মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬

মনের মানুষ

তুমি সেই মানুষটিকে ভালোবাসো বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছাড়া—
যে ভালোবাসা কখনো কোথায় জিজ্ঞেস করে না,
কারণ কোথায় শব্দটি গলে যায়
ঠিক সেই মুহূর্তে
যখন তার কণ্ঠ বলে ওঠে— চলো।

তার সঙ্গে থাকলে মানচিত্রের কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে।
সীমানাগুলো আলগা করে তাদের সেলাই,
কম্পাস ঘুরতে থাকে মাতাল ভবিষ্যদ্বক্তার মতো,
আর পৃথিবী সঙ্কুচিত হয়ে আসে
তোমার নিঃশ্বাস আর তার নিঃশ্বাসের মাঝের দূরত্বে।

তুমি সর্বদা প্রস্তুত, কারণ প্রস্তুতি
ইতিমধ্যেই তোমার সঙ্গে থাকতে শুরু করেছে—
সে তোমার স্যুটকেসে ঘুমায়,
তোমার নীরবতায় নিজেকে ভাঁজ করে,
তোমার বুকের পাঁজরের আড়ালে অপেক্ষা করে
একটি পাসপোর্টের মতো
যার মেয়াদ কখনো ফুরোয় না।

সে যদি বলে এখন,
সময় তার কাগজপত্র ফেলে দেয়।
ঘড়ির কাঁটা ঝরে পড়ে,
ট্রেন ভুলে যায় তাদের সময়সূচি,
রাস্তারা মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে
শুধু তোমার পায়ের স্পর্শ পেতে।

সে যদি বলে যেকোনো জায়গায়,
যেকোনো জায়গা রাজি হয়ে যায়।
মরুভূমি আগেভাগেই রিহার্সাল দেয় তোমার পদচিহ্নের,
সমুদ্র মুখস্থ করে নেয় তোমাদের নাম,
অচেনা আকাশগুলো তারা সাজায় নতুন করে
লিখে দেয়— আগমন।

তুমি তাকে অনুসরণ করো না—
তোমরা একসঙ্গে খুলে যাও।
দুটি অভিপ্রায় হাঁটে একটি ছায়া হয়ে,
দুটি ইতিহাস হালকা করে গুছিয়ে নেয় ব্যাগ,
পেছনে ফেলে আসে ভয়ের আসবাবপত্র
আর দ্বিধার অ্যালবামে বাঁধানো ছবি।

এটা পালিয়ে যাওয়া নয়।
এটা মাধ্যাকর্ষণের নতুন কেন্দ্র বেছে নেওয়া।
এমন এক নিশ্চিত ভালোবাসা
যাতে পৃথিবী বহনযোগ্য হয়ে ওঠে,
আর ঘর আর কোনো জায়গা থাকে না—
ঘর হয়ে যায় সেই দিকটি
যেদিকে সে আঙুল তোলে
একফোঁটা সংশয় ছাড়া।

আর যখন রাত প্রশ্ন করে
তুমি কী ফেলে এসেছ,
তুমি খোলা হাত দেখিয়ে বলো—
কিছুই নয়, যা জরুরি ছিল।
কারণ সন্দেহ রয়ে গেছে পেছনে,
বন্ধ দরজার সঙ্গে তর্ক করতে করতে।
কারণ ভয় মিস করেছে যাত্রা,
ঝুঁকি গুনতে গুনতেই।
আর নিশ্চিন্তি—নীরব, খালি পায়ে—
ইতিমধ্যেই তোমার পাশে হাঁটছিল।

যেখানেই পৌঁছাও,
মাটি চিনে নেয় তোমার পা।
দেয়াল নরম হয়ে ওঠে সাক্ষী হয়ে,
জানালারা ঝুঁকে আসে কাছে,
এমনকি অচেনা মানুষও পরিচিত লাগে
কেন জানে না, তবু লাগে।
তোমরা কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ো না,
গড়ো শুধু মুহূর্ত—
নীরবতার কাপ,
ক্লান্তির ভেতরে সেলাই করা হাসি,
স্বপ্ন ঝুলিয়ে দেওয়া হয় শুকোতে
অপরিচিত সূর্যের নিচে।

