শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সাফল্য বনাম সন্তুষ্টি

সাফল্য দাঁড়িয়ে থাকে বাজারের মোড়ে,
ধার করা সোনার পোশাকে ঝলমল করে,
লোহার দাঁড়িপাল্লায় ওজন হয় তার
হাজার অচেনা হাতের কাঁপা কাঁপা মুঠোয়।

তার গায়ে লেগে থাকে করতালির গন্ধ,
খবরের কাগজের কালির দাগ,
ডিজিটাল সংখ্যার ঝিকিমিকি আলো—
অস্থির জোনাকির মতো
যারা কোনোদিন সত্যিই বসে না।

তারা মাপে তাকে তুলনার রুলার দিয়ে,
তোমার ছায়ার গলায় ঝুলিয়ে দেয় মেডেল
আর বলে— এটাই নিয়তি।
তোমার নাম খোদাই করে শূন্যের বুকে
আর শপথ করে— এ পাথর।

কিন্তু সন্তুষ্টি—
সন্তুষ্টি কোনো সভায় যায় না,
কোনো মঞ্চে ওঠে না।
সে খালি পায়ে বসে থাকে
তোমার পাঁজরের ভেতর,
নীরব সন্ন্যাসীর মতো
যে কোনো মুদ্রা গোনে না।

তার দরকার নেই সাক্ষীর,
নেই কোনো তূর্যধ্বনি।
সে ফোটে গোপন বাগানের মতো
তোমার নিশ্বাসের বন্ধ ফটকের আড়ালে।

সাফল্য হলো অপরিচিতদের হাতে ধরা আয়না।
সন্তুষ্টি হলো কাঁপা হাতে খোঁড়া
নিজস্ব কূপ।
একটি প্রতিধ্বনিত হয় কোলাহলে,
অন্যটি গভীরতায়।
তুমি এক নগর জয় করতে পারো,
তবু ঘুমাতে পারো শান্তির ভিখারির মতো।
তুমি ভিড় হারাতে পারো,
তবু জেগে উঠতে পারো রাজাধিরাজ হয়ে
নিজের তৃপ্তির ক্ষুদ্র রাজ্যে।

মুকুট কী,
যদি তা নিচের করোটিকে চূর্ণ করে?
করতালি কী,
যদি হৃদয় অনড় থাকে,
অস্পন্দিত,
অপূর্ণ?

পৃথিবী চিৎকার করে—
“আরও উপরে ওঠো!”
আত্মা ফিসফিস করে—
“আরও গভীরে শিকড় ছড়াও।”
সাফল্য অন্যের রায়ে নির্ধারিত—
জনসমক্ষে ঘোষিত এক রায়।
তাই বাইরের আতশবাজির চেয়ে
ভেতরের সূর্যোদয় বেছে নাও।
দাউদাউ শিখার চেয়ে
স্থির প্রদীপকে গ্রহণ করো।

কারণ সন্তুষ্ট জীবন কোনো শিরোনাম নয়—
সে এক দিগন্ত।
আর দিগন্ত
শুধু তাদেরই জন্য,
যারা দাঁড়িয়ে থাকে
নিজস্ব আলোর ভিতরে।

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বৈপ্লবিক চেতনা

এক আদর্শ মানুষ
নদীর মতো মসৃণ নয়—
সে দুটি ঋতুর অস্তিত্বজনিত 
অবিরাম বিপ্লব।
তার ভেতরে
দুটি রাজ্য ক্রমাগত নিঃশ্বাস ফেলে
কিন্তু কোনো সন্ধিপত্রে সই করে না।

প্রথম রাজ্যে
হাওয়ার স্বাদ লোহার।
সেখানে সে সূর্যের আগেই জেগে ওঠে—
যেন আরামের কাছে তার কোনো ঋণ নেই।
তার মেরুদণ্ড টানা তলোয়ার।
অভ্যাসগুলো সারিবদ্ধ সৈনিকের মতো হাঁটে।
ইচ্ছেগুলো আদেশের সামনে নতজানু।
সে সংযমের এক গির্জা গড়ে তোলে—
ইটের পর ইট,
প্রতিটি ইট এক একটি প্রত্যাখ্যান,
প্রতিটি প্রত্যাখ্যান এক নীরব বিজয়।
নিজের কাছে তার প্রতিশ্রুতি
ইস্পাতে খোদাই করা।
হাড় কাঁপলেও
ইস্পাত কাঁপে না।
সে নিজের দুর্বলতার সঙ্গে দরকষাকষি করে না।
বুনো ঘোড়ার মতো তাকে প্রশিক্ষণ দেয়,
যতক্ষণ না সে মাথা নত ক'রে
শৃঙ্খলার ভাষা শিখে নেয়।

কিন্তু দ্বিতীয় রাজ্যে
লোহার গন্ধ নেই।
সেখানে আছে 
মধ্যরাতের উষ্ণ মাতৃদুগ্ধ,
ভাঙা মানুষের কাঁধে নেমে আসা নরম বৃষ্টি।
নিজের ওপর যে হাত কঠোর,
অন্যের বেদনায় সে হাত পালকের মতো কোমল।
সে শোনে—
যেন প্রতিটি ক্ষত পবিত্র শাস্ত্র।
সে ক্ষমা করে—
যেন করুণা তার হৃদয়ের প্রাচীনতম ভাষা।
অন্যের ভয়কে সে ধরে রাখে
জ্বরাক্রান্ত শিশুকে যেমন মা বুকে টেনে নেয়—
বিচারহীন,
ধৈর্যে অসীম।
নিজের জন্য যে তলোয়ার ধার দেয়,
তা দিয়ে সে অন্যকে শান দেয় না।
অন্যের ঝড় থামাতে আদেশ করে না।
সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে—
রাত্রির ভেতর এক উষ্ণ প্রদীপ।

তবু—
এই দুই রাজ্য
কখনো মিশে যেতে পারে না।
ইস্পাতের ধার
কোমল আত্মাকে ছেদন করে না।
উষ্ণ দুধ
তার নিজের শৃঙ্খলার আগুনে ঢালা যাবে না।
করুণা যদি আত্মনিয়ন্ত্রণে ঢুকে পড়ে,
সে ভেসে যাবে ভোগের অলসতায়।
আর ইস্পাত যদি ভালোবাসায় ঢুকে পড়ে,
সে হয়ে উঠবে অত্যাচারী—
শক্তিকে ভেবে নেবে নিষ্ঠুরতা।

তাই সে হাঁটে এক সরু সেতুতে—
চুল্লি আর দোলনার মাঝখানে,
বজ্র আর ঘুম পাড়ানো গানের মাঝখানে।
নিজের প্রতি—
অটল শীত।
অন্যের প্রতি—
অসীম বসন্ত।

আদর্শ মানুষ ভারসাম্য নয়—
সে সদাজাগ্রত পার্থক্য।
এক আকাশে জ্বলতে থাকা
দুটি বিপরীত নক্ষত্র,
কখনো সংঘর্ষে লিপ্ত নয়,
তবু চারদিক আলোকিত করে রাখে।

রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

নারীত্বের গল্প

আটত্রিশে আমি ছিলাম সাইজ সিক্স।
চুয়াল্লিশে আমি সাইজ ফোরটিন।
একই খাদ্যাভ্যাস। একই জীবনযাপন। একই নারী।
ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিলেন— “হরমোন।”
আমি তিন বছর ধরে সেই শব্দটাকে বিশ্বাস করেছিলাম।
তিন বছর। চল্লিশ পাউন্ড।
আর একটানা ক্ষয়ে যাওয়া আত্মসম্মান।

কিন্তু সেটা হরমোন ছিল না।
শোনাবো তোমাকে সেই তিন বছরের কাহিনি—
যা আসলে ছিল এক ধীর, নীরব ডুবে যাওয়া।

