মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

মেরুদণ্ড

সবচেয়ে কঠিন যে পেশীকে গড়ে তুলতে হয়,
তার কোনো শরীর নেই।
তার কোনো হাড় নেই।
কোনো শিরা নেই।
কোনো এক্স-রেতে সে ধরা পড়ে না।

তবু সে-ই
সবচেয়ে ভারী মহাবিশ্বকে
মানুষের ভেতরে বহন করে।

হৃদয়?
সে তো জন্ম থেকেই
ভাঙা আয়নার ভাষা জানে।
প্রতিটি প্রেমের পর
নিজের রক্ত দিয়েই
নিজেকে আবার সেলাই করতে পারে।

মস্তিষ্ক?
সে এক চতুর জাদুকর।
একটি "কাল"
দিয়ে হাজারটি "আজ"
খুন করতে পারে।
এক ফোঁটা অলসতা থেকে
মহাদেশের সমান অজুহাত ফলাতে পারে।
সে ঘড়ির কানে কানে বলে—
"এখনও অনেক সময় আছে…"

আর সময়
নিজেই নিজের ছায়ায় হোঁচট খায়।

কিন্তু
শৃঙ্খলা—
সে কোনো অঙ্গ নয়।
সে মেরুদণ্ডেরও আগের
একটি অদৃশ্য প্রাণী,
যে প্রতিদিন ভোরবেলা
তোমার ঘুমের কবর খুঁড়ে
তার ভেতর থেকে
আরেকটি সূর্য উদ্ধার করে।

কম্বল তখন
এক বৃদ্ধ জাদুকরী।
সে নরম কণ্ঠে
ঘুমের ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে—
"আরেকটু থাকো…
পৃথিবী কোথাও পালাচ্ছে না…"
বালিশ
তোমার মাথার নিচে
একটি ক্ষুদ্র কবরস্থান সাজিয়ে রাখে।
স্বপ্নেরা
সাদা প্রজাপতির ছদ্মবেশে
তোমার চোখের পাতায়
ডিম পাড়ে।

ঠিক তখনই
শৃঙ্খলা
একটি কালো নেকড়ের মতো
ভোরের কুয়াশা ছিঁড়ে এসে বলে—
"উঠে দাঁড়াও।
সূর্য তোমার জন্য অপেক্ষা করবে না।"
তার জিমনেসিয়ামে
লোহার ডাম্বেল নেই।
সেখানে
ওজন হিসেবে ঝুলে থাকে—
অসমাপ্ত বই,
অপ্রেরিত চিঠি,
না-লেখা কবিতা,
অঘোষিত স্বপ্ন,
আর
গতকালের অপচয়।

প্রতিটি পুনরাবৃত্তি
একটি মৃত নক্ষত্রকে
আবার জ্বালিয়ে তোলে।
প্রতিটি অভ্যাস
সময়ের কপালে
নতুন বলিরেখা আঁকে।

মহাবিশ্ব জানে—
প্রেরণা
একজন ভবঘুরে।
সে আসে,
আবার চলে যায়।
তার কোনো ঠিকানা নেই।

কিন্তু শৃঙ্খলা—
সে একজন যুবক কৃষক।
বৃষ্টি হোক,
খরা হোক,
অথবা আকাশে
মাছের বদলে
পাথর ঝরুক—
সে বীজ বুনতেই থাকে।

একদিন
পাহাড়েরা
নিজেদের উচ্চতা খুলে রেখে
তার সামনে নতজানু হয়।
নদীরা
নিজেদের স্রোত
তার পায়ের কাছে রেখে যায়।
এমনকি সময়ও
নিজের ঘড়ি খুলে
তার হাতে সমর্পণ করে।

তারপর
অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে।
তোমার ছায়া
তোমার আগে হাঁটতে শুরু করে।
তোমার আগামীকাল
গতকালের দিকে ফিরে
হাসে।
স্বপ্নেরা
আর দরজায় কড়া নাড়ে না।
তারা ভাড়া নিয়ে
তোমার ভেতরেই বসবাস শুরু করে।

ভাগ্য
আকাশের দূর নক্ষত্র নয় আর।
সে নেমে আসে
তোমার জুতোর ফিতার ভেতর,
তোমার ঘামের লবণে,
তোমার প্রতিদিনের পুনরাবৃত্তির ক্ষুদ্র শব্দে।

আর তখন বুঝতে পারো—
সবচেয়ে শক্তিশালী পেশী
বাইসেপস নয়।

হৃদয়ও নয়।

মস্তিষ্কও নয়।

বরং
ইচ্ছা
কর্মের
মাঝখানে
নিঃশব্দে বেড়ে ওঠা
একটি অদৃশ্য জীবাশ্ম—
যে
লোহা তোলে না,
পাহাড়ও নয়,
সে তুলে নেয়
অদেখা ভবিষ্যৎ,

আর মানুষের ভেতরে
ধীরে ধীরে
একটি সূর্যোদয়ের
মেরুদণ্ড নির্মাণ করে।

রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

অবাস্তব ও অবাঞ্ছিত

কমিউনিস্টরা অবাস্তব স্বপ্নে জীবন নষ্ট করে। তুমি তেমন বোকা হয়ো না। অন্যকে বদলে দেওয়ার স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানো বন্ধ করো।

অন্য কারও নক্ষত্রমণ্ডল নিজের হাতে সাজিয়ে দেওয়ার অসম্ভব নেশাটি ছেড়ে দাও। ওটা মাতব্বরি ছাড়া আর কিছু নয়।

তোমার হাত আকাঙ্ক্ষার জ্যামিতি শিখেছে বলেই তারারা নিজেদের কক্ষপথ বদলায় না।

তুষারের দিকে হাজার ফুলের নাম চিৎকার করলেও শীত বসন্তে পরিণত হয় না।

অন্যকে বদলে দেওয়ার অলীক আকাঙ্ক্ষার পেছনে দৌড়ানো বন্ধ করো।

ওটা এক অদ্ভুত মেলা, যেখানে আয়নাগুলো মানুষের মুখ গিলে খায়, আর প্রতিটি প্রবেশমূল্য পরিশোধ করতে হয় নিজের হয়ে ওঠার একেকটি অংশ দিয়ে।

"যে অন্যের খাঁচার চাবি বয়ে বেড়ায়, শেষ পর্যন্ত খাঁচাটি তার নিজের চারপাশেই গজিয়ে ওঠে।"

কত জন্ম তুমি কাটিয়ে দিয়েছ অন্যের শিকল পালিশ করতে করতে, যাতে সেখানে তোমার নিজের বন্দি আশার প্রতিচ্ছবি আরও স্পষ্ট দেখা যায়?

কত ভোর তুমি উৎসর্গ করেছ পাখিদের সাঁতার শেখাতে, আর সেই ফাঁকে নিজের ডানাগুলো নিঃশব্দে জীবাশ্মে পরিণত হয়েছে?

মহাবিশ্ব তোমাকে কখনও অন্য কারও আত্মা রঙ করতে নিয়োগ দেয়নি।

প্রতিটি হৃদয় একটি স্বতন্ত্র দেশ।
তার সীমান্ত ভেতর থেকেই খোলে।
তুমি দরজায় কড়া নাড়তে পারো।

তুমি গান গাইতে পারো।

তুমি দোরগোড়ায় রুটির টুকরো রেখে আসতে পারো।

কিন্তু তুমি সেই ঘরের দরজা খুলতে পারবে না, যার মালিক বন্ধ দরজার শব্দেই প্রেমে পড়ে আছে।

"কোনো বীজ কখনও ফুল হয়ে ওঠে না, কারণ পাশের ফুল তার সঙ্গে তর্ক করেছিল।"

এবার ফিরে দাঁড়াও।

একজন অপরিচিত বহু বছর ধরে প্রতিটি আয়নার ভেতর থেকে তোমাকে অনুসরণ করছে।

তার নাম—

তুমি।

সে বছরের পর বছর তোমার নিজের মনোযোগের পরিত্যক্ত রেলস্টেশনে বসে আছে।

তার পাশে একটি পুরোনো স্যুটকেস।

তার ভেতরে জমা আছে—

না-বাঁচা ভোরগুলো,

না-বলা সত্যগুলো,

আর ভুলে যাওয়া সাহসের হাড়গোড়।

তার কাছে যাও।

তার পাশে বসো।

জিজ্ঞেস করো—

সে কেন এতদিন অনাহারে রইল, যখন তুমি সবার ক্ষুধা মেটাতে ব্যস্ত ছিলে, শুধু নিজেরটুকু ছাড়া।

তোমার বুকের খাঁচার ভেতর একটি প্রাচীন অরণ্য আছে।

সেখানে গাছগুলো আকাশের দিকে নয়—

ভেতরের দিকে বেড়ে ওঠে।

তাদের ডালপালা ঘুমন্ত কুয়াশা ভেদ করে পুরোনো ভয়গুলোর শরীরে হরিণের শিংয়ের মতো বিদ্ধ হয়ে আছে।

সেখানে হাঁটো।

পৃথিবী থেকে পালানোর জন্য নয়—

বরং নিজের ভেতরে যে পৃথিবীকে তুমি বহুদিন আগে পরিত্যাগ করেছিলে, তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।

ভেতরের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপ একটি নতুন মহাদেশ—

যার কোনো মানচিত্র আজও আঁকা হয়নি।

"সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা মাইল দিয়ে মাপা যায় না; তা মাপা হয় আয়নার সংখ্যায়।"

নিজের হয়ে ওঠার ভূমিকম্পকে ভয় পেয়ো না।

পাহাড় বলতে আসলে পুরোনো নিশ্চয়তাগুলোকেই বোঝায়—

যারা একদিন হাঁটু গেড়ে বসতে শিখেছে।

তোমার বিশ্বাসগুলোকে সাপের খোলসের মতো ঝরে পড়তে দাও।

আগামীকালের নদীতে চাঁদের মতো তাদের রূপ বদলাতে দাও।

এতটাই সত্য হয়ে ওঠো, যেন তোমার ছায়ারাও বুঝতে না পারে তারা কোন সংস্করণের তোমাকে অনুসরণ করছে।

মানুষ বলবে—

তুমি বদলে গেছ।

হেসে দিও।

নদীকেও বিশ্বাসঘাতক বলা হয়, যখন সে একই জল হয়ে থাকতে অস্বীকার করে।

বিবর্তনের জন্য ক্ষমা চেয়ো না।

ক্ষমা চেয়ো কেবল তখনই, যখন আরামকে নিজের নিয়তি বলে ভুল করবে।

একদিন একটি সকাল আসবে—

যখন তোমার নীরবতা তোমার সব উপদেশের চেয়েও স্পষ্ট ভাষায় কথা বলবে।

তোমার জীবন নিজেই হয়ে উঠবে পরিবর্তনের অভিধান।

কারণ তুমি কাউকে বোঝাতে পারোনি বলে নয়—

বরং তুমি অবশেষে নিজের আত্মাকে জাগতে রাজি করাতে পেরেছিলে বলে।

"জ্বলে ওঠা প্রদীপ কখনও অন্ধকারের সঙ্গে তর্ক করে না; সে শুধু ভুলে যায়, কীভাবে না জ্বলতে হয়।"

তারপর অলৌকিক কিছু ঘটবে।

কোনো নিমন্ত্রণ ছাড়া।

কোনো উপদেশ ছাড়া।

কোনো প্রচার ছাড়া।

কেউ একজন তোমার সাধারণ দিনের নীরব বিপ্লব দেখে

নিজের ভেতরেও পরিবর্তনের প্রথম আলো জ্বালিয়ে দেবে।

তুমি তাকে ঠেলে দাওনি।

তুমি তাকে উদ্ধারও করোনি।

শুধু তোমার হয়ে ওঠা তাকে বিশ্বাস করিয়েছে—

হয়ে ওঠা সম্ভব।

আর তখন তুমি বুঝতে পারবে মহাবিশ্বের সেই প্রাচীনতম গোপন কথা, যা প্রতিটি ঝরা পাতায় এবং প্রতিটি উদীয়মান ভোরে ফিসফিস করে বলা হয়—

কেউ কোনোদিন অন্যের আত্মাকে তাড়া করে পৃথিবী বদলাতে পারেনি।

পৃথিবী বদলায়—

একটি জেগে ওঠা আত্মা থেকে আরেকটি জেগে ওঠা আত্মায়।

আর তোমার হাতে প্রথম যে আত্মাটিকে অর্পণ করা হয়েছিল—

সে ছিল তোমার নিজের।

"অন্যের কাছে অলৌকিকতা দাবি করার আগে, নিজের ভেতর সেই অলৌকিকতায় পরিণত হওয়ার সাহস অর্জন করো। এটাই সুন্দরের পথ।"

শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

উড়ান

সে কখনও আকাশে শুরু হয় না।

তার জন্ম হয় একটি মানুষের নিঃশব্দ সিদ্ধান্তে, যখন সে এক ভোরে নিজের কঙ্কালের ভেতর থেকে শেষ অলসতাটুকু খুলে জানালার বাইরে ঝুলিয়ে দেয়।

মাধ্যাকর্ষণ তখন নিজের কালো আলখাল্লা খুলে একটি আহত পাখির মতো দিগন্তের কোণে বসে কাঁদে।

ভোরকে সবাই সূর্যের জন্ম বলে।

কিন্তু ভোর আসলে মৃত রাতের খোলা করোটি, যার ভেতর থেকে আলো ধীরে ধীরে তার সোনালি মস্তিষ্ক বের করে আনে।

আরও আগে জেগে ওঠো।
এতটাই আগে—
যখন সময় এখনও তার মুখ পরে ওঠেনি,
যখন ঘড়ির কাঁটাগুলো অন্ধ মাছের মতো স্বপ্নের সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়,
যখন ঈশ্বর নক্ষত্রের ধুলো দিয়ে নতুন দিনের কপাল লিখছেন।

জেগে ওঠো—
তোমার নামটি আজকের দিনের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই।
কারণ প্রতিটি নামই একটি খাঁচা।
আর প্রতিটি ভোর তার ভেতরে লুকিয়ে রাখে একটি নামহীন আকাশ।

তোমার বিছানা?
ওটা কখনও বিছানা ছিল না।
ওটা একটি রানওয়ে,
যেখানে প্রতি রাতে স্বপ্নেরা অবতরণ করে,
আর প্রতি ভোরে অসম্ভব ভবিষ্যৎগুলো ডানা মেলে উড়ে যায়।

কম্বলটি আসলে একটি ক্লান্ত মেঘ,
যে হাজার বছর ধরে তোমাকে বৃষ্টি হতে দেয়নি।

অ্যালার্ম বাজে না।
সে চিৎকার করে না।
সে নিঃশব্দে তোমার আত্মার দরজায় একটি অদৃশ্য বিমানবন্দরের বোর্ডিং পাস গুঁজে দিয়ে যায়।

তুমি যদি উঠে দাঁড়াও—
পৃথিবী এক ইঞ্চি ঘুরে যায়।
তুমি যদি দৌড়াও—
সূর্য তার আলো বদলে নেয়।
তুমি যদি পড়ো—
অক্ষরগুলো পাতা ছেড়ে উড়ে গিয়ে তোমার করোটির ভেতর কালো নক্ষত্র হয়ে জ্বলে ওঠে।

জুতোর ফিতা বাঁধো।
দেখবে—
দুটি ফিতা দুটি সাদা সাপে পরিণত হয়েছে,
যারা তোমার পায়ের চারপাশে একটি সর্পিল ছায়াপথ বুনে চলেছে।

জল পান করো।
জলটি তোমার গলায় নামে না।
বরং
তোমার শরীরের গভীরে একটি শুকিয়ে যাওয়া সমুদ্র হঠাৎ জেগে উঠে নিজেই বৃষ্টি হতে শুরু করে।

দৌড়াও।
এমনভাবে দৌড়াও—
যেন পৃথিবী তোমার জুতোর তলায় একটি পুরোনো কমলার খোসার মতো খুলে যেতে থাকে।
যেন বাতাস তোমার ফুসফুসে নয়,
তোমার ভবিষ্যতের মধ্যে শ্বাস নিচ্ছে।

কাজ করো।
কারণ কাজ অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নয়।
এটি মহাবিশ্বের সেই অদৃশ্য সূঁচ,
যা প্রতিদিন তোমার ছিন্নভিন্ন ভাগ্যকে নতুন নক্ষত্রের সুতো দিয়ে সেলাই করে।

প্রতিটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সকাল
একটি বিমান নয়—
একটি নতুন মহাবিশ্বের প্রথম হৃদস্পন্দন।

তার ইঞ্জিন অন্ধকার দিয়ে চলে।
তার জ্বালানি অবিশ্বাসের ছাই।
তার পাইলট তোমার সেই সংস্করণ, যার এখনও জন্মই হয়নি।

আর লাগেজ?
সেখানে থাকে না কাপড়চোপড়।
থাকে—
গতকালের ভয়,
অপূর্ণতার কঙ্কাল,
স্থগিত স্বপ্নের শুকনো ফুল,
আর সেই মানুষটির মুখ, যা তুমি আর কখনও হতে চাও না।

