বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০২২

ভঙ্গুর

শাশ্বতে - সত্যের একমাত্র অধিকার ।
অথচ মিথ্যাকে বহু যতনে লালন করেছ,
নিজের থেকে বড় করে, তিলে তিলে,
পরমুখাপেক্ষী তোষামোদে ও স্বীকৃতিতে ।

তথাপি সে চিরন্তন ভঙ্গুর ।
ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ে যাবে
কাচের মত
একটিমাত্র সত্যের আঘাতে 
আর তার সাথে
অপমানে নীল হতে হতে
আচমকা অশ্লীল নগ্নতায় ককিয়ে উঠবে 
এ যাবৎ লুকিয়ে রাখা দুর্বলতারা তোমার,
যখন পারবে না প্রতিরোধ করতে
দুঃখ আর হতাশাকে,
যখন দেখতে হবে কেবল দূর হতে 
অসহায় দৃষ্টিতে -
যে আত্মবিশ্বাসে
কখনো প্রশ্রয় পায়নি অহমিকা,
তার নেই এমনতর অক্ষমতার দায় ।

সোমবার, ২১ মার্চ, ২০২২

শক্তি

প্রতিটি মানবজনম যে শক্তি-সম্পদ সহ ধরায় অবতীর্ণ হয়, 

তার মধ্যে স্থুলতমটি হলো তার শরীর
যার নিয়মিত ক্ষুধা-নিবৃত্তি শ্রেষ্ঠতম তৃপ্তির মূল লক্ষ্য ও শর্ত।

শরীরের চেয়ে সূক্ষতর ও বৃহত্তর শক্তির উৎস হলো মানুষের মস্তিষ্ক-সম্ভূত যুক্তি-বুদ্ধি, বা তার মন । মন সর্বপ্রকারের চিন্তা ও কল্পনাশক্তির কারক । মনের দ্বারা মানুষের তাবৎ বিদ্যালাভ । মনের লক্ষ্য হলো নিজের ও পরের উপর কর্তৃত্ব-অর্জন এবং তার দ্বারা পার্থিব সম্পদ ও সুখের আহরণ ও সম্ভোগ। মন মানুষের আমিত্ব বা অহমিকার ধারক ও বাহক । মানুষের মন আপন অর্জন-জনিত দম্ভের লালন করতে দক্ষ - যে কোনও প্রকার প্রতিযোগী পরিস্থিতিতে ।

মনের অপেক্ষা অধিকতর শক্তি ও সূক্ষতার ধারক মানুষের প্রাণ বা পরাণ অথবা হৃদয় । পরাণের বিশেষ সামর্থটি হলো তার অনুভব-দক্ষতা । বিদ্যা অপেক্ষা বহুগুণে সার্থক সত্যনির্ণয় সম্ভবপর অনুভবের দ্বারা । মানুষের বুদ্ধি যেখানে, সত্যের মত, মিথ্যার সাথে সাথ দিতে সমান পারগ, সেখানে মানুষের পরাণ বা হৃদয় কেবল সৎ ও সত্যের সাথে সাথ দেওয়ায়, বুদ্ধি অপেক্ষা প্রবঞ্চকতাহীন ও যে কোনও প্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিক নির্ভরযোগ্য ।

তবে, হৃদয়বৃত্তির উপযোগিতার নিয়মিত প্রয়োগে মানুষ চিরকালই বহুল পরিমানে অপারগ, বুদ্ধিবৃত্তির বিপরীতমুখী কারকতার কারণে । মস্তিষ্ক-চর্চার উপায়টি যেখানে অর্জন-জনিত আমিত্বের বিকাশে, সেখানে হৃদয়-চর্চার উপায়টি নিহিত ভালবাসার কাঙালপনায় । যে যত বেশি ভালবাসায় কাঙাল বা সমর্পণ-প্রবণ, সে তত অধিক হৃদয়-সামর্থের অধিকারী । 

