বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫

যে হাসি শিখেছে চিনে নিতে

যদি তুমি একজন মানুষকে বুঝতে পারো—

তার বর্তমান মুখোশ দেখে নয়,
নয় তার উচ্চারিত পরিচয়ে—
বরং সেই মুহূর্ত থেকে
যখন সে কাঁদতে শেখেনি,
যখন সময় তাকে গড়তে শুরু করেনি,
যখন হৃদয় ছিল নিঃশব্দ অথচ সতেজ—
সেই আদিম চেতনার উৎস থেকে—

তবে তুমি মুখ ফিরিয়ে নেবে না।

তুমি ভয় পাবে না তার চোখের ক্লান্তিকে,
ভুল করে বুঝবে না তার নীরবতাকে প্রাচীর বলে।
বরং চিনে ফেলবে—
ওটা আসলে একটুকরো নির্জনতা,
যেখানে সে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে
বিশ্বের শব্দ থেকে।

এবং হঠাৎ, এক প্রশান্ত হাসি
উঠে আসবে তোমার ঠোঁটে—
সাধারণ সৌজন্যের মতো নয়,
বরং আত্মা থেকে আত্মায়
এক অব্যক্ত অভিবাদন।

কারণ একটি হাসি—
যদিও ইচ্ছাকৃত, তবু কোমল—
একটি নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি,
যা বলে: “আমি তোমাকে দেখেছি।”
হয়তো পোশাকের নিচে লুকানো যুদ্ধে,
হয়তো ভাঙা স্বপ্নের মধ্যেও
তুমি এখনও জেগে আছো—
এবং সেইটুকু যথেষ্ট।

প্রত্যেক মানুষই চায়—
না হয় গোপনে,
না হয় চিৎকার করে—
কারও কাছ থেকে
একটিবার সত্যিকারের স্বীকৃতি।

তুমি যদি সেই এক মুহূর্তে
একটি হাসি উপহার দিতে পারো—
ভদ্রতার জন্য নয়,
মানবিক উপলব্ধির জন্য—
তাহলে হয়তো তুমি স্মরণ করবে,
তুমিও একদিন চেয়েছিলে
এইটুকুই—
কেউ এসে বলুক,
"তুমি হারিয়ে যাওনি।"

সেই মুহূর্তে,
তোমার হাসি হয়ে উঠবে
একটা নীরব বিপ্লব।
আর মানবতা—
তার সমস্ত ভঙ্গুর জ্যোতিতে—
পুনরায় চিনে নেবে নিজেকে।

শনিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৫

যখন যেমন

অনেকদিন ধরে ইচ্ছে হয়েছিল 
একটা বিকেল কাটাবো
তোমার মন খারাপের অলিন্দে। 
পায়ে পায়ে চলে এলাম তাই
নদী, খাল, বিল,
ঘন ঝাউ-বাগান পেরিয়ে 
এতটা দীর্ঘ পথ ।

গতকাল বেহালায় তুলছিলে
করুণ সুর ভরদুপুরে ।
সে সুর অনেকটা পথ পেরিয়ে
পৌঁছেছিল পরাণে আমার। 

আজ যখন এসে পৌঁছলাম 
দুয়ারে তোমার,
তখনো বিষণ্ণমুখে রয়েছো বসে
খোলা চুলে
আধফোটা মাছের ঝোলের সামনে ।

এসে যখন পড়েইছি, তখন
আসন পেতে ভাত বাড়ো তো এবার 
তোমার মনখারাপের বারান্দায়। 
ভার কমে, অবশেষে, হালকা হোক 
যুগলজীবন আর ফুটে উঠুক
সেই বিখ্যাত, রহস্যময়, বিজয়ের হাসি
অধরে তোমার।

মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫

নম্র

তীব্র শব্দের ব্যবহার 
না করলে কি কবিতা হয় না,
সেই বিশিষ্ট শব্দসমূহ,
যার অকস্মাৎ প্রয়োগ
সর্বদা চমকে দেয় মানুষকে ?

তোমার সাথে কথা বলে
বড়ই আরাম হয় আমার।
কেন জানো ?
কারণ - তোমার কোনও কথায় 
চমকে যাই না আমি কখনও। 

চমকে দেওয়া কথারা 
বাঁধ ও বাধার কারক
মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে ।
মানুষ তো চিরকাল চেয়ে এসেছে
আকাঙ্খিত স্বচ্ছতার সুখে
একজনের ভিতর দিয়ে অপরজন
নির্বিঘ্নে বয়ে যেতে ।

শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫

অবিবেচক

স্পর্শ করতে পারে উভয় পরাণ,
মন্থন করতে পারে দুটি হৃদয়,
শুধুমাত্র একটি সার্থক চুম্বনে। 

অথচ সেই সার্থকতাকে স্পর্শ করার আগেই 
শেষ হয়ে যায় পৃথিবীর অধিকাংশ চুম্বন। 
আত্মিক বিনিময় অধরা রয়ে যায়। 
কেন এমনটাই হয় ?
কার থাকে এমন বেকুব তাড়া?
কে আগেই হেরে বসে থাকে ?
কার অধরে
সিক্ততার কার্পণ্য অবিরাম জিতে যায়?

বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫

শ্রদ্ধা

যদি—
পদে পদে, এক বিনম্র চিত্তে—
তুমি জীবনকে গ্রহণ করো নিঃশব্দ উৎসর্গে,
তবে ভাগ্যের প্রতিটি বাঁক
ধ্বনিত হবে এক পবিত্র মন্ত্রের মতো,
আর প্রতিটি শ্বাস
জাগিয়ে তুলবে এক অদৃশ্য দীপ্তি।

জীবন কখনোই প্রতারণা করে না
তাদের সঙ্গে, যারা নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করে না।

জীবনের রহস্য চিৎকার করে না—
তা ধীরে ধীরে খুলে যায় শুধু তাদের জন্য
যারা গ্রহণ করতে জানে সমস্তটা—
মন, আত্মা, আর নিঃস্বার্থ দানের ঐকান্তিকতা।

কারণ জীবনের আসল কবিতা তো এটাই—
নিজেকে বিশ্বাস করা
কোনো দায় হিসেবে নয়,
বরং এক পবিত্র মন্ত্র হিসেবে—
আর বেঁচে থাকা
কোনো কিছু পাওয়ার জন্য নয়,
একটি প্রতিদিনের সাধনা হিসেবে।

মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০২৫

তোমার ওখানে

আমার এখানে সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার।  মাঝে মাঝে এক-আধ পশলা বৃষ্টি । তোমার ওখানে কী খবর গো ? কুবো ডাকে ফাঁকতালে ?

বিপিন বলেছে আসবে বিকেলে। ও এলে ওকে নিয়ে রওনা দেব হাকিম বাড়ির দিকে । গতকাল বলছিলে খুব ব্যথা তোমার ওখানে ।

সকালে তোমার প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা । বললো কী যেন কাজ শেষ হয়নি এখনও তোমার ওখানে।

তুমি বলেছিলে "একটা লাজুক ময়ূর" । আমি শুধিয়েছিলাম "কী লুকিয়ে রেখেছো তোমার ওখানে ?"

সকাল থেকে কবিতা লিখছো এক এর পর এক। আজ যে বড় পুলক দেখছি তোমার ওখানে ।

একটু জোরে হাঁটতেই ঘামে ভিজে গেলে পুরো । খুব স্যাঁতস্যাঁতে বুঝি এখন, তোমার ওখানে ?

একদিন শান্তিনিকেতনে যাবে সোনাঝুরির মেলায়? একটু বসবো গাছের আড়ালে, সকলের নজর এড়িয়ে।  তারপরে তুমি সম্মত হলে চুটিয়ে আদর করবো তোমার ওখানে ।
দেখবো কতটা লাল হতে হয় লজ্জায়!

একদিন একটা সিঁদুর-রঙা লিপস্টিক যত্ন করে লাগিয়ে দেব ঠোঁটে, তোমার ওখানে । তারপরে বলবো - "এবার একটু হাসো তো দেখি" ।



সোমবার, ৭ জুলাই, ২০২৫

বন্ধু

প্রত্যেক আত্মা, নিঃশব্দ ক্ষুধায়,

খোঁজে—কমপক্ষে একবার—
একটি এমন সত্তা,
যার উপর ভরসা রাখা যায়
নিঃশঙ্ক চিত্তে, নির্ভয়ে—
একজন বন্ধু,
যার নীরবতা হয়ে ওঠে ভাষা,
যার সান্নিধ্যে শব্দের প্রয়োজন থাকে না।

কিন্তু এই অনুগ্রহ
খুবই দুর্লভ
এই ক্ষণিকের পৃথিবীতে;
বেশিরভাগ হাতই,
যা বাড়িয়ে দেয়া হয়,
তারা নিজেই কাঁপে—
বাঁচতে গিয়ে ভুলে যায়
কি করে ভালোবাসতে হয়।

তবু, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ন্যায়পরায়ণ—
এটি আকাঙ্ক্ষায় সাড়া দেয় না,
সাড়া দেয় উৎসর্গে।
কিছুই লাভ হয় না
যথাযথ আত্মদান ছাড়া।

তবে মানুষ কোন অর্ঘ্য দিতে পারে
যা সময়ের ক্ষয়স্পর্শে ম্লান হয় না?

ধন নয়—
তা ক্ষয়িষ্ণু।
বুদ্ধি নয়—
তা ভ্রান্ত।
শুধু দুটি বস্তু—
হৃদয়ের পবিত্রতা
এবং অদ্বন্দ্ব সত্য

এগুলি উচ্চারণের নয়—
জীবনের ভাষায় প্রকাশ পায়।
এগুলি ঘোষণার নয়—
ব্যক্তিত্বের মৌন ঘ্রাণে প্রকাশিত হয়।

আর যখন এগুলি উৎসর্গ করা হয়
প্রভাব বিস্তারের জন্য নয়,
বরং আত্মা থেকে নিঃসৃত স্বাভাবিক সৌরভরূপে—
তখন, নিঃশব্দে,
অপ্রত্যাশিতভাবে,
মনের ভেতরের আকাশ খুলে যায়।

তুমি শুধু কাউকে খুঁজে পাও না—
তোমাকে খুঁজে পায়
চিরন্তন সেই বন্ধু—
যার কোনও রূপ নেই,
যে সমস্ত আলেয়ার পেছনের সাক্ষী।

আর সেই বন্ধুত্ব থেকে কী ঝরে পড়ে?
না, ভোগ নয়—
তা ক্ষণস্থায়ী।
না, সাফল্য নয়—
তা বন্ধন।

বরং আরও দুর্লভ উপহার:
শর্তহীন ভালোবাসা।
বোধের অতীত এক শান্তি।
আনন্দের উজ্জ্বলতা,
কোনো তরল আবেগ নয়।

এসব দেয়া হয় না,
জাগ্রত হয়—
যেন এতকাল নিজের মাঝেই ছিল
তবুও তুমি জানতে না
অস্তিত্বের কুয়াশায় ঢেকে ছিল।

ঈশ্বরের বন্ধু হয়ে ওঠা মানে
আকাশে উড়ে যাওয়া নয়—
বরং আত্মার গহিনে নামা,
যেখানে এক নিরব অসীম সত্তা
তোমার মধ্যেই অপেক্ষা করছে,
প্রেম নিয়ে,
চিরকাল ধরে।