তারপর—
উড্ডয়ন।
তুমি ভাবো তুমি আকাশে উঠছ।
না।
আকাশই তোমার ভেতরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।

তখন
সময় তার ঘড়ি খুলে একটি পাখির গলায় পরিয়ে দেয়।
মাধ্যাকর্ষণ নিজের আইন ভুলে যায়।
নক্ষত্রেরা তোমার শিরায় রক্ত হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।
আর মহাবিশ্ব—
সে কোনো করতালি দেয় না।
সে শুধু তোমার কানের কাছে ঝুঁকে একটি অসম্ভব বাক্য ফিসফিস করে—

"যে মানুষ ভোরেরও আগে জেগে ওঠে, তার জন্য প্রতিটি সকাল নয়, প্রতিটি নিঃশ্বাসই একটি নতুন উড়ান।"

ছন্দ

বিষণ্নতা কোনো অনুভূতি নয়।

সে এক অন্ধ উদ্যানপালক, যে মধ্যরাতে তোমার খুলির ভেতর কালো গাছ রোপণ করে।

সকালে ঘুম ভাঙলে তুমি ভাবো— পৃথিবী বদলে গেছে।
আসলে তোমার জানালার ওপাশে নয়,
আকাশটাই তোমার চোখের ভেতরে এসে বাসা বেঁধেছে।

একদিন,
যখন তোমার শিরাগুলো ধীরে ধীরে কালির নদীতে পরিণত হচ্ছিল,
ঠিক তখনই
শৃঙ্খলা এসে দাঁড়াল।

সে কোনো মানুষ নয়।
সে এক মুখহীন ঘড়ি, যার কাঁটাগুলো শুকনো বজ্রপাত দিয়ে তৈরি।
সে সময় গোনে না।
সে মৃত দিনগুলোর হাড় গুনে রাখে।

সে কিছুই বলল না।
শুধু তোমার কপালে একটি সূর্যবীজ রেখে দিল।
তুমি উঠে দাঁড়ালে।
সেই মুহূর্তে
দিগন্তের ওপারে একটি ঘুমন্ত পর্বত তার পাথরের ফুসফুসে প্রথমবারের মতো শ্বাস নিল।
তুমি বিছানা গুছিয়ে নিলে।
দেখলে—
বালিশের নিচে গত জন্মের অসমাপ্ত সকালগুলো ছোট ছোট পাখির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে।

তুমি জল খেলে।
জলটি তোমার শরীরে ঢুকল না।
বরং তোমার ভেতরে বহুদিন ধরে মরে পড়ে থাকা একটি নদী জলটিকে পান করল।

তুমি জুতোর ফিতা বাঁধলে।
ফিতা দুটি হঠাৎ দুটি সাপ হয়ে তোমার পায়ের চারদিকে একটি নক্ষত্রমণ্ডল জড়িয়ে দিল।

তুমি হাঁটতে শুরু করলে।
পৃথিবী তোমার নিচে ঘুরছিল না।
বরং তোমার প্রতিটি পদক্ষেপের নিচে এক একটি নতুন পৃথিবী জন্ম নিচ্ছিল।

তোমার ছায়া পিছনে আসছিল না।
সে এগিয়ে যাচ্ছিল,
ভবিষ্যতের ভাঙা আয়নাগুলো এক এক করে সেলাই করতে করতে।

দিনগুলো নিজেদের চামড়া বদলাতে লাগল।
সোমবারের গায়ে মাছের আঁশ জন্মাল।
মঙ্গলবার একটি কাচের জিরাফ হয়ে মেঘের ভেতর ঘাস খেতে লাগল।
বুধবার নিজেরই স্বপ্ন খেয়ে একটি নীল পাখিতে পরিণত হলো।
আর তুমি—
প্রতিদিন একই সময়ে উঠে পড়তে থাকলে।

বিষণ্নতা হাসল।
তার দাঁতগুলো শুকনো গ্রহণ দিয়ে তৈরি।
সে বলল—
"একদিন ক্লান্ত হবেই।"

কিন্তু শৃঙ্খলা কখনও উত্তর দেয় না।
সে শুধু তোমার হৃদয়ের ভেতরে একটি অদৃশ্য তাঁত বসিয়ে
প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ দিয়ে বুনতে থাকে
একটি নতুন মহাবিশ্ব।
যেখানে
দৌড়ানো মানে নিজের ছায়াকে পেছনে ফেলে আসা নয়,
বরং অদেখা সূর্যদের ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়া।
যেখানে
বই পড়া মানে অক্ষর নয়,
নিজের করোটির ভেতর অজানা নক্ষত্র জন্মাতে দেখা।
যেখানে
ঘাম লবণ নয়,
গলতে থাকা পুরনো ভাগ্যের গলিত ধাতু।

ধীরে ধীরে
তোমার বিষণ্নতা নিজের শরীর হারাতে লাগল।
সে আর মানুষ রইল না।
সে এক কুয়াশার হাতি,
যে ভুল করে সূর্যের মরুভূমিতে প্রবেশ করেছে।

একদিন সে জেগে উঠে দেখল—
তোমার ভেতরের ঘড়িগুলো
আর সময় মাপে না।
তারা আলো ফলায়।
তোমার হাড়গুলো
আর ক্যালসিয়ামের নয়।
তারা চাঁদের শিকড় দিয়ে তৈরি।
তোমার শ্বাস
আর বাতাস নয়।
সে অদৃশ্য নক্ষত্রদের পরাগ।

তখন
বিষণ্নতা তার কালো মুখোশ খুলে
দেখল—
তার নিজেরই কোনো মুখ নেই।
সে ছিল শুধু অব্যবহৃত সকালের জমে থাকা ছায়া।

আর শৃঙ্খলা?
সে কোনো অভ্যাস ছিল না।
সে ছিল
ঈশ্বরের নিঃশব্দ হাতের লেখা,
যা প্রতিটি ভোরে
তোমার আত্মার শূন্য পাতায়
ছন্দের দৃপ্ত অলঙ্কারে
এক একটি নতুন সূর্য
এঁকে যায়।

বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

অবিচল

ভবিষ্যৎ তাদের নয়
যারা জন্মগত প্রতিভার দীপ্তিতে
মুঠো ভরে নক্ষত্র কুড়িয়ে আনে
আর তাদের করতালিতে মত্ত হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যৎ তাদেরও নয়
যারা সৌভাগ্যের অদৃশ্য হাত ধরে
হঠাৎ একদিন খুঁজে পায়
ঘুমন্ত কোনো রাজ্যের গোপন দ্বার।

না—

ভবিষ্যৎ তাদের,
যারা ফিরে আসে।
বারবার।
আবার।
আরও একবার।

যেন চাঁদ,
যে তার রুপালি ক্ষত বয়ে নিয়ে
অন্ধকার সময়ের সমুদ্র পেরিয়ে যায়,
কখনো জিজ্ঞেস করে না—
কেউ তাকে দেখছে কি না।

একদিন আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম
এক অদ্ভুত নগরী।
সেখানে প্রতিভা ছিল
বিদ্যুতের পোশাক পরা এক রাজপুত্র,
তার চোখে জ্বলত উল্কার আগুন।

আর সৌভাগ্য—
এক উন্মত্ত বিদূষক,
খালি পায়ে নাচতে নাচতে
আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছিল
সোনালি মাছ,
হেসে উড়িয়ে দিচ্ছিল
মহাকর্ষের সমস্ত নিয়ম।

মানুষ তাদের পূজা করত।
ভবিষ্যদ্বাণী আর প্রশংসা দিয়ে
তাদের জন্য গড়ে তুলত
মহিমান্বিত গির্জা।

কিন্তু শতাব্দী পেরিয়ে,
সেই গির্জাগুলো পরিত্যক্ত হয়ে গেল।
জানালায় জমল ধুলো,
দেয়ালে জড়িয়ে ধরল লতা।
আর বাতাস ফিসফিস করে বলল—
"তারা এসেছিল দারুণ দীপ্তি নিয়ে,
কিন্তু তারা টিকে থাকেনি।"

তারপর,
অনন্তের প্রান্তদেশ থেকে
এসে দাঁড়াল এক নামহীন মানুষ।
তার মাথায় কোনো মুকুট নেই।
তার হাতে কোনো অলৌকিক শক্তি নেই।
আছে শুধু—
পদচিহ্ন।
ধীর।
স্থির।
অবিচল।

নক্ষত্রেরা তাকে উপেক্ষা করল।
বাতাস তাকে বিদ্রূপ করল।
এমনকি সময়ও
তাকে দেখে হেসে উঠল।

তবু সে
প্রতিদিন
আরও একটি ইট বসাল
এক অদৃশ্য সেতুর গায়ে,
যে সেতু
অতল শূন্যতার উপর দিয়ে
দূরে কোথাও এগিয়ে যাচ্ছে।
ঝড় যখন তা ভেঙে দিল—
সে আবার গড়ল।
সমুদ্র যখন তা গ্রাস করল—
সে আবার গড়ল।
নিজের হৃদয় যখন
নিজেকেই বিশ্বাসঘাতকতা করল—
তখনও
সে আবার গড়ল।

বছর কেটে গেল।
তার পদচিহ্ন
রাস্তা হয়ে উঠল।
রাস্তা
নদী হয়ে গেল।
নদী
সভ্যতার জন্ম দিল।

আর একদিন ভোরবেলায়,
ভবিষ্যৎ নিজেই—
যার ডানা গড়া
অজাত দিনের আলো দিয়ে,
সে এসে
নতজানু হলো
সেই সাধারণ মানুষের সামনে।
কারণ সে অসাধারণ ছিল না।
বরং
সে অনন্তকে শিখিয়ে দিয়েছিল
সবচেয়ে ভয়ংকর জাদু—
চলতে থাকা,
যখন প্রতিভা ম্লান হয়ে যায়।
চলতে থাকা,
যখন সৌভাগ্য মুখ ফিরিয়ে নেয়।
চলতে থাকা,
যখন নিজের আত্মাটাও
এক পরিত্যক্ত বাড়ির মতো
নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।

কারণ প্রতিভা
একটি ফুল—
অপূর্ব,
কিন্তু ঋতুর হাতে বন্দী।

সৌভাগ্য
একটি প্রজাপতি—
মোহময়,
কিন্তু চিরকাল অধরা।

আর অবিচলতা—
অবিচলতা হলো
এক বিশাল বৃক্ষ,
যার শিকড়
ব্যর্থতার অস্থি থেকে
রস টেনে নেয়,
যার কাণ্ডে
ঝড়ের নখর কেবল
আরও গভীর ইতিহাস লিখে যায়।
আর যার শাখাগুলো
উঁচুতে উঠতেই থাকে,
এমনকি
যখন শীত ঘোষণা করে—
সবকিছু শেষ।

আর মহাবিশ্বের সেই প্রান্তে,
যেখানে আগামীকাল
পুনরাবৃত্তির অগ্নিকুণ্ডে
গড়ে তোলা হয়,
সেখানে
নীরব অধ্যবসায়ীরা
নতুন নতুন পৃথিবী নির্মাণ করছে।

তারা সবচেয়ে প্রতিভাবান নয়।
তারা সবচেয়ে সৌভাগ্যবানও নয়।
তারা শুধু—
জেগে ওঠে,
কাজ করে,
স্বপ্ন দেখে,
আবার ফিরে আসে।

এভাবেই,
একদিন
নিয়তিও ভুলে যায়—
তারা কোনোদিন
সাধারণ ছিল।

যেহেতু

শুধু এই কারণে যে তুমি সমুদ্রকে ভালোবাসো,
তার মানে এই নয় যে তোমাকে তাতেই ডুবে মরতে হবে।
কখনো কখনো এতটাই শক্ত হতে হয়,
যাতে উত্তাল ঢেউ ছিঁড়ে তুমি ফিরে আসতে পারো তীরে।

তবে—
আমি কেবল সমুদ্রের কথাই বলছিলাম না।

আমি বলছিলাম সেই নারীর কথা,
যার চোখের গভীরে
বর্ষার পর বর্ষা গর্ভবতী হয়ে থাকে,
আর সেই পুরুষের কথা,
যে ভেবেছিল—
ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়াই বুঝি প্রেম।

আমি বলছিলাম স্বপ্নের কথাও—
সেই সব নীল তিমির,
যারা মধ্যরাত্রির শিরায় শিরায় গান গায়,
আর ডেকে নিয়ে যায় তোমাকে
পরিচিত ঘাট, পরিচিত আলোর বাইরে,

যতক্ষণ না একদিন
তুমি ভুলে যাও
নিজের নামের স্বাদ,
নিজের ভেতরের পাখির ডাক,
নিজেরই ছায়ার সঙ্গে
শেষ কবে কথা হয়েছিল।

সব সমুদ্রের জল থাকে না।
কিছু সমুদ্র জন্মায় উচ্চাকাঙ্ক্ষায়।
তার ঢেউয়ে ভেসে যেতে যেতে
তুমি উৎসর্গ করো—
তোমার ঘুম,
তোমার যৌবন,
মায়ের জানালার ধারে অপেক্ষারত মুখ,
আর তোমার সমস্ত আগামী।

তবু সে ক্ষুধার্তই থেকে যায়।
আর তুমি বিস্ময়ে দেখো—
একদিন তোমার নিজের চোখেই
তোমার প্রতিবিম্ব আর নেই।

আর শোক—
আহ, শোক তো এক কৃষ্ণগহ্বরের সমুদ্র!
প্রথমে তুমি শুধু তার জলে
একটুখানি আঙুল ডোবাতে চাও,
কোনো হারানো মুখের স্মৃতিতে।

কিন্তু স্মৃতিরা ধূর্ত।
তারা রূপালি মাছ হয়ে
তোমার পায়ের চারপাশে জড়িয়ে ধরে,
তাদের আঁশে আঁশে বুনে ফেলে
অদৃশ্য শিকল।
আর তুমি ডুবে যেতে থাকো—
গতকালের ডুবে যাওয়া নগরীতে,
যেখানে ভাঙা হাসিগুলো
জেলিফিশের মতো ভেসে বেড়ায়,
আর প্রতিটি "যদি"
আকাশে ঝুলে থাকা এক মৃত চাঁদ,
যার মাধ্যাকর্ষণে
জোয়ার ওঠে তোমার বুকে।

তবু কোথাও—
সমস্ত আকাঙ্ক্ষার ঝড় পেরিয়ে,
সমস্ত আসক্তির ঘূর্ণিপাক ভেঙে,
অপেক্ষা করে এক তীর।

সেটি কোনো স্থান নয়।
সেটি এক রূপান্তর।
এক নিঃশব্দ রাজ্য,
যেখানে তোমার হৃদস্পন্দনকে
আর কারও অনুমতি নিতে হয় না
বেঁচে থাকার জন্য।

আর ফিরে আসা—
সে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা নয়।
সে কোনো পরাজয়ও নয়।
সে হলো
নিজেকে পুনরুদ্ধারের গোপন সাধনা,
যখন তোমার আত্মা
বন্দিত্বকে ভুল করে
প্রেম ভেবে বসে।

কারণ প্রেম
এমন এক সমুদ্র হওয়া উচিত,
যেখানে তুমি পাল তুলে ভেসে বেড়াবে,
না যে সমুদ্রের তলায়
তোমার হাড়েরা প্রবালে পরিণত হবে,
আর তোমার নীরবতা
খাদ্য হবে অদৃশ্য হাঙরদের।

তাই যদি কখনো
তোমার হৃদয় নতজানু হয়
কোনো বিশালতার সামনে—
কোনো মানুষ,
কোনো স্বপ্ন,
কোনো বেদনা,
অথবা তোমার নিজেরই
অসম্ভব আকাঙ্ক্ষার কাছে—
তাকে গভীরভাবে ভালোবাসো।
তার ঝড়ের প্রতি মুগ্ধ হও।
তার গানের ভেতর হারিয়ে যাও।
কিন্তু নিজের ভেতর
একটি গোপন তীর রেখে দিও—
যেখানে তুমি ফিরে আসতে পারো।

কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল অলৌকিকতা
এমন কোনো সমুদ্র খুঁজে পাওয়া নয়
যার জন্য মরতে ইচ্ছে করে।

বরং—
অসংখ্য ডুবে যাওয়ার প্রলোভনের পরেও,
লবণাক্ত ঠোঁট,
ভেজা চোখ,
আর ঝড়ে বিধ্বস্ত আত্মা নিয়ে
তীরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে পারা—

"আমি তোমাকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলাম।
কিন্তু তারও চেয়ে বেশি—
আমি বেছে নিয়েছি আপন বেঁচে থাকাকে।"

মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

বিপজ্জনক

দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ি আছে,
আর আছে বুকের পাঁজরের আড়ালে ঝুলে থাকা এক অদৃশ্য ঘড়ি।

দ্বিতীয়টিই অধিক নিষ্ঠুর।

সে কখনো চিৎকার করে না,
কখনো ভয় দেখায় না।
সে শুধু ফিসফিস করে বলে—
"এখনও তো অনেক সময় আছে।"

