সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬

অসহায়

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে 
এ জগতের প্রতিটি মানুষ অসহায়
একটি সত্যের কাছে।
জানো কি—
তুমি লড়তে পারো শত শত পুরুষের সঙ্গে
যারা তাকে চায়।

ধার করা নামের ঝড়ের মতো তাদের জড়ো করো,
ক্ষুধার ব্যাকরণ শেখাও তাদের মুষ্টিকে,
চোখগুলোকে ধারালো অস্ত্র বানিয়ে দাও—
তবু তুমি তাদের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাবে
অপ্রতিরোধ্য এক চিন্তার মতো,
তোমার শ্বাস সংযত,
তোমার সাহস বাতাসকেও আঘাত করার মতো উচ্চ।

চাওয়া সহজ।
সে নিজেকে ঘোষণা করে।
সে ছুটে আসে।
সে ভেঙে পড়ে, রক্তাক্ত হয়।
কিন্তু তুমি লড়তে পারো না
সেই মানুষের সঙ্গে
যাকে সে চায়।

কারণ সেই প্রতিদ্বন্দ্বী
তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে না।
দখল করার মতো কোনও ভূমি নেই,
পায়ের তালে তালে হাঁটার মতো কোনও সংগীত নেই,
তলোয়ার কোথায় কাজে লাগবে—
তারও কোনও সম্মত দিকনির্দেশ নেই।
কীভাবে আঘাত করবে
এমন এক পছন্দকে
যা তার নীরবতার ভেতর ঘুমিয়ে থাকে?
কীভাবে কোণঠাসা করবে
এমন এক হৃদস্পন্দনকে
যে আগেই বেছে নিয়েছে
অন্য এক ছন্দ?

সে মানুষটি কোথাও নেই—
তবু সর্বত্র তার বাস:
সে উত্তর দেওয়ার আগে যে বিলম্ব,
তার হাসি যেভাবে হেলে পড়ে
এক অনুপস্থিত উপস্থিতির দিকে,
একটি নামের মধ্যে থাকা
অব্যাখ্যাত কোমলতায়।

তার সামনে
শক্তি নিজের শব্দভাণ্ডার হারায়।
পেশি ভদ্রতায় রূপ নেয়।
রাগ বসে থাকতে শেখে।
তুমি হারাতে পারো
তার শরীরের কল্পনায় মাতাল
সমগ্র বাহিনী,
কিন্তু তুমি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র
তার সামনে
যে তার নীরব নিশ্চিততার অধিকারী।

কারণ প্রেম নিষ্ঠুরভাবে নিখুঁত—
সে তোমাকে শব্দের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে,
তারপর একটিমাত্র
নিখুঁত নীরবতায়
তোমাকে পরাজিত করে।

তাই তুমি হাত নামিয়ে রাখো,
না আত্মসমর্পণে,
না দুর্বলতায়,
বরং এই জ্ঞানে যে
কিছু যুদ্ধ জেতা যায় না
নিজের লড়াইয়ের কারণটিকেই
ধ্বংস না করে।

প্রার্থী

জানি, তুমি বিরলতম সুন্দরী—
তোমার সৌন্দর্য মনকে পাগল করে,
এটা হেঁটে বেড়ায় সময়ের ভেতর,
ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়
নিজের প্রতিবিম্ব রেখে যায়।

মানি, তুমি বহু গুণেরও গুণী—
যখন গান কর,
সুর তখন নদীর মতো নিজের নাম ভুলে যায়,
যখন কবিতা লেখো,
শব্দেরা তখন মাথা নত করে
অর্থের সামনে নয়,
আভিজাত্যের সামনে।

তোমার কণ্ঠে রাতের কোমলতা,
কলমে ভোরের সাহস—
তুমি চাইলে
নীরবতাও তাল মিলিয়ে গুনগুন করে।

তবু, আমার সমস্যা আছে।
শ্রদ্ধাশূন্য প্রেম
আমার কাছে কেবল শব্দের কঙ্কাল—
চামড়া আছে,
কিন্তু আত্মা নেই।
আমি এমন আকর্ষণে বিশ্বাস করি না
যা চোখে ঝিলিক তোলে
কিন্তু মাথা নিচু করতে শেখায় না।

আমি তাই বাধ্য
নৈতিক শুদ্ধতার পুজারী হতে—
আমার মন্দিরে
ভিড় নেই,
কিন্তু প্রতিটি পাথর
সততাকে চেনে।
এখানে কোনও আপোষ নেই—
ভাঙা আয়নায় মুখ দেখার অভ্যাস নেই,
নিজেকে বোঝাতে শেখা অর্ধসত্যেরও নয়।

