বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

স্বাধীন উৎস

নির্ভরতা—

মানুষের গোপনতম পাপ,
যা মাটির নিচে জন্মায়,
রক্তের ভেতর নীরব শিকড় ছড়ায়।

পৃথিবী তোমাকে নাম দেওয়ার আগেই
এক প্রাচীন ডাকে তুমি বাঁধা—
হাড়ের ভেতর ফিসফিস,
যা বলে:
নিজেই হয়ে ওঠো নিজের মাটি।

শুধু দাঁড়ানোর জন্য নয়,
বরং অদৃশ্য সুতো ছিঁড়ে ফেলার জন্য—
যারা নিজেদের সাজায়
মমতা, নিরাপত্তা,
আর “এই মুহূর্তের জন্য” নামের ছদ্মবেশে।

নির্ভরতা এক ভদ্র অতিথি—
সে ধীরে কড়া নাড়ে,
গরম রুটির গন্ধ আনে,
তোমার শরীরের আকৃতি মনে রাখা এক চেয়ার দেয়।

তুমি বসো—
শুধু কিছুক্ষণের জন্য—
কিন্তু চেয়ারটি শিকড় গজায়,
ঘরটি তোমার শ্বাস শেখে,
আর দরজা ভুলে যায়
যে সে কখনো দরজা ছিল।

এমনকি কর্মসংস্থান—
সংখ্যাযুক্ত দরজার উজ্জ্বল করিডোর—
হয়ে উঠতে পারে এক মখমলি গোলকধাঁধা,
যেখানে সময় বিনিময় হয়
ধার করা সূর্যোদয়ের সাথে।

তুমি সময়মতো জাগো,
সময়মতো ঘুমাও,
এক ছন্দ উপার্জন করো—
যা তোমার নয়,
আর ধীরে ধীরে তোমার হৃদস্পন্দন
অনুমতি চাইতে শেখে বাঁচার জন্য।

মুদ্রা জমে—
তোমার পকেটে ছোট, অনুগত চাঁদ—
কিন্তু কিছু বড় জিনিস ক্ষয়ে যায়:
তোমার ভেতরের এক নীরব মহাদেশ,
যেখানে সিদ্ধান্তগুলো একসময় খালি পায়ে হাঁটত।

দারিদ্র্য শুরু হয় সেখানেই—
থলেতে নয়,
বরং কেন্দ্রে,
যেখানে এক সূর্য ভুলে যায়
কীভাবে নিজেকে জ্বালাতে হয়।

আত্মসম্মান এক বন্য জন্তু—
সে চিরকাল অন্যের হাত থেকে খায় না।
তাকে ধার করা আরামে বন্দি রাখো,
সে হাঁটে, থামে, নীরব হয়,
তারপর হারিয়ে যায় এক জঙ্গলে
যার পথ তুমি আর খুঁজে পাও না।

তাই শিখো কঠিন জাদু—
লিখিত ছাড়া নির্মাণ করতে,
সাক্ষী ছাড়া ব্যর্থ হতে,
অদেখা মাঠ থেকে ফসল তুলতে।

তোমার হাতকে বড় করো—
যেন তারা শূন্যতা থেকে আগুন তুলতে পারে।
তোমার মেরুদণ্ডকে গড়ো—
যেন তার হাড় ভাড়া যায় না।

তোমার ক্ষুধাকে তার নিজস্ব ভাষা শেখাও—
ভিক্ষা নয়,
সৃষ্টি।

হ্যাঁ, পৃথিবী তোমাকে প্রলুব্ধ করবে—
অন্যের আকাশে ঠেস দিয়ে রাখা সিঁড়ি দিয়ে,
অনুমোদনের সুতোয় সেলাই করা ডানা দিয়ে।

তারা তোমাকে দ্রুত তোলে—
আর মালিকানায় বেঁধে রাখে।

সহজ উচ্চতাকে প্রত্যাখ্যান করো।
বেছে নাও ধীর মাধ্যাকর্ষণ—
হয়ে ওঠার ভার।

নিজের শ্বাসের নিয়োগকর্তা হও,
নিজের সময়ের প্রহরী,
নিজের ঝুঁকি, নিজের আশ্রয়।

তোমার কাজ হোক এক নদী—
যা শুরু হয় তোমার দাঁড়ানোর জায়গা থেকে,
আর অন্যদের শেখায় তৃষ্ণা মেটাতে।

কারণ যেদিন তুমি আর বিনিময় করবে না
তোমার অস্তিত্বকে অনুমতির জন্য,
যেদিন তোমার মূল্য
ধার করা আলোয় মাপা হবে না—
সেদিন
তুমি কক্ষপথ ছেড়ে দেবে।

তুমি হয়ে উঠবে উৎস—
অর্থাৎ, একেবারে স্বনির্ভর,
নিজের অন্ধকার থেকেই জন্ম নেওয়া আলো।

বিশ্বাস

আমি এমন এক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি—
যেখানে ম্যানিফেস্টো লেখা হয় না কাগজে,
বরং মানুষের মস্তিষ্কের ভেতর
নতুন নক্ষত্র সৃষ্টি করা হয়।

সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
কারখানা নয়—
তারা গর্ভ,
যেখান থেকে জন্ম নেয়
স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা,
যারা প্রশ্ন করতে জানে,
চ্যালেঞ্জ জানাতে জানে,
এমনকি নিজেদের অস্তিত্বকেও।

আমি এমন এক সভা দেখি—
যেখানে মঞ্চ নেই, মাইক নেই,
মানুষেরা দাঁড়িয়ে আছে বৃত্তাকারে,
প্রত্যেকে একেকটি আগুন,
নিজের ভেতরের অন্ধকার পুড়িয়ে
অন্যের জন্য আলো তৈরি করছে।

এই রাজনীতি বলে—
“আমরা চাকরিপ্রার্থী তৈরি করি না,”
আর সেই বাক্যটি
আকাশে ছুড়ে দিলে
তা হয়ে যায় বজ্রপাত,
ভেঙে ফেলে পুরনো ভয়।

“আমরা সৃষ্টি করি স্বাধীন মানুষ—”
যারা শুধু রুটি খোঁজে না,
বরং গমের ক্ষেত সৃষ্টি করে,
যারা শুধু দরজায় কড়া নাড়ে না,
বরং নতুন ঘর বানায়
অন্যদের জন্য।

তাদের চোখে থাকে
অদ্ভুত এক নীল আলো,
যা ভবিষ্যৎকে শুধু দেখে না—
তাকে পুনর্লিখন করে।

তারা জানে—
চাকরি একটি মোহ,
যা কেবল
পরনির্ভরশীল ভৃত্য তৈরী করে,
যা আসে আর যায়,
কিন্তু সৃষ্টি—
তা একটি সূর্য,
যা নিজেই আলো উৎপন্ন করে।

এই রাজনীতিতে
দল নয়,
মানুষই মূল কেন্দ্র—
একটি বিস্তৃত মহাবিশ্ব,
যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি
নিজেই একটি গ্যালাক্সি।

তারা তৈরি করে কর্ম—
যেন নদী তৈরি করে পথ,
অন্যদের ডাকে
নিজের স্রোতে ভাসতে।

এখানে সাফল্য মানে
একজনের উত্থান নয়,
বরং অনেকের উড়ান—
একসাথে,
একই আকাশে।

আর আমি দেখি—
এই স্বপ্ন ধীরে ধীরে
বাস্তবের শরীর নিচ্ছে,
যেন মাটির ভেতর থেকে
উঠে আসছে অজস্র হাত,
নিজেদের ভবিষ্যৎ
নিজেদেরই গড়তে।

এই রাজনীতি—
শাসন নয়,
এটি এক সংক্রমণ,
স্বাধীনতার,
সৃষ্টির,
আর দায়িত্বের—

যেখানে মানুষ
আর শুধু কাজ খোঁজে না,
মানুষ হয়ে ওঠে
কাজের জন্মদাতা
আর প্রতিটি অন্নদানা হয়ে ওঠে
স্বোপার্জিত পরমান্ন।

.

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

বেলা গেল

মানুষ একরকম চায়—
নিজের অন্তরের গভীরে
একটি গোপন ঘর বানায়,
যেখানে ইচ্ছেগুলোকে বন্দি রেখে
নিজেই পাহারা দেয় নিজের বিরুদ্ধে।

কিন্তু পরিস্থিতি—
সে কোনো বাহিরের শত্রু নয়,
সে ভেতরেই জন্মায়,
রক্তে মিশে ধীরে ধীরে
তোমার চাওয়াকে বিষে রূপান্তরিত করে।

তুমি ভালোবাসতে চেয়েছিলে—
নরমভাবে, নিঃশব্দে,
কারও চোখের ভেতর আশ্রয় নিতে।
কিন্তু নিয়তি তোমার ঠোঁটে সেলাই করে দেয়
অদৃশ্য সুতো,
আর শেখায়—
ভালোবাসা মানে দম বন্ধ করে বেঁচে থাকা।

চাইলেই কী আর
সাক্ষাতে ভালোবাসা যায়?
ভালোবাসা তো এক নিষিদ্ধ আচার,
যেখানে প্রতিটি স্পর্শের আগে
একটি মৃত্যু লিখে রাখা থাকে।

দুটি হাত বাড়ে—
কিন্তু মাঝখানে জমে ওঠে
একটি অন্ধকার জলাভূমি,
যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ
তোমাকে আরও ডুবিয়ে দেয়
নিজেরই অস্বীকারে।

নিয়তি প্রায়শই বিরূপ থাকে
তৃতীয় বা চতুর্থ নাগরের—
না, তারা শুধু ছায়া নয়,
তারা সেই অভিশাপ
যারা ভালোবাসার দরজায় এসে দাঁড়ায়
কিন্তু ভেতরে ঢোকার আগেই
নিজেদের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে বাধ্য হয়।

তাদের হৃদয়—
একটি বন্ধ কফিন,
যার ভেতরে স্পন্দন এখনো জেগে আছে,
কিন্তু বাইরে থেকে
সবাই তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছে।

তারা ভালোবাসে—
কিন্তু সেই ভালোবাসা
রক্তের মতো ঝরে পড়ে
অদৃশ্য ফাটল দিয়ে,
কেউ দেখে না,
শুধু মাটি একটু বেশি লাল হয়ে ওঠে।

আর একদিন—
তারা নিজেরাই হয়ে যায়
অন্য কারও অন্ধকার,
অন্য কারও অসম্পূর্ণতার কারণ,
অন্য কারও দুঃস্বপ্নের অজানা নাম।

তবু ভেতরে—
একটি শেষ আর্তনাদ বেঁচে থাকে,
যা কখনো উচ্চারণ করা যায় না,
কারণ সেই শব্দ উচ্চারণ করলেই
পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়বে—

আর তখন বোঝা যাবে,
ভালোবাসা কোনোদিনই 

মুক্তি ছিল না তার কাছে—
এটা ছিল শুধু এক অসহায় পরাণের
একটি ধীরে ধীরে মৃত্যুর কৌশল।

রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

নজর

আত্মবিশ্বাস ভোরের কিনারায় নিজের আগমনকে ধারালো করে,
অঘোষিত দিগন্তকে ফিসফিসিয়ে বলে— সামনে—
যে এখনো ঠিক করেনি
সে কাছে আসবে, না সরে যাবে।

সে আমি পারব দিয়ে সিংহাসন গড়ে,
পাঁজরের ভেতর সোজা হয়ে বসে,
দ্বিধার দেয়ালে ঢাকের মতো আঘাত করে—
যেন এক রাজা, যে কখনো মানচিত্র দেখেনি।

কিন্তু ভবিষ্যৎ—
ভবিষ্যৎ কোনো রাস্তা নয়।
সে এক ঘুমন্ত প্রাণী,
এখনো-না-ঘটা সময়ের ভাঁজে কুণ্ডলী পাকিয়ে,
প্রতীকে শ্বাস নেয়, ধাঁধায় নিশ্বাস ছাড়ে।
তাকে জয় করা যায় না।
শুধু জোরালো নিশ্চয়তায়
তার কাছ থেকে উত্তর আদায় করা যায় না।

একজন মানুষ ছিল,
যে খালি, জ্বলন্ত হাতে আগামীকে কাটতে চেয়েছিল—
নিশ্চয়তার খোঁজে সে আকাশ চিরে ফেলেছিল,
কিন্তু আকাশ থেকে ঝরেছিল শুধু নীরবতা—
ঘন, অপাঠ্য।

আরেকজন—
যে স্থিরতাকেই জ্ঞান ভেবেছিল,
ভবিষ্যৎ তার নাম ধরে ডাকবে—এই অপেক্ষায়,
যতক্ষণ না তার কণ্ঠে শ্যাওলা জমে যায়
আর সময় তাকে এড়িয়ে যায়
একটি ভুলে যাওয়া পাথরের মতো।