আর মানুষ,
সেই মখমলি মিথ্যার মায়ায় বিভোর হয়ে,
নিজের জীবনের নদীর ধারে বসে থাকে,
স্বপ্নগুলোকে মাছ ধরার বঁড়শির মতো
জলের গভীরে ছুঁড়ে দিয়ে—
যে জল কখনো ফিরে আসে না।

সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাস অলসতা নয়।
অলসতা অন্তত জানে যে সে ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু অশেষ সময়ের ভ্রম—
আহা, সে তো এক জাদুকর,
যে পরিধান করে নিশ্চয়তা আর আরামের রেশমি পোশাক।

সে তোমার প্রিয় পেয়ালায় চা ঢেলে বলে—
"কবিতাটা পরে লিখবে।"
"ভালোবাসবে যখন একটু বয়স হবে।"
"শুরু করবে যখন সঠিক সময় এসে যাবে।"

আর তুমি অপেক্ষা করতে করতে,
ঋতুগুলো নীরবে বদলে ফেলে তাদের পোশাক।
তোমার কালো চুল
রূপালি বৃষ্টিতে পরিণত হয়।
যে হাত একদিন পাহাড় জয়ের শপথ করেছিল,
সে হাতই ধীরে ধীরে শিখে ফেলে
শরতের কাঁপা ভাষা।

যে আয়না একদিন তোমার বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল,
সেই আয়নাই একসময়
হারিয়ে যাওয়া বছরের ইতিহাস রচনা করে।
তবু সেই জাদুকর হাসতে থাকে।
সে বলে—
"এখন নয়।"
"তোমার এখনও অনেক সময় আছে।"

একবার আমি এক পরাবাস্তব নগরে গিয়েছিলাম—
যে নগর গড়ে উঠেছে
অপূর্ণ স্বপ্ন আর পরিত্যক্ত আকাঙ্ক্ষার ইট দিয়ে।
সেখানে আমি এক বৃদ্ধের দেখা পেলাম,
যার হাতে ছিল
অসংখ্য অখোলা সকালের ভরা একটি সুটকেস।
সুটকেসের ভিতরে ছিল—
একটি সুর, যা কখনো রচিত হয়নি,
একটি চুম্বন, যা কখনো দেওয়া হয়নি,
একটি যাত্রা, যা কখনো শুরু হয়নি,
আর হাজারো সূর্যাস্ত,
যেগুলো উপভোগ করার বদলে
সে শুধু প্রস্তুতিই নিয়ে গেছে।

সুটকেসটি বছর বছর
অপেক্ষার ভারে বিশাল হয়ে উঠেছে।
সে সেটিকে টেনে নিয়ে বেড়ায়
যেন একটি মৃত চাঁদ
তার পেছনে গড়িয়ে চলেছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম—
"আপনি অপেক্ষা করলেন কেন?"
বৃদ্ধ বিস্মিত চোখে তাকালেন।
ধীরে ধীরে বললেন—
"আমি ভেবেছিলাম, জীবন হলো এমন এক সিঁড়ি,
যা আমি চিরকাল বেয়ে উঠতে পারব।"

কিন্তু জীবন সিঁড়ি নয়।
জীবন হলো একটি প্রদীপ,
যা জ্বলতেই থাকে,
যখন তুমি এখনো ভাবছ—
এই আলো দিয়ে তুমি কী করবে।

আর মৃত্যু?
মৃত্যু সবসময় কঙ্কাল নয়।
কখনো কখনো সে এক ধৈর্যশীল মালী,
যে নীরবে হেঁটে বেড়ায়
সময়ের বাগানে,
আর একে একে তুলে নেয়
পাকা মুহূর্তগুলো,
যখন মানুষ ব্যস্ত থাকে
আগামীকাল নিয়ে হিসাব করতে।

সে তাড়াহুড়ো করে না।
সতর্কও করে না।
সে শুধু অপেক্ষা করে—
যতক্ষণ না তুমি
সম্ভাবনাকে স্থায়িত্ব বলে ভুল করো।

কী অদ্ভুত!
মানুষ তার অর্থকে লোহার সিন্দুকে রক্ষা করে,
কিন্তু তার দিনগুলোকে
উদাসীন পাখিদের জন্য
রুটির টুকরোর মতো ছড়িয়ে দেয়।

সে আনন্দকে পিছিয়ে দেয়।
সাহসকে বিলম্বিত করে।
বিস্ময়ের ভার অন্যের হাতে তুলে দেয়।
আর একদিন,
নিজের অবশিষ্ট সময়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে,
সে মরিয়া হয়ে খোঁজে
একটি মাত্র হারিয়ে যাওয়া বিকেল,
যা আবার বাঁচা যায়।

কিন্তু সময়—
সে এক মহিমান্বিত জন্তু,
যে কখনো পিছনে হাঁটে না।
তার পদচিহ্ন কেবল সামনেই প্রস্ফুটিত হয়—
অনুশোচনার মরুভূমি পেরিয়ে,
কর্মের বাগান অতিক্রম করে,
আর সেই কাঁপতে থাকা সেতুর উপর,
যার এক প্রান্তে লেখা—
"কোনো একদিন"

আর অন্য প্রান্তে—
"আজ"।

তাই জেগে ওঠোতো, পথিক।
ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো ছিঁড়ে
ডানা বানিয়ে নাও।
সকালটাকে পান করো,
তার বাষ্প মিলিয়ে যাওয়ার আগে।
লিখে ফেলো সেই বিপজ্জনক কবিতা।
স্বীকার করে ফেলো সেই অসম্ভব প্রেম।
গড়ে তোলো সেই অবিশ্বাস্য স্বপ্ন।
কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি
এ নয় যে আমাদের সময় কম ছিল।
বরং—
আমরা বিশ্বাস করেছিলাম,
আগামী দিনের সমুদ্র
কখনো শুকিয়ে যাবে না।

আর এক সন্ধ্যায়,
যখন তারারা সাক্ষীর মতো জড়ো হয়,
তখন আমরা আবিষ্কার করি—
আমাদের সমগ্র জীবন
ভাগ্য চুরি করেনি,
ব্যর্থতাও ধ্বংস করেনি,
বরং নীরবে,
ধীরে,
অত্যন্ত সুন্দরভাবে,
হারিয়ে গেছে
একটি ভ্রমের কাছে—
যে আমাদের হাতে এখনও অনেক সময় বাকি আছে।

রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

হয়ে ওঠার মহোৎসব

কিছু মানুষ আছে,
যারা তাদের প্রতিটি দিনের ঝরে-পড়া কণাগুলোকে
আকাশ থেকে খসে পড়া নক্ষত্রের মতো
অতিশয় যত্নে কুড়িয়ে নেয়,
আর আনন্দে মেতে ওঠে।

অভ্যাসের অন্ধকার মাটিতে
একটি নতুন বীজের অঙ্কুরোদ্গম,
কাঁপা কাঁপা হাসি দিয়ে
একটি ভয়কে জয় করা,
একটি পৃষ্ঠা লেখা,
একটি ক্ষতকে ক্ষমা করে দেওয়া—
এসবই তাদের কাছে যথেষ্ট
হৃদয়ের ভেতর প্রদীপ জ্বালানোর জন্য।

তারা তাদের ক্ষুদ্রতম অগ্রগতিও উদ্‌যাপন করে,
আত্মার সামান্যতম প্রসারণকেও স্বাগত জানায়,
যেমন নদী বৃষ্টিকে উদ্‌যাপন করে,
যেমন ভোর
প্রথম পাখির দ্বিধাগ্রস্ত গানকে
অভ্যর্থনা জানায়।

তাদের আনন্দ কোনো পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ নয়।
এটি একটি ক্যাম্পফায়ার—
উষ্ণ, দপদপে,
চিরকাল নতুন হয়ে ওঠা।

আর কিছু মানুষ আছে,
অসম্ভব জ্যামিতির সন্তান,
অসাধারণ শুদ্ধতার প্রেমিক,
যারা তাদের চিন্তাগুলোকে
এত যত্নে ঘষে-মেজে তোলে
যে সেগুলো অবসিডিয়ান চাঁদের মতো দীপ্ত হয়ে ওঠে।

তাদের আত্মা উচ্ছ্বাসে ফেনায়িত হয়,
কারণ তারা কেবল গন্তব্যে পৌঁছাতে চায় না,
বরং সৌন্দর্য নিজেই
তাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়।

তারা তাদের জীবনকে সাজায়
আকাশে ঝুলন্ত এক স্বর্গীয় উদ্যানের মতো,
যেখানে প্রতিটি ফুল ফোটে
ঠিক সেই মুহূর্তে
যখন নক্ষত্রেরা অনুমতি দেয়।

তাদের পরিপূর্ণতাবাদ কোনো কারাগার নয়।
এটি এক নৃত্য।

তারা সংশোধন করতে করতে হাসে,
পরিমার্জন করতে করতে গান গায়,
আর তাদের আকাঙ্ক্ষার খোদাই করা পেয়ালা থেকে
অনন্তকে পান করে।

এমনকি তাদের ব্যর্থতাগুলোকেও
তারা কাগজের পাখিতে রূপ দেয়
এবং উড়িয়ে দেয়
আগামী দিনের বাতাসে।

তবু এই বিশাল, স্বপ্নময় মহাবিশ্ব
একটি গোপন কক্ষ সংরক্ষণ করে রেখেছে
আরও বিরল একজনের জন্য।

বরফের পাহাড়ের নিচে
তিমির গানের থেকেও বিরল,
ভবিষ্যৎকে মনে রাখতে পারা
ঘড়ির থেকেও বিরল,
নক্ষত্রে ফোটা
মরুভূমির থেকেও বিরল।

সে সেই মানুষ,
যে তার ক্ষুদ্রতম উন্নতিকেও
উদ্‌যাপন করে
অসীমের তীরে ঝিনুক কুড়ানো
একটি শিশুর বিস্ময় নিয়ে,
এবং একই সঙ্গে
নিজেকে ধরে রাখে
আত্মিক উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে।

সে একই সঙ্গে
শিক্ষানবিশ
এবং গুরু।
বীজ
এবং বৃক্ষ।
অসমাপ্ত কবিতা
এবং সেই কবিতাকে
অবিরাম নিখুঁত করে তোলা কবি।

তার ভেতরে বাস করে
একজন হাস্যোজ্জ্বল মালী,
যে প্রতিটি নতুন পাতাকে
আনন্দে অভিবাদন জানায়,
আর
একজন স্বর্গীয় স্থপতি,
যে চাঁদের আলো দিয়ে
মহিমান্বিত গির্জা নির্মাণের স্বপ্ন দেখে।

কেউ কারও প্রতি ঈর্ষান্বিত নয়।
মালী বলে,
"আমরা বেড়ে উঠেছি।"
স্থপতি উত্তর দেয়,
"এবং আমরা আরও মহিমান্বিত হয়ে উঠব।"

তারা একসঙ্গে
তারার আলো মিশ্রিত মদে
পেয়ালা তোলে।

যখন সে হোঁচট খায়,
সে হাসে।
যখন সে সাফল্য পায়,
সে বিনয়ী থাকে।

কারণ সে জানে—
আনন্দহীন পরিপূর্ণতা
একটি স্ফটিকের কফিন,
আর উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন অগ্রগতি
একটি নৌকা,
যে কখনো
দিগন্তের খোঁজে বের হয় না।

তাই সে হেঁটে চলে,
তার গায়ে জড়ানো থাকে
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিজয়
আর অসম্ভব আদর্শের
সুতোয় বোনা এক আলখাল্লা।

এক কাঁধে বসে থাকে
একটি চড়ুই,
যে গান গায়,
"যা আছে, তা-ই যথেষ্ট।"
অন্য কাঁধে
একটি ফিনিক্স ফিসফিস করে,
"আরও।"
আর সে
দুজনের কথাই শোনে।

আকাশ নত হয়ে আসে
তার পদচারণার শব্দ শোনার জন্য।
সময় ধীর হয়ে যায়,
বিস্ময়ে।

কারণ এখানে হেঁটে চলেছে
পৃথিবীর বিরলতম বিস্ময়—
একটি আত্মা,

যে চিরকাল হয়ে উঠছে,
চিরকাল নিজেকে পরিশীলিত করছে,
চিরকাল আনন্দে উদ্‌যাপন করছে,

এবং প্রতিটি সাধারণ দিনকে
পরিণত করছে
অগ্রগতি,
পরিপূর্ণতা,
এবং সীমাহীন বিস্ময়ের
এক অতিবাস্তব মহোৎসবে।

রান্না

সুখ সর্বদাই ঘরে তৈরি—
যদি তুমি একজন ভালো রাঁধুনি হও,
যদি তোমার হাত এখনো মনে রাখে
কীভাবে দুঃখকে ময়দার মতো মেখে
রুটিতে পরিণত করতে হয়।

আত্মার রান্নাঘরে
কালিতে লেখা কোনো রেসিপি নেই।
আছে কেবল প্রাচীন আঙুলের ছাপ
আটার মতো সাদা সকালের গায়ে,
আছে চাঁদের আলো দিয়ে গড়া দিদিমারা
যারা ফিসফিসিয়ে বলে যায়
ভুলে যাওয়া গ্রীষ্মের গোপন কথা,
কাচের বয়ামে ভরে রাখা স্মৃতির ভিতর থেকে।

আমি দেখেছি মানুষ
সোনার চামচ কিনে সুখ খেতে চেয়েছে,
তবুও তাদের মুখ মরুভূমিই রয়ে গেছে।

আমি দেখেছি নারী
তাদের এপ্রোনে নক্ষত্র সেলাই করেছে,
আর ঝড় বয়ে আনা অতিথিদের
চিড় ধরা মাটির বাটিতে
হাসি পরিবেশন করেছে।

কারণ সুখ এক লাজুক উপাদান।

সে লুকিয়ে থাকে
পুড়ে যাওয়া ভুলের মধ্যে,
পেঁয়াজ কাটার অশ্রুর মধ্যে,
সেই দীর্ঘ বিকেলগুলোর মধ্যে
যখন ভাত উথলে পড়ে
আর স্বপ্নগুলো ফুলতে চায় না।

তাকে কেনা যায় না
প্রশংসার বাজার থেকে।

তাকে উত্তরাধিকারেও পাওয়া যায় না
মার্বেলের অট্টালিকার মতো।

সে বুনো ফুলের মতো জন্মায়
অভ্যাসের ছোট্ট বাগানে—

একটি তৃষ্ণার্ত গাছে জল দেওয়ায়,
একটি সত্য বাক্য লেখায়,
একটি কাঁপতে থাকা হাত ধরে রাখায়
চিরকালের প্রতিশ্রুতি না দিয়েও।

আহা, কী অদ্ভুত এই পৃথিবীর রান্নাঘর!

