সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

বিরলক্ষণ

রাত শেষ হয়ে
সদ্য যখন ফুটতে শুরু করে
ভোরের আলো,
রাত আর দিনের মধ্যবর্তী
সে বিরল ক্ষণে
এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।

মনের উপরে সর্বপ্রকার চাপ
চেষ্টা ছাড়া হঠাৎই সরে যায়।
পারলে তখন
প্রেমিকাকে নিয়ে কবিতা লিখো।
আপন অন্তরে লুকিয়ে থাকা
দারুচিনি দ্বীপটি দেখতে পাবে।

ওগো শুনছো

একদিন,  মন্দাক্রান্তা,
মুখোমুখি বসবো তোমার সামনে
এক টেবিলে।
তারপরে কফি খাব
দুজনে পাল্লা দিয়ে 
এককাপ দুইকাপ তিনকাপ,
আর সেই ফাঁকে 
জমিয়ে গল্প করবো তোমার সাথে।

তুমি খুব ভালো কথা বলতে পারো
জানি আমি।
আর আমিও একটা জিনিস 
ভালোই পারি
( যেটা শুনলে চকচক করে উঠবে
তোমার দুষ্টু চোখদুটো। )

তোমার কথাদের ছেঁকে ছেঁকে
তৈরী করবো তোমার পরাণের
একটা স্বচ্ছ স্কেচ - আমার শব্দ দিয়ে,
যেটা পড়ে 
বিচক্ষণরা অম্লানবদনে বলবেন
তোমার নামটা আদপেই 
তুমি মানুষটার যোগ্য নয়।

খুঁত

নিখুঁত কেউ নয়—
প্রতিটি চরিত্রের ভেতরে
অদৃশ্য ভূমিকম্পের স্মৃতি থাকে,
কিছু সূক্ষ্ম ফাটল
যেন শুকনো নদীর পাড়ে
সময়ের নখের আঁচড়।

সেই ফাটলগুলো
তোমার লজ্জা নয়।
ওগুলো কেবল প্রমাণ—
তুমি পাথর নও,
তুমি একসময় কেঁপে উঠেছিলে জীবনের স্পর্শে।

দেখো,
যখন সূর্যের আলো
আকাশের গোপন জানালা খুলে
তোমার ভাঙা দেয়ালের ভেতর ঢুকে পড়ে,
ফাটলগুলো তখন
অদ্ভুত সব সবুজ ভাষায় কথা বলতে শুরু করে।

সেই আলোকে
তুমি বৃথা যেতে দিও না।
তোমার ভেতরের পাতাহীন বৃক্ষগুলোকে বলো—
“এই আলো দিয়ে সালোকসংশ্লেষ করো,
এই ক্ষত দিয়ে নতুন ক্লোরোফিল জন্মাও।”

তখন তোমার ভেতরে
নিঃশব্দে জন্ম নেবে
অরণ্যের মতো গভীর এক জীবন—
যেখানে ব্যথা আর আলো
একসাথে পাতায় পাতায়
যাপনকে লিখে যায়।

এভাবেই একদিন
হঠাৎ করে আবিষ্কার করবে—
তোমার ফাটলগুলো
আর ফাটল নেই,
তারা হয়ে গেছে ইতিহাসের প্রাচীন মানচিত্র,
যেখানে একসময় যুদ্ধ হয়েছিল
আর এখন জন্মেছে সবুজ ঘাস।

আর তুমি—
যে নিজেকে ভাঙা ভাবতে—
দেখবে,
সময়ের মৃদু হাতের ছোঁয়ায়
তুমি আরও বেশি নিটোল হয়ে উঠেছো,
একটি গ্রহের মতো
যার পুরনো আগ্নেয়গিরির দাগই
তাকে সবচেয়ে সুন্দর করে তুলেছে। ✨

সহযাত্রী

সহযাত্রী পরাণ
সে নয়—
যে এসে তোমার অসম্পূর্ণতাকে
নিজের উপস্থিতির প্লাস্টার দিয়ে ঢেকে দেয়।
সহযাত্রী সেই—
যে তোমার ভেতরের অর্ধসমাপ্ত নক্ষত্রগুলোকে
নিজের আঙুলের ইশারায় বলে,
“জ্বলে ওঠো,
তোমার আকাশ তুমি নিজেই সম্পূর্ণ করো।”

সে তোমাকে ভালোবাসে—
তোমার ফাটলগুলোর মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া আলোসহ।
তোমার ভুলগুলোর দিকে
সে আঙুল তোলে না বিচারকের মতো,
বরং দেখে—
সেগুলো কেবল পুরনো দরজা,
যেগুলো পেরিয়ে তুমি
আরও গভীর এক মানুষ হয়ে উঠছ।

