মানুষ বলে,
টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না।
হয়তো তারা ঠিকই বলে।
সুখ এক মাতাল প্রজাপতি, সূর্যের আলোয় নেশাগ্রস্ত— সে কিছুক্ষণের জন্য এসে কাঁধে বসে, তারপর উড়ে যায় অন্য কোনো ঋতুর দিকে।
কিন্তু তৃপ্তি—
আহ, তৃপ্তি এক পাহাড়।
সে উড়ে বেড়ায় না।
সে থেকে যায়।
আর আশ্চর্যের বিষয়, মুদ্রা, নোট, ব্যাংকের হিসাব এবং নীরব বিনিয়োগ কখনো কখনো সেই পাথর হয়ে ওঠে যার উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয় তৃপ্তির পাহাড়।
---
একদিন স্বপ্নের মধ্যে আমি এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ীর দেখা পেলাম।
তিনি কোনো গয়না বিক্রি করতেন না।
তার দোকানে ছিল না হীরের ঝলক, ছিল না সোনার মূর্তি।
বরং তিনি বিক্রি করতেন অদৃশ্য জিনিস।
একটি তাকের উপর রাখা ছিল কয়েকটি কাঁচের বোতল।
তাদের গায়ে লেখা—
স্বাধীনতা।
নীরবতা।
সময়।
শান্তি।
যথেষ্ট।
আমি যখন তাদের দাম জানতে চাইলাম, তিনি চাঁদের আলোয় ভেজা নদীর মতো হেসে বললেন—
"এসবের দাম অনেক।
কিন্তু সারা জীবন এসব ছাড়া বেঁচে থাকার মূল্য এর থেকেও অনেক বেশি।"
---
আমি দেখেছি মানুষ নিজের অহংকার বহন করার জন্য গাড়ি কিনছে।
দেখেছি একাকীত্বকে দামী সুগন্ধি দিয়ে সাজাতে।
দেখেছি এত বড় বাড়ি যার মালিক শেষ পর্যন্ত নিজের ছাদেরই চাকর হয়ে গেছে।
তাদের আলমারি ভরে গেছে।
তাদের হৃদয় নয়।
প্রতিটি জিনিসের দাঁত গজিয়েছে।
প্রতিটি সম্পদ আরও যত্ন দাবি করেছে।
আর তারা ধীরে ধীরে নিজেদের জীবনকে একটি জাদুঘরে পরিণত করেছে, যেখানে পাহারাদারও তারা, বন্দিও তারা।
---
অথচ দূরে কোথাও,
এক সাধারণ মানুষ একটি আমগাছের নিচে বসে ভাঙা কাপের চা খাচ্ছে।
তার ব্যাংক ব্যালেন্স খুব বড় নয়।
কিন্তু তার হাসি বিশাল।
তার সম্পদ কম।
কিন্তু তার সন্ধ্যাগুলো পুরোটাই তার নিজের।
তারকারা তাকে নামে চেনে।
আর ঘুম তার কাছে আসে পুরোনো বন্ধুর মতো।
---
আমি বুঝলাম,
টাকা কোনো রাজা নয়।
টাকা একটি চাবি।
বোকারা সেই চাবি দিয়ে আরও বড় কারাগারের দরজা খোলে।
জ্ঞানীরা খুলে ফেলে মুক্তির দরজা।
অপমান থেকে মুক্তি।
নির্ভরতা থেকে মুক্তি।
জীবনের কাছে শ্বাস নেওয়ার অনুমতি চাওয়া থেকে মুক্তি।
স্বাধীনতা—
সেই অদৃশ্য প্রাসাদ—
কখনো কখনো কেনা যায়।
অহংকার দিয়ে নয়।
লোভ দিয়ে নয়।
বরং ধৈর্য দিয়ে।
সঞ্চয় দিয়ে।
অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছার মুখে নরম কণ্ঠে "আজ নয়" বলে দেওয়ার শক্তি দিয়ে।
---
এক রাতে সময় নিজেই আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
ঘড়ি হয়ে নয়।
ক্যালেন্ডার হয়ে নয়।
বরং এক বৃদ্ধা নারী হয়ে, যার চুলে জড়ানো ছিল অসংখ্য ছায়াপথ।
তার এপ্রনের ভাঁজে লুকিয়ে ছিল কোটি কোটি ঘড়ি।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
"মানুষ প্রতিদিন আমাকে বিক্রি করে।
কিন্তু খুব কম মানুষই পরে আবার আমাকে কিনে নেয়।"
তারপর তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
আর আমি বুঝলাম—
টাকা আসলে জমাট বাঁধা সময়।
বছরগুলো সংখ্যায় পরিণত হয়েছে।
দিনগুলো বেতনে রূপান্তরিত হয়েছে।
ঘণ্টাগুলো মুদ্রার ছদ্মবেশ ধারণ করেছে।
আর জীবনের সর্বোচ্চ শিল্প হলো—
শুধু টাকা উপার্জন নয়,
বরং সেই টাকা দিয়ে নিজের সময়কে পুনরুদ্ধার করা।
ধীরে ধীরে সকালের নাস্তা খাওয়া।