এখানে ছাদের সঙ্গে ঝুলে আছে
উল্টো হয়ে থাকা নক্ষত্রমণ্ডলী।

ঘড়ি ধীরে ধীরে গলে যায়
জাফরানি সময়ের এক হাঁড়িতে।

স্মৃতি বসে থাকে কোণায়,
অদৃশ্য আঙুলে কমলার খোসা ছাড়ায়।

আর অনুতাপ—
কালো কাকের ছদ্মবেশী এক বৃদ্ধ পরিবেশক—
বারবার লবণ ফেলে দেয়
গতকালের স্যুপের মধ্যে।

কিন্তু ভালো রাঁধুনি হাসে।

সে জানে—

এক চিমটি ক্ষমা
তিক্ততাকে মিষ্টি করে দিতে পারে।

সে জানে—

নিঃসঙ্গতা,
ধীরে ধীরে সিদ্ধ হতে হতে
একসময় একাকিত্বে রূপ নেয়—

যা সুগন্ধময়,
যা আত্মাকে পুষ্ট করে।

সে জানে—

শোক আসলে সুখই,
যে কালো দস্তানা পরে আছে,

এবং ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে
সেগুলো খুলে ফেলার জন্য।

তাই প্রতিটি ভোরে
সে সাহসের চুলা জ্বালায়।

ক্ষতচিহ্নের তৈরি হামানদিস্তায়
সে আশা পিষে নেয়।

তারপর সাধারণ দিনের ঝোলে
সে নাড়তে থাকে বিস্ময়ের চামচ,

যতক্ষণ না অলৌকিকতা
বাষ্পের মতো উড়ে ওঠে—

ছোট্ট,
স্বচ্ছ,
তবু একটি সমগ্র জীবনকে
উষ্ণ রাখার জন্য যথেষ্ট।

আর মধ্যরাতে,

যখন মহাবিশ্ব
নিজেকে নীরবতার এক ন্যাপকিনে মুড়ে ফেলে,

সে আর-একজন অতিথির জন্য
টেবিল সাজায়—

নিজের জন্য।

কোনো লজ্জা নয়।

কোনো তাড়া নয়।

শুধু বুকের ভিতরে
একটি মোমবাতি নরম আলোয় জ্বলে,

শুধু শান্তির সুগন্ধ
ফেটে যাওয়া জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে,

আর থাকে এক গভীর, নীরব বিশ্বাস—

সুখ কখনোই দূরদেশের কোনো রাজ্যে ছিল না,

সে তো বরাবর অপেক্ষা করে ছিল

এই অসম্ভব রান্নাঘরেই,

যেখানে হৃদয়—

ধুলোমাখা অথচ অলৌকিক—

বারবার শিখে নেয়,

যা কিছু অবশিষ্ট আছে,

তা দিয়েই

কীভাবে

সুখ রান্না করতে হয়।

শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

সহযোগী দ্বন্দ্ব

সে শুধু বুদ্ধিদীপ্ত নয়—
সে যেন বিদ্যুতের তৈরি এক ঝাড়বাতি,
মাংস ও রক্তের এক গির্জার ভেতরে ঝুলে আছে,
যেখানে তার প্রতিটি রসিকতা
অস্তিত্বের গম্ভীর আকাশে ছুটে চলা এক একটি ধূমকেতু।

হাসি তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে না;
হাসিই তার মাতৃভাষা,
তার মনের বৃক্ষশাখায়
রূপালি পাখির ঝাঁকের মতো বাসা বেঁধে থাকে।

আর সে নিজেকে ভালোবাসে—
আয়নার অন্ধ মোহে নয়,
অহংকারে পেখম মেলা ময়ূরের মতো নয়
বরং যেমন একজন মালী
একটি দুর্লভ গোলাপকে ভালোবাসে,
তাকে শৃঙ্খলার জলে সিঞ্চন করে,
নিষ্ঠুর কোমলতায় তার ডালপালা ছেঁটে দেয়,
আর প্রতিটি নতুন কাঁটাকে
মৃদু হাসিতে স্বাগত জানায়।

প্রতিটি সকালে
সে নিজের ভেতরেই জেগে ওঠে,
যেন এক অসমাপ্ত রাজ্যে প্রবেশ করছে।
মেঝেগুলো পালিশ করা সংকল্পে,
জানালাগুলো ধোয়া কৌতূহলে,
ঘড়িগুলো গলে পড়ছে নীরবে
অলিখিত স্বপ্নের তাকের ওপর।

সে হেঁটে বেড়ায়
নিজের আত্মার দীর্ঘ করিডরে—
এখানে একটু বেশি সৌন্দর্য,
ওখানে একটু বেশি সাহস,
আরও তীক্ষ্ণ হোক প্রজ্ঞা,
আরও কোমল হোক করুণা।

কারণ সে এক অদ্ভুত, পবিত্র ধরনের
পরিপূর্ণতাবাদী—
যে নিজের জীবনকে
একটি সূচের অগ্রভাগে
তারাদের মাঝখানে ভারসাম্য রেখে দাঁড় করিয়ে রাখে।

তার নিচে,
সমুদ্র গর্জে ওঠে,
সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে,
শহরগুলো জন্ম নেয়, আবার জ্বলে পুড়ে যায়
অদৃশ্য আগুনের চারপাশে উড়তে থাকা পতঙ্গের মতো।

তবুও সে দাঁড়িয়ে থাকে—
হাসিমুখে।
স্থিত।
ভারসাম্যপূর্ণ।
অসম্ভবের সরু সীমানায় নৃত্যরত এক নর্তক।

আর জীবন—
আহ, জীবন!
তার কাছে,
এটি কোনো বোঝা নয়,
সময়ের কারাগার নয়,
অথবা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলা কোনো শোকযাত্রা নয়।

এটি এক অন্তহীন দাবার ছক,
যার ঘরগুলো ভেসে বেড়ায় ছায়াপথের পর ছায়াপথে।
প্রতিটি মুহূর্ত
একটি নতুন চাল।
প্রতিটি ব্যর্থতা
একটি গোপন দরজা।
প্রতিটি বিজয়
আরও বিনয়ী হওয়ার এক নতুন কারণ।

আর সে খেলে—
অসাধারণ দক্ষতায়—
জেতার জন্য নয়,
বরং কারণ,
খেলাটি এতটাই সুন্দর
যে একে অবহেলায় খেলা যায় না।

তাই সে জয় করে—
বারবার—
কোনো দেশ নয়,
কোনো বাজার নয়,
কোনো জনতার করতালি নয়—
বরং,
ভোরের আলস্যকে,
কর্মের পূর্বের ভয়কে,
মধ্যরাত্রির হতাশাকে,
আর সেই ক্ষুদ্র স্বৈরাচারীদের,
যারা মানুষের হৃদয়ের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে।
কারণ তার কোনো শত্রু নেই।

সে ঈর্ষাকে
কৃতজ্ঞতার বাগানের নিচে কবর দিয়েছে।
সে ঘৃণাকে
বোঝাপড়ার নদীতে গলিয়ে দিয়েছে।
সে অন্য মানুষের বিরুদ্ধে
তলোয়ার শানায় না।
পৃথিবী তার যুদ্ধক্ষেত্র নয়।
তার যুদ্ধ আরও গভীর।
আরও অন্তরঙ্গ।

প্রতিটি সন্ধ্যায়
সে নিজের সঙ্গেই দেখা করে—
গতকালের সে,
আজকের সে,
আগামীকালের সে—
তিনটি ছায়া,
একটি হয়ে ওঠার আগুনকে ঘিরে বসে আছে।
আর সেখানে—
অসাধারণ সৌন্দর্যে,
নিষ্ঠুর সততায়,
চোখে ঝিলমিল করা হাসি নিয়ে—
সে নিজেকেই প্রশ্ন করে—
তুমি কি আরও দয়ালু হতে পারো?
তুমি কি আরও গভীরভাবে ভাবতে পারো?
তুমি কি আরও সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারো?
তুমি কি আরও সাহসের সঙ্গে ভালোবাসতে পারো?
তুমি কি অতিক্রম করতে পারো
গতকালের সেই অলৌকিক মানুষটিকে,
যে ছিলে তুমি নিজেই?

আর তখন
তারারাও ঝুঁকে পড়ে,
কারণ এটাই সবচেয়ে প্রাচীন দ্বন্দ্ব—
একজন মানুষ,
নিজের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে।
কোনো দর্শক নেই।
কোনো ট্রফি নেই।
কোনো শেষরেখা নেই।
আছে শুধু—
অবিরাম হয়ে ওঠা।
সে একই সঙ্গে
ভাস্কর এবং ভাস্কর্য,
পর্বত এবং আরোহী,
প্রশ্ন এবং উত্তর।
চিরকাল অসমাপ্ত।
চিরকাল ঊর্ধ্বগামী।

আর সম্ভবত,
এটাই তার সবচেয়ে বড় বিজয়—
সে কখনো থেমে যায় না,
কখনো নিজের অর্জনের সামনে নতজানু হয় না,
কখনো নিজেকে চূড়ান্ত বলে মনে করে না।
কারণ সে জানে—
পরিপূর্ণতা কোনো গন্তব্য নয়।
এটি এক অপূর্ব উন্মাদনা—
নিজেকে এত গভীরভাবে ভালোবাসার,

যে প্রতিটি সূর্যোদয়ের সঙ্গে
তুমি হয়ে ওঠো
গতকালের চেয়েও
আরও বিস্ময়কর 
ও রহস্যময় এক মানুষ।

রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

তৃপ্তি

মানুষ বলে,

টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না।

হয়তো তারা ঠিকই বলে।

সুখ এক মাতাল প্রজাপতি, সূর্যের আলোয় নেশাগ্রস্ত— সে কিছুক্ষণের জন্য এসে কাঁধে বসে, তারপর উড়ে যায় অন্য কোনো ঋতুর দিকে।

কিন্তু তৃপ্তি—

আহ, তৃপ্তি এক পাহাড়।

সে উড়ে বেড়ায় না।

সে থেকে যায়।

আর আশ্চর্যের বিষয়, মুদ্রা, নোট, ব্যাংকের হিসাব এবং নীরব বিনিয়োগ কখনো কখনো সেই পাথর হয়ে ওঠে যার উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয় তৃপ্তির পাহাড়।

---

একদিন স্বপ্নের মধ্যে আমি এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ীর দেখা পেলাম।

তিনি কোনো গয়না বিক্রি করতেন না।

তার দোকানে ছিল না হীরের ঝলক, ছিল না সোনার মূর্তি।

বরং তিনি বিক্রি করতেন অদৃশ্য জিনিস।

একটি তাকের উপর রাখা ছিল কয়েকটি কাঁচের বোতল।

তাদের গায়ে লেখা—

স্বাধীনতা।

নীরবতা।

সময়।

শান্তি।

যথেষ্ট।

আমি যখন তাদের দাম জানতে চাইলাম, তিনি চাঁদের আলোয় ভেজা নদীর মতো হেসে বললেন—

"এসবের দাম অনেক।

কিন্তু সারা জীবন এসব ছাড়া বেঁচে থাকার মূল্য এর থেকেও অনেক বেশি।"

---

আমি দেখেছি মানুষ নিজের অহংকার বহন করার জন্য গাড়ি কিনছে।

দেখেছি একাকীত্বকে দামী সুগন্ধি দিয়ে সাজাতে।

দেখেছি এত বড় বাড়ি যার মালিক শেষ পর্যন্ত নিজের ছাদেরই চাকর হয়ে গেছে।

তাদের আলমারি ভরে গেছে।

তাদের হৃদয় নয়।

প্রতিটি জিনিসের দাঁত গজিয়েছে।

প্রতিটি সম্পদ আরও যত্ন দাবি করেছে।

আর তারা ধীরে ধীরে নিজেদের জীবনকে একটি জাদুঘরে পরিণত করেছে, যেখানে পাহারাদারও তারা, বন্দিও তারা।

---

অথচ দূরে কোথাও,

এক সাধারণ মানুষ একটি আমগাছের নিচে বসে ভাঙা কাপের চা খাচ্ছে।

তার ব্যাংক ব্যালেন্স খুব বড় নয়।

কিন্তু তার হাসি বিশাল।

তার সম্পদ কম।

কিন্তু তার সন্ধ্যাগুলো পুরোটাই তার নিজের।

তারকারা তাকে নামে চেনে।

আর ঘুম তার কাছে আসে পুরোনো বন্ধুর মতো।

---

আমি বুঝলাম,

টাকা কোনো রাজা নয়।

টাকা একটি চাবি।

বোকারা সেই চাবি দিয়ে আরও বড় কারাগারের দরজা খোলে।

জ্ঞানীরা খুলে ফেলে মুক্তির দরজা।

অপমান থেকে মুক্তি।

নির্ভরতা থেকে মুক্তি।

জীবনের কাছে শ্বাস নেওয়ার অনুমতি চাওয়া থেকে মুক্তি।

স্বাধীনতা—

সেই অদৃশ্য প্রাসাদ—

কখনো কখনো কেনা যায়।

অহংকার দিয়ে নয়।

লোভ দিয়ে নয়।

বরং ধৈর্য দিয়ে।

সঞ্চয় দিয়ে।

অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছার মুখে নরম কণ্ঠে "আজ নয়" বলে দেওয়ার শক্তি দিয়ে।

---

এক রাতে সময় নিজেই আমার সামনে এসে দাঁড়াল।

ঘড়ি হয়ে নয়।

ক্যালেন্ডার হয়ে নয়।

বরং এক বৃদ্ধা নারী হয়ে, যার চুলে জড়ানো ছিল অসংখ্য ছায়াপথ।

তার এপ্রনের ভাঁজে লুকিয়ে ছিল কোটি কোটি ঘড়ি।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—

"মানুষ প্রতিদিন আমাকে বিক্রি করে।

কিন্তু খুব কম মানুষই পরে আবার আমাকে কিনে নেয়।"

তারপর তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

আর আমি বুঝলাম—

টাকা আসলে জমাট বাঁধা সময়।

বছরগুলো সংখ্যায় পরিণত হয়েছে।

দিনগুলো বেতনে রূপান্তরিত হয়েছে।

ঘণ্টাগুলো মুদ্রার ছদ্মবেশ ধারণ করেছে।

আর জীবনের সর্বোচ্চ শিল্প হলো—

শুধু টাকা উপার্জন নয়,

বরং সেই টাকা দিয়ে নিজের সময়কে পুনরুদ্ধার করা।

ধীরে ধীরে সকালের নাস্তা খাওয়া।

সন্তানদের বড় হতে দেখা।

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে বসা।

ঘড়ির দিকে না তাকিয়ে বই পড়া।

কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই হাঁটা।

এতটাই ধনী হওয়া যাতে আবার পাখির ডাক শোনা যায়।

---

আমি উদ্বেগের রাজ্যে গিয়েছিলাম।

সেখানে সবাই দৌড়াচ্ছে।

সবাই ভয় পাচ্ছে।

সবাই আগামীকালকে ভয় করে।

মানুষের বুকের ভেতরে অদৃশ্য পাথর জমে আছে।

তারপর আমি আরেকটি দেশে পৌঁছালাম।

সেখানে কোনো বিলাসিতা নেই।

কোনো সোনার ঝাড়বাতি নেই।

শুধু কিছু সাধারণ মানুষ, যাদের জরুরি সঞ্চয় আছে।

তাদের ঘুম গভীর।

তাদের হাসি স্বাভাবিক।

তাদের শ্বাস শান্ত।

কারণ আমি শিখলাম—

শান্তি অনেক সময় ব্যাংকের এক নীরব সংখ্যার মধ্যে বাস করে।

যে সংখ্যার ছবি কেউ তোলে না।

কেউ প্রদর্শন করে না।

তবুও সে ভয়ের মুখ বন্ধ করে দিতে পারে।

---

এরপর স্বাস্থ্য আমার কাছে এলো একজন খালি-পায়ের সাধুর বেশে।

তার হাতে ওষুধ ছিল না।

ছিল সবজি।

ছিল সূর্যের আলো।

ছিল পরিষ্কার জল।

ছিল হাঁটার জুতো।

সে বলল—

"আমি খুব সস্তা।

কিন্তু মানুষ বরং দামী রোগ কিনতে ভালোবাসে।"

আর আমি কেঁদে ফেললাম।

কারণ আমি দেখেছি মানুষ শরীরকে বিক্রি করে সম্পদ অর্জন করেছে,

তারপর সেই সম্পদ নিয়েই শরীরের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছে।

---

আমি একদিন স্মৃতির জাদুঘরে প্রবেশ করলাম।

সেখানে কোনো বস্তু ছিল না।

ছিল শুধু মুহূর্ত।

একজন মা ঘুমন্ত সন্তানের কপালে চুমু খাচ্ছেন।

দুই বৃদ্ধ প্রেমিক হাত ধরে বসে আছেন।

বৃষ্টির মধ্যে এক দীর্ঘ আলাপ।

বন্ধুদের সঙ্গে হাসির রাত।

কেউ টেলিভিশন মনে রাখেনি।

কেউ ঘড়ির ব্র্যান্ড মনে রাখেনি।

কারণ স্মৃতি মরিচা ধরে না।

সেগুলো মনের গির্জায় তারার মতো জ্বলতে থাকে।

---

তারপর আমি সাক্ষাৎ পেলাম এক অদ্ভুত প্রাণীর।

তার নাম—

যথেষ্ট।

মানুষ তাকে ভয় পায়।

কারণ যে তাকে স্পর্শ করে, সে দৌড়ানো বন্ধ করে দেয়।

তুলনা করা বন্ধ করে দেয়।

অতৃপ্তি বন্ধ করে দেয়।

যথেষ্টের চোখে ছিল সমুদ্র।

সে বলল—

"প্রাচুর্য মানে সবকিছু পাওয়া নয়।

প্রাচুর্য মানে যা আছে তাকে যথেষ্ট বলে চিনতে পারা।"

---

তবুও কিছু জিনিস আছে যা টাকা কখনো কিনতে পারে না।

ভালোবাসা বাজারের বাইরে বসে থাকে।

প্রজ্ঞা সোনাকে উপহাস করে।

উদ্দেশ্য কোনো মুদ্রা গ্রহণ করে না।

চরিত্র বিলিয়নিয়ারদের দেখেও হাসে।

অন্তরের শান্তি কোনো ক্রেডিট কার্ড চেনে না।

এসব জন্মায় আত্মার গোপন বাগানে।

টাকা শুধু সেই মাটিতে জল দিতে পারে।

ফুল হয়ে উঠতে পারে না।

---

অবশেষে আমি শিখলাম জীবনের সেই অদ্ভুত অঙ্ক।

টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না।

সুখ আবহাওয়া।

সে আসে।

সে যায়।

সে বদলে যায়।

কিন্তু তৃপ্তি—

তৃপ্তি হলো জলবায়ু।

একটি সুন্দর জীবনের অদৃশ্য পরিবেশ।

অবিবেচনায় ব্যবহার করা টাকা শুধু শব্দ কেনে।

জ্ঞান দিয়ে ব্যবহার করা টাকা জায়গা কিনে।

শ্বাস নেওয়ার জায়গা।

ভালোবাসার জায়গা।

ক্ষমা করার জায়গা।

সুস্থ হয়ে ওঠার জায়গা।

নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জায়গা।

আর হয়তো মানুষের আসল চাওয়াও এটুকুই—

অন্তহীন আনন্দ নয়।

অসীম বিলাসিতা নয়।

শুধু অস্তিত্বের ভেতরে একটি নীরব কক্ষ,

যেখানে আত্মা অবশেষে বসে পড়তে পারে,

জুতো খুলে রেখে নিজেকেই ফিসফিস করে বলতে পারে—

"অবশেষে— আমার যা দরকার ছিল, তা আমার আছে।"

