মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

বাঙালী আজ যে পথে

রবীন্দ্রনাথ-ইত্যাদি বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া, ব্যক্তি-বিশেষের শ্রেষ্ঠত্ব খুব বেশি মানে রাখে না সামগ্রিক জীবনে ৷ একটি জাতির জনসমষ্টি শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা ধরে রাখতে পারে সমষ্টিগত ভাবে তীব্র জাত্যাভিমানের আত্মশ্রদ্ধায় ! জাপান আর জার্মানীকে এক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ করা বহুদিন আগে বস্তাপচা অভ্যাস হয়ে গেছে ৷


আত্মশ্রদ্ধা মানুষকে সমষ্টিগত ভাবে, দৈনন্দিনে, কতদূর উচ্চশির করে রাখতে পারে, তার সুবাস আজও পাওয়া যেতে পারে আমাদেরই ভারতবর্ষে, পুনা শহরে গেলে ৷ 


একা নারী নির্বিঘ্নে মধ্যরাত্রে সেখানে চলা ফেরা করতে পারে রোজ দিন ৷ রাস্তায় ভীড়, কোনও বড় শহরের থেকে কম না হলেও, ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যাধিক্য বা ব্যস্ততা খুব একটা নেই ৷ মানুষে মানুষে ঝগড়া, চেঁচামেচি, মতবিরোধ, চোখেই পড়ে না ৷ রাজনীতির বাড়াবাড়ি হাজিরা নেই সমাজ-জীবনে - গড়পড়তা মানুষ পাত্তা দেয় না বলে ৷ বেশির ভাগ মানুষই আপন মারাঠা-গরবে, নিজে নিয়মানুবর্তী ও বিনয়ী থেকে অন্যের সুবিধা করে দেওয়াকে স্বেচ্ছায় পছন্দ করে ৷


এবার একটু নিজেদের দিকে তাকাতেও বাধ্য সাধ হয় ৷ আমাদের চৌঁত্রিশ বছরের আপোষী বিপ্লবের হতভাগ্য পরিনতির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেই দায় ফুরায় না ৷ আমরা নিজ জাতির মধ্য হতে উদ্ভূত বীরত্ব ও মহত্বের ইতিহাসকে অস্বীকার করে, ধামাচাপা দিয়ে, বিকৃত অর্থ পই পই করে বুঝিয়ে, জোর করে, জনে জনে কানে ঢুকিয়ে দিয়ে, যে লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে তুং দের মহত্বকে শ্রেষ্ঠ আদর্শ হিসেবে আমদানি করার হঠকারিতা দীর্ঘ কাল যাবৎ করে গেছি, তারই ফলশ্রুতি হলো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের আত্মশ্রদ্ধাহীনতা ! আমরা নিজের মাকে নিয়ে গর্ব করতে ভুলে গেছি ৷


#শ্রদ্ধার_উৎস_অন্তরে_না_থেকে_কেবল_বাইরে_হলে_মানুষ_অন্ধবিশ্বাসের_ক্রীতদাস_হতে_বাধ্য_হয় ৷ 


এক্ষেত্রে ধর্ম আর রাজনীতিতে পারতপক্ষে কোনও প্রভেদ নেই ৷ "মার্ক্সিজম বৈজ্ঞানিক, তাই একমাত্র সত্য" - ইত্যাদি নিছক বুলিকে বাঙালীর পূর্ব প্রজন্মের মধ্যে অন্ধবিশ্বাসে পরিনত করতে সেই চৌঁত্রিশ বছরের বিপ্লব অনেকটাই সফল ৷ বুদ্ধিজীবী নামক বুদ্ধু-সমষ্টি যে আঁতেল-বাঙালি, তাকে মোহগ্রস্ত রাখার শক্তি মার্ক্সিজমের আঁতেল ভাষার শার্দূল-চরিত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিদ্যমান ছিল, একথা বলাই বাহুল্য ৷


এরূপ সমষ্টিগত আত্মশ্রদ্ধার দৈন্যই, দাস-প্রবণ হয়ে, আজ অবাঙালী প্রভুদের আহ্বাণ করছে আমাদের মাথায় চেপে বসতে দিতে ৷ বাঙালীর চিরন্তন সংবেদী মানসের, বর্তমান প্রজন্মে, এই নিদারুণ বিভ্রম ও অবক্ষয় - রাজনৈতিক অন্ধবিশ্বাসের জেরে, অতীতের নিরবচ্ছিন্ন বঞ্চনার অভিশাপ হতে মুক্তি পাওয়ার অলীক স্বপ্ন দেখে অবাঙালী নেতৃত্বে ৷ 


কী করুণ দশা এই পরবর্তী প্রজন্মের ! এই প্রজন্মের এমন অবনতির দায় সেই চৌঁত্রিশ বছরের হঠকারিতা কি নেবে আজ স্বেচ্ছায় ? উত্তর হলো "না ৷ নেবে না !" তারা এখন ব্যস্ত হবে বিজেপির দিকে আর বর্তমান শাসক দলের দিকে আঙুল তুলতে, - আপন বৃদ্ধ অস্তিত্বটুকু রক্ষার মরীয়া স্বার্থে, তথাপি আঙুল কদাপি নিজেদের দিকে ওঠা নয় ৷ 


সত্য অমোঘের পথে যেমন যায় যাবে ৷