
তোমার সীমানাগুলো
আর একে বলো ভক্তি।

শেষ পর্যন্ত,
সে তোমাকে জয় করে না।
সে তোমাকে রাজি করায়—
স্বেচ্ছায় হাঁটু গেড়ে বসতে
বিশ্বাসঘাতকতার বেদীর সামনে
আর তাকে ধন্যবাদ দিতে
এটা শেখানোর জন্য যে
কত গভীরভাবে
তুমি রক্ত ঝরাতে পারো
এবং তবুও
তাকে ভালোবাসা বলে ভুল কর।

—তবু গল্প এখানেই থামে না।
কারণ রক্তক্ষরণ একসময়
নিজস্ব ভাষা শিখে ফেলে।
আয়নায় দাঁড়িয়ে তুমি হঠাৎ দেখো—
লতাগুলো আর তোমাকে জড়িয়ে রাখেনি,
তারা শুকিয়ে গেছে
তোমার নীরব প্রত্যাখ্যানে।
যে শত্রু এতদিন অন্তরঙ্গ ছিল,
সে হঠাৎ দূরের শব্দ হয়ে যায়—
চেনা, কিন্তু অপ্রয়োজনীয়।
তার হাসি আর নির্দেশ দেয় না,
তার উপস্থিতি আর নিয়তি নয়।

তুমি ধীরে ধীরে শিখে নাও—
ভালোবাসা মানে আত্মসমর্পণ নয়,
ব্যথা মানেই গভীরতা নয়,
নীরবতা কখনোই সম্মতি নয়।
তখন তুমি উঠে দাঁড়াও—
কোনো বিজয়ের উল্লাসে নয়,
বরং এক শান্ত প্রত্যাহারে।

ভাঙা সীমানার জায়গায়
নতুন রেখা টানো,
নিজের নামটা আবার
নিজের কণ্ঠে উচ্চারণ করো।
আর সেই মুহূর্তে
সবচেয়ে অন্তরঙ্গ শত্রু
তার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রটি হারায়—
কারণ তুমি আর তাকে
ভালোবাসা বলে ভুল করো না।

বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬

পশ্চাতে

ক্ষণিক এই জীবনের মানে
নারী-পুরুষের শরীরে আলাদা আলাদা করে লেখা নয়—
একই কালি,
একই ভঙ্গুর কাগজে
সময় তার দাঁত বসিয়ে রাখে।

মানুষ প্রায়শই বোঝে না—
জীবন আসলে হাঁটে না,
সে পিছলে যায়।
প্রতিটি সকাল
একটা সাবানের ফেনা,
হাতে ধরলেই
মুহূর্তে উধাও।

নারী ভাবে—
চুলে সময়ের ধুলো পড়ে,
পুরুষ ভাবে—
কাঁধে পড়ে দায়িত্বের ভার।
কিন্তু ঘড়ি কারও লিঙ্গ চেনে না,
সে শুধু কেটে নেয়—
নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে।

শৈশব একদিন
খেলনার বাক্সে নিজেই ঢুকে পড়ে,
যৌবন দাঁড়িয়ে থাকে
আয়নার সামনে—
নিজেকে বিশ্বাস করতে করতে
হঠাৎ বুড়িয়ে যায়।

আমরা বলি, “পরে হবে,”
“আরো সময় আছে,”
এই বাক্যগুলোই
সময়ের প্রিয় খাবার।
সে খেয়ে নেয় আমাদের আগামীকাল,
আর বদলে দেয়
একটা ক্লান্ত আজ।

এই ক্ষণস্থায়ী জীবন
কোনো লিঙ্গের প্রতি পক্ষপাতী নয়—
সে সবার পায়ের নিচে
একই রকম পিচ্ছিল।
তবু মানুষ বোঝে না,
জীবন সততই পলায়নপর—
সে থামে না,
সে ধরা দেয় না,
সে শুধু ফসকে পড়ে
আমাদের আত্মবিশ্বাসের ফাঁক দিয়ে।
ফাঁক দিয়ে
সে নেমে যায় অদৃশ্য সিঁড়িতে,
যেখানে কোনো হাতল নেই,
কোনো ফিরে তাকানোর সুযোগও না।