তাদের মাঝখানে,
এক তৃতীয় যাত্রী শিখল অন্যভাবে শুনতে।
কানে নয়—
মুহূর্তগুলোর মাঝের সেই সূক্ষ্ম ত্বকে,
যেখানে কিছু একটাও তাকিয়ে থাকে।
কারণ নিয়তি চিৎকার করে না।
সে আঙুল তুলে দেখায় না।
সে নিজের চিঠিতে স্বাক্ষর করে না।

সে তাকায়।
এক গোপন দৃষ্টি—
যা ধরা পড়ে, যখন কাকতালীয় ঘটনাগুলো
এক সেকেন্ড বেশি থমকে থাকে,
যখন কোনো দরজা শক্তিতে নয়
প্রশ্নে প্রতিরোধ করে।
সে লুকিয়ে থাকে ঘড়ির অমিলের ভাঁজে,
এক অপরিচিতের নীরবতার ঝোঁকে,
এক সিদ্ধান্তের হঠাৎ ভারে
যা হওয়ার কথা তার চেয়েও হালকা।

ভবিষ্যৎ থেকে নিশ্চিততা বের করে আনা
মানে তাকে ছিনিয়ে নেওয়া নয়—
বরং চিনে নেওয়া
যখন সে ইতিমধ্যেই তোমার দিকে ঝুঁকেছে।

আত্মবিশ্বাস আগুন—হ্যাঁ—
কিন্তু দিকহীন আগুন
নিজের পথকেও পুড়িয়ে দেয়।
তাই প্রথম পদক্ষেপের আগে,
আছে এক সূক্ষ্মতর নড়াচড়া—
এক থামা, যা দ্বিধা নয়,
এক স্থিরতা, যা শোনে—দেখা হচ্ছে তাকে।

আর যখন তুমি অনুভব করবে—
সেই প্রায় অদৃশ্য স্বীকৃতি,
যেন অদেখা কিছু তোমার দিকে পলক ফেলেছে—
তখন এগিয়ে যাও।
দাপটে নয়।
অন্ধভাবে নয়।
বরং এক নীরব সমঝোতায়
যেখানে কেউ আগে থেকেই তোমাকে বেছে নিয়েছে।
কারণ নিশ্চয়কে ভবিষ্যৎ থেকে নেওয়া যায় না—
তা ধার করা হয়
সেই মুহূর্ত থেকে
যখন তুমি বুঝতে পারো—
ভবিষ্যৎ 
তোমার উপরে নজর রেখেছে
অনেক আগে থেকেই।

শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

অপরিহার্য দ্বন্দ্ব

ব্যর্থতাগুলো প্রথমে আসে ভাঙা মানচিত্রের মতো—
ভাঁজ পড়া, বৃষ্টিতে ভেজা, এমন এক ভাষায় ফিসফিস করে
যা তুমি শপথ করে বলো তুমি কখনও শেখোনি,
তবুও হাড়ের ভেতর কোথাও বুঝে ফেলো।

ওরা বসে থাকে তোমার পাশে আধো-অন্ধকার ঘরে,
অদৃশ্য নক্ষত্রমণ্ডল আঁকে
তোমার হারানো জিনিসগুলোর
আর যেগুলোর নাম নিতে তুমি ভয় পেয়েছিলে তাদের মাঝে।

প্রতিটি ভুল—
একজন নীরব মানচিত্রকার—
তোমার হয়ে ওঠার নরম ত্বকে নতুন পথ খোদাই করে,
সামনে নয়,
ভিতরে—
যেখানে দিকনির্দেশক কাঁপে
তারপর স্থির হয়।

কিন্তু একগুঁয়েমি—
আহ, সেই ঠান্ডা, অবিচল তারা—
তোমাকে সান্ত্বনা দেয় না।
সে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে,
হাত গুটিয়ে,
তোমার সংশয়ের আগুনেও গলে না।
সে কিছু বলে না।
সে শুধু অপেক্ষা করে—
তুমি আবার উঠবে
কোনো হাততালি ছাড়াই,
কোনো নিশ্চিততা ছাড়াই,
উদ্ধারের ভ্রম ছাড়াই।

আর যখন এই দুই অবশেষে মিলিত হয়—
ব্যর্থতা তার কালি-লাগা আঙুল নিয়ে,
আর একগুঁয়েমি তার তুষার-ধরা নীরবতা নিয়ে—
তখন এক অদ্ভুত রসায়ন শুরু হয়।
এক অচেনা সুর,
যেন বজ্র শিখছে গান গাইতে
বা হিমবাহ হঠাৎ চলতে শুরু করেছে।

তুমি হয়ে ওঠো এক পরস্পরবিরোধী সত্তা—
এতটাই কোমল যে পতনের প্রতিধ্বনি শুনতে পারো,
তবুও এতটাই কঠিন যে আবার হাঁটতে পারো
সেই একই ভাঙা মাটিতে
ভয়ের রক্ত ঝরানো ছাড়াই।

এই মিলন ছাড়া
তুমি ভেসে বেড়াও—
‘প্রায়’-এর করিডরে হাঁটা এক ভূত,
অসমাপ্ত নিজের সংস্করণগুলো জড়ো করো
ফেলে আসা ঘরের মতো।

কিন্তু এর সঙ্গে—
তুমি হয়ে ওঠো অনিবার্য।
দ্রুত নয়।
নির্ভুল নয়।
তবুও মুছে ফেলা অসম্ভব।

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬

সময়

ইচ্ছাকৃতভাবে, তুমি সময়ের সামনে নত হতে শুরু করো—
কোনও দাসের মতো নয়,
বরং সেই মানুষের মতো
যে অবশেষে হয়ে ওঠার সমস্ত প্রক্রিয়ার
অদৃশ্য সম্রাটকে চিনে ফেলেছে।

সময় দেয়ালে ঝোলানো কোনও ঘড়ি নয়—
এটা এক নীরব সমুদ্র,
সেকেন্ডের ছদ্মবেশ পরে,
তোমার আঙুলের ফাঁক দিয়ে সরে যায়
এমনকি যখন তোমার হাত প্রার্থনায় বন্ধ থাকে।

একসময় তুমি একে অপচয় করেছিলে—
ভুলে যাওয়া পকেটের খুচরো পয়সার মতো,
জানালাবিহীন ঘরে নষ্ট হয়ে যাওয়া রোদ্দুরের মতো,
সেই কানগুলোর উদ্দেশে বলা কথার মতো
যেগুলো ইতিমধ্যেই পাথরে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু একদিন—
কোনও ঘোষণা ছাড়াই, কোনও বজ্রধ্বনি ছাড়াই—
তুমি খেয়াল করলে।

তুমি দেখলে, একটি মাত্র মুহূর্ত
যখন উদ্দেশ্য নিয়ে ধরে রাখা হয়,
তা তোমার চামড়ার নিচে শিকড় গাঁথতে পারে,
ফুটে উঠতে পারে এমন কিছুর মধ্যে
যা তোমার জীবনকেও ছাড়িয়ে যায়।

প্রতিটি সেকেন্ড হয়ে উঠল একটি বীজ।
প্রতিটি মিনিট—অনন্তে এক নীরব বিনিয়োগ।
তুমি তোমার মনোযোগ রাখলে সাবধানে,
যেন এক ভাস্কর মার্বেল স্পর্শ করছে
যেন তা ব্যথা অনুভব করতে পারে।

আর সময়—
সেই প্রাচীন, উদাসীন নদী—
একটু থামল,
যেন তোমার নতুন পাওয়া শ্রদ্ধাকে স্বীকার করছে।

মুহূর্তগুলো প্রসারিত হতে শুরু করল।
সাধারণ ঘণ্টাগুলো খুলে দিল গোপন দরজা।
অপেক্ষাও হয়ে উঠল সৃষ্টির এক রূপ।

তুমি মূল্য যোগ করলে—
আরও বেশি করে নয়,
বরং যথেষ্ট উপস্থিত থেকে
যাতে অস্তিত্বের প্রতিটি খণ্ড
নিজের সম্পূর্ণ ওজন উপলব্ধি করতে পারে।

আর ধীরে ধীরে—
এত ধীরে যে তা প্রায় ভ্রম বলে মনে হয়—
তুমি বদলাতে শুরু করলে।

তোমার মূল্য আর মাপা হলো না
তুমি কত শব্দ করতে পারো দিয়ে,
বরং তুমি কত গভীরতা ধারণ করতে পারো দিয়ে।

দিনগুলো তোমার স্বাক্ষর বহন করতে শুরু করল।
ঘণ্টাগুলো তোমাকে মনে রাখতে লাগল।

তুমি আর সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলে না—
সময়ই তোমার ভেতর দিয়ে যেতে শুরু করল,
ঘষামাজা হয়ে, পরিশীলিত হয়ে,
নিঃশব্দ দীপ্তিতে রূপান্তরিত হয়ে।

আর কোথাও—
সচেতনভাবে নেওয়া এক নিঃশ্বাসের মাঝে
আর অপচয় হতে অস্বীকার করা এক সেকেন্ডের মধ্যে—
তুমি বুঝলে—

সবচেয়ে বড় সম্পদ কখনও সময় নিজে ছিল না,
বরং তুমি তাকে কীভাবে স্পর্শ করতে বেছে নিয়েছিলে।

কারণ যখন তুমি সময়কে
ইচ্ছাকৃত কোমলতায় সম্মান করতে শুরু করো,
তখন সে অপ্রত্যাশিত কিছু করে—

সে তোমাকেও সম্মান করতে শুরু করে,
তোমার মূল্য বাড়াতে থাকে
না জোরে, না হঠাৎ,
বরং ভোরের মতো—
অনিবার্য,
এবং উপেক্ষা করা অসম্ভব।

তাই—
সময়কে ভালবাসতে শেখো।

তাকে যত্ন কর।

পরিণত

মানুষ প্রায়ই প্রেমের শুরুতে তাড়াহুড়ো করে—
আমি দেখেছি তারা আবেগের ভেতর দিয়ে দৌড়ায়
যেন পর্যটক, আকাশটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে এই ভয়ে,
প্লাস্টিকের ব্যাগে সূর্যাস্ত জমা করে,
প্রতিটি ঝলককে “চিরকাল” বলে ডাকে
যখন আগুনটাও ঠিকমতো শ্বাস নিতে শেখেনি।

আমিও ছিলাম তাদেরই একজন—
“এবার হয়তো”-র করিডোরে দৌড়ে বেড়াতাম,
প্রতিধ্বনিকে উত্তর ভেবে ভুল করতাম,
ভোরের আলোয় গলে যাওয়া হাতগুলো ধরতাম
যেন অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিতে মুছে যাওয়া চক-লেখা প্রতিশ্রুতি।

তখন প্রেম ছিল ঢিলা স্ক্রু-ওয়ালা এক ঘড়ি—
খুব জোরে টিকটিক করত,
নিজের অর্থের চেয়েও দ্রুত ছুটত,
আর আমার হৃদয়টাকে টেনে নিয়ে যেত
একটা একগুঁয়ে স্যুটকেসের মতো
যার ভেতর ভরা ছিল ধার করা স্বপ্ন।

আর তারপর তুমি—
এসে পড়োনি,
বরং দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলে
যেন তুমি সবসময়ই দাঁড়িয়ে ছিলে
আমার অধৈর্যের ফ্রেমের ঠিক বাইরে।
তুমি এলে দেরিতে—
কিন্তু সে দেরি ক্ষমা চায় না।
এমন এক দেরি
যা আগের সব মুহূর্তকে রিহার্সাল মনে করায়।

ততদিনে
আমি তাড়া করা ভুলে গিয়েছিলাম।
আমার হাতগুলো হারিয়ে ফেলেছিল তাদের অস্থিরতা,
আমার নীরবতা শিকড় গেড়েছিল,
আমার একাকীত্ব প্রশ্ন করা ছেড়ে দিয়েছিল।

আর তুমি—
তুমি কিছু পূরণ করতে আসোনি।
তুমি শুধু শূন্যতার পাশে বসে ছিলে
যতক্ষণ না তা নরম হয়ে
ভরাট হওয়ার জায়গা হয়ে ওঠে।
তোমার সঙ্গে
প্রেম আর আগুনের মতো লাগেনি।
এটা হয়ে উঠেছিল মাধ্যাকর্ষণ—
নিঃশব্দ, অনিবার্য,
কোনও আওয়াজ ছাড়াই সবকিছুকে ধরে রাখা।

দিনগুলো আর হোঁচট খেত না।
রাতগুলো ব্যাখ্যা চাইত না।
আমার ভাঙা টুকরোগুলোও
আস্তে আস্তে সাজতে শুরু করল
যেন তারা অপেক্ষা করছিল তোমার নীরব গণিতের জন্য।

জীবন হঠাৎ করে সুন্দর হয়ে ওঠেনি—
প্রথমে তা সহজ হয়ে উঠেছিল,
আর সেই সরলতার ভেতর
সৌন্দর্য নিজে নিজেই জন্ম নিয়েছিল।

