সবচেয়ে গভীর ভাঙন
কখনো চিৎকার করে না।
তারা নক্ষত্র নিভিয়ে দেয়।
তারা আসে
এক অন্ধ গ্রহণের মতো,
আলোকে শেখায়
নিজের নাম ভুলে যেতে।
কোনো বজ্রধ্বনি নেই।
ভাঙা কাচের শব্দ নেই।
শেষকৃত্যের ঘণ্টাও বাজে না।
শুধু এক অদ্ভুত নীরবতা—
এত ভারী,
যে অনন্তকালও
চোখ নামিয়ে নেয়।
“সবচেয়ে প্রাণঘাতী বিশ্বাসঘাতকতা শরীরে কোনো ক্ষত রেখে যায় না; সে একটি মাত্র হৃদস্পন্দনের নিচে সমগ্র মহাবিশ্বকে কবর দিয়ে দেয়।”
আমি হেঁটে ঢুকলাম
এক ক্যাথেড্রালে,
যা নির্মিত হয়েছে
পরিত্যক্ত অঙ্গীকারের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে।
তার দেয়ালগুলো সেলাই করা
অলিখিত ক্ষমাপ্রার্থনায়।
তার রঙিন কাচের জানালাগুলো
ভাঙা বিশ্বাসের টুকরো দিয়ে গড়া,
আর প্রতিটি রঙ
আশার মুখটি কেমন ছিল
তা ভুলে গেছে।
বেদীর ওপর
কোনো ঈশ্বর ছিলেন না।
ছিল শুধু এক শূন্য সিংহাসন—
যেখানে বিশ্বাস
নিঃশব্দে মারা গেছে।
মোমবাতিগুলো জ্বলছিল,
কিন্তু আগুন ছাড়া।
তাদের ধোঁয়া
লিখে চলেছিল
সেইসব মানুষের নাম,
যারা ভেঙে পড়া আশ্রয়ে
অত্যন্ত দীর্ঘ সময়
থেকে গিয়েছিল।
একসময়
প্রতিটি নাম
মুছে গেল।
যেন স্মৃতিও
তাদের মনে রাখতে লজ্জা পাচ্ছিল।
“অনেক কবর খোঁড়া হয়ে যায়, শরীর পড়ে যাওয়ার বহু আগেই।”
ক্যাথেড্রালের ওপারে
বয়ে চলেছে
অনুচ্চারিত বিদায়ের নদী।
তার জল কালো।
রাত্রির জন্য নয়—
সে বয়ে নিয়ে চলে
সেই সব অশ্রু,
যেগুলো অহংকার
কখনো ঝরতে দেয়নি।
তার তলায় ভেসে বেড়ায়
অসংখ্য মুখ।
মৃতদের নয়।
জীবিতদের।
যারা নিজের মর্যাদা বিসর্জন দিয়েছিল
এমন কিছু পুনর্জীবিত করার জন্য,
যাকে নিয়তি
অনেক আগেই কবর দিয়ে রেখেছিল।
নদীটি কখনো সাগরে পৌঁছায় না।
সে একই বৃত্তে
চিরকাল ঘুরে বেড়ায়,
অসমাপ্ত সমাপ্তিগুলোকে
খাদ্য বানিয়ে।
আমি হাঁটু গেড়ে বসিনি।
আমি নদী পার হয়ে গিয়েছিলাম।
“বিশ্বাসঘাতকতার প্রতি অতিরিক্ত দয়া প্রায়ই নিজের আত্মার প্রতি নিষ্ঠুরতা হয়ে ওঠে।”
তারপর এলো
শূন্য হৃদয়ের বন।
গাছগুলোর কোনো পাতা নেই।
শুধু খালি খাঁচা,
যেখানে একদিন পাখিরা গান গাইত।
বাতাস এলেই
খাঁচাগুলো ফিসফিস করে বলত—
"থেকে যাও..."