সন্তানদের বড় হতে দেখা।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে বসা।
ঘড়ির দিকে না তাকিয়ে বই পড়া।
কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই হাঁটা।
এতটাই ধনী হওয়া যাতে আবার পাখির ডাক শোনা যায়।
---
আমি উদ্বেগের রাজ্যে গিয়েছিলাম।
সেখানে সবাই দৌড়াচ্ছে।
সবাই ভয় পাচ্ছে।
সবাই আগামীকালকে ভয় করে।
মানুষের বুকের ভেতরে অদৃশ্য পাথর জমে আছে।
তারপর আমি আরেকটি দেশে পৌঁছালাম।
সেখানে কোনো বিলাসিতা নেই।
কোনো সোনার ঝাড়বাতি নেই।
শুধু কিছু সাধারণ মানুষ, যাদের জরুরি সঞ্চয় আছে।
তাদের ঘুম গভীর।
তাদের হাসি স্বাভাবিক।
তাদের শ্বাস শান্ত।
কারণ আমি শিখলাম—
শান্তি অনেক সময় ব্যাংকের এক নীরব সংখ্যার মধ্যে বাস করে।
যে সংখ্যার ছবি কেউ তোলে না।
কেউ প্রদর্শন করে না।
তবুও সে ভয়ের মুখ বন্ধ করে দিতে পারে।
---
এরপর স্বাস্থ্য আমার কাছে এলো একজন খালি-পায়ের সাধুর বেশে।
তার হাতে ওষুধ ছিল না।
ছিল সবজি।
ছিল সূর্যের আলো।
ছিল পরিষ্কার জল।
ছিল হাঁটার জুতো।
সে বলল—
"আমি খুব সস্তা।
কিন্তু মানুষ বরং দামী রোগ কিনতে ভালোবাসে।"
আর আমি কেঁদে ফেললাম।
কারণ আমি দেখেছি মানুষ শরীরকে বিক্রি করে সম্পদ অর্জন করেছে,
তারপর সেই সম্পদ নিয়েই শরীরের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছে।
---
আমি একদিন স্মৃতির জাদুঘরে প্রবেশ করলাম।
সেখানে কোনো বস্তু ছিল না।
ছিল শুধু মুহূর্ত।
একজন মা ঘুমন্ত সন্তানের কপালে চুমু খাচ্ছেন।
দুই বৃদ্ধ প্রেমিক হাত ধরে বসে আছেন।
বৃষ্টির মধ্যে এক দীর্ঘ আলাপ।
বন্ধুদের সঙ্গে হাসির রাত।
কেউ টেলিভিশন মনে রাখেনি।
কেউ ঘড়ির ব্র্যান্ড মনে রাখেনি।
কারণ স্মৃতি মরিচা ধরে না।
সেগুলো মনের গির্জায় তারার মতো জ্বলতে থাকে।
---
তারপর আমি সাক্ষাৎ পেলাম এক অদ্ভুত প্রাণীর।
তার নাম—
যথেষ্ট।
মানুষ তাকে ভয় পায়।
কারণ যে তাকে স্পর্শ করে, সে দৌড়ানো বন্ধ করে দেয়।
তুলনা করা বন্ধ করে দেয়।
অতৃপ্তি বন্ধ করে দেয়।
যথেষ্টের চোখে ছিল সমুদ্র।
সে বলল—
"প্রাচুর্য মানে সবকিছু পাওয়া নয়।
প্রাচুর্য মানে যা আছে তাকে যথেষ্ট বলে চিনতে পারা।"
---
তবুও কিছু জিনিস আছে যা টাকা কখনো কিনতে পারে না।
ভালোবাসা বাজারের বাইরে বসে থাকে।
প্রজ্ঞা সোনাকে উপহাস করে।
উদ্দেশ্য কোনো মুদ্রা গ্রহণ করে না।
চরিত্র বিলিয়নিয়ারদের দেখেও হাসে।
অন্তরের শান্তি কোনো ক্রেডিট কার্ড চেনে না।
এসব জন্মায় আত্মার গোপন বাগানে।
টাকা শুধু সেই মাটিতে জল দিতে পারে।
ফুল হয়ে উঠতে পারে না।
---
অবশেষে আমি শিখলাম জীবনের সেই অদ্ভুত অঙ্ক।
টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না।
সুখ আবহাওয়া।
সে আসে।
সে যায়।
সে বদলে যায়।
কিন্তু তৃপ্তি—
তৃপ্তি হলো জলবায়ু।
একটি সুন্দর জীবনের অদৃশ্য পরিবেশ।
অবিবেচনায় ব্যবহার করা টাকা শুধু শব্দ কেনে।
জ্ঞান দিয়ে ব্যবহার করা টাকা জায়গা কিনে।
শ্বাস নেওয়ার জায়গা।
ভালোবাসার জায়গা।
ক্ষমা করার জায়গা।
সুস্থ হয়ে ওঠার জায়গা।
নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জায়গা।
আর হয়তো মানুষের আসল চাওয়াও এটুকুই—
অন্তহীন আনন্দ নয়।
অসীম বিলাসিতা নয়।
শুধু অস্তিত্বের ভেতরে একটি নীরব কক্ষ,
যেখানে আত্মা অবশেষে বসে পড়তে পারে,
জুতো খুলে রেখে নিজেকেই ফিসফিস করে বলতে পারে—
"অবশেষে— আমার যা দরকার ছিল, তা আমার আছে।"