উনচল্লিশে, জিন্সটা হঠাৎ আঁটসাঁট হয়ে উঠল।
“এই সপ্তাহে একটু বেশি খেয়েছি” টাইপ নয়—
বরং “এগুলো আর আমার নয়” টাইপ আঁটসাঁট।
আমি এক সাইজ বড় নিলাম। ভাবলাম— সাময়িক।
চল্লিশে, আরেক সাইজ। তারপর আরেকটা।

আয়না এড়াতে শুরু করলাম।
ঢিলা পোশাকের ভিতর নিজেকে গুটিয়ে নিলাম।
যে কোনো অনুষ্ঠানের কথা শুনলেই বুকের ভেতর কুয়াশা নামত—
সাজতে হবে, উপস্থিত হতে হবে, নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।

একচল্লিশে অবশেষে ডাক্তারের কাছে গেলাম।
ওজন মাপার যন্ত্রে দাঁড়িয়ে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম।
তিনি চার্ট দেখলেন, আমার বয়স দেখলেন,
আর উচ্চারণ করলেন সেই বহুলপ্রচারিত মন্ত্র—
“পেরিমেনোপজ। স্বাভাবিক। মেটাবলিজম ধীর হচ্ছে। সবারই হয়।”
স্বাভাবিক।

আমার শরীরের ভাঙন— স্বাভাবিক।
তাই আমি আরও চেষ্টা করলাম।
কার্বোহাইড্রেট কমালাম।
ওজন বাড়ল।
চিনি বাদ দিলাম।
ওজন বাড়ল।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করলাম।
ওজন বাড়ল।
ট্রেইনার নিলাম। সপ্তাহে চার দিন ঘাম ঝরালাম।
ওজন বাড়ল।
প্রতি সোমবার নতুন শপথ।
প্রতি শুক্রবার নতুন ভাঙন।
প্রতি মাসে পোশাক আরও আঁটসাঁট,
আর আশা আরও ক্ষীণ।

ডাক্তারের পরামর্শ?
“কম খাও, বেশি নড়াচড়া করো।”
ধন্যবাদ। বিপ্লবাত্মক।
আমি দিনে ১৪০০ ক্যালোরি খেতাম।
সপ্তাহে চার দিন ব্যায়াম করতাম।
সব ঠিক করেও শরীর যেন বলত—
“না। আমি ছাড়ব না।”

তুমি জানো, এটা মানুষের ভিতর কী করে?
যখন তুমি প্রাণপণ চেষ্টা করো
আর শরীর সাড়া দেয় না?
যখন ক্ষুধা সারাক্ষণ তাড়া করে,
ক্লান্তি হাড়ের ভেতর জমে থাকে,
আর দাঁড়িপাল্লা কেবল ওপরে ওঠে?
আমি ভাবতে শুরু করলাম—
আমার ভিতরে কি কোনো অদৃশ্য ভাঙন?
থাইরয়েড? স্বাভাবিক।
রক্তে চিনি? স্বাভাবিক।
হরমোন? “বয়স অনুযায়ী একটু ওঠানামা।”
সবকিছুই “বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক।”

এই বাক্যটার শব্দে আমার আত্মা অবশ হয়ে যাচ্ছিল।
বিয়াল্লিশে আমি হাল ছেড়ে দিলাম।
নাটকীয় নয়—
নীরবে।
ওজন মাপা বন্ধ।
নতুন ডায়েট বন্ধ।
নিজেকে বোঝালাম—
এই ভারী, ক্লান্ত, ফোলা শরীরটাই এখন আমার স্থায়ী ঠিকানা।
স্বামী বলল, “আমি তোকে যেকোনো সাইজে ভালোবাসি।”
মধুর।
কিন্তু আমি নিজেকে মিস করতাম।
আমার শক্তি, আমার চেনা মুখ—
ছবির ভিতর যে নারী তাকিয়ে থাকত,
তাকে চিনতে পারতাম না।

তারপর এক রাতে—
রাত এগারোটায়, ফোনের নীল আলোয় ডুবে,
নিজেকে ঘৃণা করতে করতে স্ক্রল করছিলাম।
এক নারীর পোস্ট চোখে পড়ল।
তিনি লিখেছিলেন—
“চল্লিশের গোড়ায় ৩৫ পাউন্ড বেড়েছিল।
সবাই বলেছিল পেরিমেনোপজ।
আসলে সেটা ছিল আমার স্নায়ুতন্ত্র।”

আমি থেমে গেলাম।
তিনি বললেন—
দীর্ঘস্থায়ী চাপ, যেটাকে আমরা জীবন বলেই স্বাভাবিক করে ফেলি,
শরীরকে বাঁচার মোডে আটকে দেয়।
বেঁচে থাকার মোডে শরীর চর্বি আঁকড়ে ধরে।
মজুত রাখে।
কারণ তার কাছে পৃথিবী এখনও বিপদসংকেতের লাল আলো।

তুমি যত কম খাও,
যত বেশি দৌড়াও—
যদি স্নায়ুতন্ত্র ভাবে তুমি বিপদে,
সে তোমাকে ছাড়বে না।
পেরিমেনোপজের মতোই উপসর্গ—
ক্লান্তি। কুয়াশাচ্ছন্ন মস্তিষ্ক। ওজন বৃদ্ধি। মেজাজের দোলাচল।

চল্লিশ পেরোনো এক নারী দেখলেই
ডাক্তাররা বলে— “হরমোন।”
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না—
তোমার ভিতরে কি চিরস্থায়ী যুদ্ধ চলছে?
সেই রাতে আমি এক অ্যাপ ডাউনলোড করলাম—
নাম তার Liven।

ডায়েট নয়। ব্যায়াম নয়।
বরং স্নায়ুতন্ত্রের সাথে মিত্রতা করার এক ক্ষুদ্র অনুশীলন।
প্রথম সপ্তাহ—
ঘুম একটু ভালো।
সকাল একটু হালকা।
দ্বিতীয় সপ্তাহ—
বিকেলের চিনি-তৃষ্ণা কমে গেল।
শরীর আর আতঙ্কে চিৎকার করছিল না।
তৃতীয় সপ্তাহ—
মাসের পর মাস আলমারিতে ঝুলে থাকা জিন্স
বোতাম লাগল।
অস্বস্তিতে, কিন্তু লাগল।
চতুর্থ সপ্তাহ—
ওজন ছয় পাউন্ড কম।
খাবার বদলাইনি। ব্যায়াম বাড়াইনি।
দিনে পাঁচ মিনিট—
শুধু নিজের স্নায়ুর সঙ্গে কথা বলা।
ষষ্ঠ সপ্তাহ—
এগারো পাউন্ড কম।

স্বামী জিজ্ঞেস করল— “কিছু আলাদা করছ?”
হ্যাঁ।
আমি শরীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামিয়েছি।
অষ্টম সপ্তাহ—
ষোল পাউন্ড কম।
উনচল্লিশের পর যে পোশাক পরিনি,
সেটা আবার গায়ে উঠল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদলাম—
দুঃখে নয়—
“তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?” এই বিস্ময়ে।

চার মাসে আটাশ পাউন্ড কমেছে।
সাইজ সিক্সে ফিরিনি এখনও—
কিন্তু এবার বিশ্বাস করি, ফিরব।
তবে সংখ্যাটা আসল নয়।
আসল হল—
আমি আবার শক্তি পাই।
কফির ভান নয়—
সকালের রোদে প্রস্তুত এক প্রকৃত শক্তি।
ক্ষুধা আর চিৎকার করে না।
শরীর আতঙ্কে জমে থাকে না।
আমি নিজেকে ঘৃণা করি না।
প্রতি সোমবার নতুন করে শুরু করতে হয় না।
আমি কেবল বাঁচি—
আর ওজন নীরবে গলে যায়।