এই সত্যটি মূলতঃ সাধারণ মানুষের জ্ঞানের অগোচরেই থেকে যায় ব'লে তারা মূলতঃ বুদ্ধি-প্রসূত অহমিকার দ্বারাই আজীবন পরিচালিত হয়ে থাকে । 

অনুভব-বিজ্ঞানের কার্যকর প্রয়োগের জন্য, তাই, বিদ্যার সম্ভার - পৃথিবীর যাবতীয় পুস্তক-সামগ্রীর পরেও মানুষের প্রয়োজন পড়ে আধ্যাত্মবাদের শিক্ষার । 

এই কারণে সর্বকালে, সব মহামানব, বিদ্যাজনিত অহমিকার মায়া ত্যাগ করে, উত্তরোত্তর আরও বেশি হৃদয়ের কাঙালপনার পথটি সাগ্রহে গ্রহণ ক'রে, আমাদের সাথে বুদ্ধি অপেক্ষা মহত্তর অধ্যাসটির পরিচয় ঘটান ।

আর এই সেই কারণ, যার জন্য আমাদের রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব বলে সম্ভাষণ না করে আর কোনও উপায় থাকে না ।
.

শনিবার, ১৯ মার্চ, ২০২২

টান

শরীর ছুঁলেই কি প্রেম হয় ?
তেমন যে নাও হতে পারে ।
প্রাণ যদি আকুলে না ডাকে
কর্ষণ হেরেই যেতে পারে ।

অনেকই দূরেই রয়েছ তবু
উল্টো কখনও হতে পেলে
উভয়েরই সাড়া যদি বাড়ে
হৃদয় উতল হওয়ার কালে

ছোটছোট প্রতিটি সুযোগে
পরষ্পরের অনুভবটি ছুঁলে
হৃদয়ের এমনই জাদুটোনা
অটুট বাঁধন ধরাতে মেলে ।

শুক্রবার, ১৮ মার্চ, ২০২২

The Fallacy

Everybody dreams to relate
In such a way that
There remains no void.

But for that
Knowing each other almost completely
Seems to be a must,

After attaining which
Romance has to die
For no newness being left 
To explore further between.
Thus each, to the other, 
Turns into a book already read.

While by better understanding 
Of each other
The reliability in mutual friendship 
Becomes certainly high.

নিষাদ

ভালবাসলে সুদূরের পথ পেরিয়ে
কাছে আসার অধিকার আসে ।
অধিকার জাগে 
দৌড়ে এসে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ার ।

ভালবাসার সরলতাকে মর্যাদা দিও ।
পরাণের ডালা খুলে
আপন কোমলতার সম্পদটিকে 
প্রথমবার এমন আকুতি ভরা নিবেদনে
পূর্ণ নিরাভরণ করেছে সে 
বক্ষ-চরণে তোমার ।

সমর্পিতাকে 
উদার অভ্যর্থনায় স্বীকার করো ।
অসহায়তার সুযোগ নিয়ে
কিছু-না-কিছু ধূর্ত শর্তের শরে
অথবা অভিযোগে শিকার করো না ।
.

বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০২২

মুখোশের আড়ালে

দ্রুত স্বার্থসিদ্ধির অভাবে
যারা একটুতেই হতাশ ও বিরক্ত হয়

অপরের ইচ্ছার স্বাধীনতাকে
মুঠোর মধ্যে বন্দী করে
আপন সুবিধাবাদী অধিকার 
প্রয়োগ না করতে পারলেই 
যারা কটু সমালোচনায় বিদ্ধ করে

যারা তাৎক্ষণিক লাভ এর গূঢ় লোভে
"চাটো", "চোষো", স্তরের
এক এর পর এক
আপোষী সম্পর্ক রচনা করে

যারা আপন কোপন স্বার্থে
পরের গোপন বিশ্বাসঘাতকতাকে
শৈল্পিক বাহবা সহকারে
আড়ালে প্রশ্রয় ও উৎসাহ দিয়ে চলে

আবেগের ব্যবসা ফেঁদে বসা
পরজীবী প্রবৃত্তির 
সেই দুমুখো ঘুণপোকারা
মানবজীবনে
স্থায়ী উত্তরণ ও শান্তির প্রতীক নয় ।
.