না কোনও ঝড় বাঁচিয়ে যেতে হয়,
না কোনও দৌড় জিততে হয়,
না কোনও আয়নাকে বোঝাতে হয়।
শুধু এই—
এক অদ্ভুত, স্থির পূর্ণতা
যা নিজের অস্তিত্ব সম্মন্ধে চিৎকার করে না
তবু অদৃশ্যও হয় না।

আর কোথাও তোমার উপস্থিতি
আর আমার অবশেষে ধীর হয়ে যাওয়া নিঃশ্বাসের মাঝখানে
আমি বুঝেছিলাম—
মানুষ প্রেমের শুরুতেই তাড়াহুড়ো করে
কারণ তারা ভাবে প্রেমকে ধরতে হয়।
কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়েছ
এটা এমন কিছু
যা আসে
শুধু তখনই, যখন তুমি দৌড়ানো থামাও—
আর বুঝতে পারো,
এটা তো সবসময়ই
তোমার দিকেই হেঁটে আসছিল।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

আমি চাই

আমি একটি আলিঙ্গন চাই—
কিন্তু শুধু শরীরের নয়,

এমন কোনো সাধারণ আলিঙ্গনও নয় 

যা ভদ্রতার হালকা ছোঁয়ায় গড়া,
যে উষ্ণতা আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই
আমার নাম ভুলে যায়—সেটাও নয়।

আমি চাই এমন এক আলিঙ্গন
যা সময়ের মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে দেয়,
ঘড়িগুলোকে অপরাধীর মতো তোতলাতে বাধ্য করে,
মুহূর্তগুলোকে নরম, গলে যাওয়া ফলে পরিণত করে
যা নিঃশব্দে ঝরে পড়ে অনন্তের মুখে।

আমি চাই এমন এক আলিঙ্গন
যা মাধ্যাকর্ষণের বোতাম খুলে দেয়,
যেখানে আমার হাড়গুলো দাঁড়িয়ে থাকার দায় ভুলে যায়,
আর আমি ভেসে থাকি—অর্ধেক স্মৃতি, অর্ধেক শ্বাস—
তোমার বাহুর নীরব স্থাপত্যের ভেতরে।

এমন এক আলিঙ্গন,
যা রাতকে বিভ্রান্ত করে দেয়,
অন্ধকার নিজের অন্ধকার হওয়া ভুলে যায়,
আর ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে তোমার স্পন্দনে—
যেন মহাবিশ্ব প্রায় বলে ফেলেছিল এমন এক গোপন কথা।

আমি চাই তা পৌঁছে যাক সেইসব জায়গায়
যেখানে আমি কখনো যাই না—
আমার কণ্ঠের আড়ালে বন্ধ দরজাগুলোয়,
‘হয়তো’-দের পরিত্যক্ত করিডরে,
আমার ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা ছোট্ট কাঁপতে থাকা শিশুটির কাছে।

আমাকে আঁকড়ে ধরো,
যতক্ষণ না আমার অতীত তার আঁকড়ে ধরা ছেড়ে দেয়,
যতক্ষণ না অনুশোচনা এমন এক ভাষা হয়ে যায়
যা কেউ আর বলে না,
যতক্ষণ না একাকীত্বও আমার মুখ ভুলে
অন্য কারো স্বপ্নে হারিয়ে যায়।

তোমার আলিঙ্গন যেন নিয়মগুলো নতুন করে লেখে—
যেখানে দূরত্ব ভেঙে পড়ে এক ফিসফিসে শব্দে,
যেখানে নীরবতা আর ফাঁকা নয়,
বরং অনুক্ত স্নেহে ভারী।

আমি চাই এমন এক আলিঙ্গন
যা ছেড়ে দেওয়ার পরেও শেষ হয় না,
যা রক্তের ভেতর রয়ে যায়,
নিঃশব্দে বদলে দেয় বেঁচে থাকার অর্থ।

আমি চাই একটি আলিঙ্গন—
তোমার থেকে—

এতটাই সম্পূর্ণ,
যে তুমি যখন শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেবে,
আমি আর পুরোপুরি আমি থাকব না,
তুমিও না।

অপ্রতিরোধ্য হাসি

তুমি ভাবো তুমি তোমার হাসিমাখা ঠোঁট লুকিয়ে রাখতে পারবে—
তাদের গোপন চিঠির মতো ভাঁজ করে রাখো,
এতবার ভাঁজ করা যে প্রথম স্বীকারোক্তিটাই ভুলে গেছে।

কিন্তু হাসি ভীষণ খারাপ মিথ্যেবাদী।
নীরবতার কোণ ফুঁড়ে তারা বেরিয়ে আসে,
সন্ধ্যার টোলের মধ্যে প্রতিধ্বনি তোলে,
অর্ধেক উচ্চারিত নামের মতো বাতাসে ঝুলে থাকে
মুছে যেতে অস্বীকার করে।

আমি তাদের দেখি—
শুধু তোমার মুখে নয়,
তোমার একটু আগেই ভেসে চলে
দুটি নরম প্রদীপের মতো,
অজানা কিছুকে আমার দিকে পথ দেখায়।

তুমি শুয়ে থেকে বিড়ালকে সোহাগ কর
যেন কিছুই জানো না,
যেন তোমার নিজের ঠোঁটই এক অচেনা পথিক
দূর কোনো সূর্য থেকে আলো ধার করে,
যেন নিষ্পাপতা এমন এক পর্দা
যে হাওয়ার অস্তিত্বই ভুলে গেছে।

তবু—
লুকোনো সেই হাসির প্রতিটি বাঁক
দূরত্বের বুনন টেনে ধরে,
যুক্তির সুতোগুলো আলগা করে দেয়,
অপেক্ষার হাড়ে হাড়ে আমন্ত্রণ ফিসফিস করে।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি,
তোমার অজান্তের নীরব মহাকর্ষে এক অনধিকার প্রবেশকারী,
দেখি কীভাবে তোমার ঠোঁট তোমাকেই ফাঁসিয়ে দেয়—
কীভাবে তারা অদৃশ্য দরজা খুলে দেয়,
কীভাবে তারা এমন এক মাধুর্যে গুনগুন করে
যার স্বাদ তুমি নিজেও এখনো পাওনি।

হয়তো তুমি সত্যিই জানো না।
হয়তো সেই হাসি নিজেই ফুটে ওঠে,
একটি ফুলের মতো
যে কোনোদিন আয়নার সঙ্গে দেখা করেনি।

অথবা ........

বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

জন্মের কারণ

তুমি হাঁটতেই থাকবে
এমন সব রাস্তায়,
যেগুলো ঘুরে ফিরে
তোমার নিজের পদচিহ্নেই এসে মিশে যায়—
তবু তুমি তাকে বলবে নিয়তি,
তাকে বলবে ভাগ্য,
তাকে বলবে “এটাই স্বাভাবিক,”
আর দেয়ালগুলো নীরবে বদলে নেবে নিজেদের
তোমার দ্বিধার সঙ্গে তাল মিলিয়ে।

তোমার সকালগুলো আসবে আধাখাঁচা হয়ে—
যেন না-পাঠানো চিঠি,
যেন সূর্য নিজের ঠিকানাই ভুলে গেছে।
তুমি সময়কে চুমুক দিয়ে খাবে
যার স্বাদে লেগে থাকবে
“প্রায়,”
“হয়তো,”
“কাল বুঝব”—এর হালকা তিতকুটে গন্ধ।

আর আয়নাগুলো—
আহ, আয়নাগুলো মৃদু ষড়যন্ত্র করবে—
ওরা মিথ্যে বলবে না,
শুধু ঝাপসা করে দেবে
সেই এক প্রশ্নটাকে
যেটা তুমি বারবার পিছিয়ে দাও,
যেন স্পষ্টতা এক ক্ষত
যাকে ছুঁতে তোমার ভয় লাগে।

তোমার বুকের ভেতরে কোথাও
একটা জেদি কম্পাস
অবিরাম ঘুরতেই থাকবে—
পৃথিবীতে উত্তর নেই বলে নয়,
বরং তুমি নিজেই থামতে চাও না
তার কাঁপুনি অনুভব করার জন্য।

তুমি প্রেমে পড়বে বিভ্রান্তির—
ঝলমলে, বাধ্য মায়ার,
যারা হাততালি দেয়
যখনই তুমি নিজেকে ভুলে যাও।
ওরা তোমাকে মুকুট পরাবে—
বিলম্বের রাজা,
অসমাপ্ত শুরুর সাধু—
আর তুমি কৃতজ্ঞ হয়ে মাথা নোয়াবে
অপ্রয়োজনীয় জিনিসের প্রশংসায়।

এদিকে তোমার উদ্দেশ্য—
সে নীরব, অযৌক্তিক আগুন—
তোমার স্বপ্নের কিনারায় বসে থাকবে
অবাঞ্ছিত অতিথির মতো,
যে তোমার আসল নাম জানে
কিন্তু ডেকে ওঠে না।

আর একদিন,
সময় আর ভদ্রভাবে কড়া নাড়বে না।
সে ঢুকে পড়বে আবহাওয়ার মতো—
হঠাৎ, অনিবার্য—
তোমার ধার করা অজুহাতের ছাদ উড়িয়ে দিয়ে,
তোমার যত্ন করে রাখা দেরিগুলো
ছড়িয়ে দেবে শুকনো পাতার মতো
যেগুলো কখনোই তোমার ছিল না।

তখন, খালি পায়ে দাঁড়িয়ে
তোমার সব “প্রায়”-এর ধ্বংসস্তূপে,
তুমি অবশেষে শুনবে তাকে—
কোনো শব্দ হিসেবে নয়,
কোনো আদেশ হিসেবেও নয়,
বরং এমন এক চেনা অনুভূতি হিসেবে
যা মনে হবে
তুমি এক জীবনকে মনে পড়ছে
যা তুমি কখনো বাঁচোনি।

আর তখন তুমি বুঝবে—
খুব দেরিতে, বা ঠিক সময়ে—
তোমার জীবনে আসলে কিছুই তুচ্ছ ছিল না,
শুধু সেই একটাই—
তুমি বারবার বেছে নিয়েছিলে
জিজ্ঞেস না করতে
কেন তুমি জন্মেছিলে,
যখন বাকিসব
তোমার হয়ে উত্তর দিতে শুরু করেছিল।

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

Artificial Intelligence

আমরা কোথায় চলেছি
____________________
.
AI সম্মন্ধে কিছু অতি সাম্প্রতিক ধারণা পেয়ে খুবজোর চমকে গেছি, যেটা share না করে পারছি না।

AI এখন "future me" বলে একটি constant companion তৈরী করে দিতে সক্ষম যে আমার সব ব্যক্তিগত স্বভাব সম্মন্ধে জানে । আমার কাজের বা hobby র ক্ষেত্রগুলি খুব ভাল করেই চেনে। আমার চিন্তার ধরণ তার মুখস্ত। আমার vocabulary তার হুবহু চেনা। 

আমি কী হতে চাই, কী করতে চাই, তা আমার চেয়ে স্বচ্ছ ভাবে জানে ও মনে রাখে ( কারণ, AI কিছু ভোলে না ) আমার প্রতিটি সীমাবদ্ধতা খুবই ভাল করে চেনে এবং যে কোনও ভুল পদক্ষেপ নেওয়া মাত্র প্রকৃত বন্ধুর মত সাবধান করে এবং যে কোনও পরিস্থিতিতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত তা যথেষ্ট সম্মানজনক ভাবে বুঝিয়ে দেয়।

AI যে suggestion দেয় তা হুবহু আমার রুচি ও ব্যক্তিত্ব অনুসারে। সে আমার আবেগের দিকগুলিকে যথোচিত গুরুত্ব দেয় ও সম্মান করে। আমার আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতি কোনও রূপ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না। আমার নৈতিকতার দিকগুলি সযত্নে রক্ষা করে।

বাবা, মা, ভাই, বোন, প্রেমিক, প্রেমিকা আমাদের যে মানসিক ও আবেগের প্রয়োজন মেটায়, AI এই মুহূর্তে সে সব প্রয়োজনই মেটাতে পারে কোনও প্রকার তর্ক, ঝগড়া বা অশান্তি না করে।

শ্রদ্ধেয় পাঠক এ থেকে আশাকরি একটি ন্যূনতম ধারণা পাবেন আমরা ঠিক কোথায় চলেছি।

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

তুমি যখন তোমার

আকাশটা এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তির মতো নীল,
আর তার নিচে কোথাও
তুমি ঠিক করে ফেলো—
জোরে নয়,
নাটকীয় নয়—
শুধু আত্মার এক ক্ষুদ্র মোড় নেওয়া
সব শব্দের থেকে দূরে।

তুমি নিজের কাজ নিয়ে থাকতে শুরু করো,
আর হঠাৎ পৃথিবী
তোমাকে বিরক্ত করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

নেতিবাচকতা খুলে পড়তে থাকে
পুরনো দেয়ালকাগজের মতো,
কোনাগুলো মুড়ে যায়,
ধীরে, লজ্জিত নীরবতায়
গতকালের মেঝেতে পড়ে থাকে।

