মূর্খরা যদিও প্রায়ই অন্ধ হয়, তবে গোঁড়ামি সর্বদাই নিজেকে সর্বশেষ সত্য বলে জাহির করে।
শেষ দিগন্তেরও ওপারে কোথাও একটি শহর রয়েছে, যেখানে প্রতিটি ঘড়ি সময়কে ভুলে গেছে, অথচ প্রতিটি নাগরিক দাবি করে—অনন্তকাল এখন ঠিক কতটা বাজে, তারা তা নিখুঁত জানে।
কেউ প্রশ্ন করে না।
সবাই ঘোষণা করে।
সেখানে রাস্তা বানানো হয়েছে সিদ্ধান্ত দিয়ে।
বাড়িগুলো গড়া হয়েছে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বাক্য দিয়ে।
জানালাগুলো শুধু ভেতরের দিকেই খোলে।
আর প্রতিটি আয়নাকে শেখানো হয়েছে করতালি দিতে।
শহরের মাথার ওপরে ঝুলে আছে এক কৃষ্ণসূর্য।
সে আলো দেয় না।
সে কেবল নিশ্চিততা ছড়ায়।
নাগরিকেরা তাকে বলে—সত্য।
মহাবিশ্ব তাকে ডাকে—গ্রহণ।
«"যারা নিশ্চিততার উপাসনা করে, তাদের থেকে সাবধান। কারণ মূর্খরা প্রায়ই অন্ধ হয়, কিন্তু গোঁড়ামি সর্বদাই নিজের সত্য সম্পর্কে নিঃসন্দেহ।"»
অন্ধত্ব মানেই চোখ না থাকা নয়।
অনেক সময় অন্ধত্ব মানে চোখ খুলতে অস্বীকার করা।
মূর্খ পথ হারায়, কারণ পথটি তার কাছে অদৃশ্য।
গোঁড়া পথ হারায়, কারণ সে নিজের চোখের পাতার ভেতরেই একটি রাস্তা এঁকে নিয়েছে।
দুজনেই হারিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু একজন অন্তত অন্য পথের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে না।
Socrates একবার বলেছিলেন—
«"প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো—আমি কিছুই জানি না, এ কথা জানা।"»
এই বাক্যটি একটি চাবি।
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ একে তালা বলে ভুল করে।
জ্ঞানীরা প্রশ্ন জমায়, যেমন বন বৃষ্টিকে জমায়।
তারা জানে—
প্রতিটি উত্তর সাময়িক।
প্রতিটি নিশ্চিততা ক্ষণস্থায়ী।
প্রতিটি দিগন্ত আরেকটি যাত্রার শুরু।
কিন্তু আরেক ধরনের পথিকও আছে।
প্রথম মাইলফলকেই তারা বাড়ি বানায় এবং ঘোষণা করে—
"এই-ই পৃথিবীর শেষ।"
তাদের মানচিত্র আসলে ভাঁজ করা কারাগার।
তাদের কম্পাস সবসময় নিজের দিকেই নির্দেশ করে।
কল্পনা করো—
একটি ক্যাথেড্রাল, যার দেয়াল পাথরের নয়, প্রতিধ্বনির।
প্রতিটি ধর্মোপদেশ একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি।
এতবার বলা হয় যে পুনরাবৃত্তিই একসময় প্রকাশিত সত্যে পরিণত হয়।
কেউ খেয়ালই করে না—
ছাদ বহু আগেই ভেঙে পড়েছে।
বৃষ্টি সরাসরি বেদীর ওপর পড়ছে।
উপাসকেরা তাকে অলৌকিক ঘটনা বলে।
বাস্তবতা বাইরে দাঁড়িয়ে ভিজছে।
Bertrand Russell লিখেছিলেন—
«"পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—মূর্খ ও উগ্রপন্থীরা নিজেদের ব্যাপারে সবসময়ই নিঃসন্দেহ, আর জ্ঞানীরা সর্বদা সন্দেহে পূর্ণ।"»
