সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

স্থিত

বিশ্বাস করে ঠকে যাওয়া সারা জীবন ধরে একপ্রকার অব্যহত থাকায়, ভালবেসে একের পর এক আগ্রহহীনতা পেতে পেতে, জীবন সম্মন্ধেই উৎসাহ বেশ কমে গেছে আজকাল পরমার ৷ মেয়েবেলার অবিশ্রান্ত খিলখিলিয়ে হাসি এখন অতীত স্মৃতি ৷

সরকারী চাকরীর সুবাদে খাওয়া থাকা নিয়ে চাপ নেই কোনও ৷ ভবিষ্যতেও থাকবে না ৷ তবে জ্যান্ত মানুষের তুলনায় রামকৃষ্ণ কথামৃত নিয়েই আজকাল সময় কাটে বেশি ৷ এর সাথে যোগ হয়েছে ছুটির দিনে সুযোগমত দক্ষিণেশ্বর বা বেলুড়মঠ যাওয়া !

সেদিনটা বেলুড়মঠের ছিল ! জি টি রোডে নেমে  গেটের কাছাকাছি আসতেই বিদ্যামন্দির পেরিয়ে হাতের বাঁদিকে খাবারের স্টল ৷ এক মোটা অবাঙালি আর তার সমানতালে স্ত্রী ব্যস্ত সুস্বাদু খাদ্যের সাথে মুখগহ্বরের সংযোগ ঘটানোয় !

পাশে দুই সন্তান, খাদ্য সম্মন্ধে সম্পূর্ণ নির্বিকার হয়ে, প্রবল ব্যস্ত নিজেদের খেলায় ! বয়স দুজনেরই সম্ভবতঃ আট এর কম ৷ খেলাটিও মনে হলো তাৎক্ষণিক আবিষ্কার ৷

বড়টি, ছোটটির মাথায় হাত দিয়ে যতদূর সম্ভব লাফিয়ে উঠছে "ভেলপুরী" বলে চেঁচিয়ে উঠে ৷ তারপর ছোটটি বড়র মাথায় হাত দিয়ে লাফিয়ে উঠছে "বাটাটাপুরী" বলে !

এরকম ক্রমান্বয়ে বার তিনেক হওয়ার পরে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে হাসতে হাসতে প্রায় লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে ! তারপরে ফের পরের রাউণ্ডের লাফানো শুরু !

অজান্তেই পরমার মুখে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি ৷ হাঁটার দিশা গেটের দিক থেকে সামান্য বাঁদিকে সরে, ওদের কাছাকাছি এসে আটকে গেল ! 

একটু পরের দৃশ্য - প্রতিবার লাফানো শেষ হলে প্রাণ খুলে হাসছে তিনজন ৷ মোটা দম্পতি খাওয়া থামিয়ে পরমা আর নিজের সন্তানদের দেখছে, তারপরে বোকার মত হেসে ফেলছে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ! বাচ্চাদের অবশ্য ভ্রুক্ষেপ নেই ৷

পরমার হাসতে হাসতে হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো চোখ ! আরে ! তাহলে, ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের উপরে তো আদৌ নির্ভর করে না জীবনের আনন্দ ৷ বাঁচার উৎসাহকে পার্থিব স্বার্থের বাইরেও দিব্যি খুঁজে নেওয়া আজও যেতেই পারে !

পরমা আর এগোলো না বেলুড়মঠের গেটের দিকে ! পেছন ফিরলো ৷ বুকের মন্দিরে তবে কি সে দেখতে পাচ্ছে অবশেষে, অ, উ, ম, এর দিব্য অবতরণে, আনন্দ, প্রেম আর শান্তির নিরুদ্বেগ স্বতঃস্ফূরণ ? বাইরের পার্থিবকে তাই তৎক্ষণাৎ গৌন হতে হলো ? 