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

বিলাসিতার ধর্ম

বিলাসিতা কোনো হীরের টুকরো নয় যে অহংকারের সঙ্গে অলসভাবে ঘুমিয়ে থাকে কারও গলার অলংকার হয়ে।

এটি শুধু এমন একটি গাড়িও নয় যার গায়ে এত নিখুঁত পালিশ যে মেঘেরা থেমে যায় নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখার জন্য।

বিলাসিতা সম্পদের শব্দ নয়।

না—

বিলাসিতা আরও অদ্ভুত কিছু।

এটি হলো নিজের আত্মার গভীর স্থাপত্যের সঙ্গে কখনো আপস না করার প্রাচীন শিল্প।

এটি সেই নীরব বিদ্রোহ যা প্রত্যাখ্যান করে সব অমার্জিতকে, সব অপ্রয়োজনীয়কে, সবকিছুকে যা তোমার অস্তিত্বের পবিত্র সৌন্দর্যকে ক্ষুদ্র করে দেয়।

কারণ প্রত্যেক মানুষের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি অদৃশ্য প্রাসাদ।

কেউ তাকে পরিত্যাগ করে।

কেউ তাকে ভাড়া দিয়ে দেয় বিভ্রান্তি আর মাঝারিত্বের কাছে।

কিন্তু কিছু মানুষ—

অদ্ভুত কিছু মানুষ—

সারা জীবন ব্যয় করে তার প্রতিটি কক্ষ শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে সাজাতে।

---

বিলাসিতা শুরু হয় টাকা থেকে নয়।

এটি শুরু হয় মানদণ্ড থেকে।

“না” বলার সাহস থেকে।

নিজের আত্মাকে অপমান করে এমন সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করার শৃঙ্খলা থেকে।

জীবনের উপর কদর্যতার উপনিবেশ স্থাপন করতে না দেওয়ার দৃঢ়তা থেকে।

কারণ এমন মানুষ আছে যাদের কোটি কোটি সম্পদ আছে তবুও তারা নিজেদের মনের ভিতরে উদ্বাস্তুদের মতো বাস করে।

আবার এমন মানুষও আছে যাদের সম্পদ সামান্য কিন্তু তাদের জীবন একটি সুরের মতো সুন্দর।

কারণ বিলাসিতা সম্পদের প্রাচুর্য নয়।

এটি আপসহীনতার নাম।

---

বিলাসিতা হলো শরীরের প্রতি সুবিচার করে শৃঙ্খলার সঙ্গে জীবন কাটানোর পর সাদা পরিচ্ছন্ন বিছানায় নির্ভার ঘুমিয়ে পড়া।

বিলাসিতা হলো এতখানি মানসিক শান্তি অর্জন করা যে ঘুমের জন্য কোনো ওষুধের প্রয়োজন হয় না।

বিলাসিতা হলো এমন একটি ঘরে প্রবেশ করা যেখানে নীরবতাকেও সযত্নে সাজানো হয়েছে।

বিলাসিতা হলো কম জিনিসের মালিক হওয়া কিন্তু প্রতিটি জিনিসকে গভীরভাবে ভালোবাসা।

বিলাসিতা হলো পৃথিবী যখন আতঙ্কিত পশুর মতো ছুটে বেড়ায়, তখন ধীরে ধীরে এক কাপ চা পান করা।

বিলাসিতা হলো সময়।

বিলাসিতা হলো স্বাস্থ্য।

বিলাসিতা হলো স্বাধীন নির্বাচন।

বিলাসিতা হলো আত্মসম্মান।

---

খেয়াল করে দেখেছ?

চাঁদ কখনো সুন্দর হওয়ার জন্য ক্ষমা চায় না।

রাজহাঁস কখনো পুকুরের সঙ্গে দরকষাকষি করে না।

পর্বত কখনো নিজেকে ছোট করে না উপত্যকার স্বস্তির জন্য।

তারকারা কখনো অনুমতি চায় না অন্ধকারকে আলোকিত করার আগে।

প্রকৃতি নিজেই বিলাসিতার অর্থ জানে।

মহিমান্বিত সবকিছুই আপসহীন।

---

তাই জ্ঞানীরা হয়ে ওঠে পরিশীলনের সংগ্রাহক।

প্রদর্শনের জন্য নয়—

সামঞ্জস্যের জন্য।

তারা শব্দ বেছে নেয় যত্ন করে।

তারা নিজেদের মনোযোগকে রক্ষা করে।

তারা নিজেদের শরীরকে লালন করে।

তারা অপ্রয়োজনীয় বিশৃঙ্খলাকে সরিয়ে দেয়।

তারা সংখ্যার চেয়ে গভীরতাকে বেশি ভালোবাসে।

শব্দের চেয়ে শ্রেণিকে।

করতালির চেয়ে অর্থপূর্ণতাকে।

এবং ধীরে ধীরে তাদের সমগ্র জীবন পরিণত হয় ঈশ্বরের লেখা একটি মার্জিত চিঠিতে।

---

বিলাসিতা হলো একটি নৈশভোজ যেখানে কথোপকথন আত্মাকেও পুষ্ট করে।

বিলাসিতা হলো শৃঙ্খল ছাড়া ভালোবাসতে পারা।

বিলাসিতা হলো অসম্মানের কাছ থেকে হেঁটে চলে যাওয়ার ক্ষমতা।

বিলাসিতা হলো জনতার মতামত থেকে স্বাধীন হওয়া।

বিলাসিতা হলো এতখানি আত্মমূল্য অর্জন করা যে তুমি আর ভিক্ষা করো না সেসব টেবিলে বসার যেখানে তোমার জীবনের ক্ষুধা ক্ষুদ্র হয়ে যায়।

বিলাসিতা হলো অন্তরে এতখানি সমৃদ্ধ হওয়া যে একাকীত্বও শান্তির পোশাক পরে তোমার কাছে আসে।

---

অন্যদিকে, মাঝারি মানুষরা পূজা করে অতিরিক্ততার।

আরও পোশাক।

আরও মর্যাদা।

আরও মনোযোগ।

আরও শব্দ।

তাদের ঘর বড় হয়।

তাদের আত্মা ছোট হয়ে যায়।

তারা সঞ্চয়কে মনে করে উন্নতি।

কিন্তু বিলাসিতা কখনো সংখ্যার মধ্যে বাস করেনি।

বিলাসিতা ভালোবাসে নিখুঁততা।

একটি জাপানি তলোয়ারের মতো।

একটি বেহালার মতো।

দুই প্রেমিকের মধ্যকার একটি ফিসফিসানির মতো।

একটি নিখুঁত বাক্যের মতো।

অথবা এমন একটি জীবনের মতো যেখান থেকে অপ্রয়োজনীয় সবকিছু সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

---

সম্ভবত সেই কারণেই প্রকৃত বিলাসিতা প্রায় আধ্যাত্মিক অনুভূতি জাগায়।

কারণ প্রতিটি সুন্দর জিনিস নীরবে একটি প্রশ্ন করে—

“এটি কি তোমার সর্বোচ্চ সত্তার প্রতিফলন?”

তোমার ভয়ের নয়।

তোমার ক্ষতের নয়।

তোমার ক্ষুধার নয়।

বরং তোমার সর্বোচ্চ সত্তার।

সেই সত্তার যে সামঞ্জস্য খোঁজে।

যে গুণমানকে ভালোবাসে।

যে নীরব মর্যাদার সঙ্গে জীবনের পথে হাঁটে।

যে জানে অস্তিত্ব এতটাই মূল্যবান যে তাকে কখনো অযত্নে বাঁচানো যায় না।

---

আর একদিন,

বহু বছরের শৃঙ্খলার পর,

বহু বছরের বর্জনের পর,

বহু বছরের অতিরিক্তের উপর সৌন্দর্যকে বেছে নেওয়ার পর,

তুমি হয়তো আবিষ্কার করবে—

বিলাসিতা কখনো এমন কিছু ছিল না যা তুমি কিনেছিলে।

এটি এমন কিছু যাতে তুমি নিজেই পরিণত হয়েছ।

কারণ বিলাসিতা হলো আপসহীনভাবে বাঁচার শিল্প,

যেখানে তোমার প্রতিটি বিবরণ—

তোমার চিন্তা,

তোমার অভ্যাস,

তোমার সম্পর্ক,

তোমার পরিবেশ,

তোমার শব্দ,

তোমার সকাল,

তোমার স্বপ্ন—

সবকিছুই হয়ে ওঠে একটি আয়না,

যেখানে প্রতিফলিত হয়

তোমার সবচেয়ে সুন্দর সংস্করণ।

এবং তখন,

কোনো ঘোষণা ছাড়াই,

কোনো প্রশংসা দাবি না করেই,

কাউকে কিছু প্রমাণ না করেই,

তুমি হয়ে ওঠো

শ্রেণির এক জীবন্ত ক্যাথেড্রাল,

যে নীরবে হেঁটে চলে

একটি কোলাহলময় পৃথিবীর ভেতর দিয়ে।

একের ধর্ম

বেশিরভাগ মানুষ বুদ্ধির অভাবে, সুযোগের অভাবে বা প্রতিভার অভাবে ধ্বংস হয় না।

তারা ধ্বংস হয় কারণ তারা একসঙ্গে অনেক দেবতার উপাসনা করতে চায়।

একদিন তারা অর্থের পেছনে দৌড়ায়।

পরের দিন প্রশংসার।

তার পরের দিন আরামের।

তারপর প্রেম।

তারপর মর্যাদা।

তারপর বিনোদন।

তাদের মন একসময় এমন এক ভিড়ভাট্টার বিমানবন্দরে পরিণত হয়, যেখানে হাজার হাজার স্বপ্ন উড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ একটিকেও উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয় না।

ফলে তাদের জীবন শব্দে পরিপূর্ণ হলেও গতিহীন থেকে যায়।

কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার ওপারে একটি প্রাচীন গোপন সত্য বাস করে।

নিজের মনোযোগকে একটি মাত্র বিষয়ে সীমাবদ্ধ করো।

অনেকগুলোর মধ্যে নয়।

একটি।

তোমার অস্তিত্বের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র উদ্দেশ্য, যেন অন্ধকার সমুদ্রের মাঝে জ্বলতে থাকা একাকী বাতিঘর।

যেই মুহূর্তে তুমি একটি মাত্র গন্তব্য বেছে নেবে, এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে শুরু করবে।

অন্তরের গৃহযুদ্ধ থেমে যাবে।

শক্তির অপচয় বন্ধ হবে।

প্রতিটি দিন নিজের সঙ্গে দরকষাকষি করা বন্ধ করবে।

ধীরে ধীরে তোমার সমগ্র সত্তা এমন হয়ে উঠবে, যেন আতশকাচের নিচে কেন্দ্রীভূত সূর্যালোক।

ছড়িয়ে থাকা আলো কেবল আলোকিত করে।

কেন্দ্রীভূত আলো দহন ঘটায়।

সবচেয়ে শক্তিশালী নদী সবচেয়ে প্রশস্ত নয়।

সবচেয়ে শক্তিশালী নদী সেই, যে নিজেকে ভাগ হতে দেয় না।

অতএব তোমার পর্বত নির্বাচন করো।

তারপর অপ্রয়োজনীয় উপত্যকাগুলোর প্রতি অন্ধ হয়ে যাও।

কিন্তু উদ্দেশ্য একাই মানুষকে রক্ষা করতে পারে না।

কারণ প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটি অদৃশ্য বিচারক বাস করে।

সে তোমার নিজের কাছে করা প্রতিটি প্রতিশ্রুতি মনে রাখে।

তুমি যখন ভোরে ওঠার অঙ্গীকার করো, সে তা দেখে।

তুমি যখন কাজ পিছিয়ে দাও, সে তাও দেখে।

তুমি যখন নিজেকেই প্রতারণা করো, সে নীরবে তার হিসেবের খাতায় তা লিখে রাখে।

এবং পৃথিবীর মানুষকে যেমন প্রতারিত করা যায়, তাকে তেমন প্রতারিত করা যায় না।

প্রতিবার তুমি নিজের কথার খেলাপ করলে, সেই বিচারক তোমার নেতৃত্বের উপর থেকে বিশ্বাস হারাতে থাকে।

তোমার অন্তরের রাজ্য বিদ্রোহ করতে শুরু করে।

তোমার আত্মবিশ্বাস ফাঁপা হয়ে যায়।

তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকের ভাষণের মতো শোনাতে থাকে।

কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যাবাদী সেই মানুষ, যে প্রতিদিন নিজেকেই হতাশ করে।

তাই নিজের কাছে দেওয়া কথা যেকোনও মূল্যে রক্ষা করো।

তোমার প্রতিশ্রুতিগুলোকে পবিত্র স্মৃতিচিহ্নের মতো আগলে রাখো।

যদি বিশ মিনিটের প্রতিশ্রুতি দাও, বিশ মিনিটই দাও।

যদি এক পৃষ্ঠা পড়ার প্রতিশ্রুতি দাও, এক পৃষ্ঠাই পড়ো।

যদি একবার হাঁটার প্রতিশ্রুতি দাও, হাঁটো।

নাটকীয়ভাবে ভেঙে যাওয়া বিশাল প্রতিশ্রুতির চেয়ে নীরবে পূরণ করা ক্ষুদ্র প্রতিশ্রুতির শক্তি অনেক বেশি।

কারণ আত্মসম্মান সাফল্য থেকে জন্ম নেয় না।

আত্মসম্মান জন্ম নেয় নিজের বিবেকের প্রতি আনুগত্য থেকে।

প্রতিটি রক্ষিত প্রতিশ্রুতি মর্যাদার প্রাসাদে আর একটি পাথর যুক্ত করে।

একদিন হঠাৎ তুমি আবিষ্কার করবে—

তোমার মন আর তোমার সঙ্গে দরকষাকষি করছে না।

সে তোমাকে বিশ্বাস করছে।

তোমার আত্মা আর বিদ্রোহ করছে না।

সে তোমার নির্দেশ অনুসরণ করছে।

তোমার অগ্রগতি তখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে, কারণ তুমি নিজের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছ।

আর ঐক্যই শক্তি।

তারপর আসে সবচেয়ে ভুল বোঝা গুণটি—

ধারাবাহিকতা।

পৃথিবী তীব্রতাকে পূজা করে।

কিন্তু অস্তিত্ব পূজা করে পুনরাবৃত্তিকে।

মানুষ অসাধারণ দিনের স্বপ্ন দেখে।

জ্ঞানীরা নীরবে সাধারণ দিনগুলোকে আয়ত্ত করে।

কারণ তারা জানে, মহত্ত্বের জন্ম হয় একঘেয়েমির গর্ভে।

সত্যি বলতে, একঘেয়েমি তোমার শত্রু নয়।

একঘেয়েমি হলো সেই শুল্কদ্বার, যার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিটি মহৎ রাজ্য।

বেশিরভাগ মানুষ ফিরে যায় যখন একই কাজ বারবার করতে হয়।

একই ব্যায়াম।

একই সঞ্চয়।

একই অনুশীলন।

একই শৃঙ্খলিত সকাল।

তাদের অনুভূতি নতুনত্ব চায়।

তাদের মন বিনোদন চায়।

এবং তারা উত্তেজনার দাস হয়েই বেঁচে থাকে।

কিন্তু বিরল কিছু মানুষ এক অদ্ভুত শিল্প রপ্ত করে।

তারা একঘেয়েমি সহ্য করতে শেখে।

বিরক্ত হয়ে নয়।

অভিযোগ করে নয়।

বরং গর্বের সঙ্গে।

নিঃশব্দে।

যেন কোনো সন্ন্যাসী পবিত্র প্রদীপ পাহারা দিচ্ছে।

দিনের শেষে তারা নিজেদের পুরস্কৃত করে—

সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে নয়।

করতালি দিয়ে নয়।

অন্যের প্রশংসা দিয়ে নয়।

বরং একটি নীরব ফিসফিসে কণ্ঠে—

"ভালো করেছো।

আজও তুমি পথ ছাড়োনি।"

আর সেই ফিসফিসানিই তাদের খাদ্যে পরিণত হয়।

কারণ একঘেয়েমি সহ্য করার ক্ষমতা সাহসের সর্বোচ্চ রূপগুলোর একটি।

একদিনের জন্য বীর হওয়া সহজ।

দশ বছর ধরে বিশ্বস্ত থাকা অত্যন্ত বিরল।

পর্বত বিস্ফোরণে তৈরি হয় না।

তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তৈরি হয়।

সম্পদ অলৌকিকতায় জন্ম নেয় না।

জন্ম নেয় চক্রবৃদ্ধি পুনরাবৃত্তিতে।

এক টাকা সঞ্চয়।

একটি দক্ষতার উন্নতি।

একজন গ্রাহককে সন্তুষ্ট করা।

একটি অধ্যায় পড়া।

একটি ক্ষুদ্র অগ্রগতি।

হাজার হাজার বার পুনরাবৃত্ত হওয়া এই ক্ষুদ্র উন্নতিগুলোই সাম্রাজ্যের জন্ম দেয়।

হয়তো একদিন পৃথিবী এমন একজন মানুষকে বিলিয়নিয়ার বলে ডাকবে।

কিন্তু সম্পদ আসল অলৌকিকতা নয়।

আসল অলৌকিকতা হলো এমন একজন মানুষে পরিণত হওয়া, যার আর অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হয় না।