কিন্তু পাখিরা শিখে গিয়েছিল—
সোনার খাঁচাও
অন্ধকারেরই আরেকটি নাম।
বনের ওপরে ঝুলছিল
একটি চাঁদ,
যা গড়া
ভাঙা আয়নার টুকরো দিয়ে।
তাতে তাকিয়ে
আমি নিজের মুখ দেখিনি।
দেখেছিলাম
নিজেরই অসংখ্য সংস্করণ,
যারা মারা গিয়েছিল
এমন কাউকে বাঁচাতে,
যে কখনোই
আমাকে ধ্বংস করা বন্ধ করতে চায়নি।
প্রতিটি ভূত
হাসছিল।
আনন্দে নয়—
স্বস্তিতে।
তাদের আর
অভিনয় করতে হচ্ছিল না।
“সবচেয়ে নিষ্ঠুর কারাগার সেই আশা, যা বিশ্বাস করে আগামীকাল ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা গতকালকে ঠিক করে দেবে।”
বনের শেষ প্রান্তে
দাঁড়িয়ে ছিল
কালো পাথরে খোদাই করা একটি দরজা।
তার ওপর লেখা ছিল—
‘এখানে আর থেকে যাওয়ার সময় নেই।’
আমি দরজাটি খুললাম।
ওপারে
এক অন্তহীন কবরস্থান।
প্রতিটি সমাধিফলকে
একই বাক্য—
‘এখানে শায়িত সেই মানুষটি,
যে হতে পারতাম আমি,
যদি অন্যের ধ্বংসস্তূপকে
নিজের আত্মার চেয়ে বেশি ভালোবাসতাম।’
হাজার হাজার কবর।
সবই আমার।
প্রতিটি
একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ,
যা প্রায়
নিজেকেই কবর দিয়ে ফেলেছিল।
মাটিটা উষ্ণ ছিল।
আগুনে নয়—
অগণিত অসমাপ্ত জীবনের
অবশিষ্ট উষ্ণতায়।
আমি ফিরে তাকাইনি।
ক্ষমা অসম্ভব ছিল বলে নয়।
বরং
বেঁচে থাকাই
একটি পবিত্র কর্তব্যে পরিণত হয়েছিল।
“চলে যাওয়া ভালোবাসাকে ত্যাগ করা নয়; বরং ভালোবাসার পরিত্যক্ত ক্যাথেড্রালে আরেকটি মৃতদেহ হতে অস্বীকার করা।”
তারপর
অন্ধকার নিজেই কথা বলল।
শব্দে নয়—
অনুপস্থিতিতে।
সব নক্ষত্র নিভে গেল।
চাঁদ গলে গেল।
এমনকি
আমার ছায়াও
আমাকে অনুসরণ করতে অস্বীকার করল।
এক ভয়ংকর মুহূর্তে
আমি হাঁটছিলাম
এমন এক মহাবিশ্বে,
যেখানে
আমার নিজের হৃদস্পন্দন ছাড়া
আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
তার শব্দ
শুনতে লাগল
একটি কবর ছেড়ে
দূরে সরে যাওয়া
পদচিহ্নের মতো।
তখনই বুঝলাম—
এই ভাঙন
আমাকে ধ্বংস করেনি।
এটি ছিল
এক নির্মম অস্ত্রোপচার।
যেখানে কেটে ফেলা হয়েছে
সেই সব শৃঙ্খল,
যেগুলোকে আমি
ভালোবাসা ভেবেছিলাম।
ক্যাথেড্রাল ভেঙে পড়ল।
নদী শুকিয়ে গেল।
কবরগুলো বন্ধ হয়ে গেল।
শুধু পথটি রয়ে গেল।
কালো।
নিঃশব্দ।
অসীম।
আমি হাঁটতে শুরু করলাম।
একবারও
পেছনে তাকাইনি।
কারণ
কিছু বিজয়ের
কোনো করতালির প্রয়োজন হয় না।
শুধু
অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সাহসই যথেষ্ট।
“সবচেয়ে গভীর ভাঙন কোনো শব্দ তোলে না, কারণ তা হৃদয়কে নয়—ভ্রমকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আর সবচেয়ে বড় বিজয় অন্ধকারে বেঁচে থাকা নয়; বরং নিজের আত্মাকে অমর রেখে সেই অন্ধকারকে চিরতরে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া।”