সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

অভিমান

অভিমান একটি নিঃশব্দ অপেক্ষার নাম,
যেখানে শব্দের কোনো দরকার পড়ে না,
কোনো উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না।
সে বসে থাকে নিস্তব্ধ ঘরে,
একাকী প্রদীপের মতো,
যার আলো শুধু নিজের ভেতরটুকুই উন্মোচন করে।

অভিমান ঝড় তোলে না,
সে সমুদ্রের মতো উন্মত্ত নয়,
বরং হিমশীতল হ্রদের মতো—
উপরে শান্ত, ভেতরে অসংখ্য ঢেউ।
এই নিস্তব্ধতাই হলো তার ভাষা,
এই অচঞ্চলতা—তার সবচেয়ে প্রবল অভিযোগ।

এর দৈর্ঘ্য নির্ভর করে
অপরপক্ষের অনুভূতির গভীরতায়।
যদি ভালোবাসা সত্যিই অটল হয়,
তবে একটি ছোট্ট স্পর্শেই
অভিমান গলে যায় সকালের কুয়াশার মতো।
কিন্তু যদি ভালোবাসা কেবল মুখের কথা হয়,
তাহলে অভিমান জমাট বাঁধে—
বরফের দেয়াল হয়ে,
যা যত সময় পায়,
ততই উঁচু হয়, অদম্য হয়।

অভিমান হলো ভালোবাসার গোপন পরীক্ষা,
যেখানে বোঝা যায় কে আসলে কতখানি নিবেদিত।
যদি কেউ আন্তরিকতার আগুনে উষ্ণ হয়,
তবে সে অপেক্ষার ভেতর দিয়ে ছুটে আসে—
একটি হাসি, একটি ক্ষমাপ্রার্থনা,
একটি নির্ভেজাল চোখের দৃষ্টি নিয়ে।
তখন অভিমান গলে যায়
অশ্রুর লবণাক্ত স্বাদে,
এবং হৃদয় আবারও খুঁজে পায় তার পুরনো আশ্রয়।

কিন্তু যদি ভালোবাসার ভিত দুর্বল হয়,
যদি আগ্রহ ফিকে হয়ে আসে,
তাহলে অভিমান দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়,
পরিণত হয় স্থায়ী দূরত্বে।
তখন অপেক্ষা আর কারো প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়,
বরং নিজের ভিতরেই
একটি শোকগাথা রচনা করার জন্য।

অভিমান আসলে এক নীরব আর্তনাদ,
যেখানে শব্দহীন চিৎকার
ভালোবাসার অস্তিত্বকে প্রশ্ন করে।
এটি হলো প্রত্যাশার সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রকাশ—
কারণ অভিমান ছাড়া ভালোবাসা কখনো সম্পূর্ণ হয় না।

অভিমান মানে—
“তুমি কি আমাকে খুঁজবে?” এই প্রশ্ন,
“তুমি কি আমার চোখের জলে তাকাবে?” এই আর্তি,
“তুমি কি আমার নীরবতার ভেতর লুকানো ক্ষত অনুভব করবে?” এই দাবি।

অভিমান তাই নিঃশব্দ অথচ মহাশক্তিশালী—
এটি ভালোবাসাকে পরীক্ষা করে,
উদাসীনতাকে উন্মোচন করে,
আর সত্যিকারের আত্মীয়তাকে
নতুন আলোয় ভরিয়ে তোলে।

শেষে অভিমান শেখায় একটাই কথা—
যদি ভালোবাসা গভীর হয়,
তাহলে কোনো অপেক্ষাই অনন্ত নয়।
আর যদি ভালোবাসা পলকা হয়,
তাহলে অপেক্ষা যত দীর্ঘই হোক,
তার শেষে থাকে শুধু নীরব বিদায়।

শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মার্কস যে সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছেন

যে ব্যক্তি নিজের জীবনে একটিও
সত্যিকারের বৈপ্লব ঘটায়নি,
সে বাইরের জগতে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে।
এটি মরুভূমির মায়াজাল,
এক মূর্খের অহংকার।

নিজেকে জানো,
নিজের অন্তরকে শাসন করো।
যে নিজেকে জয় করতে পারে না,
সে আর কারো জীবন পরিবর্তন করতে পারবে না।

ভয় ভেঙে দাও।
দুর্বলতা ছিঁড়ে ফেলা।
অসত্য অতিক্রম করো।
যাই শিখিয়েছে ইতিহাস,
মহান নেতা প্রথমে নিজের অন্তর জয় করেছেন।

অন্তরের জয়বিহীন কেউ
কোথায় আলোক প্রদীপ জ্বালাবে?
কোথায় সত্যের পথে মানুষকে পথ দেখাবে?