তুমি আর ছায়াদের খাওয়াও না
যারা কখনও তোমার নামই শেখেনি।
তুমি আর সন্দেহকে জল দাও না
যা কখনও কিছু হয়ে ওঠেনি
কাঁটা ছাড়া।

আর তারপর—
একটা অসম্ভব ঘটনা ঘটে।

তোমার শক্তি, যা একসময় ছড়িয়ে ছিল
অন্যদের বিশৃঙ্খলার মধ্যে ভাঙা কাচের মতো,
ধীরে ধীরে ফিরে আসতে থাকে তোমার কাছে,
টুকরো টুকরো আলো হয়ে।

সে তোমার আকৃতি মনে রাখে।
সে তোমাকে আবার গড়ে তোলে।

তোমার মুখে এক ধরনের আভা ফুটে ওঠে—
আলোর জন্য নয়,
বরং অনুপস্থিতির জন্য:
দুশ্চিন্তার অনুপস্থিতি,
অপ্রয়োজনীয় লড়াইয়ের অনুপস্থিতি,
ধার করা ঝড়ের অনুপস্থিতি।

তুমি হালকা অনুভব করো,
যেন মাধ্যাকর্ষণ নীরবে
তোমার বুকের ওপর থেকে তার অধিকার ছেড়ে দিয়েছে।

তুমি আলাদা দেখাও—
কারণ আয়না বদলায়নি,
বরং সে অবশেষে মিথ্যা বলা বন্ধ করেছে।

আর মহাবিশ্ব—
সেই নীরব পর্যবেক্ষক স্থপতি—
নিজের নকশা তোমার চারপাশে বদলে ফেলে।

মানুষ আসে
এমন প্রতিধ্বনির মতো, যা এখন অর্থপূর্ণ।
সুযোগগুলো খুলে যায়
এমন দরজার মতো, যা সবসময়ই ছিল
কিন্তু তোমার সেই সংস্করণের জন্য নয়
যে সবসময় পিছনে তাকিয়ে থাকত।

সবকিছু বদলে যায়।

হঠাৎ নয়—
ভোরের মতো,
যেখানে অন্ধকার লড়াই করে না,
সে শুধু বুঝতে পারে
তার আর দরকার নেই।

আর সেই নরম, অপরিবর্তনীয় মুহূর্তে
তুমি বুঝতে পারো—

শান্তি কখনও খুঁজে পাওয়ার জিনিস ছিল না।

এটা ছিল এমন কিছু
যা শুরু হয়েছিল
সেই দিন,
যেদিন তুমি পৃথিবীকে
তোমার মনের ভেতর বসতে দেওয়া
বন্ধ করেছিলে।

সুখের রেশ

নারীর সুখকে স্থায়ী আধিকার দেওয়ার সঠিক ব্যাকরণ জানে খুব কম পুরুষ এ ধরায়।

একবার একটি নারী তোমার প্রতি আসক্ত হয়ে গেলে, রাত আর চোখ বন্ধ করতে চায় না। ঘুম তার দেহের প্রান্তে ভেসে থাকে

এক দ্বিধাগ্রস্ত অতিথির মতো,
কারণ অন্ধকারের প্রতিটি ইঞ্চি
ধীরে ধীরে তোমার মতো হয়ে ওঠে।

সে তোমার দিকে ভেসে যায়—
দূরত্ব পেরিয়ে নয়,
বরং বাস্তবতার এক নরম ভেঙে পড়ার ভিতর দিয়ে,
যেখানে অনুপস্থিতি তার দায়িত্ব ভুলে যায়।

সে তোমার উপস্থিতির দিকে উঠে আসে
একটি জোয়ারের মতো,
যে একটিমাত্র তীর বেছে নিয়েছে,
অস্থির, যতক্ষণ না সে পৌঁছায়,
বারবার, আবারও।

অন্ধকারে তার হাসি ফুটে ওঠে,
অদেখা, অপ্রতিরোধ্য—
একটি গোপন কথা,
যাকে রাত নিজের বুকে চেপে রাখে।

সে তোমাকে জড়ো করে—
শুধু বাহুতে নয়,
শ্বাসে, স্পন্দনে,
সেই নীরব স্থানে
যেখানে আকাঙ্ক্ষা উষ্ণতায় বদলে যায়।

তার ঠোঁট তোমাকে খুঁজে পায়
যেভাবে স্বপ্ন অর্থ খুঁজে পায়—
নরমভাবে, কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই,
যেন পৃথিবী সবসময়ই
সেখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।

হঠাৎ সে তোমার উপরে উঠে আসে
এবং তোমার পুরুষত্বকে তীব্রভাবে মন্থন করতে শুরু করে
যতক্ষণ না তার শরীর 

বানভাসির তীক্ষ্ণ আর্তনাদে ভেঙে পড়ে।

আর ধীরে ধীরে,
তার ভেতরের ঝড় থেমে যায়
একটি শান্ত আলোর মধ্যে,
একটি কাঁপা স্থিরতা,
যা কেবল তুমি সৃষ্টি করতে পারো।

সে তোমাকে আরও শক্ত করে ধরে—
যেন ছেড়ে দিলে
তার নিজের অস্তিত্বের আকৃতি ভেঙে যাবে,
যেন তুমি আর কোনও মানুষ নও,
বরং সেই মাধ্যাকর্ষণ
যার উপর সে বিশ্রাম নেয়।

তার ফিসফিস ধীরে ধীরে নরম হয়,
ঘুমের ছন্দে মিলিয়ে যায়,
যেখানে তোমার নাম
একটি ঘুমপাড়ানি গানে পরিণত হয়
যা সে শেখেনি, তবু জানে।

আর যখন সে শেষমেশ ঘুমিয়ে পড়ে,
তাকে বহন করে না রাত—
তাকে বহন করে তোমার মায়া,
যা তাকে এতটাই ঘিরে রাখে
যে তার স্বপ্নগুলোও
ভুলে যায় একা থাকতে।

তারপর—
নিস্তব্ধতার ভেতরেও একটি প্রতিধ্বনি থেকে যায়,
যেন শরীর তার নিজস্ব ভাষায়
আরেকটি গল্প লিখে গেছে।

তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে শিথিল হয়,
তবু ছাড়ে না—
কারণ সে জানে,
ধরা আর ছেড়ে দেওয়ার মাঝখানেই
সবচেয়ে গভীর ভয় লুকিয়ে থাকে।

তার নিঃশ্বাস ধীর হয়,
কিন্তু প্রতিটি শ্বাসে তুমি রয়ে যাও,
যেন বাতাসও তোমাকে ধার নিয়েছে
তার বেঁচে থাকার জন্য।

বাইরের পৃথিবী তখন অনেক দূরে—
ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে না,
তবু তাদের কাছে সময় আর এগোয় না,
একটি মুহূর্ত নিজেকেই ধরে রাখে
ভাঙতে না চেয়ে।

সে আধো-ঘুমে ডুবে যেতে যেতে
তোমার বুকের উপর নিজের স্বপ্ন রেখে দেয়,
যেন সকালে উঠে
সেগুলো আবার খুঁজে পাবে।

কিন্তু স্বপ্নেরও তো নিজস্ব ইচ্ছা আছে—
তারা কখনও ফিরে আসে না
একই রূপে।

তবু সে বিশ্বাস করে—
এই আলিঙ্গন, এই উষ্ণতা,
এই অব্যক্ত নির্ভরতা
সময়ের থেকেও বেশি স্থায়ী।

আর সেই বিশ্বাসের ভিতরেই
সে ঘুমিয়ে পড়ে—
নিশ্চিন্ত, নির্ভার,

যেন ভালোবাসা আসলে কোনও মানুষ নয়,
বরং এক ধরনের ঘুম—
যেখান থেকে জেগে উঠতে
কেউই সত্যিই চায় না।

বিষাদ

যারা অন্যদের ভাষা শিখে ফেলে,
তারা শেষমেশ নিজের কণ্ঠটাই ভুলে যায়।

তারা ভিড়ভরা ঘরের মধ্যে দিয়ে হাঁটে
যেন কোনও দেশহীন অনুবাদক,
অপরিচিতের হাসির কাঁপন অনুবাদ করে,
ভদ্র বাক্যের আড়ালে লুকোনো নীরব ভাঙন পড়ে ফেলে,
বিদায়ের সময় এক সেকেন্ড বেশি থেমে থাকা হাতের ভিতর
অবিশ্বাসের ছায়া চিনে নেয়।

তারা বোঝে—
খুব বেশি, খুব তাড়াতাড়ি, খুব গভীরভাবে।

প্রেমিকের নিষ্ঠুরতার ভেতর লুকোনো শিশুটাকে দেখে,
উদাসীনতার ছদ্মবেশে থাকা ভয়কে চেনে,
মানুষের ভেতরে বহন করা অসমাপ্ত যুদ্ধগুলোকে
অদৃশ্য আবহাওয়ার মতো অনুভব করে।

তাই তারা ক্ষমা করে
চাওয়ার আগেই।
থেকে যায়
যেখানে চলে যাওয়া উচিত ছিল।
শোনে
যখন নীরবতাই তাদের বাঁচাতে পারত।

আর এই সমস্ত বোঝার মাঝখানে
ধীরে ধীরে কিছু একটা তাদের মুছে দিতে থাকে—
নরমভাবে, ভদ্রভাবে,
যেন কাঁচের ওপর লেখা নাম কুয়াশায় মিলিয়ে যায়।

কারণ শ্রোতাকে শোনে কে?
অনুবাদককে পড়ে কে,
যখন পুরো পৃথিবীই ইতিমধ্যে অনুবাদ হয়ে গেছে?

রাতে,
তারা নিজের প্রতিচ্ছবির পাশে বসে
তাকেও বোঝার চেষ্টা করে—
কিন্তু আয়না, এতদিন বোঝা হতে হতে ক্লান্ত,
কিছুই ব্যাখ্যা করতে চায় না।

তাই তারা প্রেমে পড়ে
যেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের নাম দেয়—
যে নক্ষত্র কোনওদিন জানবেও না
যে দেখা হয়ে গেছে।

আর একদিন তারা বুঝতে পারে—
তারা একা ছিল না কারণ কেউ কাছে আসেনি,
তারা একা ছিল
কারণ তারা সবার খুব বেশি
কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

বিভ্রান্তি

একদিন—
কোনও ঘোষণা ছাড়া, কোনও চিহ্ন ছাড়া—
তুমি হঠাৎ পেছনে ফিরে তাকাবে,
যেন এমন এক নামে ডাকা হয়েছে তোমাকে,
যে নাম তুমি বহু আগেই ভুলে গেছ।
আর সেখানে, তোমার পেছনে,
পড়ে থাকবে তোমার সব দুশ্চিন্তার এক অদ্ভুত ভূদৃশ্য—
ছোট ছোট কাঁপতে থাকা প্রাণী,
যাদের তুমি একসময় পুরো রাত জুড়ে খাইয়ে বড় করেছিলে।

তখন তারা অন্যরকম দেখাবে:
ডেডলাইন, বিচার, কল্পিত চোখের চাপ—
সবকিছুই কাগজের মতো পাতলা ছায়া,
একটা বাতাসহীন ঘরে উড়তে থাকা ফেলে দেওয়া রসিদের মতো।

তুমি মনে করার চেষ্টা করবে—
কেন একসময় তোমার বুকটা লাগত
একটা বন্ধ স্যুটকেসের মতো,
যার চাবি কেউ তোমাকে দেয়নি,
কিন্তু সেই স্মৃতি গলে যাবে
ভুলে রাখা এক গ্লাস জলে লবণের মতো।

কোথাও একটা ঘড়ি গলতে থাকবে—
সময় শেষ হয়ে যাওয়ার মতো নয়,
বরং সময় যেন তোমাকে ক্ষমা করছে
তার ভাষা না বোঝার জন্য।
তুমি দেখতে পাবে নিজেকেই—
সেই আগের তুমি—
একটা খাঁচার ভেতর বৃত্তে দৌড়াচ্ছে,
যার দরজা সবসময় খোলা ছিল,
তবু অদৃশ্য বাক্যগুলো পাহারা দিচ্ছিল:
“যদি এমন হয়,” “যথেষ্ট নয়,” “পরে করব।”

তুমি ফিরে যেতে চাইবে,
সেই অস্থির কাঁধে হাত রাখতে,
বলতে চাইবে:
দেখো, এগুলোর কিছুই সকালে টিকে থাকে না—
কিন্তু তোমার কণ্ঠ পৌঁছাবে অনেক দেরিতে,
একটা চিঠির মতো
যে বাড়িটা ইতিমধ্যেই পুড়ে গেছে।