একটি সহযাত্রী পরাণ
তোমাকে পথ দেখায় না মানচিত্র দিয়ে—
সে তোমার পাশে হাঁটে,
যেন এক নিঃশব্দ বাতিঘর,
যার আলো পড়ে তোমার নিজের ভেতরে।
কারণ সে জানে—
তোমার ভেতরে ইতিমধ্যেই ঘুমিয়ে আছে
এক বিস্ময়কর মানুষ,
একটি গোপন মহাবিশ্ব,
যার দরজা খুলতে
তোমার শুধু একটু সাহস
আর একটু আলো দরকার।

আর সেই আলো—
তোমার সহযাত্রী পরাণ
চুপচাপ ধরে রাখে
তোমার হাতের খুব কাছে। ✨

অবাধ্য মুগ্ধতা

মুগ্ধতারা আমার
ভালবাসা হয়ে গেছে বারবার—
যেন আকাশের ছোট ছোট নক্ষত্র
হঠাৎ নেমে এসে
আমার বুকের ভিতর
নিজেদের আলো বসিয়ে দিয়েছে।
আমি তো শুধু তাকিয়ে ছিলাম—
কোনো গোপন পরিকল্পনা ছিল না,
কোনো ছলনার মানচিত্র
আমার হাতের রেখায় আঁকা ছিল না।

তবু
প্রতিবার যখন মুগ্ধতা
নরম ডানায় ভর করে
ভালবাসা হয়ে উঠল,
তখন পৃথিবী
আমার চরিত্রের সামনে
একটি বিশাল প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিল।

লোকেরা যেন আকাশের আদালত—
তাদের চোখে সন্দেহের ধুলো,
তাদের ঠোঁটে ফিসফিসে রায়।
তারা জিজ্ঞেস করল—
“কেন এত আলো
তোমার চোখে জমে ওঠে?”

কিন্তু আমি জানতাম
আলোকে তো আটকানো যায় না—
সে যেন নদী
যে নিজেই নিজের পথ বানায়।
মুগ্ধতা তো একধরনের বৃষ্টি—
হঠাৎ আসে,
হঠাৎ ভিজিয়ে দেয়
অচেনা বিকেলের জানালা।
আর আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম
একটি খোলা মাঠের মতো—
যেখানে আকাশের যেমন ইচ্ছে
নেমে আসতে পারে,
যখন
করার কিছুই ছিল না আমার।

আমি তো শুধু
দেখেছিলাম তোমাকে
একটি অদ্ভুত উজ্জ্বল মুহূর্তে—
যেখানে তোমার হাসি
দূরের কোনো নক্ষত্রের মতো
আমার ভিতরে বাসা গেড়েছিল।

আমি ঠকাইনি তোমাকে
একবারও।
বিশ্বাস করো—
আমার হৃদয়ের নদীতে
কোনো গোপন স্রোত ছিল না।
আমি শুধু
ভালবাসাকে চিনেছি
যখন সে আমার কাছে এসেছে
মুগ্ধতার মুখোশ পরে।

তুমি যেন ভুল বুঝো না—
কারণ কখনও কখনও
একটি হৃদয়
কিছুই করে না,
তবু
তার ভেতরের আকাশ ভরে যায়
উজ্জ্বল আলোয়। ✨

ছায়া

তোমার ছায়া কী ক্লান্ত
তোমাকে অনুসরণ করতে করতে?

দিনের পর দিন
সূর্যের কোণ বদলায়,
রাস্তার ধুলো বদলায়,
শহরের ভিড় বদলায়—
কিন্তু ছায়াটি
একটি নীরব কুকুরের মতো
তোমার পায়ের কাছে
চুপচাপ হাঁটতেই থাকে।

সে জানে তোমার সব থেমে যাওয়া,
সব নিঃশ্বাসের ভাঙা সিঁড়ি,
সব অর্ধেক স্বপ্ন
যেগুলো তুমি রাতের অন্ধকারে
ভাঁজ করে রেখে দিয়েছিলে।
হয়তো সে ক্লান্ত—
তোমার দুঃখের ভার টেনে নিতে নিতে,
তোমার দ্বিধার ধোঁয়া
নিজের শরীরে জমাতে জমাতে।

তাহলে
একবার ফিরে তাকাও
আর বলো তাকে—
“যাও,
আজ একটু বিশ্রাম নাও
কোনো গাছের শীতল গোড়ায়
বা কোনো পুরোনো দেয়ালের পাশে।”

