শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

এসো

শুধু একবার তোমাকে ছোঁব—
একবার, শুধু একবার,
যেন সমস্ত জন্মের ভেতর ঘুরে বেড়ানো এক তৃষ্ণা
হঠাৎ নিজেরই উৎসে পৌঁছে যায়,
আর বিস্ময়ে থেমে থাকে—
আমি কি তবে এতদিন তোমাকেই খুঁজছিলাম?

সেই ঠোঁটজোড়া—
যারা ঝগড়া করে না
উপরে না নিচে ব’লে,
যারা উচ্চতার অহংকারে ওঠে না,
গভীরতার ভয়ে নামে না,
শুধু পাশাপাশি থাকে—
দুটি সমান্তরাল নিশ্বাসের মতো,
যারা একে অপরকে স্পর্শ না করেও
একই জীবনের ভার বহন করে।

তারা চিরকাল পাশাপাশি—
যেন এক অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা
যা কখনো উচ্চারিত হয়নি,
তবু ভাঙেওনি কোনোদিন।

আর তারা ভিজে থাকে—
সর্বদাই ভালবাসায়,
যেন ভালোবাসা কোনো আবেগ নয়,
বরং এক স্থায়ী স্রোত,
যা ভেতর থেকে বাইরে নয়,
বরং বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকে
সবকিছুকে ভিজিয়ে দেয়
অপরিচিত এক উষ্ণতায়।

তোমার ঠোঁট—
একটি গোপন জ্যোৎস্না,
যাকে তুমি লুকিয়ে রাখো
অন্ধকারের আড়ালে,
যেন আলো তাদের স্পর্শ করলে
তারা ভেঙে পড়বে
নিজেদের অতিরিক্ত সত্যে।

যাদের তুমি যত্ন করে লুকিয়ে রাখো—
যেন কোনো সূর্য
তাদের উন্মোচন করতে না পারে,
যেন প্রকাশ মানেই ক্ষয়,
যেন দৃষ্টি মানেই
ভালবাসার অবসান।

তুমি তাদের আড়াল করো
নিজের নীরবতার পর্দায়,
যেখানে শব্দ ঢোকার আগেই
নিজেকে ভুলে যায়,
আর প্রতিটি অপ্রকাশিত অনুভূতি
নিজের পূর্ণতায় পৌঁছে যায়
অন্ধকারের সুরক্ষায়।

কখনও সূর্যের আলো দেখতে দেবে না ব’লে—
তুমি যেন প্রতিজ্ঞা করেছো
তাদের চিরকাল রক্ষা করার,
যেন কিছু জিনিস
শুধু অদেখাই থাকলে বেঁচে থাকে,
শুধু লুকিয়ে থাকলেই
অমর হয়।

আর তারা—
যারা জন্মেছেই
পৌরুষকে পাগল করবে বলে
গভীরতার আস্বাদনে—

তারা কোনো প্রলোভন নয়,
তারা কোনো দখলযোগ্য শরীর নয়,
তারা এক গভীর আহ্বান,
যেখানে ডুব দিলে
ফিরে আসা যায় না আগের মতো।

তাদের ভেতরে আছে
এক অতল নিমন্ত্রণ,
যা চোখে দেখা যায় না,
তবু অনুভূত হয়—
মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে
একটি শিহরণ হয়ে।

আমি সেই শিহরণে ডুবতে চাই—
একবার,
শুধু একবার,
যেন নিজের ভেতরের সমস্ত স্থিরতা
ভেঙে পড়ে
এক অচেনা অস্থিরতায়।

একবার ছোঁয়া মানে—
নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়,
বরং নিজের অজানা দিকগুলোকে
হঠাৎ চিনে ফেলা,
যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
দেখা—
এই আমি নই,
তবু এই আমিই।

তোমার ঠোঁটের ভেতরে
আমি হয়তো খুঁজে পাবো
একটি গোপন গভীরতা,
যেখানে পৌরুষ মানে শক্তি নয়,
বরং ভেঙে পড়ার সাহস,
ডুবে যাওয়ার ইচ্ছা,
আর নিজেকে সমর্পণ করার
অদ্ভুত এক স্বাধীনতা।