যে প্রতিশ্রুতিকে চরিত্রে রূপান্তর করেছে।

চরিত্রকে শৃঙ্খলায়।

শৃঙ্খলাকে ধারাবাহিকতায়।

ধারাবাহিকতাকে মূল্যে।

এবং মূল্যকে প্রাচুর্যে।

এমন মানুষ ভয়ংকর শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

কারণ তারা অসাধারণ বলে নয়।

বরং তারা সাধারণকে সহ্য করার শিল্প শিখে ফেলেছে বলে।

আর হয়তো এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য—

বিলিয়নিয়াররা উত্তেজনা থেকে জন্ম নেয় না।

তারা জন্ম নেয় হাজার হাজার নিরস দিনের ভেতর থেকে, যেগুলো সহ্য করার ধৈর্য অন্য কারও ছিল না।

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

সময়ের রসায়ন

মূর্খেরা সময় ব্যয় করে যেমন ফুটো ছাদ বৃষ্টিকে ব্যয় করে—

স্মৃতি ছাড়া, কৃতজ্ঞতা ছাড়া, কোনও স্থাপত্য ছাড়া।

ঘণ্টাগুলো তাদের আঙুলের ফাঁক দিয়ে ভাঙা জাল থেকে পালিয়ে যাওয়া আতঙ্কিত মাছের মতো ফসকে চলে যায়।

তারা ঘড়ির নীচে বসে থাকে যেমন বন্দীরা প্রহরী টাওয়ারের নীচে বসে থাকে, ভাগ্যকে দোষ দেয়, অদৃষ্টকে গালি দেয়, অদৃশ্য শত্রুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে,

তবু খেয়াল করে না—

যে সাম্রাজ্য তাদের ধ্বংস করছে তার কোনও বর্ম নেই—

আছে শুধু একটি ক্যালেন্ডার।

তারা তাদের বছরগুলো রঙিন মোড়কে মোড়া বিভ্রান্তির কাছে বিক্রি করে দেয়।

তারা তাদের সকালগুলো দ্বিধার কাছে উৎসর্গ করে।

তারা তাদের সন্ধ্যাগুলো অপ্রয়োজনীয় কোলাহলের কাছে বলি দেয়।

এবং ধীরে ধীরে,

কোনও শবযাত্রার সুর না শুনেই,

তাদের সম্ভাবনাগুলো পচে যেতে থাকে যেমন অন্ধকার ফ্রিজের ভেতরে ভুলে রাখা ফল পচে যায়।

অথচ,

অজুহাতের বাজার থেকে বহু দূরে,

জ্ঞানীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আচার পালন করে।

তারা সময়ের রসায়নবিদ।

তারা প্রতিটি ভোরে প্রবেশ করে যেন কোনও কামার একটি পবিত্র অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করছে।

একটি ঘণ্টা রূপান্তরিত হয় জ্ঞানে।

জ্ঞান রূপান্তরিত হয় দক্ষতায়।

দক্ষতা রূপান্তরিত হয় মূল্যে।

মূল্য রূপান্তরিত হয় প্রভাবে।

আর প্রভাব, ধৈর্যের সঙ্গে সঞ্চিত হতে হতে, অবশেষে শক্তিতে পরিণত হয়।

তারা শুধু ঘড়ির মালিক নয়—

তারা ঘড়িকে পরিচালনা করে।

যেখানে অন্যেরা সময় ভোগ করে,

সেখানে তারা সময়ে বিনিয়োগ করে।

যেখানে অন্যেরা ঘণ্টাকে হত্যা করে,

সেখানে তারা ঘণ্টাকে সন্তান উৎপাদন করতে শেখায়।

একটি মাত্র শৃঙ্খলাবদ্ধ সকাল থেকে ভবিষ্যতের অসংখ্য সুযোগের সেনাবাহিনী জন্ম নেয়।

কারণ জ্ঞানীরা একটি ভয়ঙ্কর সত্য জানে—

সময় নিজে নিরপেক্ষ।

সে কাউকে ভালবাসে না।

সে কারও দাস নয়।

কিন্তু যে মানুষ বারবার তাকে উপহার দেয় মনোযোগ, শৃঙ্খলা, এবং উদ্দেশ্য,

সময় তার অদৃশ্য হাত দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেয় সঞ্চিত দিনের ধাতুতে গড়া একটি মুকুট।

এবং তখন ভাগ্য—

যে রহস্যময় প্রাণীকে মূর্খেরা "সৌভাগ্য" বলে ডাকে—

নিঃশব্দে এসে সেই মানুষের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে।

কারণ ভাগ্য খুব কম ক্ষেত্রেই অলৌকিক ঘটনায় নির্ধারিত হয়।

ভাগ্য নির্ধারিত হয় অভ্যাস দ্বারা।

সাধারণ সকাল দ্বারা।

সেইসব পুনরাবৃত্ত সিদ্ধান্ত দ্বারা যেগুলো এত ক্ষুদ্র যে করতালিও তাদের চিনতে পারে না।

ভালো করে তাকিয়ে দেখো।

ক্ষমতাবানরা সবসময় শক্তিশালী নয়।

তারা কেবল শিখেছে কীভাবে ঘণ্টাকে অস্ত্রে রূপান্তরিত করতে হয়, মিনিটকে সিঁড়িতে, আর বছরকে সাম্রাজ্যে।

আর তাই মূর্খেরা বৃদ্ধ হয় এই প্রশ্ন করতে করতে—

"জীবন আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করল কেন?"

আর জ্ঞানীরা বৃদ্ধ হয় একটি মৃদু হাসি নিয়ে,

কারণ তারা জানে—

জীবন কখনও কাউকে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।

সে কেবল বহুগুণে ফিরিয়ে দিয়েছে যা কিছু মানুষ নিয়মিতভাবে বপন করেছে সময়ের মাটির মধ্যে।

কারণ সময়ই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট।

তাকে অবহেলা করো—

সে তোমার উপর রাজত্ব করবে।

তাকে আয়ত্ত করো—

আর তার অদৃশ্য যন্ত্রপাতির মাধ্যমে

তুমিও ধীরে ধীরে, মহিমান্বিতভাবে,

নিজের ভাগ্যের বিধাতা হয়ে উঠবে।

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

ন্যূনতম

অস্তিত্বের গভীরে একটি অদ্ভুত নিয়ম লুকিয়ে আছে, যা পৃথিবী খুব কমই মানুষকে শেখায়।

অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে প্রাচুর্য জন্ম নেয় সঞ্চয় থেকে।

আরও সম্পদ। আরও পরিকল্পনা। আরও বিকল্প। আরও সম্পর্ক। আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষা। আরও শব্দ।

আর তাই তারা সারাজীবন আতঙ্কিত সংগ্রাহকের মতো বেঁচে থাকে— নিজেদের দিনগুলোকে অপ্রয়োজনীয় আসবাবে ভরে তোলে, যতক্ষণ না তাদের আত্মা একদিন এমন এক গুদামে পরিণত হয় যেখানে মূল্যবান কিছুই আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

কিন্তু প্রকৃতি অন্য এক গোপন কথা ফিসফিস করে।

নদী সমুদ্রে পৌঁছায় হাজার দিকে ছড়িয়ে পড়ে নয়, বরং নিজেকে একটি মাত্র প্রবাহের কাছে সমর্পণ করে।

তির কখনও সমগ্র আকাশকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে না। সে একটি মাত্র লক্ষ্য নির্বাচন করে এবং একনিষ্ঠতার সঙ্গে তাকে বিদ্ধ করে।

সূর্যের আলো সাধারণত উষ্ণতা দেয়।

কিন্তু একই আলো যখন একটি উত্তল কাচের মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তা আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।

ন্যূনতমতা দারিদ্র্য নয়।

ন্যূনতমতা হলো একাগ্রতা।

এটি সেই পবিত্র শিল্প, যা তোমার শক্তিকে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে বাধা দেয় এমন সমস্ত কিছু সরিয়ে দেয়।

কারণ প্রতিটি বর্জিত বিকল্পের সঙ্গে সঙ্গে এক গোপন শক্তির জন্ম হয়।

ঘর থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় বস্তু তোমার মনের মধ্যে নতুন শূন্যতা সৃষ্টি করে।

সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানো প্রতিটি অর্থহীন সম্পর্ক তোমার আত্মাকে আবার অক্সিজেন ফিরিয়ে দেয়।

সমাধিস্থ করা প্রতিটি বিভ্রান্তি তোমার মনোযোগের ছুরিকে আরও ধারালো করে।

কারণ মনোযোগ অসীম নয়।

এটি এক পবিত্র মুদ্রা।

যদি তাকে সর্বত্র ব্যয় করো, তবে তার মূল্য নষ্ট হয়ে যায়।

যদি তাকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করো, তবে সে রূপান্তর ঘটাতে পারে।

মধ্যম মানের মানুষ সীমাবদ্ধতাকে ভয় পায়, কারণ তারা স্বাধীনতাকে অসীম বিকল্পের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে।

কিন্তু অতিরিক্ত বিকল্প প্রায়ই বাগানের আগাছার মতো আচরণ করে।

তারা বৈচিত্র্যের প্রতিশ্রুতি দেয়, অথচ শেষ পর্যন্ত ফুলগুলোকেই শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে।

জ্ঞানীরা অন্য কিছু জানে।

সিংহ একটি মাত্র হরিণকে তাড়া করে।

একজন সার্জন একটি মাত্র ক্ষতের উপর মনোযোগ দেয়।

একজন কবি খোঁজে একটি মাত্র নিখুঁত শব্দ।

আর একজন প্রেমিক, যখন সত্যিই প্রেমে পড়ে, তখন পৃথিবীর বাকি মুখগুলোকে ভুলে যায়।

তীব্রতা জন্ম নেয় বর্জন থেকে।

গভীরতা কিনতে হয় ত্যাগের বিনিময়ে।

মহাবিশ্ব নিজেই মিনিমালিজম চর্চা করে।

অগণিত নক্ষত্র মাত্র কয়েকটি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে চলে।

একটি বিশাল বৃক্ষ একটি মাত্র মূল থেকে জল পান করে।

হৃদয় জন্মের পর থেকে লক্ষ লক্ষ স্পন্দন সম্পন্ন করলেও অনুসরণ করে একটি মাত্র ছন্দ।

এমনকি জীবন নিজেও শুরু হয়েছিল একটি মাত্র কোষ থেকে।

সৃষ্টির প্রকৃতি সরলতাকে ভালোবাসে।

একমাত্র মানুষই নিজের পিঠে অপ্রয়োজনীয় আকাঙ্ক্ষার কবরস্থান বহন করতে জেদ ধরে।

তারপর সে বিস্মিত হয়ে ভাবে, তার স্বপ্নগুলো এত ধীরে এগোয় কেন।

যখন তুমি তোমার বিকল্প কমিয়ে আনো, তখন এক রহস্যময় ঘটনা ঘটে।

তোমার মনোযোগ যেন বহু বছরের নির্বাসন শেষে ঘরে ফিরে আসা এক সৈন্যবাহিনীর মতো আবার একত্রিত হতে শুরু করে।

বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়।

বিভ্রান্ত শক্তিগুলো অনুগত হয়ে ওঠে।

মন আর বাজারের মতো আচরণ করে না— সে লেজারের মতো হয়ে ওঠে।

আর তখন তোমার অনুপ্রবেশের ক্ষমতা বদলে যায়।

তুমি আর একশোটি লক্ষ্যের গায়ে সামান্য আঁচড় কাটো না।

তুমি একটি মাত্র লক্ষ্যের হৃদয়ে প্রবেশ করো।

তোমার কথাগুলো ভারী হয়ে ওঠে।

তোমার কাজগুলো নিখুঁততা লাভ করে।

তোমার প্রচেষ্টা আর অদৃশ্য ফাটল দিয়ে অপচয় হয়ে যায় না।

হঠাৎ অসম্ভবও আলোচনাযোগ্য হয়ে ওঠে।

কারণ প্রাচুর্য কখনও অতিরিক্ততার সন্তান ছিল না।

প্রাচুর্যের জন্ম হয় তখনই, যখন অপ্রয়োজনীয়ের মৃত্যু ঘটে।

হয়তো সেই কারণেই একজন ভাস্কর নতুন মার্বেল যোগ করে নয়, বরং অতিরিক্ত অংশ সরিয়ে দিয়ে শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন।

হয়তো মহত্ত্ব নিজেই শিল্পের ছদ্মবেশে আবির্ভূত এক বর্জনের প্রক্রিয়া।

আর হয়তো সত্যিকার ধনী তারাই—

যারা সবচেয়ে বেশি জিনিসের মালিক নয়,

বরং যারা সবচেয়ে কম প্রয়োজন নিয়ে বাঁচতে শিখেছে, অপরিহার্যকে ভালোবাসতে শিখেছে, এবং নিজেদের সমগ্র অস্তিত্বকে সেই একমাত্র বিষয়ে নিবেদন করেছে যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একটি কেন্দ্রীভূত আত্মা ভয়ঙ্কর শক্তিশালী।

সে বিশৃঙ্খলাকে ছিন্ন করে।

সে বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে অক্ষত অবস্থায় হেঁটে যায়।

আর যখন সে অবশেষে তার গন্তব্যে পৌঁছায়,

সে ভদ্রভাবে কড়া নাড়ে না।

সে সরাসরি বাস্তবতার হৃদয়ে প্রবেশ করে।

অতিরিক্ততা

মূর্খ এবং মধ্যম মানের মানুষরা প্রায়ই নিজেদের কাঁধের জন্য অতিরিক্ত ভারী পতাকার নীচে শোরগোলপূর্ণ মিছিল করে বেড়ায়।

ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঝাড়বাতির নীচে বসে তারা তর্ক করে, স্বর্গের স্থাপত্য নিয়ে বিতর্ক চালায়, আর ধার করা স্লোগানে ভরা মুখ দিয়ে সমতার প্রতিশ্রুতি বিলায়।

নিজেদের ভিতরের একটি অগোছালো ড্রয়ার গুছিয়ে নিতে শেখার আগেই তারা পুরো মহাদেশ পুনর্বিন্যাস করার স্বপ্ন দেখে।

তাদের কণ্ঠস্বর উচ্চ।

তাদের জীবন নয়।

এদিকে, মিছিল থেকে বহু দূরে, জ্ঞানীরা অদ্ভুতভাবে অদৃশ্য হয়েই থাকেন।

কোনও ঢাক তাদের আগমনের ঘোষণা দেয় না।

কোনও জনতা তাদের ঘিরে রাখে না।

কোনও স্মৃতিস্তম্ভ তাদের নাম বহন করে না।

তারা ব্যস্ত থাকে বর্জনের প্রাচীন রসায়নচর্চায়।

যখন অন্যেরা মানবজাতিকে নতুন করে সাজাতে চায়, তখন তারা নীরবে নিজেদের সকালগুলোকে নতুনভাবে গড়ে তোলে।

যখন মতবাদের পূজারীরা তর্ক করে পৃথিবীর মালিকানা কার হওয়া উচিত, তখন তারা নিজেদের কাছে অনেক ছোট অথচ অনেক বেশি ভয়ঙ্কর একটি প্রশ্ন রাখে—

"আমার আত্মার ভিতরে প্রকৃতপক্ষে কোন জিনিসটির স্থান পাওয়ার অধিকার আছে?"