সন্দেহ জ্ঞানের হৃদস্পন্দন।
অন্ধ নিশ্চিততা তার সমাধিফলক।
মহাবিশ্ব কখনো প্রশ্নকে ভয় পায়নি।
নক্ষত্র জন্মায় বিস্ফোরণ থেকে।
ছায়াপথ জন্ম নেয় বিশৃঙ্খলা থেকে।
প্রতিটি শিশু পৃথিবীতে আসে কিছুই না জেনে।
তবুও তার ভেতরে অসীম সম্ভাবনা থাকে।
কিন্তু বড় হতে হতে আমরা বিস্ময়ের বদলে সিদ্ধান্ত জমাতে থাকি।
প্রতিটি প্রশ্নহীন নিশ্চিততা কল্পনার চারপাশে আরেকটি অদৃশ্য ইটের দেয়াল তুলে দেয়।
অহংকার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর।
সে অনুমানকে মূর্তিতে রূপ দেয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগেই মতামতের মাথায় মুকুট পরিয়ে দেয়।
তারপর কানে কানে বলে—
"তুমি পৌঁছে গেছ।"
এদিকে প্রজ্ঞা নীরবে আরেকটি ব্যাগ গোছায়।
গভীর সমুদ্র কখনো নিজের গভীরতা নিয়ে গর্ব করে না।
শুধু অগভীর জলই পুরো আকাশের প্রতিচ্ছবি ধরে নিজেকে আকাশের মালিক ভাবে।
Friedrich Nietzsche লিখেছিলেন—
«"মিথ্যার চেয়েও সত্যের বড় শত্রু হলো অন্ধ বিশ্বাস।"»
মিথ্যাকে সংশোধন করা যায়।
কিন্তু পবিত্র বিশ্বাসে পরিণত হওয়া নিশ্চিততাকে সংশোধন করা প্রায় অসম্ভব।
যখন নিশ্চিততাই পরিচয়ে পরিণত হয়—
তখন ভিন্নমত মৃত্যু বলে মনে হয়।
তর্ক আর প্রমাণ নিয়ে থাকে না।
তা আত্মরক্ষার যুদ্ধে পরিণত হয়।
ভীত মানুষ প্রশ্নকেও শত্রু ভাবতে শুরু করে।
কোথাও একটি গ্রন্থাগার আছে—
যেখানে প্রতিটি বইয়ে শুধু শিরোনাম লেখা।
মানুষ পড়ে বেরিয়ে এসে নিজেকে পণ্ডিত ভাবে।
জ্ঞান মাথা নত করে চলে যায়।
আরেকটি গ্রন্থাগারও আছে—
যেখানে প্রতিটি পাতার শেষে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
সেখানে খুব কম মানুষ প্রবেশ করে।
আর যারা করে—
তারা আর আগের মানুষ থাকে না।
Richard Feynman বলেছিলেন—
«"প্রথম নিয়ম হলো—নিজেকে প্রতারণা কোরো না। কারণ নিজেকেই প্রতারণা করা সবচেয়ে সহজ।"»
অদ্ভুত বিষয়—
আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় জাদুকর আমাদের নিজের মন।
সে স্মৃতিকে সম্পাদনা করে।
জটিলতাকে সরল বানায়।
অনিশ্চয়তাকে দুর্বলতা বলে সাজায়।
আর আত্মবিশ্বাসকে জ্ঞানের মুখোশ পরিয়ে দেয়।
আয়নাই তখন শিল্পী।
আয়নাই দর্শক।
বাস্তবতা নীরবে মঞ্চ ছেড়ে চলে যায়।
ইতিহাস আসলে প্রশ্নহীন নিশ্চিততার কবরস্থান।
সাম্রাজ্য ভেবেছিল তারা চিরস্থায়ী।
রাজারা ভেবেছিল ঈশ্বর তাদের চিরকাল বেছে রেখেছেন।
মতবাদ ভেবেছিল ইতিহাসের শেষ অধ্যায় তারা লিখে ফেলেছে।
আজ কবরস্থান পূর্ণ।