মানুষ তখনো তর্ক করে—
কে বেশি পেয়েছে,
কে কম হেরেছে,
নারী না পুরুষ,
শক্তি না সৌন্দর্য—
অথচ সময় ইতিমধ্যেই
খেলা গুটিয়ে নিয়েছে।

জীবন আমাদের অনুমতির অপেক্ষা করে না।
সে আসে না ঘোষণা দিয়ে,
সে যায় না বিদায় জানিয়ে।
হঠাৎ এক বিকেলে
শ্বাস একটু ভারী লাগে,
সূর্যটা অকারণে নরম হয়ে আসে,
আর আমরা বুঝি—
কিছু একটা চুপিচুপি শেষ হয়ে গেছে।

তখন আয়নায় দাঁড়িয়ে
নিজেকে প্রশ্ন করি—
আমি কি বেঁচেছিলাম,
নাকি শুধু টিকে ছিলাম?

এই ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বে
ভালবাসা দিয়েছিলাম তো,
নাকি হিসাব মিলিয়েই
সময় কাটিয়ে দিয়েছিলাম?

জীবন তখন হেসে ওঠে—
নিষ্ঠুর নয়,
কেবল নির্লিপ্ত।
সে বলে,
“আমি তো সব সময়ই বলেছি—
আমি ক্ষণস্থায়ী।
তোমরাই ভেবেছিলে
আমি চিরস্থায়ী কোনো অজুহাত।”

আর শেষে
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে
আমরা সবাই দাঁড়িয়ে থাকি
একই প্রান্তে—
খালি হাতে,
খোলা চোখে,
এই উপলব্ধি নিয়ে
যে জীবন আসলে
কখনোই আমাদের ছিল না—
আমরাই ছিলাম
তার ক্ষণিকের অতিথি।
অতিথি হয়ে এসে
আমরা ঘর সাজাতে চেয়েছিলাম,
দেয়ালে নাম লিখে
স্থায়িত্বের ভান ধরেছিলাম।
কিন্তু জীবন তো হোটেলের ঘর—
চাবি বদলায় প্রতিদিন,
পরিচারিকা এসে মুছে দেয়
আমাদের উপস্থিতির চিহ্ন।

শেষ পর্যন্ত
কিছুই সঙ্গে যায় না—
না লিঙ্গের অহংকার,
না সাফল্যের পদক,
না অপূর্ণ অভিযোগ।
যায় শুধু
যে মুহূর্তগুলো আমরা সত্যিই ছিলাম—
যেখানে হাসি মিথ্যে ছিল না,
ভালবাসা দরকষাকষি শেখেনি,
আর নীরবতা ভয় পায়নি।

তখন বোঝা যায়—
জীবন কখনো আমাদের শত্রু ছিল না,
আমরাই তাকে ভুল বুঝেছি।
তার ক্ষণস্থায়িত্ব ছিল
একটা দয়া,
যাতে আমরা দেরি না করি
ভালবাসতে,
ক্ষমা করতে,
নিজের দিকে ফিরে তাকাতে।

শুনতে ভালো না লাগলেও,
এই জন্যই 
প্রেম ও জীবন আসলে 
সুযোগ খোঁজে মানুষের পোদে—
পলায়নপর হয়,
ক্ষণস্থায়ী ও অস্থির হয়—
যাতে আমরা ঘুমিয়ে না পড়ি
মিথ্যে স্থায়িত্বের কোলে।
যাতে প্রতিটি মুহূর্ত
আগুনের মতো জ্বলে ওঠে
হাতের ভেতর।
আর যখন সব শেষ,
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে
আমরা হালকা হয়ে যাই—
সময়ের কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখি
নিজেদের ভার।

তখন জীবন
শেষবারের মতো ফিসফিস করে—
“আমি ক্ষণিক ছিলাম ঠিকই,
কিন্তু যদি আমাকে বুঝে থাকো,
আমি যথেষ্ট ছিলাম।”

মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬

এখন সময়

এরপরও সহ্য করবে
নিজের প্রতি অনধিকার?
কতদিন আর?