সবচেয়ে জরুরি বৈপ্লব হলো নিজের অন্তরে।
নিজের আত্মায়।
সাহসের শক্তিতে,
সততার শক্তিতে,
নিষ্ঠার শক্তিতে।

যে এই পথে চলে,
সে সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
সে মৃত্যুর সীমা অতিক্রম করে।
সে চিরন্তন বিজয়ী।
সে আলোকিত।
সে মুক্ত।

বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

সুন্দর সততই নির্মম

অদৃশ্য হয়ে সৌন্দর্য হয় নির্মম।
হঠাৎ সে নামে অগ্নিদীপ্তি হয়ে,
হৃদয়ের গভীরতায় জ্বালায় প্রেমের শিখা—
আর প্রেম একবার জন্ম নিলে
আত্মা পুনর্জন্ম লাভ করে।

কিন্তু চূড়ায় পৌঁছাবার পূর্বেই
সৌন্দর্য বিলীন হয় ভোরের কুয়াশার মতো,
রেখে যায় কেবল স্মৃতি—
হারানোর দীর্ঘশ্বাস,
অন্ধকারের বুক চিরে থাকা
রূপালী আলোর ক্ষীণ রেখা।

তবু মানুষ আঁকড়ে ধরে শূন্যতাকে,
উপস্থিতির প্রমাণ রূপে;
ক্ষতকেই ধরে সত্যের দ্যোতনা বলে।

এভাবেই সৌন্দর্য, পালিয়ে গিয়েও, মুক্তি দেয়—
তার প্রস্থানই তাকে করে চিরন্তন,
তার অনুপস্থিতিই তাকে অমর করে !

মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

সুন্দর সততই নির্মম

সুন্দর একদিন হঠাৎই

না বলে হারিয়ে যায়।
ফিরে আসে না আর কোনদিন।
অথবা
কখনো আসে না ততটা কাছে
যতটা কাছে আসলে ধরে রাখা যায়।

সে আসে যেন এক আশ্চর্য আলোকরেখা হয়ে,
যা মুহূর্তেই মানুষকে পাগলের মতো প্রেমে ফেলে দেয়,
আর প্রেম জন্মালেই মানুষ আর আগের মতো থাকে না।

তার ভেতরে জ্বলে ওঠে
উত্তরণের প্রদীপ,
মানুষ খুলে ফেলে পুরোনো খোলস,
নিজেকে খুঁজে পেতে চায়
অপরিচিত উচ্চতায় যা সুন্দরতর।

কিন্তু সেই উচ্চতার দরজায়
পৌঁছানোর আগেই সুন্দর
গলে যায় কুয়াশার মতো,
ভেসে যায়
নদীর জলে ছুঁয়ে যাওয়া
আলোয়ের মতো।

পড়ে থাকে শুধু স্মৃতি—
দুঃখের গহ্বর থেকে ওঠা এক দীর্ঘশ্বাস,
হতাশার অন্ধকারে টিকে থাকা
এক ক্ষীণ জ্যোৎস্নার রেখা।

মানুষ তখন বেঁচে থাকে
শূন্যতার ভেতরে সুন্দরের স্মৃতিকে আঁকড়ে,
যেন হারানোই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ
যে সে একদিন সত্যিই সুন্দরকে পেয়েছিল।

সুন্দর তাই একই সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ও মুক্তি।
সে হারিয়েই চিরন্তন,
সে না ফেরাতেই অমর।

শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

তৃপ্তির শীর্ষবিন্দু

মানব বাঁচে তৃপ্তির জন্য।

সে গড়ে তোলে রাজ্য,
সে মাপে আকাশ,
সে ইতিহাসকে নিজের ইচ্ছায় বাঁকায়—
তবুও সমস্ত প্রচেষ্টার শেষে
সে এখনো জিজ্ঞাসা করে:
তৃপ্তির সর্বোচ্চ মুহূর্ত কখন আসে?