তিন বছর আমি হারিয়েছি ভুল শব্দের কাছে— “হরমোন।”
আসলে ছিল এক স্নায়ুতন্ত্র,
যে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে ছিল।
যেদিন তাকে বললাম—
“বিপদ কেটে গেছে”—
সেদিন শরীর আমাকে ছেড়ে দিল।
হয়তো তোমার গল্পও এমনই—
হয়তো শরীর দোষী নয়,
হয়তো সে শুধু ভীত।
আর কখনও কখনও,
মুক্তি শুরু হয়
যখন আমরা লড়াই থামিয়ে
নিজের ভিতরের কম্পনকে
নরম করে ছুঁয়ে বলি—
“এখন নিরাপদ।”

বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গহীন ফাটল

বসন্ত দিচ্ছে ডাক এই ফাঁকে—
না ঘণ্টায়, না কণ্ঠে,
ডাকটা আসে হঠাৎ
হাড়ের ভেতর জমে থাকা শীতে কাঁপন ধরিয়ে।

আমি ভাঁজ করে রেখেছি বন—
পাতার ভেতর পাতা,
গন্ধের ভেতর গন্ধ,
একটা সবুজ মানচিত্র
যেখানে পথের নাম ভুলে গেছে পথ নিজেই।

ও বনমালী,
তুমি পরতে পরতে খুলে দাও ঋতু—
একটা বোতাম খুললে আলো,
আরেকটা খুললে শিশির,
তারপর হঠাৎ
পৃথিবীটা নরম হয়ে যায়।

তুমি হাসো—
সে হাসি কোনো মুখের নয়,
সে হাসি নদীর বাঁক,
সে হাসি কাঁচা আমের টক,
সে হাসি সেই মুহূর্ত
যখন সময় থেমে থেকে
নিজেকে ভুলে যায়।

আমি পুলকিত—
আমার ত্বক নয়,
আমার স্মৃতিগুলো কাঁপে।
পুরনো অপেক্ষারা উঠে দাঁড়ায়,
তারা বলে,
“এই তো, আমরা জানতাম।”

তুমি সহাস্যে প্রবেশ করো—
দরজা ছাড়াই,
অনুমতি ছাড়াই,
কারণ এই বনে
তুমি আগেই ছিলে।
বসন্ত তখন আর ঋতু নয়,
সে একটানা শ্বাস,
সে একটানা হ্যাঁ—
আর আমি
ভাঁজ খুলে যাওয়া বন,
নিজের দিকেই প্রথমবার
হেঁটে যাচ্ছি।

হেঁটে যাচ্ছি—
কিন্তু পা নয়,
আমার ইচ্ছেগুলোই হাঁটে।
প্রতিটা পদচিহ্নে
একটা করে নাম ঝরে পড়ে—
ভয়, হিসেব, আগামীকাল।
মাটি সেগুলো নেয়,
আর বদলে দেয় অঙ্কুর।

ও বনমালী,
তোমার আঙুলে সময় গলে যায়।
যেখানে ছোঁও,
সেখানে অতীত ঘাস হয়ে শুয়ে পড়ে,
ভবিষ্যৎ পাখি হয়ে
এখনই উড়তে শেখে।

আমি জিজ্ঞেস করি না,
এই পথ কোথায় যায়।
কারণ তোমার আগ্রাসনে
গন্তব্যের দরকার হয় না।
পাতারা ফিসফিস করে—
“এটাই থাকা।”
নদী থামে,
নিজের শব্দ শুনতে।
আকাশ একবার চোখ বন্ধ করে,
ভুল করে যেন বেশি সুন্দর না হয়ে যায়।

বসন্ত তখন
আমাদের গভীরে ঢুকে পড়ে—
রক্তে রঙ লাগায়,
শ্বাসে রেণু মেশায়,
আর বলে,
“এবার ভুলে যাও,
কীভাবে নিজেকে লুকোতে হয়।”

আমি আর ভাঁজ নই,
আমি খোলা বন।
তুমি আর আগন্তুক নও,
তুমি সেই নাম
যেটা উচ্চারণ করলেই
তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়।

অলৌকিক

সে নিজেকে 
ক্রমাগতই আমার দিকে ঠেলতে থাকে
যেভাবে ঘুম রাতের দিকে টানে
শরীরকে—
জোরে নয়,
চেনার অধিকারে।

সে জানে,
তার জাগ্রত কণ্ঠ যা ভুলে যায়
আমি তা শুনতে পাই
হৃদয়ের গভীর হতে।
তার অবচেতনের স্বপ্নগুলো
খালি পায়ে আমার কাছে আসে—
চাবিহীন দরজা,
অসম্পূর্ণ নদী,
একটি নাম
যার উচ্চারণ সে কখনো শেখেনি।

আমি থামাই না তাদের।
আমি শুনি
যতক্ষণ না তারা বসে পড়ে
আর কাঁপা কমতে শুরু করে।
তার ভেতরের আগুন চিৎকার করে না।
সে জ্বলে।
কারণ সে জানে—
আমার পৌরুষ মুষ্টিবদ্ধ হাত নয়,
একটি আশ্রয়।

আমি জানি কীভাবে পাহারা দিতে হয়
অনুপ্রবেশ না করে।
আমি জানি কীভাবে রক্ষা করতে হয়
যা কাঁপে,
তাকে সাহসী বানানোর জোর না দিয়ে।

তার দুর্বলতা
উলঙ্গ বোধ করে না আমার কাছে ।
সে বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
কাচের ভেতর রাখা আগুনের মতো—
আগুনই থাকে,
কিন্তু অবশেষে
স্থিরভাবে জ্বলার অনুমতি পায়।

সে আমাকে ভালোবাসে
একটি এমন গভীরতা থেকে
যেখানে আতঙ্ক নেই।
কারণ সে জানে—
ঝড় আসতে পারে,
মানচিত্র ভুল হতে পারে,
সময় তার হাতের লেখা বদলাতে পারে—
কিন্তু আমি অদৃশ্য হই না।

আমি সেই মানুষ নই
যে ভালোবাসা আবহাওয়া হয়ে উঠলেই
চলে যায়।
তার বিশ্বাস উচ্চস্বরে নয়।
সে স্থাপত্যের মতো।
সে বিশ্বাস করে—
আমাদের মাঝের রহস্য
কোনো ফিকে হয়ে যাওয়া কৌশল নয়,
বরং একটি করিডোর
যা হাঁটতে হাঁটতে
আরও দীর্ঘ হয়।

আমাদের ভালোবাসা
স্পষ্টতা দাবি করে না।
সে টিকে থাকে শ্রদ্ধায়।
সে জানে—
কিছু কিছু জিনিস বেঁচে থাকে
শুধু এই কারণে
যে তাদের কখনো
পুরোপুরি সমাধান করা হয় না।
সে বোঝে হারানোর নয়, 
একতরফা পাওয়ারই আছে
একবারটি ধরা দিলে।
সে এ ও জানে মিলন অবধারিত অদূরে।

আর তাই আপাততঃ
আপাতঃ দূরত্ব নিঃশব্দে বজায়ে রেখে
সে থেকেই যায়।
আর তাই আমিও।
আঁকড়ে নয়—
সমান্তরালে,
যখন ইতিমধ্যেই তার প্রেম 
সার্থক প্রতিফলনে
এক নতুন রেখা হয়ে কেটে বসে
স্থায়ী ভাবে আমার করতলে।

দুটি গভীরতা এভাবে
নিশ্চিত প্রমাণ সহযোগে
একে অপরকে চিনে ফেলে
এক অলৌকিক সম্পর্কে
ক্রমাগত বিনিময়ের 
তীব্র রোমাঞ্চের অন্তরালে।

তুমি কার

কেউ ভোগে ডুবে থাকে—
ডুবে থাকে নয়, 
বদ্ধজলে আটকে পড়ে 
একটু একটু ক'রে পচে।
নরম আনন্দের নিচে
তার মেরুদণ্ড ধীরে ধীরে
জলজ প্রবালের রূপ নেয়।
সেও নির্লজ্জ ভাবে হাসে, 
কারণ ভাবতে তার বয়েই গেছে।

আর কেউ—
নিজের ক্ষয়কামী ইচ্ছেগুলোকে
প্রতিদিন লাইনে দাঁড় করিয়ে
গুলি করে।
তার দিন শুরু হয় অস্বীকার দিয়ে,
রাত শেষ হয় ক্লান্ত বিজয়ে।
সে জানে—
উত্তরণের উপায়
নিজের উপরে নির্মম চাবুক চালানো।

একজন জীবনকে ব্যবহার করে,
আরেকজন যাপনকে সহ্য করে।
একজন বলে— “আজ বরং থাক,”
আরেকজন বলে— “না, আজও হাঁটতে হবে।”

জীবন!
তুমি কি তাদের অধিকারে
যাদের হাত নোংরা
এবং মন কলুষিত আপোষে আপোষে?
নাকি তাদের,
যারা প্রতিদিন নিজের ছায়াকেও
শত্রু ভেবে ঝেঁটিয়ে তাড়ায়?