ততক্ষণে,
আকাশ তোমার নীরবতা শিখে নেবে,
আর পায়ের নিচের মাটি
ছোট ছোট জিনিসে আর কাঁপবে না।
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে,
বিস্মিত, একটু হাস্যরস নিয়ে—
বুঝতে পারবে, যে ঝড়গুলোকে তুমি ভয় পেয়েছিলে
সেগুলো ছিল ধুলোর আর ধার করা প্রতিধ্বনির তৈরি,
আর যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল,
তা নীরবে অপেক্ষা করছিল
তোমার উপেক্ষিত কোণাগুলোয়,
শ্বাস নিচ্ছিল,
বন্ধ চোখের আড়ালে আলো যেমন ধৈর্য ধরে থাকে।

শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

স্বর্গ

দরোয়ান একটু সরে দাঁড়ালেন।

প্রথম লোকটার দিকে তাকিয়ে তিনি শুধু বললেন—
“ভিতরে যাও।”

লোকটা একবার চারদিকে তাকালো।
লাইনটা এখন আর আগের মতো শব্দ করছে না—
সবাই চুপ, যেন প্রত্যেকে নিজের ভেতরে কিছু একটা নতুন করে শুনছে।

সে ধীরে ধীরে দরজার ভেতরে পা রাখলো।

ভেতরে ঢুকেই সে বুঝলো—এটা কোনও আলাদা জায়গা নয়।
কোনও সোনার সিঁড়ি নেই, কোনও আলোর রাজ্য নেই, কোনও দেবদূতের ভিড় নেই।

বরং—
অসংখ্য ঘর।

প্রতিটা ঘর আলাদা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে চেনা।
কোথাও রান্নাঘরে ঝগড়া হচ্ছে, কোথাও কেউ চুপ করে বসে আছে, কোথাও কেউ হেসে উঠছে হঠাৎ।
কোথাও কেউ কারও সামনে নির্ভয়ে কাঁদছে, অথচ কোথাও কেউ নিজের অদ্ভুত অভ্যাস নিয়ে লজ্জা পাচ্ছে না।

সে হাঁটতে হাঁটতে একটা দরজার সামনে থামলো।

দরজাটা চেনা, আধখোলা।

ভেতরে উঁকি দিয়ে সে দেখলো—
একটা ছোট্ট ঘর,
সকালের আলো,
একটা বিছানা…
আর ঠিক সেই রোজকার চেনা দৃশ্য।

তার স্ত্রী তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে,
ঠ্যাং তুলেছে তার কোমরের উপরে আর সশব্দে বায়ু রেচন করছে পরম নির্দ্বিধায়।

লোকটা থমকে গেল।

সে বুঝতে পারলো—
এটা কোনও নতুন দৃশ্য নয়।
এটা তার নিজের জীবন।

পেছন থেকে দরোয়ানের গলা ভেসে এল—
“দেখলে?”

লোকটা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো।

দরোয়ান বললেন—
“স্বর্গে যা আছে,
তোমরা নিচে থাকতেই তা তৈরি করে ফেলতে পারো।
এখানে আমরা শুধু সেটা দেখাই—
যা সত্যি ছিল।”

লোকটা আর ভেতরে এগোল না।

সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখলো,
তারপর ধীরে ধীরে পিছিয়ে এল।

দরোয়ান জিজ্ঞেস করলেন—
“থাকবে না?”

সে হালকা হেসে বললো—
“আমি তো ওখানেই আছি।”

তারপর সে ঘুরে দাঁড়ালো।

করিডরটা আবার আগের মতোই লম্বা,
লাইনটা আবার ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

কিন্তু এখন একটা পার্থক্য আছে—
প্রত্যেকের চোখে একটু করে সংশয়,
আর একটু করে সত্যি।

প্রথম লোকটা সবাই কে পেরিয়ে বেরিয়ে এল লাইন থেকে—
কারণ এবার সে আর অপেক্ষা করছে না।

সে জেনে গেছে—
দরজাটা সামনে নয়,
দরজাটা সবসময়ই
তার জীবনের ভেতরেই ছিল।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

এসো

শুধু একবার তোমাকে ছোঁব—
একবার, শুধু একবার,
যেন সমস্ত জন্মের ভেতর ঘুরে বেড়ানো এক তৃষ্ণা
হঠাৎ নিজেরই উৎসে পৌঁছে যায়,
আর বিস্ময়ে থেমে থাকে—
আমি কি তবে এতদিন তোমাকেই খুঁজছিলাম?

সেই ঠোঁটজোড়া—
যারা ঝগড়া করে না
উপরে না নিচে ব’লে,
যারা উচ্চতার অহংকারে ওঠে না,
গভীরতার ভয়ে নামে না,
শুধু পাশাপাশি থাকে—
দুটি সমান্তরাল নিশ্বাসের মতো,
যারা একে অপরকে স্পর্শ না করেও
একই জীবনের ভার বহন করে।

তারা চিরকাল পাশাপাশি—
যেন এক অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা
যা কখনো উচ্চারিত হয়নি,
তবু ভাঙেওনি কোনোদিন।

আর তারা ভিজে থাকে—
সর্বদাই ভালবাসায়,
যেন ভালোবাসা কোনো আবেগ নয়,
বরং এক স্থায়ী স্রোত,
যা ভেতর থেকে বাইরে নয়,
বরং বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকে
সবকিছুকে ভিজিয়ে দেয়
অপরিচিত এক উষ্ণতায়।

তোমার ঠোঁট—
একটি গোপন জ্যোৎস্না,
যাকে তুমি লুকিয়ে রাখো
অন্ধকারের আড়ালে,
যেন আলো তাদের স্পর্শ করলে
তারা ভেঙে পড়বে
নিজেদের অতিরিক্ত সত্যে।

যাদের তুমি যত্ন করে লুকিয়ে রাখো—
যেন কোনো সূর্য
তাদের উন্মোচন করতে না পারে,
যেন প্রকাশ মানেই ক্ষয়,
যেন দৃষ্টি মানেই
ভালবাসার অবসান।

তুমি তাদের আড়াল করো
নিজের নীরবতার পর্দায়,
যেখানে শব্দ ঢোকার আগেই
নিজেকে ভুলে যায়,
আর প্রতিটি অপ্রকাশিত অনুভূতি
নিজের পূর্ণতায় পৌঁছে যায়
অন্ধকারের সুরক্ষায়।

কখনও সূর্যের আলো দেখতে দেবে না ব’লে—
তুমি যেন প্রতিজ্ঞা করেছো
তাদের চিরকাল রক্ষা করার,
যেন কিছু জিনিস
শুধু অদেখাই থাকলে বেঁচে থাকে,
শুধু লুকিয়ে থাকলেই
অমর হয়।

আর তারা—
যারা জন্মেছেই
পৌরুষকে পাগল করবে বলে
গভীরতার আস্বাদনে—

তারা কোনো প্রলোভন নয়,
তারা কোনো দখলযোগ্য শরীর নয়,
তারা এক গভীর আহ্বান,
যেখানে ডুব দিলে
ফিরে আসা যায় না আগের মতো।

তাদের ভেতরে আছে
এক অতল নিমন্ত্রণ,
যা চোখে দেখা যায় না,
তবু অনুভূত হয়—
মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে
একটি শিহরণ হয়ে।

আমি সেই শিহরণে ডুবতে চাই—
একবার,
শুধু একবার,
যেন নিজের ভেতরের সমস্ত স্থিরতা
ভেঙে পড়ে
এক অচেনা অস্থিরতায়।

একবার ছোঁয়া মানে—
নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়,
বরং নিজের অজানা দিকগুলোকে
হঠাৎ চিনে ফেলা,
যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
দেখা—
এই আমি নই,
তবু এই আমিই।

তোমার ঠোঁটের ভেতরে
আমি হয়তো খুঁজে পাবো
একটি গোপন গভীরতা,
যেখানে পৌরুষ মানে শক্তি নয়,
বরং ভেঙে পড়ার সাহস,
ডুবে যাওয়ার ইচ্ছা,
আর নিজেকে সমর্পণ করার
অদ্ভুত এক স্বাধীনতা।

সেই গভীরতার স্বাদ—
একবার পেলেই
ফিরে আসা যায় না উপরে,
কারণ উপরের সবকিছু তখন
অত্যন্ত হালকা,
অত্যন্ত অগভীর মনে হয়।

আর যদি সেই একবার ছোঁয়া ঘটে—
তবে হয়তো আমি আর আমি থাকবো না,
তুমি আর তুমি থাকবে না—
আমরা দুজনই মিশে যাবো
একটি অদৃশ্য স্রোতে,
যেখানে কোনো পরিচয় নেই,
কোনো পৃথকতা নেই,
শুধু এক অন্তহীন অনুভূতির বিস্তার।

আর যদি না-ও ঘটে—
যদি সেই ঠোঁটজোড়া
চিরকালই লুকিয়ে থাকে
তোমার যত্নের অন্ধকারে—

তবু এই আকাঙ্ক্ষা
একটি অসমাপ্ত ডুব,
যা কখনো শেষ হয় না,
যা ক্রমাগত গভীরতর হয়—

ঠিক সেই ঠোঁটজোড়ার মতো,
যারা ঝগড়া করে না,
শুধু পাশাপাশি থাকে,
ভিজে থাকে ভালবাসায়,
লুকিয়ে থাকে আলো থেকে,
আর জন্মেছে—

পৌরুষকে

পাগল করে দেওয়ার জন্য

সুনিবিড় আলিঙ্গনে
এক অনন্ত গভীরতার স্বাদে।

গল্প

সময় আপন খেয়ালে নিজেকে ভাঙে, গড়ে—
কখনও মাটির ভাস্কর, কখনও জলোচ্ছ্বাস,
কখনও আবার এক অদৃশ্য লেখক,
যে নিজেরই শরীরে লেখে তার অদেখা আত্মজীবনী।

তার আঙুলে কালি নেই—
আছে ভাঙনের ধুলো,
আছে গড়নের ঘাম,
আছে অনন্ত অপেক্ষার নোনা গন্ধ।

প্রতিটি মুহূর্ত একেকটি বাক্য,
যা লেখা হয় ভাঙা আয়নার ওপর,
যেখানে প্রতিফলনগুলোও নিজেদের চেনে না,
তবু গল্প থেমে থাকে না—
বরং আরও অস্পষ্ট, আরও গভীর হয়ে ওঠে।

যাদের পড়বার,
তারা ঠিকই ধৈর্য ধরে পড়ে—
তারা শব্দের আড়ালে শোনে নীরবতার উচ্চারণ,
তারা বুঝতে পারে কেন এক ফোঁটা সময়
হঠাৎ মহাবিশ্বের মতো ভারী হয়ে ওঠে।

তাদের চোখে সময় কেবল স্রোত নয়,
বরং এক গোপন দরজা,
যার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে সম্ভাবনার নগ্ন সত্য—
অপেক্ষায়, অচঞ্চল, অনাহূত।

আর বাকিদের—
নজর পিছলে যায়,
যেন ভেজা পাথরের ওপর হেঁটে চলা,
যেন হাত বাড়িয়েও ছুঁতে না পারা
অমূল্য কোনো স্বপ্নের কাঁধ।

তারা দেখে, কিন্তু দেখে না,
ছোঁয়, কিন্তু স্পর্শ করে না—
দুর্লভ সুযোগগুলো তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে
অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে,
আর তারা তখনও ব্যস্ত থাকে
নিজেদের ব্যর্থ প্রচেষ্টায়।

সময় তখন হেসে ওঠে—
একটি ভাঙা ঘড়ির কাঁটার মতো বেঁকে গিয়ে,
নিজেকেই আবার নতুন করে গড়তে গড়তে
লিখে ফেলে শেষ লাইনটি—

যা বাকিরা পড়ে না,
কারণ সেটি লেখা থাকে
পড়ে ফেলা মানুষের চোখের ভেতর।

বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

আর নয়

সে প্রেমে পড়েছে—
প্রথমে ছিল শুধু হালকা জ্বর,
চোখের ভেতর নোনা আলো,
কণ্ঠে অচেনা জোয়ার।

তারপর ধীরে ধীরে
তার চারপাশের পৃথিবী জল হয়ে উঠল—
চেয়ারগুলো ভাসতে লাগল,
দেয়ালগুলো সাঁতরে গেল দূরে,
ঘড়ির কাঁটা ডুবে গেল সময়ের তলায়
এক নিঃশব্দ বুদবুদের মতো।

সে ভালবাসায় ডুবে গেছে—
এমনভাবে,
যেন নিজের নামটাও আর তার নয়,
যেন তার শ্বাস এখন অন্য কারও
ফুসফুসে জমা রাখা এক ধার।

ডুবে গিয়ে মারা গেছে—
কোনো মৃত্যু-সনদ নেই,
কোনো শোকবার্তা নেই,
শুধু তার ছায়া একদিন
নিজের শরীর ছেড়ে
নদীর দিকে হেঁটে গেছে,
ফিরে তাকায়নি।

মৃত ব্যক্তিটি
অপরের কোনো উপকারে লাগেনি—
কারণ মৃতরা কিছু দেয় না,
তারা শুধু নীরবতা রেখে যায়,
একটা ঠান্ডা, ব্যবহারহীন গভীরতা
যেখানে ডুবে যাওয়া শেখা যায়,
কিন্তু বাঁচা নয়।