বুধবার, ১৬ মার্চ, ২০২২

অবগুণ্ঠন

পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চাও
যে বাঁধন-রা
আটকে রেখেছে নিঠুর অনধিকারে
এযাবৎ নব-জনম তোমার ।
একবার অন্তত উঠে দাঁড়াতে চাও
ভেনাসের পবিত্রতার মুক্তিতে ।
জমিয়েছ থরে থরে বারুদের স্তুপ
একদিন নিজের আগুনে
নিজে পুড়ে যাবে ব'লে।

দেশলাই খুঁজতে বেরোও,
পৌছাও প্রতিবার সেই মানুষটির কাছে
যার হাসি, কি করে যেন,
প্রতিটি ঠিকানা ঠিক-ঠাক চেনে
যেখানে সৎকারের মাঝে
বিবশ আত্মসাক্ষাৎকার বাসে ।

আগমনী

দরজা খুলে ডেকে নিও তাকে
কখনো সখনো
যদি নৈঃশব্দ্যের ফাঁকে 
আলতো ক'রে কড়া নাড়ে এসে,
একবার ভিতরে আসতে চায় ।

সে এসেছে 
তোমাকে আপন গভীরে নিয়ে যেতে,
খুজে দিতে মুক্তির আলয় 
যখনই তুমি পরাণের নগরপ্রান্তে 
বেদম একা ও নিরুপায় ।

জীবনের গভীরতর সত্যদের 
অখণ্ডে চিনাতে পারে ব'লে
বিষাদ-রা পরাজয় নয় ।
.

সোমবার, ১৪ মার্চ, ২০২২

আপোষহীনতা

একটি কার্য সুসম্পন্ন করা
মানে পরবর্তী ধাপটি গড়ে ফেলা ।
আপন গড়া ধাপে পা রেখে
ক্রমশঃ উঠে যাওয়া বিনা
উন্নতির পথে 
অগ্রগতির উপায় নেই আর ।

যোগ্যতা ও অর্জনকে
স্থায়ী উচ্চতায় ঠেলে উঠিয়ে দিয়ে
প্রসারণের নির্ভরযোগ্য সিঁড়ি
অপর কেউ গড়ে দেবে না ব'লে
শুধুমাত্র তোমাকেই দরকার ।

অপ্রতিহত চারণ 
সাবলীলতার পথ খুঁজে পায়
"ধৈর্য আর সহনশীলতা"
এই দুটি বিনম্র গুণের ভরসায় ।

জীবনের হাতে সময় অধিক নয় ।
তোমার ভবিষ্যৎ
আপন বর্তমানকে তাই
কঠোর নিষ্ঠায় নিয়মানুবর্তী চায় ।

রেসকিউ

মুকুরটি একমাত্র জানে,
ভরন্ত দুই বুক জুড়ে
এক সমুদ্র 
কোমল হৃদয় মেয়েটার
ভরে গেছে টইটুম্বুরে 
ভালবাসার ভারে ।

কুলোবে না গ্রহীতার আধারে ।
পালিয়ে গেছে অযোগ্য প্রেমিক
জলের প্রবল তোড় দেখে
ভয়ে "বাপরে" ব'লে ।
কি হবে এবারে ?

ফেরার দিশা 
চেনে না একলা মেয়ে ।
অমানিশা, সুবর্ণ সুযোগে, 
অবলার তৃষাকে 
শিউরে ওঠা হাতছানিতে 
নিবারণে ধরা দিতে
ক্রমাগত সোহাগ উজাড় করে ।
.

