তোমার কি কখনও দুঃখ হয়
যে তুমি নিজের সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়াও না—
অথচ একটি বিমান,
শীতল ধাতু আর হিসেবি আগুনে নির্মিত,
রানওয়ের উপর
নিজের সর্বোচ্চ বেগে ছুটে চলে
এবং হঠাৎই
পৃথিবীর দাসত্ব ছিঁড়ে
আকাশে উঠে যায়?
তুমি কি কখনও দাঁড়িয়ে থেকেছ
সেই অসম্ভব উড্ডয়ন দেখে,
বুকের ভিতর এক অদ্ভুত ব্যথা নিয়ে,
ভাবতে ভাবতে—
কেন তোমার নিজের উত্তরণ
এখনও দ্বিধার ধুলোর মধ্যে
আহত প্রাণীর মত হামাগুড়ি দেয়?
বিমান তার গতির জন্য
কখনও ক্ষমা চায় না।
সে তার সমস্ত ইঞ্জিন,
সমস্ত গোপন দহন,
মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে
সমস্ত সহিংস চুক্তি
একত্র করে,
এবং তারপর—
কয়েকটি ভয়ঙ্কর সেকেন্ডের জন্য—
ধ্বংসের ঝুঁকি নেয়
শুধু আকাশের অধিকার পাওয়ার জন্য।
কিন্তু তুমি—
তোমাকে বিস্ময়ের আগে
সতর্কতা শেখানো হয়েছে।
তোমাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে
জীবনের ভিতর দিয়ে
সাবধানে হাঁটার জন্য,
যেন তোমার পাঁজরের মধ্যে
কাঁচ বহন করছ।
তাই তোমার স্বপ্নগুলো
এখনও দাঁড়িয়ে থাকে
স্থগিতকরণের অন্ধকার হ্যাঙ্গারে,
“একদিন” নামের ধুলোর নিচে ঢাকা পড়ে,
আর তোমার আত্মা
নীরবে মরিচা ধরে
তাদের পাশেই।
বিমানটিকে গভীরভাবে দেখো।
উড্ডয়নের আগে
সেও কাঁপে।
চাপের মধ্যে
তার শরীর চিৎকার করে ওঠে।
রানওয়ে তার নিচে জ্বলতে থাকে
যেন কোনও ভবিষ্যদ্বাণী
বাস্তব হতে চাইছে।
এমনকি তার ডানাগুলোও
সন্দেহে কেঁপে ওঠে।
তবু সে এগিয়ে যায়।
কারণ যে সত্তা
নিজের প্রয়োজনীয় গতি অর্জন করতে অস্বীকার করে,
তার পক্ষে উড্ডয়ন অসম্ভব।
এবং সম্ভবত
এটাই মানবজাতির গোপন ট্র্যাজেডি—
যোগ্যতার অভাব নয়,
বুদ্ধির অভাব নয়,
বরং সম্পূর্ণরূপে জ্বলে উঠতে
অস্বীকার করা।
তুমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো
এক ভবিষ্যতের জন্য
যা কখনও আসে না।
তুমি শক্তি জমিয়ে রাখো
যেমন কৃপণ মানুষ মুদ্রা জমায়,
অথচ অস্তিত্ব
অধীর হয়ে অপেক্ষা করে
তোমার বিস্ফোরণের জন্য।
তোমার ভিতরে
অসংখ্য অপ্রকাশিত ইঞ্জিন আছে,
ঘুমন্ত সূর্য আছে,
সম্পূর্ণ ঝড় আছে
যারা ভদ্রতার নিচে
সযত্নে ভাঁজ হয়ে আছে।
কিন্তু ভয়—
সেই প্রাচীন বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রকের মত—
বারবার তোমার উড্ডয়ন পিছিয়ে দেয়।
সে বলে—
“আজ নয়।
আবহাওয়া অনিশ্চিত।
তুমি ব্যর্থ হতে পারো।
তুমি পড়ে যেতে পারো।
মাটিতেই নিরাপদে থাকো।”
এবং ধীরে ধীরে
তুমি রানওয়ের প্রতিই আসক্ত হয়ে পড়ো।
তুমি সেটাকেই সাজাতে শুরু করো।
তার উপর আরামের ঘর বানাও।
তাকেই বাড়ি বলে ডাকো।
অথচ তোমার উপরে
আকাশ ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকে
তোমার নাম ছাড়াই।
কিন্তু একদিন—
হয়তো যথেষ্ট দুঃখের পর,
যথেষ্ট অপমানের পর,
যথেষ্ট অসহনীয় উপলব্ধির পর
যে তুমি নিজের উচ্চতাকেই নষ্ট করে ফেলেছ—
তোমার ভিতরে কিছু একটা
অবশেষে বিদ্রোহ করবে।
তুমি দৌড়াতে শুরু করবে।
ভদ্রভাবে নয়।
আংশিকভাবে নয়।
বরং সেই ভয়ঙ্কর পূর্ণতায়
যে পূর্ণতা আসে
যখন কোনও সত্তা বুঝে যায়
তার খাঁচায় কখনও তালাই ছিল না।
তোমার রক্ত গর্জে উঠবে
আগুন গিলে খাওয়া ইঞ্জিনের মত।
পুরনো অজুহাতগুলো
তোমার শরীর থেকে ঝরে পড়বে
মৃত যন্ত্রের আলগা বোল্টের মত।
এবং তারপর—
এক এমন গতিতে
যা তোমাকেও ভয় পাইয়ে দেবে—
তোমার আত্মা হঠাৎ আবিষ্কার করবে
মাধ্যাকর্ষণ
কখনও তোমার শত্রু ছিল না।
সে ছিল কেবল
তোমার পূর্ণ প্রতিশ্রুতির কাছে
পরাজিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক শক্তি।
এবং যখন অবশেষে
তুমি উঠবে—
সত্যিই উঠবে—
নিচের মানুষগুলো
তাকে বলবে প্রতিভা,
ভাগ্য,
নিয়তি,
অলৌকিকতা।
কিন্তু তুমি জানবে
গোপন সত্যটি।
আকাশ কেবল তাদেরই গ্রহণ করে
যারা যথেষ্ট পরিমাণে জ্বলতে রাজি
মাটি ছেড়ে ওঠার জন্য।