জানো কি?
দিনের সারি থেকে বেরিয়ে আসা
তোমার জন্য 
এই মুহূর্তেই অতীব জরুরী—
যেখানে সকালগুলো নিজেকেই ফটোকপি করে
আর সন্ধ্যাগুলো 
একই সই করে যায়
ক্লান্ত হাজিরা খাতায়।

তোমার জীবন বসে আছে এক অপেক্ষাঘরে,
খোসা ওঠা দেয়ালের পাশে,
একটা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে
যে নিজের কাঁটাগুলো নিজেই চিবোচ্ছে—
তার নাম কোনো একদিন।

এই একঘেয়েমি—
যন্ত্রণার মতো যথেষ্ট জোরালো নয়,
রক্তপাতের মতো যথেষ্ট ধারালো নয়—
আঙুলের ছাপ না রেখে
শ্বাসরোধের শিল্প নিখুঁত করে ফেলেছে।

মূল্যহীনতা ভদ্রভাবে আসে,
জুতো খুলে রাখে,
আর তোমার মনের আসবাবপত্র এমনভাবে সাজিয়ে দেয়
যে আশা পর্যন্ত ভুলে যায়
সে কোথায় রাখা ছিল।

তুমি ধারাবাহিকভাবে স্থবির,
একজন মানুষের পুনঃপ্রচার,
স্বপ্নগুলোর মাঝে বাফারিং—
যেগুলো লোড হতে চায় না।

তাই একটু বিরতি নাও—
ক্যালেন্ডার-অনুমোদিত বিরতি নয়,
বরং সেই বিরতি
যা অভ্যাসে ফাটল ধরায়,
যেখানে রুটিন সস্তা কাঁচের মতো ভেঙে পড়ে
আর বাতাস হঠাৎ করে
অবৈধ গন্ধ পায়।

তোমার এই সংস্করণটাকে ফেলে এসো
যে বেঁচে ছিল,
কিন্তু কোথাও পৌঁছায়নি।
ওকে বিশ্রাম নিতে দাও।
যথেষ্ট হওয়ার ভান করতে করতে
সে ক্লান্ত।

সেখানে যাও
যেখানে তোমার নামটা অচেনা শোনায়,
যেখানে আয়নাও তোমার সঙ্গে একমত হতে
একটু থমকে যায়,
যেখানে ব্যর্থতার শব্দ জোরে হতে পারে
আর পুনর্জন্মের জন্য
সাক্ষীর দরকার হয় না।

এটা পালিয়ে যাওয়া নয়।
এটা তোমার ভবিষ্যতকে মঞ্চস্থ করার জন্য 
এক হস্তক্ষেপ,
তোমার নিজের স্পন্দনের কলার ধরে
তোমাকে মূল্যহীনতা থেকে টেনে তোলা।

মন্ত্র ভেঙে দাও।
একঘেয়েমি টিকে থাকে আনুগত্যে।
স্থবিরতা মারা যায় ঠিক সেই মুহূর্তে
যখন তুমি নড়ো—
এমনকি ভুল দিকেও হলেও।

ভুল স্বপ্ন

সবাই ভাবলো
জীবন মানে মূলত সুখ—
একটা রঙিন বেলুন,
হাওয়ায় ভাসে,
হাত বাড়ালেই ধরা যায়।
শৈশব থেকে শেখানো হলো
হাসিই নাকি সাফল্যের প্রমাণ,
দুঃখ মানেই ব্যর্থতা,
কান্না যেন
একটা নিষিদ্ধ ভাষা।

কিন্তু জীবন এলো
মাটির গন্ধ মেখে—
হাঁটুর চামড়া ছিঁড়ে
শেখাল হাঁটা,
ঘামের নোনতা জলে
ভিজিয়ে দিল স্বপ্ন।

জীবন আসলে কষ্ট—
পাথরের মতো ভারী নয়,
বরং বালির মতো,
প্রতিদিন জুতোর ভেতর ঢুকে
হাঁটাকে ধীরে ধীরে
রক্তাক্ত করে।

এই সামান্য সত্যটি
মানতে না পেরে মানুষ
সুখের দোকানে দোকানে ঘুরলো,
নকল হাসি কিনলো,
ডিসকাউন্টে আশা নিলো,
আর প্রতিবারই
রসিদের শেষে লিখা থাকলো—
“ফেরতযোগ্য নয়।”