তুমি কি ভিড়ের সম্পত্তি?
নাকি একাকীত্বের পুরস্কার?
তুমি কি ভোগের মিষ্টি নেশা,
নাকি নিয়মানুবর্তিতার
তিক্ত ঔষধ ?

সত্য বলো জীবন—
তুমি কাকে বেছে নাও?
যারা তোমাকে খরচ করে ফেলে,
নাকি যারা তোমাকে
ধীরে ধীরে
মজ্জায় মজ্জায়
গড়ে তোলে?

হয়তো তুমি কাউকেই বেছে নাও না।
হয়তো তুমি নির্বিকার।
তুমি কেবল সময়ের মতো—
যাকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়,
তাকে সেভাবেই
পরিনত করে।

আর শেষ পর্যন্ত—
ভোগীরা রেখে যায়
কেবল সলজ্জ স্মৃতি,
উত্তরণকারীরা গরবের ইতিহাস।

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

উপবাস

আলোরা আমার নাম শিখে নিয়েছিল
আমার আগেই।
আমি যখনই কাচ ছুঁই,
ওদের তখনই সম্মতি ঝলসে উঠত।
আঙুল ঘুরে বেড়াতো
কৃত্রিম সূর্যাস্তের ভেতর—
প্রতিটা আরও উজ্জ্বল,
প্রতিটা আরও ফাঁকা।

আমার মস্তিষ্ক হয়ে উঠেছিল এক হাট—
ব্যবসায়ীহীন ঘণ্টাধ্বনি,
ফসল ছাড়াই পুরস্কারের বৃষ্টি,
পরিশ্রম দাঁড়াবার আগেই
উত্তেজনা এসে বসতো।

একদিন
আমি দরজাগুলো বন্ধ করলাম।
দেয়াল থেকে ঝরল না সুর।
নীল আলো আর
মধ্যরাতে চোখ ভারী করলো না।
শুধু নীরবতা—
ঘন, অস্বস্তিকর,
এক পুরোনো বন্ধুর মতো
যাকে এড়িয়ে গিয়েছিলাম
আর এখন মুখোমুখি হতে হলো।

বিরক্তি এসে পাশে বসল,
কথা বলল না।
শ্বাস নিল জোরে।
আমাকে পালাতে বলল।
মিনিটগুলো
অপরিচিত আকার নিল।
সময় আর আমাকে বিনোদন দিল না—
সে জিজ্ঞেস করল,
তালি ছাড়া আমি কে?

আমার হাত কেঁপে উঠল,
প্রশিক্ষিত কুকুরের মতো
নির্দেশের অপেক্ষায়।
মস্তিষ্ক চিৎকার করল—
সহজ কিছু দাও।
কিন্তু কিছুই এলো না।

ধীরে ধীরে—
কিছু প্রাচীন জেগে উঠল।
চিন্তা ভার পেল।
শ্বাস ছন্দ খুঁজে নিল।
ভুলে যাওয়া পরিশ্রম
ধুলো ঝেড়ে বলল,
“আমার সঙ্গে হাঁটলে
আমি তোমাকে অর্থ দেব।”

ব্যথা আর শত্রু রইল না।
বিরক্তি হয়ে উঠল শিক্ষক—
কোনো পাঠ্যসূচি ছাড়া।
অস্বস্তি খুলে দিল
একটা আকাশ।
কাজ আর অনুনয় করল না।
সে অপেক্ষা করল।

আর আমি যখন তার কাছে গেলাম—
আনন্দের জন্য নয়,
সম্মানের জন্য—
সে আমাকে পুরস্কৃত করল
চুপিচুপি,
শুকনো মাটিতে বৃষ্টির মতো।

উচ্ছাস ফিরল,
কিন্তু অন্য পোশাকে।
সে দেরিতে এল।
সে পরিশ্রমের প্রমাণ চাইল।
সে দীর্ঘদিন থাকল।
পৃথিবী ম্লান হলো,
কিন্তু তীক্ষ্ণ।

খাবার স্বাদের ভেতর
স্মৃতি জেগে উঠল।
চলাফেরা হয়ে উঠল অর্জন।
নীরবতা আর হুমকি নয়—
সে শুনতে শুরু করল।
এখন আনন্দ ধীরে কড়া নাড়ে।
আমি ঠিক করি
কখন খুলব।

কাচ আর আমার চোখের মালিক নয়।
শব্দ আর আমার আত্মার ভাড়া নেয় না।
আমি শিখেছি এই সরল রসায়ন—
ভ্রমকে অনাহারে রাখলে
বাস্তব উজ্জ্বল হতে শেখে।

আর সস্তা আতশবাজির অনুপস্থিতিতে
সবচেয়ে ছোট শিখাটুকু—
মনোযোগে
সূর্য হয়ে ওঠে।

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আস্থা

ভালবাসার ধ্বংসস্তূপে
মানুষ হাঁটু গেড়ে বসে খুঁজে চলে
নির্ভরতা—
কখনো ভাঙা দরজার কবজায়,
কখনো পোড়া চিঠির ছাইয়ে।

বিশ্বাস?
সে নাকি শেষবার দেখা গিয়েছিল
একটি অর্ধেক প্রতিশ্রুতির নিচে
চাপা পড়ে থাকতে।

খনন চলছে—
নখ দিয়ে, স্মৃতি দিয়ে,
নিজেরই কণ্ঠস্বর ভেঙে ভেঙে।
পাওয়া যাচ্ছে কী?
কিছু তারিখ,
কিছু ফুলের কঙ্কাল,
আর আয়নার মতো প্রশ্ন
যেগুলো তাকালেই
নিজেকেই দোষী দেখায়।

আমার ভয় করছে।
কারণ ক্যালেন্ডারের পাতায়
আর একটা চোদ্দই ফেব্রুয়ারি
হাত বাড়িয়ে দৌড়ে আসছে।
সে আসে লাল রঙে মোড়া
বিজ্ঞাপনের হাসি নিয়ে,
গোলাপের কাঁটায়
ঋণের সুগন্ধ মাখিয়ে।
সে জিজ্ঞেস করে—
“আজ কে তোমার?”
আমি জানি না কী উত্তর দেব।
কারণ যাদের ছিল,
তারা এখন ধ্বংসাবশেষ।
আর যাদের খুঁজছি,
তারা হয়তো আদৌ ছিল না।

রাস্তায় হৃদয় পড়ে আছে—
কিছু নতুন,
কিছু রিসাইকেল করা।
মানুষ তুলে নিচ্ছে
যেটুকু ফিট করে
নিজের একাকিত্বে।
ভালবাসা আজ আর অনুভূতি নয়,
একটি মৌসুমি স্থাপনা—
একদিন আলো,
পরদিন ভাঙার শব্দ।