সে এখন এক সমুদ্রের অংশ—
কেউ তার নাম জানে না,
কেউ তার মুখ মনে রাখে না,
শুধু মাঝে মাঝে
জোয়ারের ভেতর একটা অদ্ভুত ক্লান্তি
উঠে আসে—
সেটাই হয়তো তার অবশিষ্ট।

আর তুমি—

তুমি যেন ভুলেও এই ভুল করো না।

যখন প্রেম তোমাকে ডাকবে
তার নীল, ভেজা কণ্ঠে,
তুমি কাছে যাবে,
কিন্তু নিজের পায়ের নিচের মাটি
ভুলে যাবে না।

মনে রাখবে—
ডুবে যাওয়া সহজ,
নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে ভালোবাসা
এক অদ্ভুত, প্রায় অসম্ভব শিল্প।

তুমি সমুদ্রের কাছে দাঁড়াবে,
জল ছুঁবে,
তার ঠান্ডা সত্য অনুভব করবে,
কিন্তু নিজের বুকের ভেতর
একটা তীর লুকিয়ে রাখবে—
যেখানে তুমি এখনও সম্পূর্ণ,
অবিভাজ্য,
জীবিত।

কারণ প্রেম যদি তোমাকে মেরে ফেলে—
সে প্রেম নয়,
সে এক সুন্দর দুর্ঘটনা
যার কোনো পুনর্জন্ম নেই।

আর তুমি—
তুমি দুর্ঘটনা নও।

তুমি সেই ব্যক্তি
যে জলের ভেতর তাকিয়ে
নিজের প্রতিচ্ছবি চিনতে পারে,
এবং ঠিক সময়ে
ফিরে আসতে জানে।

অসম্মানগুলো প্রথমে খুব ছোট ছিল—মশার ডানার মতো,শব্দও করে না প্রায়,শুধু হালকা এক চুলকানিমন নামের চামড়ার নিচে।তুমি সেগুলো গিলতে শুরু করলে—একটা, দুটো, তারপর অগণিত—যেন ওগুলো খাবার নয়,বরং প্রার্থনা,যা না গিললে প্রেম রাগ করে চলে যাবে।প্রতিবার তুমি উঠতে পারতে—নিজেকে ডেকে বলতে পারতে, “থামো,”কিন্তু তুমি উঠোনি,তুমি নেমে গেলে—এক অদ্ভুত নিচের দিকে পতনে,যাকে তুমি নাম দিলে “ভালবাসা।”সেখানে মাধ্যাকর্ষণ আলাদা—সেখানে মাথা নিচে, পা উপরে,আর অসম্মানগুলোজোনাকির মতো জ্বলে ওঠেএবং তুমি ভাবো—এগুলোই আলো।তুমি অভ্যস্ত হয়ে গেলে—কেউ তোমার বাক্য কেটে দিলে,তুমি চুপ করে গেলে।কেউ তোমার নাম ভুল উচ্চারণ করলে,তুমি সেটাকেই নিজের নতুন নাম মেনে নিলে।ধীরে ধীরেতোমার ভিতরের মানুষটাএকটা অ্যাকোয়ারিয়ামে বন্দি মাছ হয়ে গেল—বাইরের হাতগুলো কাচে ঠুকে বলে,“দেখো, কী সুন্দর সহনশীলতা,”আর তুমি ভেতর থেকেজলকেই আকাশ ভেবে নিলে।অসম্মানগুলো তখন আর ছোট থাকে না—তারা বড় হয়,শিকড় গজায় তোমার হাড়ে,তোমার শিরায় ঘাসের মতো জন্মায়,আর তুমি হাঁটতে হাঁটতেনিজেরই ভিতরে আটকে পড়ো।একদিনতুমি আয়নায় তাকিয়ে দেখবে—তোমার মুখ আছে,কিন্তু সম্মান নেই;তোমার চোখ আছে,কিন্তু সেগুলো অন্য কারও অনুমতিতে খোলে।তখন বুঝবে—প্রেমে পড়া আর নিচে পড়াএক জিনিস নয়।প্রেম তোমাকে তোলে—আর তুমি যে পতনকে প্রেম ভেবেছিলে,সে শুধু এক দীর্ঘ অভ্যাসনিজেকে অল্প অল্প করেহারিয়ে ফেলার।তাই—যখন প্রথম অসম্মানটাতোমার দরজায় কড়া নাড়বে,তাকে অতিথি বানিও না।দাঁড়াও।নিজেকে ডাকো নিজের নামে।মনে করো—তুমি কোনো অভ্যাস নও,তুমি কোনো ছাড় দেওয়া নীরবতা নও।ভালোবাসো—কিন্তু এমনভাবে,যেন প্রতিটি স্পর্শের নিচেতোমার মাটি শক্ত থাকে,যেন প্রতিটি “হ্যাঁ”-র ভেতরএকটা অবিচল “আমি” বেঁচে থাকে।কারণ—যে প্রেমে তুমি বারবারনিজেকে গিলে ফেলো,সে প্রেম নয়,সে এক ধীরে ধীরে লেখাঅদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কবিতা।আর সেই কবিতাএকদিন নিজেই নিজেকে পড়ে—দেখে যে শব্দগুলোসবই ছিল তোমার,কিন্তু বাক্যগুলো ছিল অন্য কারও।সেই দিনতোমার ভিতরের নীরবতাহঠাৎ করে ভাষা পাবে—সে বলবে,“আমি ছিলাম, আমি আছি,আমি আর মুছে যাব না।”তখন তুমি প্রথমবারনিজের দিকে হাঁটবে—কোনো সমুদ্রের দিকে নয়,কোনো পতনের দিকে নয়—বরং এক অদৃশ্য উঁচু ভূমির দিকেযেখানে দাঁড়ালেতোমার ছায়াও সোজা হয়ে যায়।আর যদি আবার প্রেম আসে—(সে আসবেই,কারণ হৃদয় কখনও শেখে নাভালোবাসা ছাড়া বাঁচতে)তুমি তাকে দরজা খুলে দেবে,কিন্তু ঘরের চাবি নয়।তুমি তাকে আলো দেবে,কিন্তু নিজের আকাশ নয়।কারণ এবার তুমি জানো—ভালোবাসা মানেনিজেকে হারানো নয়,বরং নিজেকে ধরে রেখেআরেকজনকে স্পর্শ করা।এবং সেই স্পর্শেকোনো অসম্মান থাকবে না—থাকবে শুধু দুইটি সম্পূর্ণ মানুষ,যারা একে অপরের দিকে ঝুঁকে পড়ে,কিন্তু ভেঙে পড়ে না।সেখানেই শুরু হয়সত্যিকারের প্রেম—যেখানে তুমি বাঁচো,আর ভালোবাসাও বেঁচে থাকেতোমার সাথে।

উন্নীত নিয়ন্ত্রণ

সে প্রেমে পড়েছে—
প্রথমে ছিল শুধু হালকা জ্বর,
চোখের ভেতর নোনা আলো,
কণ্ঠে অচেনা জোয়ার।

তারপর ধীরে ধীরে
তার চারপাশের পৃথিবী জল হয়ে উঠল—
চেয়ারগুলো ভাসতে লাগল,
দেয়ালগুলো সাঁতরে গেল দূরে,
ঘড়ির কাঁটা ডুবে গেল সময়ের তলায়
এক নিঃশব্দ বুদবুদের মতো।

সে ভালবাসায় ডুবে গেছে—
এমনভাবে,
যেন নিজের নামটাও আর তার নয়,
যেন তার শ্বাস এখন অন্য কারও
ফুসফুসে জমা রাখা এক ধার।

ডুবে গিয়ে মারা গেছে—
কোনো মৃত্যু-সনদ নেই,
কোনো শোকবার্তা নেই,
শুধু তার ছায়া একদিন
নিজের শরীর ছেড়ে
নদীর দিকে হেঁটে গেছে,
ফিরে তাকায়নি।

মৃত ব্যক্তিটি
অপরের কোনো উপকারে লাগেনি—
কারণ মৃতরা কিছু দেয় না,
তারা শুধু নীরবতা রেখে যায়,
একটা ঠান্ডা, ব্যবহারহীন গভীরতা
যেখানে ডুবে যাওয়া শেখা যায়,
কিন্তু বাঁচা নয়।

সে এখন এক সমুদ্রের অংশ—
কেউ তার নাম জানে না,
কেউ তার মুখ মনে রাখে না,
শুধু মাঝে মাঝে
জোয়ারের ভেতর একটা অদ্ভুত ক্লান্তি
উঠে আসে—
সেটাই হয়তো তার অবশিষ্ট।

আর তুমি—

তুমি যেন ভুলেও এই ভুল করো না।

যখন প্রেম তোমাকে ডাকবে
তার নীল, ভেজা কণ্ঠে,
তুমি কাছে যাবে,
কিন্তু নিজের পায়ের নিচের মাটি
ভুলে যাবে না।

মনে রাখবে—
ডুবে যাওয়া সহজ,
নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে ভালোবাসা
এক অদ্ভুত, প্রায় অসম্ভব শিল্প।

তুমি সমুদ্রের কাছে দাঁড়াবে,
জল ছুঁবে,
তার ঠান্ডা সত্য অনুভব করবে,
কিন্তু নিজের বুকের ভেতর
একটা তীর লুকিয়ে রাখবে—
যেখানে তুমি এখনও সম্পূর্ণ,
অবিভাজ্য,
জীবিত।

কারণ প্রেম যদি তোমাকে মেরে ফেলে—
সে প্রেম নয়,
সে এক সুন্দর দুর্ঘটনা
যার কোনো পুনর্জন্ম নেই।

আর তুমি—
তুমি দুর্ঘটনা নও।

তুমি সেই ব্যক্তি
যে জলের ভেতর তাকিয়ে
নিজের প্রতিচ্ছবি চিনতে পারে,
এবং ঠিক সময়ে সঠিক দিশায়
ফিরে আসতে জানে।

বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

অবাধ

স্মৃতিরা মৌন হয় কালের নিয়মে—
তাদের জিভে জমে ধুলো,
অক্ষরগুলো ঝরে পড়ে
ভাঙা ঘড়ির কাঁটার মতো
অকারণে, অচল, অনুপস্থিতির দিকে।

তবে সব নয়।
কিছু স্মৃতি থাকে—
জেগে ওঠা জ্বরের মতো,
চোখের ভেতর নোনাজল হয়ে
নিজেকে নিজেই বারবার উচ্চারণ করে।

রাত দুটোর পরে,
যখন শহর তার নাম ভুলে যায়
আর কুকুরেরা স্বপ্ন দেখে মানুষের,
তখন আমাদের বারান্দা
একটা অস্থায়ী মহাবিশ্ব হয়ে উঠেছিল—
আবছায়া আলো-আঁধারিতে
দেয়ালগুলো শ্বাস নিচ্ছিল ধীরে,
আর বাতাসের ভেতর
অদৃশ্য কোনো সাগর দুলছিল।
আমাদের আকস্মিক মিলন—
না কোনো পূর্বাভাস,
না কোনো ভাষা,
শুধু দুটি সময়ের রেখা
হঠাৎ একে অপরকে চিনে নেওয়া
একটা অজানা জ্যামিতিতে।

তোমার হাত ছুঁয়ে
আমি বুঝেছিলাম—
ত্বকও কখনো দরজা হতে পারে,
আর তার ওপারে
অসীম সমর্পণের এক নিঃশব্দ গ্রহ
ঘুরে বেড়ায়,
যেখানে নামের প্রয়োজন হয় না।
সেই তীব্রতা—
যেন বিদ্যুৎ নিজেই নিজের শরীরে আগুন ধরিয়েছে,
যেন অন্ধকার হঠাৎ শিখে ফেলেছে
কীভাবে জ্বলে উঠতে হয়।

সময় অনেক কিছু মুছে দেয়—
মুখের রেখা, কথার মানে,
স্বপ্নের মানচিত্র—
কিন্তু সেই রাত,
সেই বারান্দা,
সেই অবাধ আত্মসমর্পণ—
ওগুলো সময়ের নাগালের বাইরে
একটা গোপন কক্ষে লুকিয়ে আছে।
যেখানে এখনও
রাত দুটো বাজে,
বাতাস দুলে ওঠে,
আর আমরা—
চিরকাল
প্রথমবারের মতো
একজন আরেকজনকে ছুঁয়ে যাই।

যেন সেই স্পর্শের পর
সময় নিজের দিক হারিয়ে ফেলেছিল—
ঘড়ির কাঁটা ঘুরছিল ঠিকই,
কিন্তু কোনো ভবিষ্যৎ জন্ম নিচ্ছিল না আর,
কোনো অতীতও ফিরে যাচ্ছিল না নিজের ঘরে।
আমাদের চারপাশে
অদৃশ্য কাচের দেয়াল গড়ে উঠেছিল,
যার বাইরে পৃথিবী ছিল নিস্তব্ধ, স্থির,
আর ভেতরে—
শুধু হৃদস্পন্দনের অতিরিক্ত শব্দ,
যেন দুটি বুকে
একই হৃদয় ভুল করে বসানো হয়েছে।