তারপর
ছেড়ে দাও তাকে।
আর ধরো পরাণের হাত—
যে হাত রক্তের ভেতর
একটি ছোট সূর্যের মতো জ্বলছে।
বল—
“আমি আরও অনেক বেশি বাঁচতে চাই
বুক ভরে
যেন ফুসফুস দুটি
হঠাৎ সমুদ্র হয়ে গেছে।
আমি আরও অনেক বেশি হাসতে চাই
যেন হাসির শব্দে
পুরোনো দুঃখের জানালাগুলো
এক এক করে খুলে যায়।
আমি দৌড়াতে চাই
তোমার হাত ধরে—
ঘাসের উপর,
বাতাসের ভেতর,
আকাশের নীচে
যেখানে পৃথিবী এখনো
শিশুর মতো নতুন।”

চলো দৌড়াই—
যেন সময় আমাদের ধরতে না পারে,
যেন ঘড়ির কাঁটা
হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেলে।
আর দূরে কোথাও
তোমার ক্লান্ত ছায়া
একটি গাছের নিচে বসে
মৃদু হেসে বলে—
“অবশেষে
তুমি বাঁচতে শিখেছো।” 🌿

তোমার সঙ্গে প্রেম করতে চাই

আমি তোমাকে শক্ত করে ধরতে চাই—
খাঁচা যেমন পাখিকে ধরে রাখে তেমন নয়,
বরং যেমন দিগন্ত সূর্যকে ধরে রাখে
একটি কাঁপতে থাকা মুহূর্তের জন্য
তারপর তাকে অন্য এক পৃথিবীতে পড়ে যেতে দেয়।

তুমি দাঁড়িয়ে আছো জাহাজের সামনের প্রান্তে,
যেখানে সমুদ্র তার অন্তহীন নীল সমীকরণ লিখে যায়,
তোমার শরীর একটি সরু মাস্তুলের মতো
যে শুনছে বাতাসের ব্যাকরণ।
তোমার দু’হাত পাশ বরাবর খোলা—
আকাশের দিকে পাঠানো
দুটি উত্তরহীন প্রশ্নের মতো।
তোমার পায়ের নিচে ডেকটি শ্বাস নেয়,
কাঠ মনে করে বনকে,
বন মনে করে বৃষ্টিকে,
বৃষ্টি মনে করে সেই প্রথম সমুদ্রকে
যে আমাদের দু’জনকে
লবণ আর স্পন্দনের স্বপ্নে সৃষ্টি করেছিল।

আমি তোমাকে সেখানে ধরে রাখতে চাই—
যেখানে বাতাস বন্য এবং কারও নয়,
যেখানে সীগালরা দূরত্বের ভাষা অনুবাদ করে
আর ঢেউগুলো ভাঁজ করে যেতে থাকে
ফেনার সাদা চিঠিগুলো।
তুমি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ো
যেন মাধ্যাকর্ষণ কেবল একটি গুজব,
যেন তোমার পাঁজরের ভেতরে গোপনে লুকিয়ে আছে
এক জোড়া ভাঁজ করা ডানা।

আর আমি তোমাকে উড়তে দিতে চাই—
শুধু ওপরে নয়,
বরং চারদিকে,
সমুদ্রের বিশাল শ্বাসের ভেতর।
যেন আকাশ দিয়ে তৈরি এক বিশাল গির্জা থেকে
মুক্তি পাওয়া একটি পায়রা। 🕊️

সেই ভাসমান মুহূর্তে
পৃথিবী তার সব সীমানা ভুলে যায়।
জাহাজ আর জাহাজ থাকে না,
সমুদ্র আর সমুদ্র থাকে না—
সবকিছু ধীরে ধীরে
একটি নীল হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়।

আর সেখানে,
সেই নির্মল বিস্তারের মধ্যে,
আমি তোমাকে ভালোবাসতে চাই
যেভাবে আলো ভালোবাসে জলকে—
স্পর্শ করে কিন্তু আঘাত দেয় না,
প্রবেশ করে কিন্তু ভাঙে না।

তুমি—
শ্বাস আর বিস্ময়ে গড়া এক পায়রা,
প্রথম সকালের নিষ্পাপ সাদায় ভরা।
আর আমি—
শুধু বাতাস,
যে শিখছে তোমার নাম
বারবার
এই পৃথিবীর অন্তহীন লবণাক্ততার উপর দিয়ে। 🌊🕊️