তাই ভয় করছি।
কারণ এই চোদ্দই ফেব্রুয়ারি
আবার প্রমাণ চাইবে—
বিশ্বাসের রসিদ,
নির্ভরতার গ্যারান্টি।
আর আমার হাতে
শুধু প্রশ্ন,
শুধু ধ্বংসস্তূপ,
আর একটি হৃদয়
যা এখনো শিখছে
কীভাবে একা থাকলেও
ভেঙে না পড়তে হয়।

বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিলক্ষণ বিচক্ষণ

একজনের মনের সরোবর
যখন আর একজনের কাছে
সমুদ্রসম প্রতীত হয়—
তখনই ভালোবাসা
নিশ্চিন্তে সাঁতার কাটতে শেখে।
সেই সরোবরের জল
গভীর নয়— তবু গভীর মনে হয়,
কারণ সেখানে আকাশ ডুবে থাকে।
ঢেউ নেই, তবু জোয়ার আসে,
শুধু চোখের পাতার ওঠানামায়।

যে মানুষটি জানে
এটা সরোবর—
সে ভয় পায় না।
সে জানে কোথায় তল,
কোথায় কাদা,
কোথায় শ্যাওলা জমে থাকা স্মৃতি।
তবু সে বলে—
“এ সমুদ্র।”
এই বলাটুকুতেই
ভালোবাসার জন্ম।

ভালোবাসা তখন
লাইফজ্যাকেট পরে না।
ভালোবাসা তখন
গভীরতা মাপে না,
ডুবে যাওয়ার হিসেব রাখে না।
সে বিশ্বাস করে
জল তাকে গ্রহণ করবে।

সরোবরটি শুনে ফেলে—
তাকে সমুদ্র বলা হয়েছে।
সে নিজের সীমা ভুলে
আরও প্রশস্ত হতে চায়।
তার জল নোনতা হয় না,
কিন্তু ঢেউ শেখে
দূরের স্বপ্ন থেকে।
কখনো কখনো
একটু বেশি নড়াচড়ায়
তলদেশে কাদা ওঠে।
ভালোবাসা তখনও সাঁতার কাটে—
কারণ সে জানে
কাদা মানেই ডুব নয়,
এ কেবল মনের পা
মাটি ছুঁয়েছে তার প্রমাণ।

যেদিন কেউ এসে বলে—
“তুমি তো সমুদ্র নও,
তুমি তো ছোট,”
সেদিন জল স্তব্ধ হয়ে যায়।
আকাশ উঠে আসে তীরে।
ভালোবাসা ভিজে দাঁড়িয়ে থাকে—
সাঁতার ভুলে।

কিন্তু যতক্ষণ একজন
আরেকজনের ভেতর
সমুদ্র দেখতে জানে,
ততক্ষণ সরোবর
ডুবতে দেয় না কাউকে।
কারণ ভালোবাসা
গভীরতার নাম নয়—
প্রতীতির নাম।

দুর্বল প্রান্তরেখা

ভালোবাসা যদি আরও গভীর করতে চাও—
তোমার Emotional Quotient বাড়াও।
কারণ ভালোবাসা কোনো নদী নয়
যেখানে বুট জুতো পরে নামা যায়।

প্রতিটি মানুষ
অদৃশ্য চক দিয়ে আঁকা,
নরম সীমারেখা—
যেগুলো অজান্তে ছোঁয়া মাত্র
কালশিটে পড়ে যায়।

কম EQ মানে
অন্ধকার ঘরে দুলে ওঠা এক হাত,
যে পারিবারিক স্মৃতিগুলো ভেঙে ফেলে
আর নাম দেয়— আবেগ।

মানুষ ভাঙে না শব্দ ক'রে।
মানুষ আলগা হয়।
প্রান্তে একটি সুতো খুলে যায়,
তারপর আরেকটি—
একদিন পুরোটা খুলে পড়ে,
আর তুমি তখনও ব্যাখ্যা দিচ্ছো
তুমি কতটা ভালোবাসো।

সীমানা দেয়াল নয়—
ওরা স্নায়ুর প্রান্ত।
ওদের টপকানো যায় না।
শোনা যায়।
সঠিক দূরত্বে দাঁড়ালে
ওরা মৃদু গুনগুন করে,
আর অনেক দেরি হলে
চিৎকার করে ওঠে—
আঘাত ইতিমধ্যেই লেগে যাওয়ার পর।

EQ ছাড়া ভালোবাসা
নির্বীজ অস্ত্রোপচার—
তুমি ভাবো তুমি সারাচ্ছো,
শরীর তখন ভয় শিখে নিচ্ছে।
তুমি অনধিকার প্রবেশকে বলো সততা,
চাপকে বলো ঘনিষ্ঠতা,
ক্ষতকে বলো ভুল বোঝাবুঝি।

EQ হলো
হাত বাড়িয়ে মাঝপথে থেমে যাওয়ার বিদ্যা।
সরে যাওয়ার আগেই
শিউরে ওঠা টের পাওয়া।

নীরবতা কখন সম্মতি নয়
বরং ভদ্র থাকতে চাওয়া
একটি বিপদসংকেত—
তা বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা।

ভালোবাসতে জানতে
খালি পায়ে হাঁটতে হয়
অন্যের ভেতরের মেঝেতে,
কাঁটা আছে কিনা দেখে
পা রাখার আগে।
কখন কাছে আসতে হবে
আর কখন শুধু উপস্থিত থাকাই
স্পর্শের সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ—
তা জানাই ভালোবাসা।

EQ বাড়াও।
নরম হতে নয়—
নিখুঁত হতে।
কারণ ভালোবাসা
প্রান্তে দাগ ফেলে না।
অজ্ঞতাই ফেলে।

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

যেখানে শব্দ ডুবে যায়

মনোযোগ কোনো অনুভূতি নয়।
এ এক চাপ—
যা সময়কে বাঁকিয়ে দেয়।

পৃথিবী সারাক্ষণ দরজায় কড়া নাড়ে—
ছোট, ঝলমলে কড়া,
পিছনে কোনো হাত নেই।

তুমি সাড়া দাও না।
দরজাটি ধীরে ধীরে নীরবতা শিখে নেয়।

অগভীর কাজ করিডরে চেঁচায়,
চেয়ার টেনে নিয়ে যায়,
ঘণ্টা বাজায়,
চলাচলকেই অগ্রগতি বলে।

গভীরতা কিছু বলে না।
সে পাহাড় সরায়
দানা দানা করে।
ব্যস্ততা ভক্তির মুখোশ পরে।
সর্বদা-উপলব্ধ নিজেকে গুণ বলে সাজায়।
এই ফাঁকে মনোযোগ নিলামে ওঠে—
একটি কম্পনের দামে।

গভীরতা নির্বাসন চায়।
মানুষ থেকে নয়—
সংকেত থেকে।
নতুনত্ব সীমান্তে রেখে
তুমি খালি পকেটে পাড়ি দাও।

একঘেয়েমি পাহারা দেয়।
দিতে দাও।
সে যাচাই করছে তুমি আদৌ সিরিয়াস কি না।

অস্থির মন খেলনা বানায়।
প্রশিক্ষিত মন পৃথিবী বানায়।
রীতিনীতি হয়ে ওঠে অক্সিজেন।
একই সময়।
একই চেয়ার।
একই অবতরণ।

অনুপ্রেরণার জন্য অপেক্ষা করো না—
তুমি তাকে ঠিকানা দাও।
কাঠিন্য এক কম্পাস।
যদি ব্যথা লাগে,
তবে তুমি উত্তরণমুখী।
গভীরতা কোনো প্রতিভা নয়।
এ এক পেশি—
ব্যবহার না হলে
যে নিজেকেই ভুলে যায়।

অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না—
তা জমাট বাঁধে
যখন মনোযোগ
এক জায়গায়
যথেষ্ট সময় থাকে।

বাজার বিরলতাকে পূজা করে।
মূল ভাবনা জন্মায় কেবল
যেখানে বাধা শ্বাস নিতে পারে না।
আয়তন শব্দ তোলে।
গভীরতা মূল্য জাগায়।