সেই গভীরতার স্বাদ—
একবার পেলেই
ফিরে আসা যায় না উপরে,
কারণ উপরের সবকিছু তখন
অত্যন্ত হালকা,
অত্যন্ত অগভীর মনে হয়।

আর যদি সেই একবার ছোঁয়া ঘটে—
তবে হয়তো আমি আর আমি থাকবো না,
তুমি আর তুমি থাকবে না—
আমরা দুজনই মিশে যাবো
একটি অদৃশ্য স্রোতে,
যেখানে কোনো পরিচয় নেই,
কোনো পৃথকতা নেই,
শুধু এক অন্তহীন অনুভূতির বিস্তার।

আর যদি না-ও ঘটে—
যদি সেই ঠোঁটজোড়া
চিরকালই লুকিয়ে থাকে
তোমার যত্নের অন্ধকারে—

তবু এই আকাঙ্ক্ষা
একটি অসমাপ্ত ডুব,
যা কখনো শেষ হয় না,
যা ক্রমাগত গভীরতর হয়—

ঠিক সেই ঠোঁটজোড়ার মতো,
যারা ঝগড়া করে না,
শুধু পাশাপাশি থাকে,
ভিজে থাকে ভালবাসায়,
লুকিয়ে থাকে আলো থেকে,
আর জন্মেছে—

পৌরুষকে

পাগল করে দেওয়ার জন্য

সুনিবিড় আলিঙ্গনে
এক অনন্ত গভীরতার স্বাদে।

গল্প

সময় আপন খেয়ালে নিজেকে ভাঙে, গড়ে—
কখনও মাটির ভাস্কর, কখনও জলোচ্ছ্বাস,
কখনও আবার এক অদৃশ্য লেখক,
যে নিজেরই শরীরে লেখে তার অদেখা আত্মজীবনী।

তার আঙুলে কালি নেই—
আছে ভাঙনের ধুলো,
আছে গড়নের ঘাম,
আছে অনন্ত অপেক্ষার নোনা গন্ধ।

প্রতিটি মুহূর্ত একেকটি বাক্য,
যা লেখা হয় ভাঙা আয়নার ওপর,
যেখানে প্রতিফলনগুলোও নিজেদের চেনে না,
তবু গল্প থেমে থাকে না—
বরং আরও অস্পষ্ট, আরও গভীর হয়ে ওঠে।

যাদের পড়বার,
তারা ঠিকই ধৈর্য ধরে পড়ে—
তারা শব্দের আড়ালে শোনে নীরবতার উচ্চারণ,
তারা বুঝতে পারে কেন এক ফোঁটা সময়
হঠাৎ মহাবিশ্বের মতো ভারী হয়ে ওঠে।

তাদের চোখে সময় কেবল স্রোত নয়,
বরং এক গোপন দরজা,
যার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে সম্ভাবনার নগ্ন সত্য—
অপেক্ষায়, অচঞ্চল, অনাহূত।

আর বাকিদের—
নজর পিছলে যায়,
যেন ভেজা পাথরের ওপর হেঁটে চলা,
যেন হাত বাড়িয়েও ছুঁতে না পারা
অমূল্য কোনো স্বপ্নের কাঁধ।

তারা দেখে, কিন্তু দেখে না,
ছোঁয়, কিন্তু স্পর্শ করে না—
দুর্লভ সুযোগগুলো তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে
অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে,
আর তারা তখনও ব্যস্ত থাকে
নিজেদের ব্যর্থ প্রচেষ্টায়।

সময় তখন হেসে ওঠে—
একটি ভাঙা ঘড়ির কাঁটার মতো বেঁকে গিয়ে,
নিজেকেই আবার নতুন করে গড়তে গড়তে
লিখে ফেলে শেষ লাইনটি—

যা বাকিরা পড়ে না,
কারণ সেটি লেখা থাকে
পড়ে ফেলা মানুষের চোখের ভেতর।