সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপরীতপন্থী

মানুষের বয়স যত বাড়ে
স্বপ্নগুলো ততই
পাতা ঝরার মতো
চুপিচুপি খুলে পড়ে—
কিছু স্বপ্ন বার্ধক্যের ভয়ে
নিজেরাই অবসর নেয়,
কিছু আবার কপালে ভাঁজ পড়ে
ভাঁজের মধ্যেই হারিয়ে যায়।

ঘড়ি তখন
শুধু সময় নয়,
স্বপ্ন গুনতে শুরু করে—
একটা, দুটো,
তারপর হঠাৎ থেমে যায়,
যেন সংখ্যারও ক্লান্তি আছে।

কিন্তু কিছু মানুষ থাকে
যাদের ভিতরে আরেকটা পৃথিবী—
যেখানে অভিজ্ঞতা মানে
ধুলো জমা নয়,
বরং প্রতিটি ধাক্কা
নতুন জানালার কাচ ভাঙে।
তাদের স্বপ্নগুলো
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে
বড় হয়,
হাঁটতে শেখে,
নিজের নাম ভুলে
নিজের আকার বানায়।
ভুল, ব্যর্থতা, ক্ষত—
সব মিলিয়ে
একটা অদ্ভুত সার তৈরি হয়
যার গন্ধে
স্বপ্ন আরও সবুজ হয়।

এই মানুষগুলো কবির মত
হাওয়ায় কথা বলে না,
তারা মাটির সঙ্গে চুক্তি করে—
বিচক্ষণতার হাতে হাত রেখে
স্বপ্নকে নামিয়ে আনে বাস্তবের উঠোনে,
যেখানে কাদা আছে,
কিন্তু দাঁড়ানোর জায়গাও আছে।

একদিন
স্বপ্ন আর কল্পনা থাকে না—
সে হয়ে যায় ঘর, সেতু, আলো,
বা এমন কিছু
যার নাম ইতিহাস পরে দেয়।
পৃথিবী তখন
এক মুহূর্তের জন্য
নির্বাক হয়ে যায়—
কারণ সে অভ্যস্ত
স্বপ্ন মরে যেতে দেখায়,
স্বপ্ন হাঁটতে দেখায় না।

আর সেই নীরবতায়
কেউ ফিসফিস করে বলে—
সবাই বড় হলে স্বপ্ন হারায় না,
কিছু মানুষ বড় হয়
স্বপ্নকে বহন করার শক্তি নিয়ে।
আর সেই শক্তি
কোনো পেশি নয়,
কোনো পদক নয়—
ওটা জন্মায়
ধৈর্যের গভীর গর্তে,
যেখানে আশা কাঁদে না,
শুধু অপেক্ষা করে।

এই মানুষগুলো জানে,
সব স্বপ্ন একসাথে আসে না—
কিছু আসে লাঠিতে ভর দিয়ে,
কিছু আসে চোখে চশমা পরে,
কিছু আসে দেরিতে
কিন্তু একদম ঠিক সময়ে।
তারা সময়কে শত্রু ভাবে না,
সময়কে তারা
কাজে লাগায়—
ছুরি হিসেবে নয়,
ছেনি হিসেবে,
যাতে বাস্তবের পাথরে
স্বপ্নের মুখটা ধীরে ধীরে
খোদাই করা যায়।

শেষে যখন
স্বপ্নটা পুরো দাঁড়িয়ে যায়—
রক্ত-মাংসের মতো সত্য,
ঘাম-মাটির মতো ভারী—
তখন কেউ আর প্রশ্ন করে না
এটা সম্ভব ছিল কি না।
পৃথিবী শুধু তাকিয়ে থাকে,
নীরবতারও শ্বাস আটকে যায়,
আর সময়—
যে এতদিন স্বপ্ন খেয়েছে—
সেদিন প্রথমবার
হার মেনে নেয়।

অনভিজ্ঞ

চুটিয়ে প্রেম করার স্বপ্ন ছিল মনে?
কিন্তু বাস্তবে চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ?