যা তুমি সময়সূচিতে রাখো না
তা নিঃশব্দে চুরি হয়
আরও জোরালো ইচ্ছেদের হাতে।

এই জীবন এক প্রতিরোধ—
তাড়াহুড়োর বিরুদ্ধে,
ঝলকের বিরুদ্ধে,
এই মিথের বিরুদ্ধে
যে সবকিছুই তোমার চোখ চায়।

গভীরে যাও।
হারিয়ে যেতে নয়—
ফিরে আসতে
এমন কিছু নিয়ে
যা শব্দ নকল করতে পারে না।

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

স্বাচ্ছন্দ্যের সমস্যা

স্বাচ্ছন্দ্য একটি ঘর তোলে
নরম দেওয়ালে মোড়া,
তার নাম দেয়—নিরাপত্তা।
প্রতি রাতে ছাদের উচ্চতা
ইঞ্চি ইঞ্চি কমিয়ে আনে,
এত ধীরে
যে মেরুদণ্ডের বাঁকটাকে
তুমি পরিণতি ভেবে বসো।

ভেতরে কিছুই তোমাকে আক্রমণ করে না।
কিন্তু কিছুই তোমাকে ডাকে না সামনে।
আয়নাগুলো দয়ালু—
তোমার ধার ভোঁতা করে,
ক্ষুধাকে মসৃণ করে,
ভয়কে অনুবাদ করে
অভ্যাসে।
স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে খাওয়ায়
গরম পুনরাবৃত্তি।
বলে—থাকো।
তুমি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট বেঁচে গেছ।
সন্দেহকে তুলে রাখে এক ড্রয়ারে
লেবেল সাঁটে—শান্তি।

কিন্তু আত্মবিশ্বাস এখানে
শ্বাস নিতে পারে না।
তার দরকার তর্ক করা হাওয়া,
ডগমগে সিঁড়ি,
আর এমন দরজা
যারা তোমার নাম চিনতে অস্বীকার করে।

বৃদ্ধি শুরু হয় সেই সীমানায়
যেখানে মেঝে ভুলে যায়
কীভাবে ধরে রাখতে হয়,
যেখানে নীরবতা আর সান্ত্বনা দেয় না,
বরং প্রশ্ন করতে শেখে।
ওখানে ব্যর্থতার একটি কণ্ঠ আছে।
সে জোরে কথা বলে,
অনেক সময় রূঢ়,
তবু সে সত্য বলে।

তোমার পুরোনো সত্তা থেকে যায় পেছনে—
চেয়ারে গুছিয়ে ভাঁজ করা,
কৃতজ্ঞ, অপরীক্ষিত,
ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত।

স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডি পেরোলে
মাটি হাততালি দেবে না।
সে তোমাকে পরীক্ষা করবে।
তোমার নিশ্চিততায় ক্ষত দেবে।
ঘাম আর সন্দেহে
দাম চাইবে।

কিন্তু সেখানে কিছু বন্য জেগে ওঠে—
দাঁতওয়ালা এক আত্মবিশ্বাস,
নিরাপত্তা থেকে নয়,
নিজের কাঁপুনি টিকে যাওয়া থেকে গড়া।
স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে অক্ষত রাখে।

বৃদ্ধি তোমাকে খুলে দেয়,
আর শেখায়
কীভাবে দাঁড়াতে হয়
দেয়ালের সহায়তা ছাড়া।

সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

অগভীরের অভিধান

যার আস্বাদন বেশি,
তার ক্ষুধা স্থায়ী।
এক মুখে সে আকাশ চায়,
পরের মুখেই ভুলে যায়
কি খাচ্ছিল।
সে বদলায় থালা,
বদলায় জিহ্বা,
বদলায় খেলা,
কিন্তু কখনো থামতে চায় না।

গভীরতা
সবার জন্য খোলা নয়।
এটি উত্তরাধিকারও নয়—
একটি ভার,
যা বহন করতে হয়
শ্রদ্ধাসহকারে।

অগভীর শব্দ করে।
ঢেউ তোলে।
নিজের প্রতিধ্বনিকে
সমুদ্র ভাবে।
বধিরতা
তার শ্রেষ্ঠ অর্জন।
সে শোনে না—
কারণ শুনলে
থামতে হয়।

যারা গভীরে নামে
তারা বৈচিত্র্যভূক নয়।
একটি স্বাদ
তাদের জন্য
পর্যাপ্ত।
তারা জানে—
অধিকতরতা
শূন্যতার আরেক নাম।

অগভীর শেষে দাঁড়ায়
নিজের ছায়ার সামনে—
পেট ভরা,
অথচ অর্থ শূন্য।

আর গভীরতা?

সে নীরব।
কারণ সত্য
চিৎকার করে না।

একমাত্র প্রতিপক্ষ

জীবন আসে ঢাকঢোল ছাড়াই—
এক টুকরো বিরল ধাতু
হঠাৎ হাতের তালুতে পড়ে,
এক মুহূর্ত উষ্ণ,
ইতিমধ্যেই শীতল হতে থাকা।

এ তার বিরলতার ঘোষণা দেয় না।
সে কেবল ছোট হতে থাকে।
এটা সংরক্ষণের মাঠ নয়।
এটা এক কর্মশালা।
এখানে সবকিছুই ধার দেওয়ার জন্য—
ব্যর্থতার সঙ্গে ঘষে তোলা মনোযোগ,
সন্দেহের পাথরে শান দেওয়া উদ্দেশ্য,
যতক্ষণ না তা শিস দিতে শেখে।

সময় তোমার সঙ্গে দৌড়ায় না।
সময় তাকিয়ে থাকে।
হাত ভাঁজ করে
দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে,
কৌতূহলী—
তুমি কি বুঝবে
এর কতটুকুই বা অনন্ত।

শুরুর রেখায় অপেক্ষা করছে
একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী—
গতকাল, আপন গতকাল, 
তোমারই মুখ পরে,
তোমার অজুহাতগুলোকে
পদকের মতো ঝুলিয়ে,
অভ্যাস থেকে ধার নেওয়া
এক আত্মবিশ্বাসে শ্বাস নিতে নিতে।
তাকে শব্দ দিয়ে হারানো যায় না।
তাকে হারাতে হয়
অদৃশ্য, সূক্ষ্ম গতিতে—
আরও পরিষ্কার একটি সিদ্ধান্ত,
আরও সাহসী একটি শুরু,
আর পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকার
যা আর তোমার গতিকে বাড়ায় না।

গতি মানে তাড়াহুড়ো নয়।
গতি মানে স্বচ্ছতা—
ক্ষমা না চেয়েই চলতে থাকা।
ভয়কে মনে পড়ার আগেই
লক্ষ্য কোথায় তা জেনে নেওয়া।
প্রতিদিন তুমি এক পা এগোও,
আর গতকাল একটু একটু করে গলে যায়—
লজ্জায় নয়,
স্বস্তিতে।

তার জেতার কথা ছিল না কখনোই।
তার কাজ ছিল অতিক্রমিত হওয়া।
আর যখন রাত নামে,
তুমি ট্রফি উদ্‌যাপন করো না।
তুমি উচ্চতা উদ্‌যাপন করো।
নিঃশব্দ সেই অলৌকিক মুহূর্তটিকে চিহ্নিত করো
যে তুমি উঠেছ
কেউ তুলে না ধরলেও।

এইভাবে জীবন হয়ে ওঠে
গোপন উৎসবের এক আত্মবিশ্বাসী মিছিল—
দর্শকহীন—
শুধু এক অবিচল উচ্ছ্বাস,
এমন এক স্বত্বার
যে আর থাকতে চায় না সেই সীমায়
সে যা ইতিমধ্যেই ছিল।

রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

অপমৃত্যু

কারণ যাই হোক—
যেদিন প্রথমবার
সরাসরি অপমান করলে তাকে,
সেদিনই শুরু হলো
একটি অবিরাম নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ
নিজেরই ভালোবাসার।

