'মানিব্যগে রাখা টাকার গোছ ঘন-ঘন কমতে থেকে, একসময়ে, অবধারিত শূন্যে মিলাতে চায়' - এ সমস্যা বোধহয়, কম-বেশি, সকলেরই । মাঝেমধ্যেই আবিষ্কার করি ব্যথিত পরাণে, আমাকে অবাক করে, কখন যেন তিনি ফের খালি হয়ে বসে আছেন ।
অথচ এটিএম এর সুবিধা নিয়ে যে, তৎক্ষণাৎ বিপদ সামলে নেব, তার আবার অন্য সমস্যাটি হলো - "পাঁচশো টাকার খুচরো নেই" ।
এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে, একটা বাফার সেভিংস এর কথা মাথায় এল কয়েক বছর আগে । মোবাইলের কভারের ফ্ল্যাপে তৎক্ষণাৎ দুটো একশো টাকার নোট ভরে রেখে দিলাম । সে টাকা যে বেশ কয়েকবার অসময়ে পরিত্রাতার ভূমিকা পালন করে নি, এমনও নয় ।
তবে এই বিষয়টি কবে যে আমার চেতনার স্তরে পরিবর্তন এনেছিল একটু একটু ক'রে, সে কথা খেয়ালে ছিল না । দীর্ঘদিন ঐ দুটো একশো টাকার নোটে হাত পড়ার আগেই মানিব্যাগ ভর্তি হয়ে যেত আবার ।
অবশ্য, অন্য সব প্রয়োজনীয় কাগজের ফাঁকে ঢুকিয়ে রাখা একশো টাকার নোট দুটো, বাধ্য হয়ে, মাঝেমধ্যেই প্রায় জোর করে, অন্য কাগজদের সাথে বেরিয়ে এসে, "আমরাও আছি"-র মরীয়া জানান দিত । যতবার এরকম করতো, আমিও বিশেষ-রূপে বিরক্ত হয়ে, একপ্রকার জোর করে ফেরৎ পাঠাতাম তাদের জন্য নির্ধারিত ফ্ল্যাপের অন্ধকার ডেরায় । এভাবে কাটছিল, খুব সম্ভবতঃ এক বছরের বেশি ।
এবছর লক্ষ্মীপুজোর পরদিনই আচমকা পুরোনো পরিস্থিতি আবির্ভূত হলো ফের । সকালে, মাছের বাজারে, মাছ কিনতে কিনতে, মানিব্যাগের টাকা হাতবদল হতে হতে, ফুরিয়ে গেল একসময়ে । আর সব ধরণের মাছ কেনা হয়ে গেলেও, আমার লোলুপ নজর তখনো আটকে লইট্যা মাছে । খেয়ালও পড়ে গেছে মোবাইলের ফ্ল্যাপের গচ্ছিত উদ্ধারকর্তাদের কথা । ফলতঃ, এক কিলো লইট্যা কেটে দিতে বলে হাত বাড়ালাম মোবাইলে । আর সব কাগজের সাথে যথারীতি বেরিয়ে এল নোট দুটো ।
নোটের ভাঁজ খুলতেই, লক্ষ্য করলাম দুটোর একটা, কখন ছিঁড়ে, অচল হয়ে বসে আছে অদ্ভুতভাবে, বেখেয়ালে অন্য কাগজ টানাহ্যাঁচড়া করতে গিয়ে । "এবার কী হবে" - ভেবে 'থ' হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, অবধারিত অপরাধবোধে । মন সেইফাঁকে পৌঁছে গেল এক অনাস্বাদিত বিষাদে ভারাক্রান্ত অসহায়তার জগতে ।
দীর্ঘ অবহেলার ভার সইতে-সইতে, একসময়ে আর না পেরে, জীবনের কাছে বাধ্য হেরে গিয়ে, কোনও মানুষের পরাণও, একসময়ে, এভাবেই ছিঁড়ে গিয়ে, অকেজো ও পরিত্যক্ত হয়নি তো, আমার অজ্ঞাতে, আমারই দ্বারা, চিরতরে ? কেবল যুক্তিবুদ্ধির মনটুকু সম্বল করে পঙ্গু-যাপন করে না মানুষ, এমনটা হ'লে, যখন ইচ্ছে-রা শুকাতে শুকাতে একপ্রকার মরেই যায়, আবেগে সাড়া না পাওয়ার কারণে আর্দ্রতা-বঞ্চিত পরাণে ? বেখেয়ালে ঘটে না অঘটন ? মানুষ কি অপর হৃদয়ের যত্ন সবসময়ে ঠিকঠাক নিতে পারে ? সব অপরাধী কি অননুভব-জনিত অপরাধ সজ্ঞানে করে ? তেমন বিশেষ ক্ষেত্রে, পাপীজনশরণপ্রভুও কি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন অক্ষমকে ক্ষমা করার বিরোধে ?