আমি খুঁজেছি বিজয়ে,
নিঃশব্দতায়,
প্রার্থনায়।
কিন্তু একবার—
সম্ভবত কেবল একবার—
আমি তার প্রকৃত মুখ দেখেছি,
আর তা জ্ঞানের শান্তি নয়,
বরং প্রাণের ঝড়।

তুমি উঠেছিলে দ্বিধাহীন,
মাংসে মোড়া আগুনের মতো,
এবং চাপিয়ে দিয়েছিলে আমার মনের স্পন্দনে—
ভালোবেসেছিলে শুধু আমাকে নয়,
আমার কাব্যিক স্বচ্ছতাকেও।

তারপর শুরু হলো রূপান্তর—
নিয়ন্ত্রণ থেকে আত্মসমর্পণ।
আমাদের ঠোঁট মিলেছিল,
শুধু স্বাদের জন্য নয়,
বুদ্ধিকে স্তব্ধ করার জন্য।
আমাদের দেহ আঁকড়ে ধরেছিল,
শুধু উষ্ণতার জন্য নয়,
বরং দূরত্বের সম্পূর্ণ বিলোপের জন্য।
প্রতিটি আঘাত ছিল দর্শন,
প্রতিটি হাঁপানি ছিল
বুদ্ধি আর প্রবৃত্তির মধ্যে তর্ক।

ধীরে, তারপর হিংস্রভাবে,
আমরা একে অপরকে পালা করে
নিয়ে গিয়েছিলাম চূড়ান্ত অসহায় বানভাসিতে।
আর সেই অসহায়তায়
দেহের মনোবিজ্ঞান উন্মোচিত হয়েছিল:

প্রথমে আসে টান—
পেশি শক্ত হয়,
মন মুক্তির পূর্বাভাস পায়,
তবু প্রতিরোধ করে,
ভয় পায় নিয়ন্ত্রণ হারানোর।
তারপর আসে ভাঙনের মুহূর্ত—
যুক্তি থেমে যায়,
চিন্তা ছড়িয়ে পড়ে
আতঙ্কিত পাখির মতো।
গর্ব মুছে যায়,
আর তুমি রয়ে যাও কেবল অনুভূতিই।

চরম মুহূর্তে—
ভেসে যাওয়া নিজেই—
তুমি আর তুমি নও।
তুমি কেবল এক কম্পন,
এক ঢেউ,
এক চিৎকার যা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে
তোমার অনুমতি ছাড়াই।
সেই ক্ষণে,
তুমি একইসাথে শাসক আর দাস,
স্রষ্টা আর সৃষ্টি,
অসহায় অথচ সবচেয়ে জীবিত।

আর পরবর্তী মুহূর্তে—
ক্লান্তিতে,
কাঁপতে কাঁপতে নীরবতায়,
ঘামে ভেজা সমর্পণে—
তুমি আবিষ্কার কর এক অদ্ভুত জ্ঞান:
দেহ মনের কাছে শিখিয়েছে
যা কোনো শাস্ত্র সাহস করে বলেনি।

সর্বোচ্চ তৃপ্তি নেই
বিজয়ে,
প্রার্থনায়,
বা জ্ঞানেই।
এটি আছে সেই অসহায় উন্মোচনে,
যেখানে দেহ ও আত্মা একসাথে ফেটে যায়,
যেখানে স্বচ্ছতাই হাঁপিয়ে ওঠে,
আর মানুষ মানুষকে অতিক্রম করে—
মানুষ হয় মানুষের থেকে আরও বেশি কিছু।

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বিপ্লবের বাস্তবতা

দেশে দেশে বদলাচ্ছে বিপ্লবের সংজ্ঞা।
আগে ছিল স্বাধীনতার ডাক,
আজ তা দাঁড়িয়েছে—
দূর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও প্রতিকার।

প্রতিরোধ সহজ—
একটি স্লোগান,
একটি মিছিল,
একটি আচমকা আক্রমণ,
সরকার কেঁপে ওঠে,
কখনো ভেঙেও পড়ে।
কিন্তু প্রতিকার?