প্রেম যদি আসে,
তাকে আসতে হবে
শ্রদ্ধার পায়ে হেঁটে,
নিঃশব্দে,
যেন সে জানে—
উচ্চতা শব্দে নয়,
নতমুখে জন্মায়।

তোমার সৌন্দর্য আমাকে ডাকতে পারে,
তোমার গুণ আমাকে থামাতে পারে,
কিন্তু আমার হৃদয়ের দরজায়
তালার চাবি একটাই—
শুদ্ধতা।

আর সে চাবি
কোনওদিনই
আপোষের অধিকারে থাকে না।

আমার ধর্ম

ধর্ম আমাকে এমন কোনো অর্জন দেয়নি
যার ভারে আমি হঠাৎ ধনী হয়ে উঠি,
বা মানুষের সারিতে
সম্ভ্রান্ত নামে আলাদা করে ডাকা পড়ে।
সে আমার কপালে
কোনো রাজচিহ্ন আঁকেনি,
আমার হাতে তুলে দেয়নি
বংশের তালাবদ্ধ চাবি।

মানুষের ভিড়ে
আমি ছিলাম কেবলই একজন—
না উঁচু, না নিচু,
শুধু দাঁড়িয়ে থাকা 
অসহায় একজন মানুষ।

বরং পরিশ্রম—
যে ধর্মগ্রন্থে ঘাম দিয়ে লেখা হয় প্রতিটি লাইন—
আর নিষ্ঠা—
যে নীরবে হাঁটে,
কিন্তু পিছু হটে না—
এই দু’জন আমাকে দিয়েছে
এক ভিন্ন ধরনের দীক্ষা।
সেই দীক্ষায়
আমি শিখেছি
ভোরের অন্ধকারে নিজের ভয়কে তুলে নিতে,
হাতুড়ির মতো ব্যবহার করতে
বারবার ভেঙে ফেলার জন্য
নিজেরই সীমাবদ্ধতা।

সাহস এসেছে
কোনো আশীর্বাদের মতো নয়,
বরং ক্ষত থেকে—
যেখানে ব্যথা দাঁত চেপে
নিজেকে শক্ত করে তোলে।
শক্তি এসেছে
কোনো মন্ত্রপাঠ থেকে নয়,
বরং পতনের পর
নিজের নাম ধরে উঠে দাঁড়ানোর অভ্যাস থেকে।

দুর্ভাগ্যগুলো তখন
শিকারির মতো ঘিরে ধরেছিল—
দারিদ্র্য, অবহেলা,
ভুল বোঝা পৃথিবী—
কিন্তু আমি শিখে গেছি
লড়াইকে প্রার্থনায় পরিণত করতে।

আজও আমি ধনী নই
মানুষের হিসাবখাতায়,
সম্ভ্রান্ত নই
তাদের সংজ্ঞার আলোয়।
কিন্তু আমার ভেতরে
একটি অবিনাশী সম্পদ আছে—
নিজের শ্রমে গড়া মেরুদণ্ড,
নিজের নিষ্ঠায় ধার করা আগুন,
যা কোনো দুর্ভাগ্যই
সহজে নিভিয়ে দিতে পারে না।

আর সেই অদম্য পরিচয়
কোনো পতাকার রঙে বাঁধা নয়,
কোনো শ্লোগানে মুখস্থ করা নয়—
এটি হাঁটে আমার সঙ্গে
প্রতিদিনের সাধারণ পথে।

যখন কিছুই থাকে না
ভরসা করার মতো,
আমি তখন নিজের পরিশ্রমকে ডাক দিই,
নিষ্ঠাকে পাশে বসাই,
আর নীরবে বলি—
চলো, আরেকটা দিন জয় করি।
দুর্ভাগ্য তখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে,
কারণ সে জানে—
আমি আশীর্বাদে ভাঙি না,
আমি অভিশাপে থামি না।

আমি তৈরি হয়েছি
পুনরাবৃত্ত চেষ্টা দিয়ে,
ভাঙা স্বপ্নের ধুলো মেখে,
নিজেকে নিজেই গড়ে তোলার
দীর্ঘ, অবিশ্রান্ত প্রক্রিয়ায়।

ধর্ম আমাকে সমাজে উঁচু করেনি,
কিন্তু শ্রম আমাকে
নিজের চোখে ছোট হতে দেয়নি।
আর পৃথিবীর মানচিত্রে
এই সত্যটি নীরবে জ্বলজ্বল করে—
কেবল পরিশ্রমী জাতিরাই
এই পৃথিবীতে
উন্নতির শিখরে উঠতে পারে।

এই দাঁড়িয়ে থাকাই আমার প্রার্থনা,
এই লড়ে যাওয়াই আমার বিশ্বাস—
আর এই পথচলাই
আমার একমাত্র,
অপরাজেয় সম্পদ।