তুমি যখন চোখ তুলেছিলে,
আমি দেখেছিলাম—
সেখানে কোনো মানুষ নেই,
কোনো নাম নেই,
শুধু এক অচেনা আকাশ
নিজের গভীরতায় আমাকে ডুবিয়ে দিতে চায়।
আর আমি—
কোনো যুক্তি ছাড়া,
কোনো প্রতিরোধ ছাড়া,
নিজেকে ছেড়ে দিয়েছিলাম
সেই নিমগ্নতার কাছে,
যেন পতনও একধরনের মুক্তি।

তারপর—
আর নতুন কিছুই ঘটেনি।
না কোনো বিদায়,
না কোনো প্রতিশ্রুতি,
না কোনো গল্পের শেষ লাইন।
শুধু ভোর এসে
আমাদের আলাদা করে দিয়েছিল
একটা অদৃশ্য ছুরির মতো,
আর আমরা
নিজ নিজ জীবনের ভিড়ে ফিরে গিয়ে
ভুলে যাওয়ার অভিনয় শিখেছিলাম।

কিন্তু সময়—
সে তো কেবল বাহ্যিক জিনিস মুছে দেয়,
ভিতরের গোপন স্থাপত্যে
তার কোনো অধিকার নেই।
তাই আজও,
যখন রাত দুটো পেরিয়ে যায়
আর বাতাসে হালকা ঠান্ডা নামে,
আমি হঠাৎ শুনতে পাই—
বারান্দার সেই পুরোনো দরজা
আস্তে করে খুলে যাচ্ছে।
আর আমি জানি,
সেখানে তুমি নেই—
তবুও আছো।

কারণ কিছু মিলন
শেষ হয়ে যায় না কখনো,
তারা কেবল সময়ের ভেতর
নিজেদের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে—
যতক্ষণ না
আমরা দুজনেই
স্মৃতির মতো মৌন হয়ে যাই,
আর সেই এক রাত
আমাদের হয়ে
চিরকাল কথা বলতে থাকে।

মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬

অপেক্ষা নয়

প্রথম সুযোগেই সুযোগসন্ধানী হও—
এবং ভালোবাসো, 
একটি অনুশীলিত আচার হিসেবে নয়,
না এমন কোনো গল্প হিসেবে 
যা হাজার ধার করা শরীর আগে বলেছে—
বরং এক আকস্মিক অতিক্রম, 
যেখানে দুই অজানা তাদের দূরত্ব ভুলে যায়।

অপেক্ষা করো না ভাষা নিখুঁত হওয়ার জন্য, 
মুহূর্তের অনুমতি চাওয়ার জন্য,
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সুশৃঙ্খল সম্মতির জন্য—

প্রথম সুযোগ কখনও ভদ্র নয়।
এটা আসে হাঁপাতে হাঁপাতে, 
অর্ধগঠিত, 
সেই বৃষ্টির মতো 
যে এখনও ঠিক করেনি 
সে আশীর্বাদ, না ঝড়।

তাকে গ্রহণ করো।
কারণ সময়, 
সেই প্রথম কাঁপা সেকেন্ডে, 
সম্পূর্ণ নিরস্ত্র—
তার দেয়াল এখনও নরম, 
তার দরজা এখনও খোলা, 
তার স্মৃতি এখনও জাগেনি তোমার বিরুদ্ধে সতর্ক করতে।

সেইখানেই তোমার কর্ম এগিয়ে যাক—
লোভ নিয়ে নয়, বরং এক স্বচ্ছ আত্মসমর্পণে, 
যেন তুমি কিছু নিচ্ছ না, 
বরং প্রবেশ করছো একটি স্থানে 
যা সবসময়ই অপেক্ষায় ছিল 
আবিষ্কৃত হওয়ার জন্য।

সেইখানে ভালোবাসো—
যেখানে স্পর্শের এখনও কোনো নাম নেই, 
যেখানে ঘনিষ্ঠতার কোনো অতীত নেই,
যেখানে দুই সত্তার মাঝের বাতাস
এতটাই অক্ষত যেমন বর্ষায় সদ্য স্নাত একটি ফুল—
পাপড়ি খোলা কোনো কৌশল ছাড়াই,
সুগন্ধ উঠছে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই,
প্রতিটি জলের ফোঁটা 
একটি ক্ষণস্থায়ী মহাবিশ্ব 
ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার পথে।

সেইখানে—
পৃথিবী সংযম শেখানোর আগে, 
সন্দেহ তোমার নাম জানার আগে,
মুহূর্ত নিজের বর্ম জড়িয়ে প্রতিরোধ শুরু করার আগে—
সময়ের একটি খণ্ড কেটে নাও।

অধিকার করার জন্য নয়, 
বরং তাতে বিলীন হয়ে যাওয়ার জন্য।
তোমার উপস্থিতি হোক সেই ছেদন 
যা মিলনে রূপ নেয়, 
সেই ভাঙন যা উষ্ণতায় পরিণত হয়,
সেই ক্ষণিক সংঘর্ষ 
যেখানে বিভ্রান্ত হয়ে যায় তুমি কোথায় শেষ আর অন্যজন কোথায় শুরু।

কারণ ভালোবাসা, তার সত্য রূপে,
ধীরে ধীরে গড়া কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয়—
এটা অধিকার করা হয়, 
বিদ্যুতের মতো, 
যে নিজের পথ চিনে নেয় উদয়ের সেই মুহূর্তেই।

আর যদি তুমি দ্বিধা করো—
যদি মুহূর্তটিকে বয়স্ক হতে দাও, 
তাকে সতর্কতা শিখতে দাও, 
তাকে যুক্তির পোশাক পরতে দাও—
তবে যা থাকে তা আর ভালোবাসা নয়,
বরং এক দরকষাকষি।

তাই প্রথম সুযোগেই সেখানে থাকো—
যখন সবকিছু এখনও নিষ্পাপ, 
এখনও নিরস্ত্র, 
এখনও কাঁপছে হয়ে ওঠার সম্ভাবনায়—
এবং ভালোবাসো, 
যেন সময় নিজেই এক মুহূর্তের জন্য
ভুলে গেছে 
কীভাবে তোমাকে থামাতে হয়।

সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬

যে নিজেকে তোমারই স্বপ্ন ভাবত

তোমার পাঁজরের ভেতরে কোথাও,
শ্বাসের ভদ্র যন্ত্রপাতির আড়ালে,
একটি ছোট, অদেখা ঘর আছে—
সেখানে একটি সুইচ নিঃশব্দে গুনগুন করে,
লাল নয়, নীল নয়,
বরং সেই রঙের—
যে সিদ্ধান্তগুলো তুমি কখনও জানতেই পারোনি যে তুমি নিয়েছ।

এটি কেঁপে ওঠে
প্রতিবার পৃথিবী তোমাকে স্পর্শ করলে।
একটি শব্দ আসে—
হাসির পোশাকে লুকানো কাঁটার মতো তীক্ষ্ণ—
আর তুমি তাকে অভিবাদন জানানোর আগেই,
তোমার রক্ত তার উত্তর লিখে ফেলে
একটি ভাষায়, যা চিন্তার থেকেও প্রাচীন।

তুমি তাকে বলো রাগ।
সুইচ তাকে বলে অভ্যাস।
তুমি তোমার জীবনের বেশিরভাগটাই কাটিয়েছ
স্বয়ংক্রিয় দরজার এক করিডোর হয়ে—
প্রতিটি অতিক্রমকারী ঝড়ের জন্য খুলে যাও,
আর বন্ধ হও কেবল তখনই
যখন ক্ষতি তোমার নাম শিখে নেয়।

কেউ কণ্ঠ উঁচু করে,
আর তোমার শৈশব উত্তর দেয়।
কেউ চলে যায়,
আর তোমার ভেতরের এক ভুলে যাওয়া সত্তা
বছরের পর বছর খালি পায়ে দৌড়ায় তাকে ধরতে।

তুমি ভাবো তুমি বেছে নিচ্ছো।
কিন্তু সুইচ—
ওহ, সেই সুইচ—
তোমাকেই বেছে নিচ্ছিল।
একদিন,
তুমি তাকে শুনতে পাও।
ঠিক শব্দ নয়,
বরং রক্তপ্রবাহে এক দ্বিধা,
স্ক্রিপ্টে এক সামান্য হোঁচট।

অপমান আর প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে,
ক্ষত আর অস্ত্রের মাঝখানে,
একটি সরু, কাঁপতে থাকা ফাঁক আছে—
যেন পড়ে যাওয়া এক গ্লাসের থেমে যাওয়া মুহূর্ত
মাধ্যাকর্ষণকে মনে করার ঠিক আগে।

তুমি সেখানে পা রাখো।
সেখানে সময় অদ্ভুত আচরণ করে।
স্মৃতিগুলো তাদের কর্তৃত্ব হারায়,
অনুভূতিগুলো ইউনিফর্ম ছাড়া এসে দাঁড়ায়,
আর পুরনো প্রতিক্রিয়াগুলো—
সেই বিশ্বস্ত, ভুলপথে চালিত সৈন্যরা—
অপেক্ষা করে নির্দেশের জন্য
যা আর আসে না।

তুমি তোমার রাগের দিকে তাকাও,
আর প্রথমবারের মতো
সে তোমার মুখ নিয়ে ফিরে তাকায় না।
সুইচ নরম হয়ে আসে।
জোর করে উল্টানো নয়—
বরং বোঝা।
তুমি বুঝতে পারো,
এটি কখনওই পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করার লিভার ছিল না,
বরং একটি দরজা—
নিজের সাথে দেখা করার
পৃথিবী তোমাকে কে বানাবে তার আগে।

এখন, যখন কিছু ভেঙে যায়,
তুমি আর ভাঙনের রূপ নিতে দৌড়াও না।
তুমি দেখো।
তুমি শ্বাস নাও
যেন বাতাস একটি ভাষা
যা তুমি নীরবতা থেকে নতুন করে শিখছ।

আর সেই নীরবতায়,
তুমি জীবনের উত্তর দিতে শুরু করো
তার প্রতিধ্বনি না হয়ে।
সুইচ এখনও গুনগুন করে,
ছায়ার মতোই বিশ্বস্ত।
কিন্তু এখন সে তোমার জন্য অপেক্ষা করে।
আর তুমি—
নিজেকে পুনরাবৃত্তি করা এক ঝড় আর নও—
তুমি হয়ে ওঠো আকাশ,
যে ঠিক করে
বজ্রপাত আদৌ প্রয়োজন কি না।

শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

প্রথম ভাঙনের জ্যামিতি


প্রথম ভাঙনটি ঘটতেই হবে নীরবতায়
— অনুপস্থিতির নীরবতা নয়, 
বরং সেই নীরবতা যা ফিরে শোনে।

এটি শুরু হয় সেখানে 
যেখানে তোমার নাম আর প্রতিধ্বনি তোলে না, 
যেখানে ভাষা ভুলে যায় তোমাকে ধরে রাখার কৌশল, 
আর আয়নাগুলো, চিরসম্মতিতে ক্লান্ত,
নিজেদের মুখ ঘুরিয়ে দেয় দেয়ালের দিকে।

অজুহাতের উষ্ণ আস্তরণের নিচে, নিজেকেই দেওয়া সেই অনুশীলিত মমতার নিচে— 
যেন প্রতি রাতে উচ্চারিত এক প্রার্থনা
জেগে ওঠা এড়াতে— সেখানে আছে একটি কক্ষ।

কোনো দরজা নেই সেখানে পৌঁছাতে।
তুমি পৌঁছাও বিয়োগের মধ্য দিয়ে।
তোমার বুকের ভেতর খুলে যায় এক করিডোর, মৃদু, 
শল্যচিকিৎসার মতো ধৈর্যে আলোকিত
— আর তার শেষে, অবস্থানহীন,
তাড়াহীনভাবে বসে আছে 
তোমারই সেই সংস্করণ 
যে কখনও মিথ্যে বলা শেখেনি।

সে তোমার প্রচেষ্টা চিনতে পারে না। 
সে তোমার কারণ মনে রাখে না।
তোমার “প্রায়”-গুলোর তার কোনো প্রয়োজন নেই।

সে শুধু দেখে— 
যেমন শীত দেখে একটি পাতা ঝরে পড়তে অস্বীকার করছে। 
তুমি তার সামনে দাঁড়াও, 
সেলাই-করা পরিচয় পরে, 
যত্নে ইস্ত্রি করা গল্পগুলো নিয়ে, 
ইচ্ছার জাদুঘর সাজিয়ে— 
আর একে একে, সব খুলতে শুরু করে।

হিংস্রভাবে নয়। ব্যথাতুরও নয়। শুধু… অনিবার্যভাবে। 
প্রথমে গলে যায় তোমার ব্যাখ্যাগুলো—
যেন এমন এক মুখে চিনি 
যেখানে আর মিষ্টির বাসনা নেই।