হতাশা তখন
স্থায়ী ঠিকানা বানালো,
বুকের ভেতর
একটা ভাড়া দেওয়া ঘর,
যেখানে প্রতিরাতে
“আরও ভালো হতো যদি…”
এই বাক্যটাই
বাতির মতো জ্বলে থাকে।

যে বুঝলো—
কষ্টই জীবন,
সুখ কেবল তার
মাঝে মাঝে নেওয়া শ্বাস,
সে আর ভাঙলো না,
সে আর অভিযোগ করলো না।
তার চোখে তখন
দুঃখও সুন্দর,
কারণ দুঃখ জানে
কীভাবে মানুষ বানাতে হয়।

আর যারা মানতে পারলো না,
তারা জীবনভর
একটা ভুল প্রশ্ন বয়ে বেড়ালো—
“আমি কেন সুখী নই?”
অথচ সঠিক প্রশ্নটা ছিল—
“আমি কষ্টকে
কতটা আপন করতে পেরেছি?”

সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

জান্নাত

ধর্মীয় আবেগ
কোনো জাতির উন্নতি ঘটাতে পারে না—
ওটা আগুনের মতো:
হাত গরম করে
কিন্তু পথ আলোকিত করে না।

আজানের ধ্বনি বাতাসে ভাসে,
ক্ষুধার্ত রাস্তাগুলোর উপর—
ছায়া লম্বা হয়,
পেট ভরে না।
ধর্মীয় বিপ্লব, যেখানেই হোক, আসে
ঝড়ের মতো,
তার চিৎকারে ভেঙে যায়
জানালার কাচ,
কিন্তু সে ভুলে যায়
ঘরের ভেতর
প্রদীপ জ্বালাতে।

পতাকা বদলায়,
স্লোগান বদলায়,
মন্ত্র নতুন পোশাক পরে—
কেবল ভিক্ষার বাটি
একই থেকে যায়,
আর তার ভেতরে
প্রতিশ্রুতির ফাঁপা প্রতিধ্বনি।

ইসলামের নামে
কারখানা বন্ধ হয়ে যায়,
স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে
ধুলো জমে,
নারীরা বোরকায় আবৃত হয়,
আর কৃষকের ঘামের উপর
জান্নাতের টিকিট ছাপা হয়।

এখানে বিশ্বাস হাঁটে
মাথা উঁচু করে,
আর যুক্তি
হাঁটু গেড়ে বসে—
ফলে ইতিহাস শেখে
কীভাবে
দারিদ্র্যকে
পবিত্র ঘোষণা করতে হয়।

একদিন জাতি প্রশ্ন করে—
আমরা এত প্রার্থনা করলাম,
তবু কেন আমাদের হাত ফাঁকা?
কোনো উত্তর আসে না,
কারণ তখন আল্লাহ
ক্ষমতার কোষাগারে ব্যস্ত।

তাই উন্নতির মানচিত্রে
ধর্মের নাম নয়,
লেখা থাকে শ্রম,
শিক্ষা, আর প্রশ্ন করার সাহস।
নইলে ধর্মীয় বিপ্লব
শেষ পর্যন্ত পারে শুধু
একটাই কাজ—
দারিদ্র্যকে
জান্নাতের নাম দিয়ে
চিরস্থায়ী করে যেতে।