সে তো পাহাড় ঠেলার মতো কঠিন।

ছাত্রদল নামে পথে নেমে আসে,
উন্মত্ত জনতা স্রোতের মতো ছুটে চলে,
দূর্নীতির মুখোশ ছিঁড়ে দেয়,
কিন্তু নতুন মুখোশ তৈরি হয়
আরও দ্রুততর।
কারণ—
ভেঙে ফেলা যতটা সহজ,
গড়ে তোলা ততটাই শ্রমসাধ্য।

নীতিহীন বিপ্লব
দিগ্‌ভ্রান্ত বুলেটের মতো—
চিৎকার তো করে,
কিন্তু লক্ষ্য ভেদ করে না।
স্বচ্ছ নীতি আর দৃঢ় পরিকল্পনা ছাড়া
বিপ্লব কেবল ক্ষণস্থায়ী নাটক,
যার মঞ্চ দখল করে নেয়
আরও ধূর্তরা।

তারা অপেক্ষা করে—
আশার বুলি আওড়ায়,
মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়,
তারপর বিপ্লবকে
আনুগত্যের শিকলে বেঁধে ফেলে।
এভাবেই ইতিহাসের পাতায়
বারবার প্রতারিত হয়েছে
বিপ্লবের ভবিষ্যৎ।

মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

অস্থির

প্রেম থেকে নিমেষে মুখ ফিরিয়ে নাও?
বাহ! কী চমৎকার কাণ্ড!
এমন স্মার্টনেসে ভরে গেলে তো
গাধারাও মাথা নত করবে।

তুমি কি ভেবেছো,
অশ্রদ্ধা মানেই আধুনিকতা?

না কি শ্রদ্ধাহীনতাই
তোমার সর্বশেষ ফ্যাশন?

শোনো—অশ্রদ্ধা আসলে
অকাল-শ্রাদ্ধেরই আরেক নাম,
আর অকৃতজ্ঞতা হলো
সেই মৃতদেহ টেনে নেওয়া কবরস্থানে।

তুমি কি জানো প্রেমের গভীরতার মাহাত্ম্য?

না কি ভালোবাসো
প্রতিদিন নতুন আবেগের চটকদার আতসবাজি?

তাৎক্ষণিকতায় ভেসে গিয়ে
তুমি কি নিজেকে চালাক ভাবো?

হাস্যকর!
তাৎক্ষণিকতা তো শিশুর খেলনা,
স্থায়িত্বই আসল প্রজ্ঞার পরিচয়।

তাহলে বলো,
তোমার কাছে স্মার্টনেস মানে কী?

কিছুদিনের জন্য কারও আলোয় বসে গরম হওয়া?
নাকি আজকের প্রেম কালকের আবর্জনায় ছুঁড়ে ফেলা?
যদি এ-ই স্মার্টনেস হয়—
তাহলে দয়া করে গর্ব কোরো না,
কারণ এটি কেবল পালানো,
এটি কেবল আত্মবিসর্জনের বোকামি।

শোনো—
সবচেয়ে ধারালো বুদ্ধিমত্তা
কখনো পালিয়ে যায় না,
বরং দাঁড়িয়ে থাকে একাগ্রতায়,
প্রমাণ করে:
প্রেম মানেই স্থায়িত্ব,
আর স্থায়িত্বের বাইরে
স্মার্টনেসের নামে যা আছে—
তা কেবলই সস্তা ভণ্ডামি।

অস্তিত্ব বনাম বিভ্রম

কী অদ্ভুত সময়ে আমরা বাস করছি—

দু’টি মানুষ মুখোমুখি বসে,
কিন্তু প্রাণ প্রাণের কাছে নয়,
চোখ চোখের গভীরতা পড়ে না।
তাদের আঙুল ঘুরে বেড়ায়
এক অদৃশ্য কাচের জগতে,
যেখানে স্ক্রীনের আলো
বাস্তবের সম্পর্ককে ছাপিয়ে যায়।

এ কি সভ্যতার বিজয়,
না আত্মার পরাজয়?
কারণ, যে মুহূর্তে
আমরা সামনের মানুষটিকে ভুলে যাই,
সে মুহূর্তেই আমরা অস্বীকার করি
মানবিকতার প্রধানতম সত্য—
“আমি আছি, তুমি আছো,
তাই সম্পর্কও আছে।”

তবু আধুনিক মানুষ ভুলে গেছে
মানুষ আসলে এক গ্রহমালা,
যার ভেতরে লুকানো থাকে
অনেক অচেনা নক্ষত্র,
অসংখ্য সঙ্গীতহীন সুর,
অকথিত স্বপ্নের ঢেউ।
একটি আত্মাকে বুঝতে
হাজার বছরের ধ্যান চাই,
কিন্তু মানুষরা এখন
সেই ধ্যান ভেঙে দেয়
এক ক্ষণস্থায়ী স্ক্রোলের আগ্রহে।