কারণ তুমি সরাসরি
ফিফথ গিয়ারে ঢুকিয়ে দিয়েছিলে চেষ্টা—
ইঞ্জিন তখনো কাঁপছিল,
ক্লাচের নিচে লুকিয়ে ছিল ভয়,
আর রাস্তাটা—
সে তো এখনো মানচিত্র শেখেনি।

প্রেম কোনো হাইওয়ে নয়
যেখানে গতি মানেই গন্তব্য।
প্রেম এক অদ্ভুত শহর—
যেখানে সিগন্যাল ঘুমিয়ে পড়ে,
আর হর্ন বাজায় স্মৃতি।

ব্যাক গিয়ার কেউ শেখায় না—
ওটা শেখে মানুষ
ভুল মোড়ে ঢুকে,
আয়নায় নিজের মুখ দেখে,
আর বুঝে যায়
পেছনে ফেরাটাও এগোনোরই
একটা গোপন কৌশল।

তুমি না শিখেই ছুটেছ,
কখন থামতে হয়,
কখন নামাতে হয় গতি,
কখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে
ইঞ্জিন ঠান্ডা করতে হয়—
এই ছোট ছোট ব্যাকরণগুলো ....

তাই প্রেম বারবার
জ্যামে আটকে পড়েছে,
চারদিকে অচেনা মুখ,
হালকা বৃষ্টি,
আর তুমি—
স্টিয়ারিংয়ে দু’হাত রেখে
অকারণে ক্ষমা চাইছ
যেন হওয়ার কথা ছিল 
রাস্তাটা একা তোমার।

মনে রেখো, পূর্ণউদ্যমে
ভালোবাসা চালাতে গেলে
শুধু অ্যাক্সিলারেটর নয়,
ব্রেক, ক্লাচ,
আর মাঝে মাঝে
নির্লজ্জ ব্যাক গিয়ারও জানতে হয়।
নইলে
গতি থাকবে,
কিন্তু এরকমই পৌঁছনো হবে না গন্তব্যে। 

ব্যতিক্রমী

হাগার পরে
পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর পোদে
গু লেগে থাকে না।

বাঘ ঘষে জঙ্গলে,
হরিণ ঝরনায়,
পাখি আকাশেই ঝেড়ে নেয়
নিজের সব অপবিত্রতা।
শুধু মানুষ— না জল পেলে
সে হাঁটে সভ্যতার রাস্তায়
পোশাকে লুকানো পচন নিয়ে,
লজ্জাকে ডিওডোরেন্ট বানিয়ে।

মানুষের গু
শুধু শরীরের নয়—
চিন্তার,
ক্ষমতার,
নৈতিকতার।
সে হাত ধোয়,
কিন্তু মন ধোয় না।
সে স্নান করে প্রতিদিন,
কিন্তু আত্মা দুর্গন্ধে ফেঁপে থাকে
শতাব্দীর পর শতাব্দী।

সভ্যতা নামের প্যান্টে
সে লুকিয়ে রাখে
লোভের দাগ,
হিংসার শুকনো স্তর,
আর ইতিহাসের জমাট মল।

অন্য প্রাণীরা হত্যা করে ক্ষুধায়,
মানুষ হত্যা করে যুক্তিতে।
তাই তাদের পোদ পরিষ্কার,
আর মানুষের—
চিরকাল নোংরা।

হাজার বছর পেরিয়েও
মানুষ শেখেনি
নিজের পিছনটা দেখতে।
আয়না বসায় সামনে,
পিছনে জমে থাকে অবাঞ্ছিত সত্য।
এই পৃথিবীতে
সবচেয়ে বিপজ্জনক দূষণ
পারমাণবিক নয়,
প্লাস্টিক নয়—
মানুষের অস্বীকার।

আর তাই হাগার পরে
পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর পোদে
গু লেগে থাকে না,
শুধু মানুষই
নিজের লুকানো মলকে
সভ্যতা বলে ডাকতে শেখে।