Worth

Time is the only given opportunity
For purposeful earning 
Of aptitudes and skills
And thus,
Higher value as a man.
Proper utilisation of time
Is, therefore, the only Life-Art.

You can still prefer
To stay basically non-creative
For most of the hours 
And relax
Or hover aimlessly
In your comfort zones
Or keep criticising others

And let Life 
In the form of Time
Only slip permanently of you
Like various waves of fart.

রবিবার, ১৩ মার্চ, ২০২২

পরাজয়

"ভালবাসা মানেই যে যৌনতা নয়"
এ তথ্য জানার সুযোগ আসেনি তার
সৌভাগ্যের চরম শিখরে ।
বরং 
"যৌনতা মানেই যে ভালবাসা নয়"
এই অভিজ্ঞান বিদীর্ণ করেছে তাকে
অহরহ প্রকারান্তরে ।

ভোগীর লোভ 
সুখকে খুঁজেছে আজীবন 
ভালবাসা ও যৌনতার কাল্পনিক সুসমন্বয়ে ।
ভ্রান্ত অভিমানের প্রতি বঙ্কিম তিরস্কারে
ভারসাম্যহীনতা
বিনিময় নিয়ন্ত্রণের নগ্ন অনধিকারে
সদ্ব্যবহার করে গেছে 
প্রতারণার প্রতিটি সুযোগের

যখন, যুগল - অপর পারে
সংযম-সুধায় আপ্লুত 
নিখাদ ভালবাসার ভোরে ।

যন্ত্রী বনাম যন্ত্র

মানুষ বড় বেশি ভুল করে ।

স্রষ্টা হাতটি বাড়িয়ে রাখেন
পিতার অধিকারে
প্রতিটি মানুষের বিবেকের পরিসরে ।

মানুষ অবহেলা করে 
উত্তরণের সে দিশা -
প্রতিনিয়ত বুদ্ধি-যন্ত্রের অহঙ্কারে ।
ভোগে প্রাণান্তকর
নিয়তির অযাচিত নিপীড়নে,
নির্বোধের সম্যক প্রমাণে ।
আক্ষেপে আক্ষেপে
জীবনকে পদে পদে হারে ।

স্রষ্টা মৌন অপেক্ষায় সেদিনও
হৃদয়ের অকৃপণ দ্বারে ।

মানুষ বড় বেশি ভুল করে ।

সোমবার, ৭ মার্চ, ২০২২

বিপর্যয়

বিয়ের পরে বয়ে গেছে একে একে আঠাশটি বছর । কিংশুকের মন বয়সের ভারে আজও হিংসুক হতে তো শেখেইনি, বরং রস ঘন হতেই চলেছে যৌবন পেরোলেও । আজ বিবাহবার্ষিকীর ভোরে রমলা ঘুম থেকে ওঠার আগেই মেসেঞ্জারে একটি দুষ্টূ মেসেজ লিখে, হাসতে হাসতে, সেন্ড করে রেখেছিল, সময়মত রমলা ঠিক পড়ে নেবে ব'লে ।

আজ রবিবার । বিকেলে কিংশুকের ঘুম থেকে ওঠার আগেই রমলা বাইরে বেরিয়েছিল । গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রবল ব্যস্ত সে, টুটুনের বিয়ের বাজার নিয়ে । টুটুন ওরফে সমর্পিতা ওদের একমাত্র কন্যা । এম ফিল ক'রে, গতবছরে লেকচারারের চাকরি বাগিয়ে নিয়েছে শহরের ভাল কলেজে । টুটুনের উড-বি বিপ্রতীপ ছয় বছর হলো ভাল চাকরি করে সফ্টঅয়ার কোম্পানিতে ।  আর ঠিক আট দিন পরে বিয়ে ওদের ।