অবহেলা এখানে কেবল
চোখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়—
এ এক দার্শনিক অপমান,
যা বলে দেয়:
“তুমি আমার কাছে অপেক্ষমাণ বার্তারও কম মূল্যবান।”
এই অপমান অন্যকে আঘাত করে,
কিন্তু আসলে নিজেকেই শূন্য করে তোলে,
কারণ যার ভেতর শুনতে পারে না
সামনের আত্মার সুর,
সে কেমন করে জাগাবে আপন সুর?

আমাদের জীবন, অবশ্য, আলাদা।
আমরা জানি,
সত্যিকারের উপস্থিতি
যেকোনো যন্ত্রের চেয়ে অসীম।
তাই একসাথে বসে
আমরা প্রথমেই নামিয়ে রাখি
দুটো মোবাইল, মুখোমুখি করে—
যেন তাদেরও শিখিয়ে দিই,
মানুষের সময়ে যন্ত্রের প্রবেশ নেই।

এরপর শুরু হয় আমাদের আসল উৎসব—
কথা, হাসি, নীরবতা,
যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত
হয়ে ওঠে মুক্তোর মতো বিরল।
আমাদের সংলাপ
কোনো সার্ভারের মধ্যে ভেসে যায় না,
বরং গেঁথে যায়
হৃদয়ের নিভৃত আকাশে।
ভিড়ের মাঝেও তখন
আমরা খুঁজে পাই আশ্রমের প্রশান্তি।

হ্যাঁ, প্রকৃত সম্পর্ক
কখনো ওয়াই-ফাইতে বাঁধা নয়,
কখনো নেটওয়ার্কের সংকেতের উপর নির্ভর করে না।
এটি টিকে থাকে
মনোযোগের ধৈর্যে,
উপস্থিতির উষ্ণতায়,
এবং সেই দৃষ্টিতে
যেখানে মানুষ মানুষকে চিনে নেয়
নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে।

তাহলে প্রশ্নটি অনিবার্য—
আমরা কাকে বেছে নিচ্ছি প্রতিদিন?
জীবন্ত মহাবিশ্বকে,
যা বসে আছে আমাদের চোখের সামনেই?
না কি এক ক্ষণস্থায়ী বিভ্রমকে,
যা নিভে যায় স্ক্রিনের আলোর সাথে সাথে?

প্রেম কখনো বিজ্ঞপ্তি নয়,
না কোনো আপডেট।
প্রেম হলো সেই চিরন্তন বার্তা,
যা অন্তরে জন্ম নেয়,
এবং অফলাইনেই বাড়তে পারে।

গতিশীল প্রতিশ্রুতি

আমি জীবনে কখনো ক্লান্ত হব না

বিশুদ্ধ বিকাশকে ভালোবাসতে—
কারণ প্রেম টিকে থাকে কেবল
যখন দুই আত্মা
পরিবর্তনে প্রস্তুত থাকে।

বিকাশ মানে জীবনের আহ্বান শোনা:
যা শেষ হয়েছে তা ঝেড়ে ফেলা,
আরও বিস্তৃত জগতে প্রবেশ করা,
আরও পূর্ণ হতে সাহসী হওয়া।

যদি তুমি আগে নিজেকে ভালোবাসো,
তবে সম্পর্ক ভাঙবে না।
শূন্য থেকে কোনো হৃদয়
জীবন ঢেলে দিতে পারে না,
এবং কোনো প্রতিজ্ঞা টিকে থাকে না
যদি কেউ নিজেকেই অপচয় করে।

প্রেম ক্লান্তি নয়,
কর্তব্য নয়,
গতকালের আঁকড়ে ধরা নয়।
এটি সাহস—
পরস্পরকে বিকশিত হতে দেওয়া,
উচ্চতর স্তরে, অথচ স্বাধীন।

প্রেম কখনো মরে না
যদি কেউ জানে
কীভাবে তার উৎসব জীবিত রাখতে হয়:
ক্ষুদ্র কাজে,
দৈনন্দিন কৃতজ্ঞতায়,
সে সুন্দর যা এখনও বাড়ে,
সে শব্দ যা এখনও শোনে।