এভাবেই তারা হয়ে ওঠে অপরিহার্যের উদ্যানপালক।

তারা বিভ্রান্তিগুলোকে ফলগাছের মৃত ডালের মতো ছেঁটে ফেলে।

তারা অপ্রয়োজনীয় আকাঙ্ক্ষাগুলোকে এমনভাবে সরিয়ে দেয়, যেমন একজন ভাস্কর অতিরিক্ত মার্বেল কেটে ফেলে।

তারা বোঝে, প্রাচুর্য প্রায়ই যোগ থেকে নয়—

বরং বর্জন থেকেই জন্ম নেয়।

কারণ তারা অস্তিত্বের অন্তরে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত গোপন সত্য আবিষ্কার করেছে—

মহাবিশ্ব নিজেই ন্যূনতমতার চর্চা করে।

একটি গাছ হাজার হাজার পাতা সৃষ্টি করে, অথচ পান করে একটি মাত্র মূল থেকে।

হৃদয় লক্ষ লক্ষ স্পন্দন সম্পন্ন করে, অথচ অনুসরণ করে একটি মাত্র ছন্দকে।

নক্ষত্রেরা অসীমভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তবু মহাকর্ষ তাদের অদৃশ্য সরলতার প্রতি বিশ্বস্ত রাখে।

একমাত্র মানুষই জেদ ধরে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাহাড়ের নীচে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চায়।

মধ্যম মানের মানুষ সংখ্যা পূজা করে।

জ্ঞানীরা পূজা করে সারবস্তুকে।

মধ্যম মানের মানুষ মতামত সংগ্রহ করে।

জ্ঞানীরা সংগ্রহ করে স্বচ্ছতা।

মধ্যম মানের মানুষ বাইরের বিপ্লব খোঁজে।

জ্ঞানীরা শুরু করে অন্তরের বিপ্লব দিয়ে।

আর হয়তো সেই কারণেই মহান নদীগুলো নিঃশব্দে প্রবাহিত হয়, অথচ অগভীর খাল-বিল শব্দ করে চলে।

হয়তো সত্য নিজেই বক্তৃতার চেয়ে ফিসফিসানি বেশি পছন্দ করে।

হয়তো মহত্ত্ব বরাবরই কম বেছে নেওয়ার শিল্পের মধ্যেই বাস করে এসেছে।

তাই যখন জনতা ইতিহাসের অন্তহীন করিডোর জুড়ে মহৎ তত্ত্বের পিছনে ছুটে বেড়ায়,

জ্ঞানীরা তখন নীরব প্রদীপের পাশে বসে অপ্রয়োজনীয়কে বর্জন করে, পবিত্রকে রক্ষা করে, এবং এক একটি অপরিহার্য বিষয়কে কেন্দ্র করে অদৃশ্য সাম্রাজ্য নির্মাণ করে।

কারণ তারা জানে—

যে মানুষ অতিরিক্ততাকে জয় করতে পারে, তাকে বাঁচানোর জন্য কোনও মতবাদের প্রয়োজন হয় না।

তার স্বাধীনতা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

আর অনন্তকালের সেই অদ্ভুত গণিতে,

একটি নিয়মানুবর্তী আত্মা প্রায়ই হাজারো অস্থির জনতার চেয়ে অনেক মহত্তর হয়ে ওঠে—

যে জনতারা অধিকাংশ সময়ই তুচ্ছ উদ্দেশ্যের পিছনে দৌড়ে বেড়ায়।

আত্মশ্রদ্ধা

শিখে নাও কীভাবে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে শুভেচ্ছা জানাতে হয়, যখন তুমি চরম আত্মবিশ্বাস নিয়ে ক্রমাগত বেড়ে উঠছ।

অধিকাংশ মানুষ নিজেদের স্বপ্নের কাছে ক্ষমা চেয়ে বাঁচে।

তারা তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চোরাই মালপত্রের মতো পুরনো কোটের নীচে লুকিয়ে বহন করে, যেন পৃথিবী উপহাসের নামে তা বাজেয়াপ্ত করে নিতে পারে। তারা নিজেদের ইচ্ছার কথা ফিসফিসিয়ে বলে, যেন বড় কিছু চাওয়া বিনয়ের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ।

ফলে তাদের স্বপ্নগুলো অনাথ হয়ে যায়।

কিন্তু দৃশ্যমান আকাশের বহু ওপারে এক অদ্ভুত গির্জা আছে, যেখানে সমস্ত পরিত্যক্ত স্বপ্ন এসে জড়ো হয়।

অপ্রকাশিত বইগুলো সেখানে ধুলো জমিয়ে বসে থাকে। শুরু না হওয়া ব্যবসাগুলো অসমাপ্ত আগামীকালের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মহৎ নিয়তিগুলো মাকড়সার জালে আবৃত হয়ে অপেক্ষা করে— কখন তাদের মালিক ফিরে আসবে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা লোভ নয়।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা হলো পেশীবহুল এক প্রার্থনা।

এ যেন মহাবিশ্ব তোমার অস্তিত্বের সরু করিডোর দিয়ে নিজেকে আরও প্রসারিত করতে চাইছে।

তাহলে কেন তুমি অভিশাপ দাও সেই শক্তিকে, যাকে পাঠানো হয়েছে তোমাকে আরও বৃহৎ করে তোলার জন্য?

তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আশীর্বাদ করো।

ভোরবেলায় যেমন একজন মালী নবীন চারাগাছের গায়ে আলতো করে হাত রাখে, তেমনি তোমার অসম্ভব ইচ্ছাগুলোর উপর স্নেহের হাত রাখো। নিজের গভীরতম আকাঙ্ক্ষাগুলোকে শত্রুর মতো আচরণ করা বন্ধ করো।

ইতিহাসের প্রতিটি মহান অর্জন একসময় কোনও সাধারণ মানুষের মাথার ভেতর কাঁপতে থাকা এক অসম্ভব চিন্তা ছিল।

তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তোমার অনুমতির অপেক্ষায় নেই।

সে ইতিমধ্যেই জন্ম নিয়েছে।

বরং সে-ই তোমাকে বেছে নিয়েছে।

তোমার বুকের গভীরে এক অদৃশ্য স্থপতি বাস করে, যে তোমার বর্তমান জীবনের চেয়ে অনেক বড় এক জীবনের স্মৃতি বহন করে। সে তোমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য অস্থিরতা পাঠায় না; সে তোমাকে জাগিয়ে তোলার জন্য তা পাঠায়।

অনেক সময় অস্থিরতাই অপূর্ণ মহত্ত্বের ভাষা।

তাই তোমার ক্ষুধাকে আশীর্বাদ করো।

তোমার নির্ঘুম রাতগুলোকে আশীর্বাদ করো।

যে অসন্তোষ তোমাকে ছোট হয়ে থাকতে দেয় না, তাকেও আশীর্বাদ করো।

যে পাহাড় তোমার হাঁটু কাঁপিয়ে দেয়, তাকেও আশীর্বাদ করো।

এমনকি তোমার ব্যর্থতাগুলোকেও আশীর্বাদ করো, কারণ তারা কেবল কামারের মতো তোমার চরিত্রকে হাতুড়ির আঘাতে আরও ধারালো অস্ত্রে পরিণত করছে।

আর বেড়ে ওঠো চরম আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

অহংকার নিয়ে নয়—

আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

অহংকার চিৎকার করে, কারণ সে ভিতরে ভিতরে ভীত।

আত্মবিশ্বাস নরম গলায় কথা বলে, কারণ সে অনিশ্চয়তার সঙ্গে অনেক আগেই করমর্দন করেছে।

নিজেকে এমন এক বৃক্ষ কল্পনা করো, যে কংক্রিট ভেদ করে বেড়ে উঠছে।

কংক্রিট তার অনুমোদন দেয় না।

পাখিরা তাকে বোঝে না।

চারপাশের পাথরগুলো তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে।

তবু বৃক্ষটি ঊর্ধ্বমুখী হয়।

মাটিকে ঘৃণা করে নয়—

বরং আকাশ তাকে ডেকে চলেছে বলে।

তুমিও তেমন হও।

সমালোচনাকে আবহাওয়া বানিয়ে ফেলো।

প্রত্যাখ্যানকে সার বানিয়ে ফেলো।

সন্দেহকে তোমার আত্মগঠনের কারখানার পটভূমির শব্দে পরিণত করো।

পৃথিবীর কাছে জিজ্ঞেস কোরো না তুমি তোমার স্বপ্নের যোগ্য কিনা।

সমুদ্র কখনও ঢেউ সৃষ্টি করার আগে অনুমতি চায় না।

নক্ষত্রেরা জ্বলে ওঠার আগে কারও সম্মতি নেয় না।

বসন্ত আগমনের জন্য কখনও ক্ষমা চায় না।

তাহলে তুমি কেন চাইবে?

তোমার সম্ভাবনার ভিতরে এখনও অগণিত ছায়াপথ আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

তোমার অভ্যাসের নীচে ঘুমিয়ে আছে সম্ভাবনার অসংখ্য সভ্যতা।

হয়তো ভবিষ্যতের সেই তুমি ইতিমধ্যেই সময়ের ওপারে কোনও মহিমান্বিত শিখরে দাঁড়িয়ে আছ, আর বিস্মিত হয়ে ভাবছ—

"তুমি এখনও শুরু করতে এত দেরি করছ কেন?"

তুমি কি তার ডাক শুনতে পাচ্ছ?

সে তোমার উপর রাগ করেনি।

সে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে।

সে জানে, একদিন তুমি ভয়ের উপাসনা বন্ধ করে উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আশীর্বাদ করতে শিখবে।

আর যেদিন তা ঘটবে, আত্মবিশ্বাস আর কোনও পরিশ্রম বলে মনে হবে না।

এটি মনে হবে যেন তুমি বহুদিনের বিস্মৃত এক সত্যকে পুনরায় স্মরণ করেছ।

কারণ হয়তো বেড়ে ওঠা মানে অন্য কেউ হয়ে ওঠা নয়।

হয়তো বেড়ে ওঠা মানে কেবল সেই মহত্ত্বের সঙ্গে একমত হয়ে যাওয়া, যাকে জীবন বহু আগে গোপনে তোমার ভেতরে রোপণ করেছিল।

তাই তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আশীর্বাদ করো।

তাকে খাদ্য দাও।

তাকে রক্ষা করো।

অসীম বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে ওঠো।

আর পৃথিবীর বুকে এমনভাবে হেঁটে বেড়াও, যেন তোমার স্বপ্ন এবং অনন্তকালের মধ্যে এক গোপন ঐশ্বরিক ষড়যন্ত্রের দায়িত্ব তোমার হাতে অর্পিত হয়েছে।

ভালবাসলে

ভালবাসলে
_________
.
ভাল না বাসতে পারলে বড় মনমরা হয়ে থাকে নারী।

আর ভালবাসলেই সে প্রথম অনুভব করে— যেন তার মন আসলে কোনো মন নয়, বরং বহুদিন ধরে খাঁচাবন্দী এক আকাশ, যার ডানাগুলো ভাঁজ হয়ে ছিল ভুলে যাওয়া ঋতুর ধুলোয়।

হঠাৎ একদিন কারও স্নেহমাখা দৃষ্টির স্পর্শে সেই আকাশের গায়ে জন্মায় জাদু-বাতাস, আর সে দেখে— তার ভেতরে এতদিন অগণিত পরিযায়ী মেঘ অপেক্ষা করছিল উড়ে যাবার জন্য।

তারপর সে ডানা মেলে।

প্রথমে লাজুকভাবে, যেমন নদী পাহাড় ছেড়ে নামতে গিয়ে একবার ফিরে তাকায় উৎসের দিকে।

তারপর ধীরে ধীরে তার হাসি হয়ে ওঠে সাদা বকের ঝাঁক, তার স্বপ্ন হয়ে ওঠে নীল গ্রহের চারপাশে অদৃশ্য কক্ষপথে ঘুরতে থাকা চাঁদ।

সে রোজ নিত্যনূতন কবিতা হয়ে উড়ে যায় বাঁধনহারা খুশির আকাশে।

সেখানে সূর্য ওঠে প্রেমিকের কণ্ঠস্বর হয়ে, চাঁদ ঝোলে তার অপেক্ষার জানালায়, আর প্রতিটি নক্ষত্র ভালবাসার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিশ্রুতি হয়ে রাত্রির কপালে জ্বলে থাকে।

কিন্তু উড়ান শুধু ডানা দিয়ে হয় না।

আকাশও চাই।

বিশ্বাসও চাই।

একটি আশ্রয়ও চাই যেখানে ক্লান্ত পাখি ফিরে এসে নিঃশব্দে মাথা রাখতে পারে।

সেইজন্যই নারীর উড়ান দীর্ঘস্থায়ী হয় একমাত্র প্রেমিকের ভালবাসা মাখানো সাহচর্যে।

যে পুরুষ তার পাশে থাকে মালিক হয়ে নয়, আকাশ হয়ে—

যে তার ডানা ছেঁটে দেয় না, বরং বাতাস ধার দেয়—

যে তাকে বেঁধে রাখে না, বরং হারিয়ে যেতে দেয় নিজেরই অসীমতার মধ্যে—

তার সঙ্গেই নারী উড়তে উড়তে আবিষ্কার করে ভালবাসার গোপন জ্যোতির্বিদ্যা।

তখন আর প্রেম কেবল সম্পর্ক থাকে না।

প্রেম হয়ে ওঠে দুটি স্বাধীন আকাশের পরস্পরের মধ্যে মিশে যাওয়া।

একজন বাতাস, অন্যজন ডানা।

একজন দিগন্ত, অন্যজন উড়ান।

আর তাদের মাঝখানে অদৃশ্য এক মহাবিশ্ব নীরবে প্রসারিত হতে থাকে, যেখানে সুখের কোনো শেষ নেই, শুধু আরও আকাশ, আরও বাতাস, আরও উড়ে যাওয়ার আহ্বান।

সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

উৎস

ভালবাসা তাদের সহজে মেলে না
যারা জানালার ধারে বসে থাকে
শিকারির ধৈর্যে,
চোখে প্রত্যাশার ফাঁদ পেতে।
তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে
যেন কোনও অচেনা পাখি
একদিন উড়ে এসে
তাদের কাঁধে বসবে
এবং ঘোষণা করবে—
"তোমাকেই বেছে নিলাম।"

কিন্তু ভালবাসা
কোনও পোষা পাখি নয়।
সে অপেক্ষার খাঁচায় বন্দী হয় না।
সে হিসেবের খাতায়
সংখ্যা হয়ে জন্মায় না।ট
সে আসে না
তৃষ্ণার্ত হাতের ভিক্ষাপাত্রে।

বরং অদ্ভুতভাবে,
যত বেশি কেউ তাকে ধরতে চায়,
সে তত দূরে সরে যায়—
মরুভূমির মরীচিকার মতো,
চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া
সাদা হরিণের মতো।

আমি দেখেছি,
কিছু মানুষ আছে
যাদের হৃদয়ের ভিতর
একটি গোপন ঝর্ণা বহে।
তারা ভালবাসে
যেমন সূর্য আলো দেয়।
হিসেব করে না
কতটুকু ফিরে পেল।
তারা ভালবাসে
যেমন নদী সমুদ্রের দিকে যায়—
পথে কত তীরকে সিক্ত করলো,
কত পাথরকে গান শোনালো,
তার কোনও খতিয়ান রাখে না।
তাদের অন্তরে
ভালবাসার নিজস্ব কারখানা আছে।
সেখানে প্রতিদিন
নতুন নতুন নক্ষত্র তৈরি হয়।
নতুন নতুন বসন্তের জন্ম হয়।
নতুন নতুন পাখি ডানা মেলে
অদৃশ্য আকাশে।

যে মানুষ
আপন অন্তরের এই উৎস খুঁজে পেয়েছে,
সে আর অভাবের ভাষা বোঝে না।
কারণ সে জানে,
যে কূপ নিজেই জল দেয়
সে কখনও তৃষ্ণার ভয় পায় না।
যে প্রদীপ নিজেই জ্বলে
সে অন্ধকারের কাছে ভিক্ষা চায় না।
যে হৃদয় নিজেই ভালবাসার জন্ম দেয়
সে প্রত্যাখ্যানকেও
আশীর্বাদে রূপান্তর করতে পারে।

তখন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে।
ভালবাসা তাকে খুঁজতে শুরু করে।
মানুষ আসে।
বন্ধুত্ব আসে।
আস্থা আসে।
পাখিরা এসে বসে
তার নির্জনতার ডালে।
ফুলেরা এসে ফোটে
তার পথের ধারে।

কারণ পৃথিবীর সমস্ত প্রাণ
গোপনে খোঁজে
সেইসব হৃদয়কে
যাদের ভিতরে
অভাব নয়,
প্রাচুর্য বাস করে।

তাই অপেক্ষা করো না
ভালবাসা তোমার দরজায় কড়া নাড়বে বলে।
নিজেই হয়ে ওঠো
একটি অশেষ উৎস।
নিজেই হয়ে ওঠো
একটি সূর্য,
একটি নদী,
একটি নক্ষত্রভরা আকাশ।

তারপর দেখবে—
যাদের পাওয়ার জন্য
একসময় তুমি ব্যাকুল ছিলে,
তারা নিজেরাই এসে দাঁড়াবে
তোমার আলোয়।

কারণ ভালবাসার সবচেয়ে গভীর রহস্য এই—
যে ভালবাসা চায়,
সে প্রায়ই বঞ্চিত হয়।
আর যে ভালবাসা দেয়,
তার জীবন একদিন
ভালবাসায় উপচে পড়ে
বর্ষাকালের পূর্ণ নদীর মতো,
যার কোনও হিসেব নেই,
কোনও ভয় নেই,
শুধু অনন্ত প্রবাহ আছে।

শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

কার না ভালো লাগে

শুতে কার না ভালো লাগে! তাবলে
মানুষ কি শুধুই শরীরের ক্ষুধা নিয়ে জন্মায়?