তাকে, তবে, আগলে রাখতেই হবে এ জাগরণ - এবার থেকে ৷ এ দীপশিখাকে আর হারাতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই ৷

হঠাৎই গুনগুনিয়ে উঠছে মনে - একের পর এক পূজা পর্যায়ের রবীন্দ্রসংগীত ৷ পঞ্চাশোর্ধ পরমা প্রায় লাফাতে লাফাতে সোজা বাড়ি ফিরে এলো ৷

রবিবার, ১৪ জুন, ২০২০

একলা আষাঢ়

পাতার আড়াল খুঁজে
বারবার সরে সরে গিয়েও
অবাধ্য বৃষ্টির জলকে
যখন রোখা গেল না আর,
ধুয়ে অবশেষে যেই দিলোই
কবিতার অনাবিল স্নানে,

তখন পাখিটা সহসা 
নিগূঢ়ের অপর্যাপ্ত আসঞ্জন ছেড়ে
সাহসের ডানা মেলে
উড়ে গেল 
পাকা দালানের ঘুলঘুলির
নিশ্চিত আশ্রয়ে !

যদিও,
প্রপাতের পূর্বমুহূর্তটিতে 
হাজির হতে পেরে,
আর সামান্যই মাত্র বাকি তখন - 
জয়ের চুড়ান্ত প্রান্ত ছুঁতে,
বানভাসির মরীয়া অভিমানের !

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

প্রজ্ঞা-পারমিতা

কিছুটা প্রাণোচ্ছল স্বেচ্ছা
আর বাদবাকিটা,
এমনকি, হয়তো সহবাস অবধি,
বাধ্য অনিচ্ছুক আপোষ
অপাংক্তেয় বিহ্বলে !

মানুষ আপ্রাণ বেঁচে চলেছে
দিনের পর দিন
ঠিক তার মাঝখানটি দিয়ে 
হেঁটে-চলে !

বাধ্যতা-রা 
কাউকে প্রবল বিব্রত করে,
কাউকে অপেক্ষাকৃত কম,
সময় - মাপকাঠি হাতে নিয়ে এলে !

ইচ্ছার স্বনির্ভরতা আর
পরাণের স্বাধীনতা সম্মন্ধে
যে অধিকতর ওয়াকিবহাল,
সে মুখের হাসিকে
ধরে রাখতে জানে অবিচল
তখনও -

অসময়-জনিত নিষেধ
অপরাপরদের পানে 
টুঁটি টিপে দম বন্ধ করে দিতে
আবির্ভূত হলে !

বুধবার, ১০ জুন, ২০২০

দ্বিমাত্রিকতার দ্বন্দ্ব

একটি অনুভূমিক
আর একটি উল্লম্ব পথ
চলে গেছে
প্রতিটি ইচ্ছুক প্রেমের মাঝ বরাবর !

অনুভূমিক পথটি অনায়াস ও হ্রস্ব !
এক হতে অপরের
অবয়বে পৌঁছেই শেষ হতে আছে !
পরদিন আবার 
প্রায় একই দৃশ্যের অবতারণায়
শুরু হতে শেষ 
আরও একটু যেন বেশি কাছে !

তা বেশ, তা বেশ !
কিন্তু কতদিন আর
ডাল মাখা ভাত
ভীষণই নূতন স্বাদের মনে হতে আছে ?

উল্লম্ব অপর পথটি 
যদিও চড়াইয়ের কষ্টের ডাক,
তবে সে পথ
খোদ প্রেমকে উত্তরণে ডাকে
নিজেদের ছাড়িয়ে,
মানুষ যখন পরিযায়ী হতে শেখে -
সম্পর্কের ক্রমবিকাশে,
হৃদয়ে - শুদ্ধ আত্মবিশ্বাসের সাহসে,
স্বাধীনতার বরে,
সম্পূর্ণরূপে তৃতীয়
সুন্দরতর কোনও জগৎ- এর
প্রত্যক্ষ আবিষ্কারে,
প্রতিনিয়তের বিবর্তনে,
ক্রমশই আপন তরুণতরকে
আপনে ঈশ্বর-রূপে
জন্ম দিতে পারার অগাধ আশ্বাসের
শ্বাসে শ্বাসে !