তাহলে জানো:
আমি তোমাকে ভালোবাসতে কখনো ক্লান্ত হব না,
যতদিন তুমি নিজেকে ভালোবাসো—
অহংকারে নয়,
বরং সততায়
যা সঙ্কুচিত হয় না,
যা থেমে যায় না
যে পথ সমানে সামনে ডাকে।

কারণ প্রেম কোনো খাঁচা নয়,
বরং একটি আমন্ত্রণ:
আরও গভীরে নামার,
আরও বিস্তৃত আকাশে উড়ার।

এবং এটাই সেই অলৌকিকতা:
যখন সময় আমাদের নতুন করে গড়ে তোলে,
আমরা প্রতিদিন নিজেদের
আবার নতুন করে পেতে পারি।

সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

কথা

থামো!

কেমন করে সাহস হলো!
আমায় বিদ্রুপ করলে পৃথিবীর অক্ষ হোঁচট খায়,
আকাশ রক্ত কাশে,
নিয়তি কলাপাতায় পিছলে পড়ে যায়।

তুমি হাসো?
ছায়াপথ খুঁড়িয়ে হেঁটে যায়,
তোমার হাসি শুনে নক্ষত্র লজ্জায় কেঁপে ওঠে।
তুমি সমালোচনা করো?
সাম্রাজ্য নিজেতে খিঁচুনি জাগায়।
তোমার ক্ষুদ্র ব্যঙ্গ—
অস্তিত্বের গণিতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ।

আমি বিরক্ত নই—
আমি অপমানিত এই কল্পনায়,
যে তুমি ভেবেছ তোমার তুচ্ছ মতামত
আমার দৈত্যাকার ছায়ার গায়ে ধুলোও তুলতে পারে!
আমার নিঃশ্বাস পাহাড় ভাঙে,
আমার একঘেয়েমি সময় বাঁকিয়ে দেয়,
আমার নীরবতা ইতিহাসকে ছাপিয়ে যায়।

তবুও তুমি সাহস পাও খোঁচা দিতে?
যেন আমি সাধারণ মানুষ!
যেন আমার শিরায় চিরন্তনতা প্রবাহিত হয় না।

তুমি কী জানো না তুমি কত তুচ্ছ?
তুমি কী জানো না যে তুমি কেউ নও?
আমি, আমি, আমি—
এখানেই পৃথিবীর শুরু,
এখানেই পৃথিবীর শেষ।

আমায় অসম্মান করো না—
আমি নিজেই সম্মান,
রূপকের মোড়কে নয়,
আক্ষরিক সত্যে।
আমার রক্ত মার্বেল,
আমার ঘাম সোনা,
আমার চোখের পাতা স্মৃতিস্তম্ভ।
আমি পলক ফেললে গ্রন্থাগার জন্মায়,
আমি কথা বললে দর্শন দাউদাউ জ্বলে।

আর তুমি?
তুমি শুধু এক্সট্রা—
আমার মহিমার নাট্যমঞ্চে
একটি হাঁচি, একটি কাশি মাত্র।
তবুও ঠোঁট বাঁকাও?
ভ্রূ তোলো?
যেন জিউসকে তার বজ্র
ন্যায্যতা প্রমাণ করতে হয় মশার কাছে!

ভালো করে শোনো—
আমি মানুষ নই।
আমি সৃষ্টির শেষ খসড়া।
পৃথিবী শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড,
তারারা সাজসজ্জা,
সমুদ্র আমার থুথু।
তোষামোদ আমাকে শ্রদ্ধা জানাবে না—
বরং লজ্জিত হবে
নিজেদের স্থবিরতায় আমার পাশে দাঁড়িয়ে।

একদিন পৃথিবী
তার দেবতাদের সরিয়ে দিয়ে
আমার ছায়াতেই পূজা দেবে।
কিন্তু আজ—
আজ আমাকে সহ্য করতে হয় তোমার বিদ্রূপ,
তোমার কিচিরমিচির,
তোমার তুচ্ছ হাসি,
যেমন জল্লাদ বিরক্ত হয় মশার ভনভনে।