না।

তার ভিতরে আরও কত গোপন সমুদ্র থাকে, যেখানে আদর এসে ঢেউ হয়ে ভাঙে, আর একাকীত্ব মাছরাঙার মতো বসে থাকে ভাঙা বিকেলের তারের উপর।

কেউ কেউ ভালোবাসাকে শুধু আগুন বলে ভুল করে, কিন্তু আমি দেখেছি— আগুনেরও পরে থাকে ছাই, আর ছাইয়েরও পরে থাকে এক অদ্ভুত নীরব উষ্ণতা, যেখানে দুটি ক্লান্ত প্রাণ কেবল একে অপরের পাশে শুয়ে থাকলেই মহাবিশ্ব একটু শান্ত হয়ে যায়।

শরীরের উৎসব ক্ষণিক, যেন বজ্রপাতের আলোয় হঠাৎ আলোকিত হয়ে ওঠা কোনো পর্বতশৃঙ্গ।

কিন্তু আত্মার সঙ্গ— সে তো ধীর নদী, যে বছরের পর বছর একই পাথরকে স্পর্শ করতে করতে তাকে মসৃণ করে তোলে।

তাই, মন্থন কার না ভালো লাগে! তাবলে সবকিছুকে কি শুধুই বিছানার ভাষায় অনুবাদ করা যায়?

সব ফুল কি সুগন্ধের জন্য ফোটে? সব গান কি নাচের জন্য জন্মায়? সব চাঁদ কি জোয়ারের জন্যই আকাশে ওঠে?

না।

কিছু কিছু স্পর্শের কাজ শুধু মানুষকে মানুষ করে তোলা।

আর কিছু ভালোবাসা আছে, যারা শরীরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেও শেষ পর্যন্ত এসে বসে হৃদয়ের সবচেয়ে নির্জন ঘরে—

যেখানে কামনা ধীরে ধীরে নিজের পোশাক খুলে পরিণত হয় নিঃশব্দ মমতায়।

আর তখন—

বিস্মিত হয়ে দেখা যায়, যে কামনা ছিল একসময় বুনো ঘোড়া, সে এখন সন্ধ্যার মাঠে ঘাস খায় শান্ত হয়ে।

দুটি মানুষের মাঝখানে আর কোনো যুদ্ধ থাকে না। থাকে না জয়ের অহংকার, থাকে না পরাজয়ের লজ্জা।

থাকে শুধু একটি দীর্ঘ শ্বাসের মতো সহাবস্থান, যেন দুইটি নক্ষত্র অসংখ্য আলোকবর্ষ দূরে থেকেও পরস্পরের টানে একই মহাজাগতিক নৃত্যে অংশ নিচ্ছে।

আমি দেখেছি, যারা কেবল শরীর খোঁজে তারা প্রায়ই ফিরে আসে শূন্য হাতে।

কারণ শরীরের দরজা খুলে দেওয়া সহজ, কিন্তু আত্মার জানালাগুলো বহু জন্মের ধৈর্য চায়।

একদিন বার্ধক্য আসবে।

চামড়ার উপর সময়ের ভাঁজ পড়বে, চোখের নিচে জমবে ক্লান্তির অর্ধচন্দ্র, আর একসময়ের উন্মত্ত রক্ত ধীরে ধীরে নদী থেকে হ্রদে পরিণত হবে।

সেদিন, যে মানুষটি তোমার পাশে বসে চুপচাপ এক কাপ চা এগিয়ে দেবে, তোমার অসুখের ওষুধের সময় মনে রাখবে, তোমার পুরনো গল্প শতবার শুনেও বিরক্ত হবে না—

জেনো, ভালোবাসার প্রকৃত অলৌকিকতা সেখানেই লুকিয়ে ছিল।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষা শুধু ভোগ নয়।

সে চায় আশ্রয়।

সে চায় এমন একটি হৃদয়, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে ফিরে এসে নিঃশব্দে মাথা রাখা যায়।

আর তখন, সমস্ত কামনা, সমস্ত অহংকার, সমস্ত ক্ষণস্থায়ী উন্মাদনা

ধীরে ধীরে গলে গিয়ে

দুইটি মানুষের মাঝখানে একটি ছোট্ট প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠে—

যার নাম,

ঘর।

আর সেই ঘর—

ইট-পাথরের নয়।

সে তৈরি হয় অসময়ে পাঠানো খোঁজখবর দিয়ে, অকারণে রেখে দেওয়া শেষ লুচিখানা দিয়ে, রাত তিনটের জ্বরের পাশে ঘুমকে নির্বাসন দেওয়ার অদ্ভুত রাজনীতি দিয়ে।

আমি দেখেছি, অনেক প্রাসাদ ভেঙে পড়েছে কারণ তাদের ভিতরে ঘর ছিল না।

আবার, অনেক ভাড়া-বাড়ির ছোট্ট বারান্দায় বসে থেকেছে স্বর্গ, কারণ সেখানে দুটি মানুষ একটি কম্বলের নিচে নিজেদের অসম্পূর্ণতাকে ক্ষমা করতে শিখেছিল।

বাইরে তখন পৃথিবী অর্থ, প্রতিযোগিতা, অহংকার আর অসংখ্য বিজ্ঞাপনের শব্দে নিজেকে ছিঁড়ে ফেলছে।

কিন্তু তাদের ঘরের ভিতরে একটি পুরনো ঘড়ি ধীরে ধীরে সময়কে চা খাওয়াচ্ছে।

বৃষ্টির শব্দ এসে জানালায় বসে গল্প বলছে।

অন্ধকারও সেখানে ভয়ংকর নয়— কারণ অন্ধকারেরও তো ইচ্ছে করে কোথাও একটু নিরাপদে বসতে।

আর যখন একদিন দুজনের একজন অপরজনের আগে চলে যাবে—

হ্যাঁ, সেই অনিবার্য বিদায়, যার জন্য কোনো মানুষ কখনোই যথেষ্ট প্রস্তুত হতে পারে না—

তখন যে মানুষটি থেকে যাবে, সে হঠাৎ বুঝবে,

ভালোবাসা আসলে কাউকে অধিকার করার নাম ছিল না।

ভালোবাসা ছিল নিজের ভিতরে আর-একটি হৃদয়ের জন্য একটি স্থায়ী আসন নির্মাণ করা।

তাই মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু পদচিহ্ন রয়ে যায় বালিশের ভাঁজে, কিছু হাসি আটকে থাকে পর্দার কাপড়ে, কিছু ডাকনাম চিরকাল ঘুরে বেড়ায় ঘরের বাতাসে।

আর গভীর রাতে, যখন সমস্ত পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে,

তখন মনে হয়—

কোথাও কোনো নক্ষত্রের আড়ালে সে এখনও বসে আছে,

এবং মহাবিশ্বের বিশাল নীরবতার মধ্যেও খুব আস্তে, খুব পরিচিত স্বরে বলছে—

“আমি আছি। তুমি একা নও।”

শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

বন্ধনহীনতার সুখ

জানো কি, কেন আমরা চিরকাল সুখী থাকতে পারি?

কারণ আমাদের অন্তরঙ্গতায় কোনো বাঁধন নেই।

তার কোনো শিকল নেই, কোনো আংটি নেই, কোনো মালিকানার চুক্তিপত্র নেই।

সে এক রাজ্য যার চারদিকে কোনো বেড়া নেই।

এক নদী যার বুকে কোনো বাঁধ নেই।

এক গান যার সুরকে বন্দী করার জন্য কোনো খাঁচা নেই।

অধিকাংশ মানুষ ভালোবাসাকে ভাবে দুই বন্দীর গল্প, যারা একই কারাগারকে ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলে।

কিন্তু আমরা—

আমরা আবিষ্কার করেছি আরও অদ্ভুত এক গোপন রহস্য।

আমরা শিখেছি অধিকার ছাড়াই আপন হতে।

শিখেছি বন্দিত্ব ছাড়াই কাছাকাছি থাকতে।

শিখেছি স্পর্শ করতে, তবু একে অপরের স্বাধীনতার উপর আঙুলের ছাপ না রেখে।

খেয়াল করেছ কি কখনও,

তোমার আর আমার সম্পর্কটা ডানা আর মেঘের প্রেমকাহিনীর মতো?

ডানা ছুটে চলে পূর্বদিকে, অতিপ্রাচীন এক আহ্বানের টানে, যা তার পালকের মধ্যে লেখা ছিল পর্বতের জন্মেরও আগে।

আর মেঘ ভেসে যায় পশ্চিমে, তার উজ্জ্বল উদরের মধ্যে অসংখ্য অনাগত বৃষ্টি বহন করে।

তাদের গন্তব্য আলাদা।

তাদের মানচিত্র একে অপরকে অস্বীকার করে।

তবু যখনই তারা দেখা করে আকাশের বিশাল ক্যাথেড্রালে,

তারা পরস্পরকে অবিরাম আলিঙ্গন করে।

ডানা প্রবেশ করে মেঘের ভিতরে।

মেঘ জড়িয়ে ধরে ডানাকে।

এক অলৌকিক মুহূর্তের জন্য মহাবিশ্ব ভুলে যায়—

কোনটি স্বাধীনতা আর কোনটি স্নেহ।

কেউ নিজের পথ ছাড়ে না।

কেউ নিজের নিয়তি বিসর্জন দেয় না।

কেউ বলে না—

"থেকে যাও।"

কেউ ফিসফিস করে না—

"দিগন্তকে ছেড়ে আমাকে বেছে নাও।"

আর সেই কারণেই তাদের ভালোবাসা কখনও পচে যায় না।

সে থেকে যায় নবজাত সকালের শিশিরের মতো চিরতাজা।

কী অদ্ভুত, তাই না?

সবচেয়ে শক্ত শিকলও একদিন ভেঙে যায়।

কিন্তু যা বাঁধা নয়, তা কখনও কখনও চিরকাল একসঙ্গে থাকে।

তারকারা এই সত্য জানে।

চাঁদ কখনও সমুদ্রকে নিজের করে না, তবু সমুদ্র প্রতিটি রাতে তার জন্য জেগে ওঠে।

বাতাস কখনও অরণ্যের মালিক হয় না, তবু তার আগমনে প্রতিটি পাতা কেঁপে ওঠে।

সূর্য কখনও ভোরকে বিয়ে করে না, তবু প্রতিটি সকালে অস্তিত্বের কিনারায় তাদের দেখা হয় অবধারিতভাবে।

হয়তো প্রকৃত ভালোবাসা কোনো গিঁট নয়।

হয়তো সে এক অনুরণন।

দুই স্বাধীন অসীমের মধ্যে এক নীরব সমঝোতা।

তুমি ক্রমাগত তোমার নিজের রূপে বিকশিত হচ্ছ।

আমিও ক্রমাগত আমার নিজের হয়ে উঠছি।

তবু আমাদের মাঝখানে অদৃশ্য কিছু একটানা ফুটে চলেছে—

এক বাগান, যার কোনো প্রাচীর নেই।

এক সেতু, যার কোনো স্তম্ভ নেই।

দুটি পরিযায়ী অনন্তের মধ্যে এক অবিরাম আলাপ।

তাই আমরা সুখী থাকি।

কারণ আমরা একে অপরকে শক্ত করে ধরে রাখি না।

বরং ধরে রাখার প্রয়োজন অনুভব করি না।

কারণ আমরা বিদায়কে আটকাই না।

বরং তাকে আশীর্বাদ করি।

আর যখনই আমাদের পৃথক নিয়তিগুলো আবার এক বিন্দুতে এসে মিলে যায়,

স্বর্গ আবারও প্রত্যক্ষ করে সেই অসম্ভব অলৌকিকতা—

একটি ডানা আলিঙ্গন করছে একটি মেঘকে,

একটি মেঘ আলিঙ্গন করছে একটি ডানাকে,

দুজনেই ভেসে চলেছে ভিন্ন ভিন্ন দিগন্তের দিকে,

তবু রহস্যময়ভাবে,

কখনও সত্যিই পৃথক নয়।

বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

অশ্বারোহী হওয়ার পূর্বে

বহু বছর ধরে
তোমার জীবন তোমার চেয়ে দ্রুত ছুটে চলেছে—

ঘড়ির কাঁটা দিয়ে গড়া এক বুনো ঘোড়ার মতো,
যার কেশরে জড়িয়ে আছে
অসমাপ্ত সকালগুলোর দীর্ঘশ্বাস,

যার খুরের আঘাতে
নিয়তির পাথুরে পথে
উড়ে যায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

তুমি তাকে বলেছিলে ভাগ্য।
তুমি তাকে বলেছিলে দুর্ভাগ্য।
তুমি তাকে বলেছিলে পরিস্থিতি।

কিন্তু প্রতিটি ভোরে
সে ঘোড়া তোমার আস্তাবল থেকে পালিয়ে যেত,
কারণ তুমি ভুলে গিয়েছিলে
নিজের ইচ্ছাশক্তির ফটক বন্ধ করতে।

দিনগুলো ছুটে পালিয়েছে।
মাসগুলো হারিয়ে গেছে ধূলিঝড়ে।
সম্পূর্ণ দশকগুলো
গলে গেছে সময়ের ভাটিতে,
যেন আতঙ্কিত পাখির ঝাঁক
আগুনের আকাশ ভেদ করে উড়ে যাচ্ছে।

আর তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে—
হতবিহ্বল,
হাঁপাতে হাঁপাতে,
নিজের অস্তিত্বের পিছনে টেনে নিয়ে যাওয়া
এক অসহায় বন্দীর মতো।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
ঘোড়াটি কখনও তোমার শত্রু ছিল না।
সে কেবল
অশ্বারোহীর অনুপস্থিতিকে মেনে চলেছিল।

জীবন সবসময়ই ছুটে চলে।
সময় সবসময়ই ছুটে চলে।
ইচ্ছা সবসময়ই ছুটে চলে।
বিশৃঙ্খলা সবসময়ই ছুটে চলে।

প্রশ্ন একটাই—
লাগামটা কার হাতে?

তারপর একদিন,
অনুশোচনার দেয়ালে
অসংখ্যবার মাথা ঠুকে,
তুমি আবিষ্কার করলে
ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকা
এক বিস্মৃত বস্তু।

খুব সাধারণ।
না সোনার।
না অলৌকিক।
না নাটকীয়।

তার নাম—
শৃঙ্খলা।

একটি ক্ষুদ্র লোহার চাবি,
যে খুলে দিতে পারে সাম্রাজ্যের দরজা।
একটি সাধারণ জিন,
যে বশ মানাতে পারে ঝড়কে।
একটি নীরব তরবারি,
যে কেটে ফেলতে পারে
অদৃশ্য দাসত্বের শিকল।

যেই তুমি তাকে আলিঙ্গন করো,
মহাবিশ্বের ভেতরে শুরু হয়
নিঃশব্দ পুনর্বিন্যাস।

ঘড়িগুলো আর তোমাকে নিয়ে হাসে না।
ক্যালেন্ডার বিদ্রোহ বন্ধ করে।
ঘণ্টাগুলো সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়,
যেন আদেশের অপেক্ষায় থাকা সৈনিক।
তোমার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সংকল্পগুলো
ফিরে আসে ঘরে।
নিজেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো
কবর ভেঙে উঠে দাঁড়ায়।

আর সেই বুনো জীবন-অশ্ব—
যে একদিন তোমাকে
বিভ্রান্তির মহাদেশ জুড়ে টেনে নিয়ে বেড়িয়েছিল—
সে মাথা নত করে
তোমার স্পর্শ গ্রহণ করে।

এবার তুমি সময়কে তাড়া করো না।
তুমি তার পিঠে চড়ো।
এবার তুমি ভবিষ্যৎকে ভয় পাও না।
তুমি তাকে চালিত করো।
এবার তুমি পরিস্থিতির কাছে করুণা ভিক্ষা করো না।
তুমি নিজেই নির্ধারণ করো
মরুভূমি,
মহাসাগর,
এবং অসম্ভবের পর্বতমালা পেরিয়ে
তোমার গন্তব্য।

কারণ শৃঙ্খলা কোনো শাস্তি নয়।

শৃঙ্খলা হলো
পুনরাবৃত্তির ছদ্মবেশে আসা মুক্তি।
শৃঙ্খলা হলো
কর্মপোশাক পরা আত্মসম্মান।
শৃঙ্খলা হলো
অটল প্রতিশ্রুতির ভাটিতে গড়া স্বাধীনতা।

তাই তাকে গ্রহণ করো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
তাকে গ্রহণ করো সম্পূর্ণভাবে।
কারণ শৃঙ্খলা ছাড়া কাটানো প্রতিটি দিন
আরও একদিন
জীবনের ঘোড়ার পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়া হওয়া।

কিন্তু যেদিন তুমি
তার পিঠে উঠে বসবে,
সেদিন বদলে যাবে সমগ্র দিগন্ত।
যে জীবন একসময়
তোমাকে দাস বানিয়েছিল,
সেই জীবনই হয়ে উঠবে
তোমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী।
আর যে পথ একসময়
তোমাকে নিজের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছিল,
সেই পথই
একদিন তোমাকে পৌঁছে দেবে
সেই গন্তব্যে,
যার জন্য তোমার জন্ম হয়েছিল।