কেউ চিৎকার শোনেনি।
দেয়ালগুলো তখনো ভদ্র ছিল,
ঘড়ি সময় দেখাচ্ছিল ঠিকঠাক,
রাস্তার কুকুরগুলো
স্বাভাবিকভাবেই ঘুমাচ্ছিল।

কিন্তু বুকের ভেতরে
একটি শব্দহীন কাচ ভাঙল—
রক্ত নয়, বেরিয়ে এলো
বিশ্বাসের লাল ধুলো।
ভালোবাসা তখন আর নাম ছিল না,
সে হয়ে উঠল একটি আহত অঙ্গ,
যাকে কেউ দেখায় না,
যার ব্যথা হয়
শুধু নিঃশ্বাস নিলেই।

প্রতিটি পরের দিনে
সে শিখে নিল কীভাবে
হাসতে হাসতে রক্ত ঝরাতে হয়,
কীভাবে ক্ষমা বলতে বলতে
নিজের শরীর থেকে
এক ইঞ্চি করে সরে যেতে হয়।

অপমান একদিনের ঘটনা ছিল,
কিন্তু তার ছায়া
প্রতিদিন এসে বসত
ভালোবাসার পাশে,
নখ দিয়ে খুঁটত
যেখানে একসময়
ভরসা বাসা বেঁধেছিল।

এভাবেই নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ
অভ্যাস হয়ে গেল—
মানুষ তাকে বলল
সহনশীলতা,
কেউ কেউ বলল পরিণতি,
কেউ বলল—এটাই প্রেম।

কিন্তু গভীর রাতে
ভালোবাসা জানত,
সে মারা যায়নি একসাথে—
ক্যান্সার বেঁধেছে বাসা, তাই
সে প্রতিদিন
অল্প অল্প করে
বাঁচতে ভুলে যাচ্ছিল।

বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পথের মহত্ত্ব

সে পথটাই বেছে নাও
যে পথ পৌঁছনোর দিকে তোমাকে তাড়া দেয় না,
যে পথ সময়কে
তার বাঁধনছাড়া দড়ি থেকে খুলে দেয়।

গন্তব্যকে অপেক্ষা করতে দাও—
তার ধৈর্য আছে,
তুমি দেরি করছ বলে
সে মিলিয়ে যাবে না।

বরং সেই পথ ধরো
যে তোমার পায়ের তালুকে শেখায়
ধুলোয় লেখা নতুন ভাষা,
যেখানে চাপের তলায় পাথর গুনগুন করে
আর প্রতিটি বাঁক চর্চা করে বিস্ময়।

এই পথে
মাইলফলকরা অঙ্ক মানতে অস্বীকার করে।
এখানে সূর্যাস্ত আসে না শেষ হিসেবে,
বরং যতিচিহ্ন হয়ে—
নিজেকে গড়ে তোলা এক বাক্যের
মাঝখানে রাখা কমা।

যখন গন্তব্য অবশেষে দেখা দেয়,
নিঃশব্দ, প্রায় লজ্জিত,
তখন তুমি বুঝতে পারো—
তুমি তো আগেই পৌঁছে গেছ
হাজারবার,
প্রতিবার বিস্ময় তোমার গতি কমিয়েছে,
প্রতিবার সৌন্দর্য কিছুই চায়নি
মনোযোগ ছাড়া।

তাই সেই পথটাই বেছে নাও
যে তোমাকে সম্পূর্ণ ব্যয় করে,
তোমার কোনো অংশকেই অব্যবহৃত রাখে না।
যাত্রা এমন পূর্ণ হোক
যেন গন্তব্য
শুধু একটি পরিশিষ্ট মনে হয়—
একটি বই
আলতো করে বন্ধ করে দেওয়া,
যে বই শেষ করতে
তুমি কখনোই চাওনি।

সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিশাল হৃদয়

যখন একজন মানুষের হৃদয়
তার মস্তিষ্কের চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে,
তখন তা গুণের ছদ্মবেশে
একটি দায় হয়ে দাঁড়ায়।

ভালবাসা তাকে প্লাবিত করে—হ্যাঁ—
কিন্তু বন্যা কখনও কোমল নয়;
সে দিশাচিহ্ন ডুবিয়ে দেয়,
রাস্তা মুছে ফেলে,
কৃতজ্ঞ অথচ পথহারা করে তোলে।

সে আগে অনুভব করে—সবসময়।
ভাবনা আসে পরে,
যদি আদৌ আসে।
তার করুণা গতি থামিয়ে দেয়।
তার সহানুভূতি দেরি করায় সেই সিদ্ধান্তগুলোকে
যাদের প্রয়োজন
‘না’-র নির্মম অথচ পরিষ্কার দৃঢ়তা।

সে উষ্ণতাকে জ্ঞান ভেবে ভুল করে।
সততাকে দিশা মনে করে।
দ্বিধাকে “মানবিকতা” বলে ডাকতে ডাকতে
জীবন তার পাশ দিয়ে হেঁটে যায়—
সব চুক্তিতে আগেই সই হয়ে যায়।

পৃথিবী তাকে শাস্তি দেয় না—
সে কেবল এগিয়ে যায়।
সুযোগ নিষ্ঠুর নয়;
তারা অধৈর্য।
তারা অপেক্ষা করে না
সে কখন সবাইকে বুঝে নেওয়া শেষ করবে।

সে নিজের প্রভাব ছুড়ে ফেলে
যেন তা বিষ।
সে কৌশলের বদলে ক্ষমা বেছে নেয়,
শৃঙ্খলার বদলে মাফ,
তারপর অবাক হয়
কেন শক্তরা ফল উত্তরাধিকার সূত্রে পায়
আর তার ভাগে জোটে কেবল গল্প।

উদ্দেশ্য চায় স্তরবিন্যাস—
অগ্রাধিকার গাঁথা,
ত্যাগ বাছাই করা।
কিন্তু তার হৃদয় শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে,
সবকিছুকে সমান প্রয়োজন,
সমান জরুরিতে অকেজো করে দেয়,
যতক্ষণ না কিছুই এগোয়।

সাফল্য চায় একধরনের সংকোচন—
হতাশ করতে পারার সাহস,
আগুন পেরিয়ে থামাহীন হাঁটা,
কিছু মানুষকে পুড়তে দেওয়া
যাতে ভবিষ্যৎ আদৌ থাকতে পারে।

সে তা পারে না।
তার হৃদয় খুব প্রশস্ত,
খুব গণতান্ত্রিক,
মুখ বাঁচাতে ব্যস্ত—
মেরুদণ্ড গড়ার সময় পায় না।

তাই সে থেকে যায় প্রিয়—
হ্যাঁ, গভীরভাবে, ব্যাপকভাবে, অকেজোভাবে।
একটি আশ্রয়, শক্তি নয়।
একটি শরণ, দিশা নয়।
আর শেষে,
ইতিহাস নথিভুক্ত করে না
সে কতটা দয়ালু ছিল।

ইতিহাস লেখে
কে পৃথিবী সরিয়েছিল।
বাকিরা স্মরণে থাকে
শুধু তাদের কাছে
যাদের বেঁচে থাকতে সে সাহায্য করেছিল।

নারীর প্রেম

তুমি কোনও নারীর হৃদয়কে
ভালবাসার আন্তরিকতা দিয়ে
বাধ্য করতে পারো না।

ভালবাসা, যখন নগ্ন হয়ে আসে,
প্রায়ই তা হয়ে ওঠে একখানা লাগাম—
নরম, সুগন্ধি, ভক্তির বেণীতে বোনা,
তবু যথেষ্ট শক্ত
একটা মেরুদণ্ডকে বেঁকিয়ে দেওয়ার জন্য।