রমলা ফিরলো রাত সাড়ে আটটা নাগাদ । দরজা খুলতেই তার মুখে উজ্জ্বল হাসি । হাতে একটি সুদৃশ্য মোড়কে ঢাকা লম্বামত একটি উপহার । কিংশুকের দিকে সেটা বাড়িয়ে দিয়ে, তারপর আবেগঘন স্বরে ব'লে উঠলো "শুভ বিবাহবার্ষিকী, মিস্টার কিংশুক মিত্র ।"

কিংশুক কিন্তু খুব জোর থতমত খেয়ে গেল । রমলা জানলো কি করে তার মনের গভীরতম ইচ্ছাটি ? প্রবল সখে, ষোলো বছর বয়েস থেকে, যত্ন করে এসরাজ বাজাতে শিখেছেলো সে । তার এই সখের ভালোবাসাটিকে সে প্রথম জানতে দিয়েছিলো রমলাকে ফুলশয্যার রাতে, প্রথম আদরের পরে । গভীর সে রাতে রমলা তন্ময় হয়ে শুনেছিল বাজানো তার । বাজানো শেষ হলে অনেকক্ষণ বেড়ালের মত মুখ ঘষেছিল কিংশুকের বুকে । চাইছিলো হয়তো নির্ভরতাকে আরও বেশি ভাল ক'রে বুঝে নিতে ।

এসরাজটি তারপরেও বেজেছিল আরও দীর্ঘ বাইশ বছর । তারপরের বর্ষায় আচমকা একদিন কিংশুক আবিষ্কার করলো যে তার সখের যন্ত্রটি বেদখল হয়ে গেছে । দুটি ইঁদুর এসরাজের বাক্স কেটে, এসরাজের কাঠ বিসদৃশ ভাবে অনেকটা খেয়ে ফেলে, তার মধ্যে প্রভূত সন্তান-সন্ততি সহ সুখের বাসা ফেঁদেছে । কভার সামান্য ফাঁক করে, ভিতরের সুখের সংসারকে নেচে উঠতে দেখেই, আর বিরক্ত না করে, একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, পুরো এসরাজটিকে আলতো করে নামিয়ে রেখে এসেছিল গ্যারেজের এক কোণে ।

তারপরে বহুবার ভেবেছে কিনবে নূতন আর একটা, কিন্তু ইতিমধ্যে দাম বেড়েছে প্রায় বারো গুণ । ইচ্ছা থাকলেও সখ পূরণ তাই হয়ে ওঠেনি আর নতুন করে ।

আজ এত বছর পরে, মেঘ না চাইতেই জল দেখে, জল আর বাঁধ মানলো না কিংশুকের চোখের কোণে । রমলা অবশ্য আগেই পাশের ঘরে চলে গেছিল ব'লে খেয়াল করেনি সে আনন্দাশ্রু তার ।

আবেগের বিহ্বলতা কেটে গেলে, কিংশুক আর অপেক্ষা করতে না পেরে, একটা একটা করে খুলতে শুরু করলো মোড়কের সেলোটেপ । পুরোটা খোলা হয়ে গেলে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো এসরাজের নূতন বাক্সটি । চামড়ার খাপের উপরে পালিশের গন্ধ বুক ভরে টানলো কিংশুক । একটু হালকা লাগছে যেন ওজনে ।  ঢাকনাটি খুলতেই পাথর হয়ে গেল কিংশুকের চোখ, অপ্রত্যাশিত অপমানে । প্রথম দৃষ্টিতেই চিনতে পারলো বাথরুমের পাশে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মুড়ো ঝ্যাঁটাটিকে ।

কিংশুক ভোরে যে ম্যাসেজ টি করেছিল, সেটি হলো - 

"তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে রমলা, তোমার যখন সাত বছর বয়েস, তখন রাখীপূর্ণিমার সকালে মায়ের হাত ধরে এসে রাখী পরিয়ে গেছিলে তিন বছরের বড় কিংশুক দাদাকে । আমার মা কোলে টেনে নিয়ে লাড্ডু খাইয়ে দিয়েছিল তোমাকে ।