আর যে অলস-রা আটকে পড়েছে 
মূলতঃ অনুভূমিকে,
তাদের নিয়তি 
শেষ অবধি সমানতালে
বাধ্য হতাশা-দীর্ণ হতেও আছে !
.

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০

প্রাণস্তত্ত্ব

ভীষণ ব্যস্ত জীবন সে এক
ঝলোমলো 
সবই যেচে জানাতো - সে যে
ভীষণ ভালো !

ভাল সে তো ছিলই সদা 
সর্বদিকে
সে হাসির বাঁশি জনে জনে মনে
পুষেই রাখে ৷

শিল্পী যেহেতু ছিলও সে সমানে
পরাণ ভরে
শিল্প অগত্যা পরাণ আঁকলে
কি আর করে ?

গানগুলি তার গান ছিল না
ধ্যান ছিল যে
আপন গোপনে সুরের শরে
উঠতো বেজে !

সে স্বর দোলা জাগাতো যার
অন্তরেতে
খুঁজো না তাকে ! পাগল ব'লেই না
উঠতো মেতে !

রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

টান

এক যে আছে তেপান্তরের মাঠ,
কিচ্ছুটি না বলে, সকাল হলেই,
সন্তানের মত
রোজ এসে সেঁধিয়ে ঢুকে পড়বেই
আমাদের ঠিক মাঝ বরাবর !

আমাদের উতলে তখন
দূর হতে
বাধ্য হাতছানিটুকুই ভরসা !

ক্রমে ক্রমে সয়ে এলে,
মাঠ তারপরে আদুরে অভিমানে বলে -
"ছানি যে আজও পড়েনি ভালোবাসার চোখে
সে প্রমাণের দায়টি 
আর কে নেবে এমন করে বল ?"
.

শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২০

আশ্রম

সে সময়টি এককালে ছিল ৷
এখন উঠেই প্রায় গেছে ৷
মহৎ সঙ্গীত-শিল্পীরা 
দশক অতিক্রান্ত নাড়া বাধতেন 
সুরের সাধনে গুরুর কাছে !

বিবাহকে নাড়া বাঁধাই মনে হয় আজও -
একের সুর অপরের শিক্ষায়,
শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার বিকল্প-শূন্য সহযোগে,
যুগলবন্দীর শিক্ষায় !

ছাত্র - প্রকৃতই হতে পেলে,
সম-পরিমানে ইচ্ছুক হলে,
সম্পর্কও প্রাপ্ত-বয়স্ক হতে জানে
সময়ের সাথে !

আত্মপ্রতারকের অন্ধত্বে অভিশপ্ত এ যুগ !
তেমন আঠেরোটি বছর
একে একে পেরিয়ে গেলে, 
তারপরে, বুকে হাত দিয়ে,
হতাশের হূতাশনে
বলুক তো একজনও
"শিক্ষা - শেষ অবধি বিফলে গেছে" ৷

সোনা-মন

নিজে দেখিনি কখনো,
তবে লোকে বলে -
অজগর খাদ্যের দিকে তাকালে
তার দৃষ্টিতে থাকে
সত্যিকারের ভালবাসার জাদু,
যা, খাদ্য প্রাণীটিকে এতই নিশ্চিত করে,
যে, সে নিজেই নিকটস্থ হয়ে
সাপের মুখে আশ্রয় খোঁজে !

মানুষও মানুষকে ভালবাসলে
না জেনে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে,
তাকে কোন না কোন ভাবে
গ্রাস করে
পুরোপুরি আত্মস্থ করতে চায় 
সুযোগ যোগে পেলে ৷

বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২০

প্রশ্ন

সারা পৃথিবীর মধ্যে
সুন্দরতম জাতির নামটি বাঙালি,
এ আত্ম-শ্রদ্ধার বিরল সুবাস
বিশ্বাসের সুগভীরে 
তার কি সদা-সর্বদা জাগ্রত থাকে ?