তবুও মানুষ প্রতিদিন নতুন নতুন নিশ্চিততার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে।
সম্ভবত ভুলে যাওয়াই আমাদের সবচেয়ে পুরোনো ধর্মীয় আচার।
অরণ্য কখনো শরতের সঙ্গে তর্ক করে না।
জোয়ার কখনো চাঁদের সঙ্গে বিতর্কে নামে না।
পাহাড় নিজের উচ্চতা নিয়ে বক্তৃতা দেয় না।
শুধু মানুষই নিশ্চিততার জন্য করতালি চায়।
যার প্রমাণ কম—
তার শব্দ সাধারণত বেশি।
সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ঘরই সবচেয়ে জ্ঞানী নয়।
গভীরতার প্রিয় ভাষা সবসময় নীরবতা।
Albert Einstein বলেছিলেন—
«"আমি যত শিখি, ততই বুঝি—আমি কত কম জানি।"»
জ্ঞান দিগন্তকে প্রসারিত করে।
প্রতিটি আবিষ্কার নতুন রহস্যের জন্ম দেয়।
প্রতিটি উত্তর আরও গভীর প্রশ্নের সূচনা করে।
এটাই বাস্তবতার ছন্দ।
একটি বাতিঘরকে কুয়াশার সঙ্গে তর্ক করতে কল্পনা করো।
কুয়াশা ঘোষণা করছে—
"কোনো তীর নেই।"
বাতিঘর কেবল আলো জ্বালিয়ে যায়।
সে তর্ক করে না।
কারণ ভোরের সঙ্গে কোনো তর্কের প্রয়োজন হয় না।
প্রজ্ঞাও তেমনই।
সে ধীরে আসে।
চিৎকার করে অন্ধকারকে হারায় না।
সে কেবল এমনভাবে উদিত হয় যে অন্ধকারের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না।
সবচেয়ে বড় বিপদ অজ্ঞতা নয়।
অজ্ঞতা শিখতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো নিশ্চিততার উপাসনা।
কারণ উপাসনা প্রশ্ন চায় না—
আত্মসমর্পণ চায়।
সে কৌতূহলের বদলে আনুগত্য বসিয়ে দেয়।
শিকলকে স্বাধীনতার রঙে রাঙিয়ে তোলে।
মহাবিশ্ব যেন প্রতিটি পরমাণুতে একটি বাক্য লিখে রেখেছে—
সবকিছু বদলায়।
নক্ষত্র বদলায়।
মহাদেশ বদলায়।
ভাষা বদলায়।
শরীর বদলায়।
চিন্তা বদলায়।
নিশ্চয়তাও বদলে যায়।
শুধু বিনয় টিকে থাকে।
কারণ সে কখনো গন্তব্য হওয়ার দাবি করে না।
সে চিরকাল পথিক হয়ে থাকতে চায়।
তাই যারা নিশ্চিততার উপাসনা করে, তাদের থেকে সাবধান।
তারা আশাহীন বলে নয়।
বরং কারণ প্রশ্নহীন নিশ্চিততা এমন এক কারাগার, যার দেয়াল বন্দিরাও দেখতে পায় না।
তোমার প্রশ্নগুলোকে রক্ষা করো।
তোমার বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাকে আগলে রাখো।
সন্দেহকে ভয় নয়—
দৃষ্টিশক্তি বানাও।
কারণ সবচেয়ে অন্ধকার গ্রহণ তখনই ঘটে, যখন একটি মন নিজের ছায়াকেই সমগ্র আকাশ বলে বিশ্বাস করে।
আর মহাবিশ্ব আজও নক্ষত্র, বন, সমুদ্র এবং নীরবতার ভাষায় ফিসফিস করে বলে—
মহাবিশ্ব কখনো তাদের ছিল না, যারা দাবি করেছিল—'শেষ উত্তরটি আমার কাছেই আছে।'
মহাবিশ্ব সবসময় তাদের কাছেই নিজেকে উন্মুক্ত করেছে, যারা বিনয়ের সঙ্গে পরবর্তী প্রশ্নটি করতে সাহস পেয়েছে।