সেই তুমি সতেরো বছর বয়সে আমাকে হতবাক করে, একদিন বিকেলে, আমার পায়ের কাছে প্রথম প্রেমপত্র ছুঁড়ে দিয়ে একছুটে পালিয়ে গেলে । তুমি ভিতরে ভিতরে কতটা বড় হয়ে গেছো মাঝখানে, সেদিনই প্রথম জানলাম আমি । তার আবার ঠিক পাঁচ বছরের মাথায়, হৈ হৈ করে ঘরে ঢুকে পড়ে, দিল্লী কা লাড্ডু আশ মিটিয়ে খেতে, আমাকে এযাবৎ বগলদাবা করে নিলে । 

অথচ কি পবিত্র চিত্তে আমাকে প্রথম রাখীটি পরিয়েছিলে ! বলছিলাম কি, আমাদের টুটুনও তো চললো এবার দিল্লী কা লাড্ডু খেতে । আমাদের তো অনেকই হলো । সামনের রাখীপূর্ণিমায় আমাকে আবার রাখী পরিয়ে এ জীবনের মত লাড্ডু খেয়ে পস্তানোর ঝামেলা মিটিয়ে নেবে ? অতঃপর পবিত্র জীবন কাটাবো দুজনে !"

~~~~~~~~~~~~~~~

না । কিংশুকের হাতে উপহারটি ধরিয়ে দিয়ে রমলা পাশের ঘরে যায়নি । কিংশুকের বিহ্বলতার সুযোগের সার্থক সদ্ব্যবহার করে, টেবিল থেকে কিংশুকের সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে আর ঠাকুরের আসন থেকে দেশলাইটি নিয়ে, নিঃশব্দে এসে বসেছিল বারান্দার স্ল্যাবে, ঠিক সেইখানে, যেখান থেকে পর্দার ফাঁক দিয়ে কিংশুকের প্রতিটি অভিব্যক্তি অনুসরণ করা যায় ।

রাখী চেয়ে, এসরাজের বাক্সে মুড়ো ঝ্যাঁটা পেয়ে, কিংশুকের পাথর হয়ে দীর্ঘ দাঁড়িয়ে থাকা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলো সে দম বন্ধ করে । আত্মবিশ্বাসের হাসি ক্রমশঃ চওড়া হলো ঠোঁটে তার । এবার সিগারেটটি ধরিয়ে সুখের দীর্ঘ টান দিল রমলা, আকাশের তারাদের দিকে দৃপ্ত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে । অপারেশন সাকসেসফুল ।

সে জানে, আর একটিও কথা বেরোবে না কিংশুকের মুখ থেকে । যত কথা বেরোবে না, তত বেশি পাথর হতে থাকবে পুরুষের পৌরুষ, নিঃশব্দে ভিতরে ভিতরে । তারপর রাতের আলো ঘরে নিভলেই, গুলি খাওয়া বাঘ অবধারিত ঝাঁপিয়ে পড়বে প্রতিশোধ নিতে । আর পুরুষ যত প্রবলতর ভাবে প্রতিশোধ নিতে যাবে, নারী ততই উঠে যাবে, তল হারাতে হারাতে, সুখের মাতাল করা উত্যুঙ্গে, এমনকি ফুলশয্যার প্রথম অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে, অবশ্যই তীব্রতায় আরও বেশ অনেকটা উপরে ।