সে তোমাকে নিষ্ঠুরতা থেকে প্রত্যাখ্যান করে না।
সে শুধু শোনে—
কোথায় তোমার মাধ্যাকর্ষণ নুয়ে পড়ে।
যদি তার নিঃশ্বাসে
তোমার কেন্দ্র সরে যায়,
যদি তার মুডের সামনে
তোমার ইচ্ছাশক্তি হাঁটু গেড়ে বসে,
তবে ভালবাসা আর সংগীত থাকে না—
ভালবাসা হয়ে যায় রিমোট কন্ট্রোল।
প্রথমে সে এই অলৌকিকতায় মুগ্ধ হয়—
কীভাবে একটি হৃদস্পন্দন ঘোরানো যায়,
কীভাবে শপথ গলে অনুমতিতে রূপ নেয়,
কীভাবে তোমার “সবই পারি”
তার চাহিদার আগেই এসে দাঁড়ায় দরজায়।

ক্ষমতা মিষ্টি লাগে
যখন তা পরিশ্রমহীন।
কিন্তু সম্মান এক বন্য প্রাণী।
সে তালু পেতে জল খায় না।
সে দূর থেকে তাকিয়ে থাকে,
মাপে তোমার নিঃসঙ্গতার প্রস্থ,
পরীক্ষা করে দেখে—
তুমি কি রক্ত না ঝরিয়ে
হেঁটে চলে যেতে পারো।

সে তোমাকে দেখতে শেখে
ঠিক সেই দিন,
যেদিন সে ব্যর্থ হয়
তোমার স্বাধীনতাকে শিকলে বাঁধতে—
যেদিন ভালবাসা থাকে,
কিন্তু আনুগত্য থাকে না।
যেদিন তোমার “না”
তার নীরবতাকে টিকে যায়।
যেদিন তোমার উদ্দেশ্য
তার অনুমোদনের চারদিকে ঘোরে না।
যেদিন তার সূর্য না দিলেও
তোমার জীবন শ্বাস নিতে থাকে।

তখন তার ভেতরে কিছু একেবারে সরে যায়—
ভালবাসা সিংহাসন ছাড়ে,
ক্ষমতা খেলনা হারায়,
আর সম্মান প্রবেশ করে,
আত্মসমর্পণ হয়ে নয়,
স্বীকৃতি হয়ে।

কারণ কামনা ভক্তি চায়,
কিন্তু শ্রদ্ধা নতজানু হয়
শুধু তার কাছেই—
যে গভীরভাবে ভালবাসে,
তবু
নিজেরই থাকে।

বিভ্রান্তি

একজন নারী খুব কমই জানতে পারে
ঠিক কোন মুহূর্তে
সে তার মানুষটিকে হারায়।

তা বজ্রের মতো আসে না।
কোনও দরজা সজোরে বন্ধ হয় না,
হাওয়ায় খোদাই করা
কোনও ঘোষণা শোনা যায় না।

ওটা ঘটে আরও আগে—
অন্তর্দৃষ্টির চেয়েও নরম,
সন্দেহের চেয়েও নীরব।

ওটা ঘটে সেদিন
যেদিন তার প্রশ্নগুলো আর ঘুরে বেড়ায় না,
সেই রাতে
যখন তার নীরবতা
একলা দাঁড়াতে শিখে যায়।

সে ভাবে অনুপস্থিতি হবে উচ্চস্বরে।
সে ভাবে ভালবাসা
পায়ের ছাপ রেখে যায়।
কিন্তু বিদায়, বেশিরভাগ সময়ে,
একটা যত্নশীল মুছে ফেলা।

সে তখনও সেখানে থাকে—
শ্বাস নেয়, কথা বলে, ছোঁয়—
তবু জরুরি কিছু
ইতিমধ্যেই গুছিয়ে নিয়েছে ব্যাগ।

সবার আগে চলে যায় আশা।
তারপর ব্যাখ্যা।
তারপর সেই ছোট্ট প্রবৃত্তি—
বোঝা যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

সে অস্বাভাবিক কিছু টের পায় না—
একই ঘর,
একই বিছানা,
একই ভাগ করা আবহাওয়া।
যা সে খেয়াল করে না,
তা হলো—
সে কীভাবে তার হৃদয়
বহন করতে শুরু করে
একটা সিল করা চিঠির মতো,
যার ঠিকানা নেই।

যখন সত্য চোখে পড়ার মতো হয়,
ততক্ষণে তা ইতিহাস।
যে মানুষটির দিকে সে হাত বাড়ায়
সে তখন এক পরছায়া,
মাথা নাড়তে শেখানো এক স্মৃতি।

হারানো—
সে খুব দেরিতে শেখে—
সবসময় নিজেকে ঘোষণা করে না।
কখনও কখনও সে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে
যতক্ষণ না ভালবাসা
নিজেই বেরিয়ে যাওয়া শেষ করে।

আর যখন শেষ বিদায় আসে,
তা হঠাৎ বলে মনে হয়—
এই জন্য নয় যে তা হঠাৎ,
বরং এই জন্য যে
তা ঘটেছিল অনেক আগেই,
বুঝতে শেখার অনেক আগে।

রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সুবিধাভোগী

পৃথিবীর কিছু জীবনের দিকে তাকিয়ে
তোমার হিংসা জাগে—
যাদের পথ ঘর্ষণহীন,
যেন তারা কড়া নাড়ার আগেই
দরজাগুলো খুলে যায়।
তাদের দিনগুলো কাঁদে না,
তাদের পকেটে সময়ে মরচে ধরে না।
দুর্ভাগ্য তাদের ছুঁয়ে যায়
রেশমে আটকে না থাকা বৃষ্টির মতো।

তুমি ভাবো—
নিশ্চয়ই কোনও গোপন আশীর্বাদ আছে,
তাদের পাঁজরের আড়ালে লুকোনো এক ঈশ্বর,
এক অদৃশ্য হাত
পথটাকে মসৃণ করে দিচ্ছে।
কিন্তু আরেকটু কাছে এসে দেখো।
তাদের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে
এক ঘন, দীপ্ত স্রোত—
ভালবাসা, অনুভূতি নয়,
একটি পদার্থ।

ওটা তাদের সকালগুলোকে মুড়ে রাখে,
ভুলগুলোর ধার কমিয়ে দেয়,
তীক্ষ্ণ মোড়কে বাঁক বানায়।
ভালবাসা তাদের রক্তে গুনগুন করে
ইঞ্জিন গরম করা তেলের মতো—
ঝগড়া নরম হয়ে যায়,
ব্যর্থতা ভাঙে না, সরে যায়,
এমনকি শোকও শিখে নেয়
শরীর ছিঁড়ে না ফেলে চলতে।

তারা তোমার চেয়ে হালকা নয়।
তারা বেশি ভাগ্যবানও নয়।
তারা শুধু ভেজা।
গভীর ভালবাসা সারাক্ষণ
তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে—
নিশ্বাসের মতো নীরব,
মাধ্যাকর্ষণের মতো বিশ্বস্ত।

ভয়ের বোল্টগুলো আলগা করে দেয় সে,
জীবনকে হাড়ে-হাড়ে ঘষা খাওয়া থেকে বাঁচায়।
তাই যখন তুমি দেখো
তারা ভেসে চলছে
আর তুমি টেনে নিয়ে যাচ্ছ নিজের পা,
তখন জেনে রেখো—
ওরা ওজন এড়িয়ে যায়নি।
ওরা শিখে নিয়েছে ওজন বহন করতে
ভক্তিতে পিচ্ছিল হয়ে ওঠা এক জগতে।

আর হয়তো একদিন,
যখন তোমার বুকেও ভালবাসা
দীর্ঘক্ষণ জমে থাকবে,
তোমার জীবনও চলতে শুরু করবে—
না আরও দ্রুত,
না আরও জোরে,
বরং আরও মসৃণভাবে,
যেন এই মহাবিশ্ব নিজেই
তোমাকে পথ ছেড়ে দিতে শিখেছে।