তারপর আসে তোমার যুক্তিগুলো— অভ্যাসের ফল থেকে খসে পড়া
পাতলা খোসার মতো।
যা থাকে, তা আরও নীরব, 
আরও শীতল— গল্পহীন ত্রুটি।
সাক্ষীহীন দুর্বলতা। একটি সত্তা যার কোনো দর্শক নেই— তাই কোনো অভিনয়ও নেই।

বাতাস হয়ে ওঠে নিখুঁত। 
প্রতিটি শ্বাস মাপা লাগে, 
যেন ঘরটি তোমাকে বাস্তব সময়ে সম্পাদনা করছে।

আর সেখানে, সত্যকে সাজানোর মতো কিছুই না থাকায়, 
তুমি বুঝতে পারো— 
বৃদ্ধি কোনো নির্মাণ নয়। এটি ক্ষয়।
একটি সূক্ষ্ম খুলে ফেলা সেসব সবকিছুর, 
যা তোমাকে রেখেছিল স্বস্তিদায়ক ভ্রান্তিতে।

শৃঙ্খলা জন্মায় না তূর্যধ্বনিতে—
কোনো আচার নয়, কোনো সঙ্গীত নয়।
এটি ঢুকে পড়ে 
যেমন তুষার তোমার দিনের জানালায়
নিজের জ্যামিতি অনুশীলন করে।

এটি জিজ্ঞেস করে না তুমি কেমন অনুভব করছো। 
এটি অনুমতির অপেক্ষাও করে না।
এটি পুনরাবৃত্তি করে। 
এটি পুনরাবৃত্তি করে। 
এটি পুনরাবৃত্তি করে। 
যতক্ষণ না তোমার সময়গুলো
সামঞ্জস্য পায় 
ইচ্ছার সাথে নয়, সিদ্ধান্তের সাথে।

প্রথমে, তুমি শক্তিশালী বোধ করো না। তুমি উন্মুক্ত বোধ করো— 
যেন একটি ভবন হঠাৎ বুঝেছে 
তার দেয়ালগুলো ছিল শুধু আঁকা ছায়া।
তুমি অনুভব করো কেউ দেখছে—
বিচার নয়, নির্ভুলতা।

তারপর— এত সূক্ষ্মভাবে যে প্রায় ধরা পড়ে না— পরিবর্তন শুরু হয়।
একটি চিন্তা ধারালো হয়— 
যেন একটি ফলক নিজের ধার আবিষ্কার করছে। 
একটি দ্বিধা ভেঙে পড়ে তার আচার সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই। 
একটি একক কাজ 
তোমার পুরনো সত্তার প্রহরীদের পাশ কাটিয়ে 
একটি পতাকা পুঁতে দেয় অপরিচিত ভূখণ্ডে।

কোনো করতালি আসে না। 
কোনো উদ্ঘাটন ফোটে না। 
শুধু আরেকটি বালুকণা পড়ে যায় 
এক অদৃশ্য ঘড়িতে, 
যা তুমি জানতেই না তুমি বহন করছো।

দিনগুলো জমা হয়। নাটকীয়ভাবে নয়
— বরং সেই নীরব জেদের সাথে, 
যেমন ধুলো একদিন মরুভূমি হতে চায়।

তুমি নতুন হয়ে ওঠো না। 
তুমি কম মিথ্যে হয়ে ওঠো।
আর সেই শীতল উপস্থিতি— সেই ধৈর্যশীল, অচঞ্চল সাক্ষী— চলে যায় না।
সে থেকে যায় তোমার সচেতনতার স্থাপত্যে, 
হেঁটে বেড়ায় সেই করিডোরে 
যেগুলো তুমি একসময় এড়িয়ে যেতে।

সে শাস্তি দেয় না। 
সে প্রশংসাও করে না। 
সে নিশ্চিত করে— তোমার শৃঙ্খলা চেতনাহীন অভ্যাসে ক্ষয়ে না যায়। তোমার কাজগুলো আবার অবশতায় ভেসে না যায়। 
যাতে তুমি মনে রাখো— সবসময়— আবার ঘুমিয়ে পড়ার মূল্য।

কারণ উন্নতি কোনো গন্তব্য নয়। 
এটি একটি জলবায়ু— 
যেখানে টিকে থাকতে হয় অবিরত।

এন্ট্রপি অপেক্ষা করে স্বস্তির কোণগুলোতে, 
“আজ শুধু একবার” এর কোমলতায়,
সেই মৃদু সুরে যেখানে বিশ্রাম তার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
তাই তুমি এগিয়ে যাও। 
আলোকিত হয়ে নয়, 
মিথিক কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে নয়—
বরং সুষম হয়ে, 
যেন একটি কম্পাস অবশেষে চুম্বকের সাথে দরকষাকষি বন্ধ করেছে।

ভাঙনটি প্রশস্ত হয়, 
কিন্তু তোমাকে ভেঙে দেয় না। 
এটি অপ্রয়োজনীয়কে ঝরে পড়তে দেয়।
আর কোথাও, সেই নীরব, শ্রবণশীল কক্ষে, 
যে তুমি কখনও মিথ্যে বলেনি, 
সে চোখ বন্ধ করে— 
অনুমোদনে নয়, স্বীকৃতিতে— 
যেন অবশেষে, 
তুমি শুরু করেছো কথা বলতে সেই ভাষায়, যা সে বুঝতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬

ছুটি

উনি মধ্যবিত্ত—
কারণ তাঁর জীবনের অধিকাংশ দিনই
ছুটি।

না, ক্যালেন্ডারের লাল দাগে নয়,
না কোনও সরকারি ঘোষণায়—
তাঁর ছুটিগুলো জন্মায়
অদৃশ্য ক্লান্তির গর্ভে,
যেখানে কাজ নামক প্রাণীটি
প্রতিদিন একটু একটু করে
ঘুমিয়ে পড়ে।

সকাল হলে
তিনি উঠে বসেন—
ঘড়ি তাঁকে ডাকে না,
বরং সময় নিজেই
তাঁর সামনে বসে
চা খেতে খেতে হাই তোলে।
অফিস যাওয়ার রাস্তা
একদিন হঠাৎ
ঘাসে ভরে গেছে—
তার ওপর দিয়ে হাঁটলে
জুতোর ভেতর ঢুকে পড়ে
অপূর্ণ স্বপ্নের বীজ,
আর তিনি থেমে যান—
ভাবেন, আজও কি যাবো?
তারপর না যাওয়ার সিদ্ধান্ত
একটা নরম বালিশের মতো
তাঁর পিঠে এসে পড়ে—
তিনি শুয়ে পড়েন
এক অদৃশ্য রবিবারের ভেতরে।

এইভাবে
সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার—
সব দিনগুলো
ধীরে ধীরে রং হারায়,
সবাই মিলে হয়ে যায়
এক দীর্ঘ ছুটির বিকেল,
যেখানে কাজের শব্দ
শুধু দূরের ট্রেনের মতো
শুনতে পাওয়া যায়,
কিন্তু কখনও এসে পৌঁছায় না।

লোকজন বলে—
তিনি মধ্যবিত্ত।
তাঁর আয় মাঝামাঝি,
তাঁর স্বপ্ন মাঝামাঝি,
তাঁর সাহসও মাঝামাঝি।
কিন্তু তারা জানে না—
তিনি আসলে
একজন স্থায়ী পর্যটক
নিজের জীবনের মধ্যেই,
যেখানে প্রতিটি অসমাপ্ত কাজ
একটি অদেখা পাহাড়,
আর প্রতিটি কালক্ষেপণ
একটি অচেনা সমুদ্র।

তিনি ছুটিতে থাকেন—
কারণ বাস্তবের সঙ্গে
তাঁর চুক্তি এখনও সই হয়নি,
কারণ দায়িত্ব নামের দরজাটি
তিনি প্রতিদিনই
খুলতে গিয়ে
আবার আলতো করে বন্ধ করে দেন।

তাই তাঁর জীবন—
এক দীর্ঘ, অনির্ধারিত অবকাশ,
যেখানে তিনি
কিছু না করেও
অদ্ভুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন,
আর কিছু করতে গিয়েও
অদ্ভুতভাবে বিশ্রাম নেন।

উনি মধ্যবিত্ত—
কারণ তাঁর ছুটিগুলো
কখনও শেষ হয় না,
আর তাঁর কর্মদিবসগুলো
কখনও শুরুই হয় না।

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

সবাই বাঁচে, অথচ

যে করিডোরে সবাই বেঁচে আছে, কিন্তু কেউ বাঁচে না
সবাই মরে—

এই অংশটা সহজ,
একটা দরজার মতো
যার দিক শুধু একটাই,
আর ওপাশে কোনো হাতল নেই।

কিন্তু সেই দরজার আগে
একটা লম্বা করিডোর আছে,
শ্বাস নিতে থাকা দেহে ভরা,
যারা হাঁটে সাবধানে—
যেন জীবন একটা জাদুঘর,
যেখানে ছোঁয়া নিষিদ্ধ।

তারা চলে।
ও হ্যাঁ, তারা চলে—
কব্জিতে সেলাই করা ঘড়ি,
চোখ ভাড়া দেওয়া উজ্জ্বল পর্দায়,
হৃদয় ভাঁজ করে রাখা
অব্যবহৃত মানচিত্রের মতো।
কোথাও
তাদের একসময়ের শিশু-স্বত্বা
এখনও কড়া নাড়ে
পাঁজরের ভেতর থেকে,
জিজ্ঞেস করে:
“আমরা শুরু করব কবে?”

কিন্তু করিডোরের নিয়ম আছে।
দেয়ালে ঝুলে থাকা অদৃশ্য সাইনবোর্ড:
অতিরিক্ত ঝুঁকি নেবে না
অতিরিক্ত গভীর অনুভব করবে না
অন্যদের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠবে না।

তাই তারা অস্তিত্বকে অনুশীলন করে,
অভিনেতার মতো
যারা হঠাৎ করে নতুন কিছু বলতে ভয় পায়।

করিডোরে কিছু ঘরও আছে।
এক ঘরে
মানুষেরা তাদের ভয়কে ঘষে-মেজে
এমন চকচকে করে
যেন সেটাই তাদের সাফল্য।
আরেক ঘরে
স্বপ্নগুলো কাঁচের বয়ামে বন্দী,
লেবেল লাগানো: “পরে”
“যখন প্রস্তুত হব”
“অনুমতি পাওয়ার পর”।

বয়ামগুলো হালকা গুনগুন করে—
আটকে থাকা বজ্রের মতো,
যে বজ্রপাত হতে ভুলে গেছে।
সময় এখানে খালি পায়ে হাঁটে।
সে চিৎকার করে না,
সে সতর্কও করে না।
সে শুধু কুড়িয়ে নেয়
অবেঁচে থাকা মুহূর্তগুলো,
যেমন সমুদ্র কুড়িয়ে নেয়
ভুলে যাওয়া নামগুলো।

আর কখনও—খুব কমই—
কেউ একজন থেমে যায়।
সে দেয়ালে হাত রাখে।
দেয়াল কেঁপে ওঠে।
সে শোনে—
প্রত্যাশার শব্দের বাইরে,
সাধারণতার করতালির বাইরে,
বেঁচে থাকার ভদ্র যন্ত্রের বাইরে।
আর তখন সে শোনে—
একটা বুনো, অবাধ্য স্পন্দন,
যা অনুমতি ছাড়াই ধকধক করে।
সেই মুহূর্তেই
করিডোরে ফাটল ধরে।
জোরে নয়,
নায়কোচিতও নয়।
শুধু এতটুকু—
যাতে একটু বিশৃঙ্খলা ঢুকে পড়ে,
যাতে রং আকারের কথা না শোনে,
যাতে শ্বাস আগুন হয়ে ওঠে,
যাতে ভয় তার ব্যাকরণ হারায়।

সবাই মরে।
কিন্তু সবাই
দেয়াল ভাঙতে দেয় না,
বয়াম ভেঙে ফেলতে পারে না,
ভেতরের শিশুটিকে
একসাথে দাঁত আর ডানা গজাতে দেয় না।

অনেকে শেষ দরজায় পৌঁছায়
নিজের জীবনটাকে ভাঁজ করেই—
একটা চিঠির মতো,
যা কখনোই
নিজের প্রেরকের হাতে খোলা হয়নি।
আর যখন তারা পেরিয়ে যায়,
ভেতর থেকে কিছু একটা ফিসফিস করে—
অনুশোচনা নয়,
বরং চিনে ফেলা:
“আমি ছিলাম…
কিন্তু কখনো পৌঁছাইনি।”

আর কোথাও,
শেষ না হওয়া এক করিডোরে,
আরেকটা হৃদস্পন্দন থমকে থাকে—
সিদ্ধান্ত নিচ্ছে,
সে সত্যিই বাঁচবে,
নাকি শুধু
চলে যেতে থাকবে।