জীবনকে, সুখ, দুঃখ ও দায়িত্বের
প্রতিটি পদে পদে,
কি ভাবে, একমাত্র সুন্দরের শর্তে
নিরন্তর যাপন করতে হয়,
সে শিক্ষাটি, আপন জীবনে,
এক যে ছিলেন অবিরাম মহামানব, 
আ মরি বাংলা ভাষায়, থরে থরে
উজাড় করে দিয়ে গেছেন

আমাদের নির্বিশেষে রবীন্দ্র-ধন্য হতে চাওয়া
আর পারার গর্বিত উত্তরাধিকারে,
মায়ের পরাণ-স্পর্শী ডাকে ?

মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০

সম্পর্ক

মানুষ তো অনেকই এলো গ্যালো,
একবার পাখিকে ভালবেসে
বাড়ি নিয়ে এসো !
ভালবাসলে খাঁচার পোষ্য করবে না তাকে,
বরং স্বাধীনতা দেবে,
অধিকতর মুক্ত বিচরণের অধিকার ৷

সে ভরসাটুকু পেলে
ঘরের সাথে বনকে জুড়ে
তাঁতি ওমনি তাঁত বুনতে লেগে যাবে !
শস্যদানা আহরণ শুরু হবে !
দিনের শেষে হিসাব মিলাতে গেলে
দেখবে একা তার নয়,
ভাগে কম পড়েনি এতটুকুও তোমার !

তবে মুখের কাছে পেলেও
অভিমানীর অপেক্ষা জেগে রবে
স্নেহ ভরে, তোমারই হাতে,
চামচটি তার ঠোঁটে বাড়াবার !

তারপরে, ক্লান্ত তার - প্রবল ঘুম পাবে !
সে কী ছটফটানি,
দাঁড়ের এ প্রান্ত হতে
বেদম হতে হতে 
ও প্রান্ত অবধি অবিরত তাড়ার !

তুমি তো রাক্ষস-সম তার তুলনায় ৷
তোমার হাতের একটি মাত্র ভুল চাপ
যে কোনও মুহূর্তে 
মরণকেও ডাকতে পারে তার ৷

তবে, নরমকে 
সাবধানে কাছে টেনে নিলে
যাচিত আশ্রয়টি পেয়ে গেলে
তুমিও জানতে পাবে
পাখিও কেমন তালে নাক ডাকে,
কোটরটি মিলে গেলে
আত্ম-অপরিচিত 
অপার হৃদয়েতে তোমার !

ঈশ্বর মালটাকে 
হাতি ঘোড়াই ভেবে গেলে আজীবন !
একবার পাখিকে ভালবেসে দেখো,
চিনতে পাবে
সততঃ বিশ্বাস আর নির্ভরের নির্ভার ৷

মস্তক বনাম হৃদয়

"আমি অতীব উৎকৃষ্ট আর
তুমি গর্হিত নিকৃষ্ট !"
অহমিকার 
এই একটি অবশিষ্ট প্রমাণই 
আমরণ অভীষ্ট !

পরিণামে 
প্রতিযোগিতার উপযোগিতা না পেয়ে,
সমানতালে না তেড়ে গিয়ে,
প্রণত
এখনো মৃদুহাস্যে স্থির উপবিষ্ট ?

( আরে শ্লা, বৃহন্নলা নাকি ? )
রইবে তথাপি শান্ত-শিষ্ট ?

সোমবার, ১ জুন, ২০২০

বিস্ময়কর

ভালবাসা 
যুক্তি তর্ক বোঝেনি কোনদিন ৷
ভালবাসা 
"করতে হয়" আর "করতে নেই"-দের
তফাৎ চিনতে পারে নি তখনও !

তবুও, কি করে জানি,
অনুভবের তীব্রতরতায়
সত্যকে সে প্রতিবারই ছুঁয়ে দেয়
আর মিথ্যারা 
বুকে ঠাঁই পায় না তার 
শেষ অবধি কখনো !