আর যদি কোনো একদিন রাস্তা গলে যায়,
যদি পৃথিবীর ধার ফুরিয়ে আসে,
তবু তোমরা চলতেই থাকবে—
না সামনে, না দূরে,
বরং ভেতরের দিকে, একসঙ্গে,
কিছুই বহন না করে
শুধু এই সরল অলৌকিক সত্যটুকু—
ভালোবাসা যখন সত্য হয়,
সে পৃথিবীর ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করে না—
সে পৃথিবীকেই
ভ্রমণের এক ক্রিয়ায় বদলে দেয়
তার সঙ্গে
যাকে অনুসরণ করতে
তুমি কখনোই দ্বিধা করো না।

বৃহত্তর হয়ে বাঁচো

তুচ্ছতাকে করুণা করার
মানে আসলে কী?
যদি তুমি বেরিয়ে আসতে চাও
ভিক্ষুকদের বর্ণানুক্রমিক সারি থেকে—
যারা হাত বাড়ায় না,
অভ্যাস বাড়ায়,
যারা ক্যালেন্ডারের নিচে দাঁড়িয়ে
করুণা টপটপ করে পড়ার 
অপেক্ষা করে—
তবে জেগে ওঠো
সূর্য তার দায়িত্ব মনে করার আগেই।

ওঠো, যখন শহরটা এখনও সেলাই হয়নি,
যখন রাস্তারা সাক্ষীহীন হাই তোলে
আর ট্রাফিক সিগন্যাল চোখ টেপে
বিভ্রান্ত নবীর মতো।

জুতোর ফিতা বাঁধো এমনভাবে
যেন সন্দেহগুলোর চারপাশে
সংকল্পকে বেঁধে ফেলছ।
দীর্ঘ দৌড়ে বেরিয়ে পড়ো—
ক্ষুধা থেকে পালিয়ে নয়,
ক্ষুধার ভেতর দিয়েই।
শ্বাসকে ফুসফুসের সঙ্গে তর্ক করতে দাও,
হৃদয়কে বিদ্রোহ বাজাতে দাও
সেই পাঁজরের বিরুদ্ধে
যারা তাকে ভয় শিখিয়েছিল।

দৌড়াও বন্ধ দোকান পেরিয়ে,
যারা লাভের স্বপ্ন দেখে,
ঘুমন্ত বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে,
যেখানে অনুতাপের পাশে
নাক ডাকায় উচ্চাকাঙ্খা।

কুকুরেরা তাড়া করবে তোমাকে—
তারা সবসময়ই করে—
কারণ স্বাধীনতার গন্ধ
তাদের চেনা নয়।
প্রতিটি মাইলের সঙ্গে
ঝরিয়ে ফেলো উত্তরাধিকার এর
একেকটি স্তর:
ধার করা অজুহাত,
আরামদায়ক হতাশা,
আর এই বিশ্বাস—
অপেক্ষা করাও নাকি এক ধরনের কাজ।

সকাল তোমাকে নীরবে দেখবে,
পরীক্ষা করবে তুমি সত্যিই কি বোঝো।
ঘাম তোমার ইচ্ছেগুলোকে দীক্ষা দেবে,
আর যন্ত্রণা ফিসফিস করে বলবে—
বৃদ্ধি কখনোই ভদ্র নয়।

ফিরে এলে,
ভিক্ষুকরা তখনও থাকবে—
ঘড়ির ভেতর সারিবদ্ধ,
অফিসের ভেতর সারিবদ্ধ,
আয়নার ভেতর সারিবদ্ধ—
কিন্তু তোমাকে শুধু 
আর সেই সারিতে মানাবে না।

তোমার জীবন,
এখন একটু বড় হয়ে,
তোমার পাশে পাশে হাঁটবে,
হাঁপাতে হাঁপাতে,
একটাই প্রশ্ন করবে—
কাল তুমি কি আবার
অভিযানে বেরোবে
প্রবল আত্মপ্রসারণের?