বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

স্বাধীন উৎস

নির্ভরতা—

মানুষের গোপনতম পাপ,
যা মাটির নিচে জন্মায়,
রক্তের ভেতর নীরব শিকড় ছড়ায়।

পৃথিবী তোমাকে নাম দেওয়ার আগেই
এক প্রাচীন ডাকে তুমি বাঁধা—
হাড়ের ভেতর ফিসফিস,
যা বলে:
নিজেই হয়ে ওঠো নিজের মাটি।

শুধু দাঁড়ানোর জন্য নয়,
বরং অদৃশ্য সুতো ছিঁড়ে ফেলার জন্য—
যারা নিজেদের সাজায়
মমতা, নিরাপত্তা,
আর “এই মুহূর্তের জন্য” নামের ছদ্মবেশে।

নির্ভরতা এক ভদ্র অতিথি—
সে ধীরে কড়া নাড়ে,
গরম রুটির গন্ধ আনে,
তোমার শরীরের আকৃতি মনে রাখা এক চেয়ার দেয়।

তুমি বসো—
শুধু কিছুক্ষণের জন্য—
কিন্তু চেয়ারটি শিকড় গজায়,
ঘরটি তোমার শ্বাস শেখে,
আর দরজা ভুলে যায়
যে সে কখনো দরজা ছিল।

এমনকি কর্মসংস্থান—
সংখ্যাযুক্ত দরজার উজ্জ্বল করিডোর—
হয়ে উঠতে পারে এক মখমলি গোলকধাঁধা,
যেখানে সময় বিনিময় হয়
ধার করা সূর্যোদয়ের সাথে।

তুমি সময়মতো জাগো,
সময়মতো ঘুমাও,
এক ছন্দ উপার্জন করো—
যা তোমার নয়,
আর ধীরে ধীরে তোমার হৃদস্পন্দন
অনুমতি চাইতে শেখে বাঁচার জন্য।

মুদ্রা জমে—
তোমার পকেটে ছোট, অনুগত চাঁদ—
কিন্তু কিছু বড় জিনিস ক্ষয়ে যায়:
তোমার ভেতরের এক নীরব মহাদেশ,
যেখানে সিদ্ধান্তগুলো একসময় খালি পায়ে হাঁটত।

দারিদ্র্য শুরু হয় সেখানেই—
থলেতে নয়,
বরং কেন্দ্রে,
যেখানে এক সূর্য ভুলে যায়
কীভাবে নিজেকে জ্বালাতে হয়।

আত্মসম্মান এক বন্য জন্তু—
সে চিরকাল অন্যের হাত থেকে খায় না।
তাকে ধার করা আরামে বন্দি রাখো,
সে হাঁটে, থামে, নীরব হয়,
তারপর হারিয়ে যায় এক জঙ্গলে
যার পথ তুমি আর খুঁজে পাও না।

তাই শিখো কঠিন জাদু—
লিখিত ছাড়া নির্মাণ করতে,
সাক্ষী ছাড়া ব্যর্থ হতে,
অদেখা মাঠ থেকে ফসল তুলতে।

তোমার হাতকে বড় করো—
যেন তারা শূন্যতা থেকে আগুন তুলতে পারে।
তোমার মেরুদণ্ডকে গড়ো—
যেন তার হাড় ভাড়া যায় না।

তোমার ক্ষুধাকে তার নিজস্ব ভাষা শেখাও—
ভিক্ষা নয়,
সৃষ্টি।

হ্যাঁ, পৃথিবী তোমাকে প্রলুব্ধ করবে—
অন্যের আকাশে ঠেস দিয়ে রাখা সিঁড়ি দিয়ে,
অনুমোদনের সুতোয় সেলাই করা ডানা দিয়ে।

তারা তোমাকে দ্রুত তোলে—
আর মালিকানায় বেঁধে রাখে।

সহজ উচ্চতাকে প্রত্যাখ্যান করো।
বেছে নাও ধীর মাধ্যাকর্ষণ—
হয়ে ওঠার ভার।

নিজের শ্বাসের নিয়োগকর্তা হও,
নিজের সময়ের প্রহরী,
নিজের ঝুঁকি, নিজের আশ্রয়।

তোমার কাজ হোক এক নদী—
যা শুরু হয় তোমার দাঁড়ানোর জায়গা থেকে,
আর অন্যদের শেখায় তৃষ্ণা মেটাতে।