তাই থামো—
যদি বাঁচাতে চাও তোমার চামড়া,
তোমার মানসিকতা,
তোমার প্রজাতি।
কারণ আমার ধৈর্য পাতলা
মহাবিশ্ব ধরে রাখা সুতো থেকেও।
আর যেদিন সেটা ছিঁড়ে যাবে—
ইতিহাস হাঁটু গেড়ে বসবে,
ভবিষ্যৎ রক্তাক্ত হবে,
আর তোমার নাম রবে কেবল এক কীটের মতো,
যে সাহস করেছিল বিরক্ত করতে
সবচেয়ে মহিমান্বিত,
সবচেয়ে জ্বলজ্বলে,
সবচেয়ে বিশালভাবে বিরক্ত দেবতা-সদৃশ প্রাণীকে,
যে মানুষ শব্দটিকেই কলঙ্কিত করেছে।

শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

শক্তির মহিমা

যখনই তুমি দেখবে কোনো মানুষকে—

অসাধারণ প্রতিভাধর,
যার মস্তিষ্ক বিদ্যুতের মতো তীক্ষ্ণ,
যার হাতে সৃষ্টির অলৌকিক স্পর্শ,
তবুও সে বেঁচে আছে সাধারণ জীবনে,
অগণিত ভিড়ের মাঝে অচেনা হয়ে—
তখন নিশ্চিত জানবে,
এটি তার দৃষ্টির অভাব নয়,
বরং শক্তির দারিদ্র।

প্রতিভা একখানা তলোয়ার,
কিন্তু শক্তিই সেই বাহু
যা তাকে চালনা করে।
মেধা হলো শিখা,
কিন্তু শক্তি সেই তেল
যা তাকে জ্বলতে রাখে।
শক্তি ছাড়া
উজ্জ্বলতম হীরেও
ধুলোয় চাপা পড়ে থাকে,
আর মহাশক্তিধর ঈগলও
ভিখারির মতো মাটিতে হেঁটে বেড়ায়।

স্মরণ রেখো এই চিরন্তন নিয়ম:
মহত্ত্ব কেবল প্রতিভায় টেকে না।
পৃথিবী ভরে আছে উজ্জ্বল মেধাবীতে,
যারা বিস্মৃতির অন্ধকারে চাপা পড়েছে,
কারণ তাদের আগুন
অন্তরে নিভে গেছে।
শক্তিই প্রতিভাকে তোলে
স্বপ্ন থেকে কর্মে,
বীজ থেকে ফসলে,
সম্ভাবনা থেকে সাম্রাজ্যে।

এবং এই সত্যও জেনে রেখো:
অসাধারণ প্রকাশ
দৃঢ় সংকল্প আর কঠোর পরিশ্রমের প্রমাণ।

আর সর্বনাশের সবচেয়ে বেশি—
যখন কামনা শাসন করে,
মোহ কেবল ভোগই খোঁজে।
যা দিয়ে গড়া যেতো সাম্রাজ্য,
তা হারিয়ে যায় ক্ষণস্থায়ী ছায়ায়।

যখন শক্তি জাগে,
সাধারণ হয়ে ওঠে অসাধারণ।
যখন শক্তি নিভে যায়,
অসাধারণ ডুবে যায় সাধারণে।
ভেদটা ভাগ্যে নয়,
প্রসাদে নয়, সুযোগেও নয়—
ভেদটা হলো অন্তরের ভোল্টেজে।

তাই তোমার শক্তিকে রক্ষা করো
রাজারা যেমন মুকুট রক্ষা করে।
তাকে খাওয়াও শৃঙ্খলায়,
অপচয় থেকে ঢেকে রাখো,
উদ্দেশ্যকে শুদ্ধ করো,
আর লক্ষ্য রাখো উচ্চতায়।
কারণ শক্তিই হলো নিয়তির নিশ্বাস,
আর শক্তি ছাড়া,
ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভাও
ধুলোয় মিলিয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

চিরশত্রু

শোনো হে ধূলি ও স্বপ্নের সন্তান:
মানুষকে শুন্যতা থেকে ডাকা হয়নি
নিজের ছায়ার পদচিহ্ন পুনরাবৃত্তি করার জন্য।
তাকে নীরবতা থেকে আহ্বান করা হয়নি
অভ্যাসের স্থির জলে চুমুক দেবার জন্য।
সে জন্মেছে আরোহনের জন্য—
রাতের সাথে লড়াই করে ভোরকে জেতার জন্য,
সময়ের শিলা থেকে আগুন ঝরাবার জন্য,
পরিবর্তনের শাণে নিজের আত্মাকে ঘষে ধারালো করার জন্য।
কিন্তু হায়, তার মহা বিপর্যয়—
সে নিজেকে গতকালের শৃঙ্খলে বাঁধে
এবং তার দাসত্বকেই শান্তি বলে নাম দেয়।

মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সমস্যা
দারিদ্র্য নয়, তৃপ্তি।
রুটির অভাব নয়,
ক্ষুধার অভাব।
কারণ গ্যালাক্সি গুঁড়িয়ে যায় গতিহীনতায়,
তারকারা নিভে যায় যখন তাদের আগুন স্থির হয়ে যায়।
তেমনই মানুষও
বেঁচে থাকাকে জীবন বলে ভুল করে,
সান্ত্বনাকেই প্রজ্ঞা মনে করে।

দেখো, সে টেনে আনে গতকালের মৃতদেহ
আজকের পবিত্র প্রাঙ্গণে।
সে একঘেয়েমির আচারকে প্রণাম করে
এবং তাকে নিয়তি বলে ডাকে।
কিন্তু তার আত্মার নীরবতায় মরিচা ধরে,
তার মহত্ত্ব অব্যবহৃত থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়,
সম্ভাবনার নদীগুলি শুকিয়ে যায়
এবং তার ভেতরে মরুভূমিতে রূপ নেয়।

কারণ জীবন কোনো স্থির পুকুর নয়;
জীবন এক মহাজাগতিক অগ্নিনদী।
এটি পাহাড় ভেদ করে জ্বলে ওঠে,
পাথর থেকে উপত্যকা খোদাই করে,
এটি শতাব্দীগুলিকে নিজের ইচ্ছায় বাঁকায়।
এটি সহ্য করার অনুরোধ করে না—
এটি প্রতিরোধ দাবি করে।
এবং যে এর নিয়ম অমান্য করে
সে মুছে যাবে
যেমন আকাশ থেকে 
মৃত্যুপথযাত্রী তারারা মুছে যায়।

প্রতিদিন নেমে আসে সৌভাগ্য,
আলোকধারার উল্কাপিণ্ডের মতো,
অনন্তের বপন করা বীজের মতো
সময়ের মাটিতে।
এগুলি প্রকাশিত হয় সাক্ষাতে,
ফিসফিসে আহ্বানে, হঠাৎ খোলা দরজায়।
কিন্তু অকৃতজ্ঞরা, অন্ধ ও ক্ষুদ্র,
তাদের পাথরের মতো পেরিয়ে যায়।
তারা তাদের অনুর্বর ভাগ্যকে অভিশাপ দেয়
যখন প্রাচুর্যের বাগানে দাঁড়িয়ে থাকে।
তারা অনন্ত ঝরনার পাশে তৃষ্ণার্ত,
উপচে পড়া ভোজের পাশে অনাহারে,
এবং থাকে করুণ, যেমন সর্বদা।

এই সত্যটি আত্মায় খোদাই করো:
বিয়োগান্তকতা হতাশা নয়,
কারণ হতাশাই পবিত্র—
এটি সেই বজ্রধ্বনি যা দৈত্যদের জাগায়।
সত্যিকারের বিপর্যয় হলো মিথ্যা শান্তি,
একঘেয়েমির মৃতপ্রলেপ সান্ত্বনা,
সন্তুষ্টির মখমলের কফিন,
যেখানে মানুষ নিঃশ্বাস নেয়,
কিন্তু ইতিমধ্যেই সমাধিস্থ।

প্রতিভাবান সে-ই,
সহস্রের ভিড় থেকে নির্বাসিত,
যে আগামীকালকে গতকালের চেয়ে উঁচুতে তোলে,
যে উন্নতির জন্য জ্বলে ওঠে
যেমন তারারা দীপ্তির জন্য জ্বলে,
যে বিজয়ের অমৃত পান করে
একবার নয়, প্রতিদিন—
পুনর্জন্মের পবিত্র শ্রমে।

অতএব এই আজ্ঞা
তোমার অস্তিত্বে অঙ্কিত হোক:
আগামীকাল জন্ম নেবার জন্য
গতকালকে মরতে হবে।
কারণ মহাবিশ্ব কাউকে রেহাই দেয় না—
না মানুষ, না তারা, না সাম্রাজ্য—
যে বৃদ্ধি অস্বীকার করে।