মহৎ লক্ষ্য

যদি তুমি স্মরণীয় হতে চাও
একজন মহান মানুষ হিসেবে,
মানবতার উপকারক হিসেবে,
মার্বেলে খোদাই করা এক নাম,
পাঠ্যসূচির পাতায় স্থায়ী হয়ে—
তবে আগে একজন বিলিয়নেয়ার হয়ে ওঠো।
তোমার বিবেককে অপেক্ষায় রাখো
ভল্টের বাইরে,
মুদ্রার বদলে প্রতিধ্বনি গুনতে দাও তাকে।
ইতিহাস ভারী পকেট পছন্দ করে—
টাকার গলা খাঁকারি দিলে
সে আরও মনোযোগ দিয়ে শোনে।
যে হাত একদিন কারখানা বন্ধ করেছিল
সেই হাত দিয়েই গড়ে তোলো গ্রন্থাগার।
যেখানে গরিবদের ফসল তোলা হয়েছিল,
সেখানে রোপণ করো হাসপাতাল।
একে বলো দানশীলতা—
সোনার পাত্রে
কণিকা ফেরত দেওয়ার শিল্প।
মূর্তিগুলো প্রশ্ন করে না
এই সম্পদের জন্ম কীভাবে।
তাদের শুধু একজন পৃষ্ঠপোষক চাই।
সেতুতে যখন তোমার নাম খোদাই হয়,
নদী তখন নিজের বিষ ভুলে যায়।
রেশমি খতিয়ানে
রক্ত তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।
সংখ্যা ক্ষমা করে দেয়
যা স্মৃতি স্পর্শ করতে অস্বীকার করে।
আগে একজন বিলিয়নেয়ার হও—
তারপর দান করো নীরবতা,
অর্থায়ন করো বিস্মৃতি,
নির্বাচিত সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করো।
পৃথিবী ভালোবাসে সেই মুক্তি
যা চালকের আসনে বসে আসে।
আর একদিন,
যখন শিশুরা মুখস্থ করবে তোমার দানশীলতা,
কেউ আর উল্লেখ করবে না
তোমার সদ্‌গুণের মূল্যটুকু—
শুধু বলবে,
সে থেকে কত সুদ পাওয়া গিয়েছিল।

শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬

আপোষহীন ঋজুতা

পরিস্থিতি যাকে কখনোই বশীভূত করতে পারে না—
তার নাম প্রখর আত্মসম্মানবোধ।

এ তেমন কোনো শব্দ নয়,
এ এক নীরব আগ্নেয়গিরি
যার লাভা বাইরে নামে না,
ভিতরে ভিতরে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দেয়।
ঝড় আসে—
চেয়ার উল্টে যায়, পর্দা ছিঁড়ে যায়,
মানুষ বদলে যায় মুখোশের মতো,
কিন্তু আত্মসম্মানবোধ
একটি পেরেকের মতো
নিজের অবস্থানে অনড় থাকে,
দেয়ালের বুক চিরে বলে—
“আমি এখানেই।”

ক্ষুধা তাকে প্রলোভন দেখায়,
ভয় তাকে দর কষাকষিতে ডাকে,
সাফল্য হাততালি দিয়ে ভুলিয়ে দিতে চায়,
আর ব্যর্থতা গোপনে হাসে।

তবু আত্মসম্মানবোধ
কোনোটির কাছেই হাঁটু ভাঙে না—
সে জানে
হাঁটু ভাঙলে আকাশ ছোট হয়ে যায়।
এ যে সেই আয়না
যেখানে মানুষ নিজের চোখে তাকিয়ে
চিনতে পারে—
আজও আমি বেঁচে আছি 
না কি শুধু যন্ত্র হয়ে গেছি ?

রাজা তাকে মুকুট দিতে পারে না,
ভিক্ষা তাকে কিনে নিতে পারে না।
সে জন্মায় না পদবিতে,
সে জন্মায় সিদ্ধান্তে—
“আমি নিজেকে ছেড়ে দেব না।”

রাতে যখন চারপাশ ঘুমিয়ে পড়ে,
আর একা মানুষের কাঁধে
সব আপসের হাত রাখা হয়,
তখন আত্মসম্মানবোধ
একটি জ্বলে-থাকা প্রদীপের মতো বলে—
“অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ,
কিন্তু আলো হয়ে থাকা জরুরি।”

পরিস্থিতি বদলায়,
মানুষ বদলায়,
ইতিহাস তার বাক্য সংশোধন করে।
কিন্তু আত্মসম্মানবোধ
নিজের বাক্য একবারই লেখে—
রক্তের কালি দিয়ে,
মেরুদণ্ডের কাগজে।

তাই যে মানুষ
সব হারিয়েও সোজা হয়ে দাঁড়ায়,
নীরবতায়ও উচ্চতা বজায় রাখে—
জেনে রেখো,
সে হারেনি।
সে শুধু ভরসা রেখেছে
অন্তরের গভীরে
ঋজু আত্মসম্মানবোধে।