কারণ যেদিন তুমি আর বিনিময় করবে না
তোমার অস্তিত্বকে অনুমতির জন্য,
যেদিন তোমার মূল্য
ধার করা আলোয় মাপা হবে না—
সেদিন
তুমি কক্ষপথ ছেড়ে দেবে।

তুমি হয়ে উঠবে উৎস—
অর্থাৎ, একেবারে স্বনির্ভর,
নিজের অন্ধকার থেকেই জন্ম নেওয়া আলো।

বিশ্বাস

আমি এমন এক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি—
যেখানে ম্যানিফেস্টো লেখা হয় না কাগজে,
বরং মানুষের মস্তিষ্কের ভেতর
নতুন নক্ষত্র সৃষ্টি করা হয়।

সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
কারখানা নয়—
তারা গর্ভ,
যেখান থেকে জন্ম নেয়
স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা,
যারা প্রশ্ন করতে জানে,
চ্যালেঞ্জ জানাতে জানে,
এমনকি নিজেদের অস্তিত্বকেও।

আমি এমন এক সভা দেখি—
যেখানে মঞ্চ নেই, মাইক নেই,
মানুষেরা দাঁড়িয়ে আছে বৃত্তাকারে,
প্রত্যেকে একেকটি আগুন,
নিজের ভেতরের অন্ধকার পুড়িয়ে
অন্যের জন্য আলো তৈরি করছে।

এই রাজনীতি বলে—
“আমরা চাকরিপ্রার্থী তৈরি করি না,”
আর সেই বাক্যটি
আকাশে ছুড়ে দিলে
তা হয়ে যায় বজ্রপাত,
ভেঙে ফেলে পুরনো ভয়।

“আমরা সৃষ্টি করি স্বাধীন মানুষ—”
যারা শুধু রুটি খোঁজে না,
বরং গমের ক্ষেত সৃষ্টি করে,
যারা শুধু দরজায় কড়া নাড়ে না,
বরং নতুন ঘর বানায়
অন্যদের জন্য।

তাদের চোখে থাকে
অদ্ভুত এক নীল আলো,
যা ভবিষ্যৎকে শুধু দেখে না—
তাকে পুনর্লিখন করে।

তারা জানে—
চাকরি একটি মোহ,
যা কেবল
পরনির্ভরশীল ভৃত্য তৈরী করে,
যা আসে আর যায়,
কিন্তু সৃষ্টি—
তা একটি সূর্য,
যা নিজেই আলো উৎপন্ন করে।

এই রাজনীতিতে
দল নয়,
মানুষই মূল কেন্দ্র—
একটি বিস্তৃত মহাবিশ্ব,
যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি
নিজেই একটি গ্যালাক্সি।

তারা তৈরি করে কর্ম—
যেন নদী তৈরি করে পথ,
অন্যদের ডাকে
নিজের স্রোতে ভাসতে।

এখানে সাফল্য মানে
একজনের উত্থান নয়,
বরং অনেকের উড়ান—
একসাথে,
একই আকাশে।

আর আমি দেখি—
এই স্বপ্ন ধীরে ধীরে
বাস্তবের শরীর নিচ্ছে,
যেন মাটির ভেতর থেকে
উঠে আসছে অজস্র হাত,
নিজেদের ভবিষ্যৎ
নিজেদেরই গড়তে।

এই রাজনীতি—
শাসন নয়,
এটি এক সংক্রমণ,
স্বাধীনতার,
সৃষ্টির,
আর দায়িত্বের—

যেখানে মানুষ
আর শুধু কাজ খোঁজে না,
মানুষ হয়ে ওঠে
কাজের জন্মদাতা
আর প্রতিটি অন্নদানা হয়ে ওঠে
স্বোপার্জিত পরমান্ন।

.