রমলার মুখ থেকে, বারংবার বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার রিং রা, আকাশের অন্ধকারে হারানোর ফাঁকে, ফিসফিসিয়ে, একে অপরকে বলতে বলতে গেল -  "যে নারীরা, পুরুষকে, আপন ইচ্ছানুসারে হুবহু পরিচালিত ক'রে, জীবনের ব্যাকুল অভীষ্টদের সিদ্ধ করে নিতে অপারগ, সে হতভাগিনীদের আর গ্রহীতা-জন্ম সার্থক কি প্রকারে ?"

রবিবার, ৬ মার্চ, ২০২২

ফেরো

হৃদয় একমাত্র
প্রতারণা করে নি
কখনও । প্রবঞ্চনা
যার অনুপান
সে বিপথের নাম 
তার চির-অচেনা ।

অতীতের 
অভিজ্ঞতায় সৃষ্ট
প্রতিটি মন
স্বচালনক্ষম
একটি যন্ত্র
,
আপন অবচেতনে
প্রবল কার্যকর
একটি কম্পিউটর
প্রোগ্রাম মাত্র,
যে - 'যতটা ভাল
ততটাই মন্দ',
উভয় দিকেই
সমান আগ্রহী,
অথচ যার 
যে কোন ক্ষেত্রে
সত্য নির্ধারণের
পথটি অজানা ।

মানুষের মন তার
ইচ্ছা হতে পৃথক,
ইচ্ছার আজ্ঞাবহ
ভৃত্যবৎ । ইচ্ছাটি 
তুমি নিজে
হতেই পারো,
তোমার মনটি
তার অধস্তন ।
অধস্তনটি
কিন্তু তুমি না ।

মস্তিষ্ক দিয়েছে বুদ্ধি ।
বুদ্ধি মন কে
দিয়েছে যুক্তি ।
যুক্তির ধার 
দিয়েছে 
উকিলের শক্তি -
'হ্যাঁ' কে 'না' এবং 'না'
কে 'হ্যাঁ' বোঝাতে পারার ।

বুদ্ধিই কুবুদ্ধি হয়ে
মানুষকে টানে
প্রবৃত্তির মায়াজালে ।
প্রবৃত্তিরা সফল হয়
মানুষকে বাঁধতে
ক্রমাগত-হারে
ভোগের প্রলোভনে ।

যুক্তির প্রতারণায়
মনটি তার 
'অহমিকার ভারে
কলুর বলদ'
না হয়ে আর
কোনও উপায় 
পড়ে থাকে না ।
কর্তৃত্বের ধূর্ততায়,
মনের দৌরাত্ম্যে,
অসহায় মানুষ
পায় না খুঁজে - 
সরল দিশা,
আপন পরাণ-বিথি
ধরে এগিয়ে
আলোকময় উত্তরণের ।

পৃথিবীর মানুষের
পরের প্রবঞ্চনায়
যত কষ্ট আর যন্ত্রণা -
তার মূলে আছে
বুদ্ধি ও যুক্তির
নির্মম অপপ্রয়োগ ।

যুক্তিবাদ দিয়েছে
বিদ্যার অহমিকা
আর তার হিসেব
না মেলার জগৎ,
সত্য, - জ্ঞান রূপে,
যে বস্তু-প্রবণ বোধে
অবতরণ করে না ।

স্বর্গাদপি গরীয়সী
বুদ্ধির গরিমার 
প্রগাঢ় অন্ধত্বে,
অসার যুক্তিবাদ,
আপন নিয়তিকে
অবধারিত করে 
তাৎক্ষণিকতার 
অদূরে, ছোট ছোট
লাভের বাজারে, 
নিয়ম করে, নিজেকে
বেচে বেচে বাঁচায়।

হৃদয়ে বিবেকের
অস্তিত্ব ও তাকে
মানব জীবনে
সফল ব্যবহারের
নিত্য প্রয়োজনে,
মাতৃ-প্রতিম
সংবেদী অনুভবের
পর্যাপ্ত উপযোগকে,
ন্যূনতম সূক্ষতার
করুণ দৈন্যে, 
জীবনকে অবধারিত
বাজার ভাবতে শেখা
'বেচারা বেচারাম' যুক্তিবাদ,
আদপে
ধরতেই পারে না।