মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

বিলম্বহীনদের গোপন পরিসর

কারা সবসময় সুখী?

কারা এমনভাবে হাঁটে যেন তাদের কাঁধে কোনও অদৃশ্য পাথর নেই, যেন আগামীকাল নামের বাঘটি তাদের পিছু ধাওয়া করছে না, যেন ঋণ, আফসোস, অপূর্ণতা তাদের বালিশের নিচে বাসা বাঁধেনি?

আমি বহুদিন ধরে খুঁজেছি তাদের।

শহরের কোলাহলে, অফিসের ধূসর খাঁচায়, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির ভেতর, এমনকি নিজের মাথার গোলকধাঁধাতেও।

প্রথমে ভেবেছিলাম, তারা নিশ্চয়ই ধনী।

তারপর দেখলাম, অনেক ধনীর বুকের ভেতরে চিন্তার কারখানা দিনরাত ধোঁয়া ছাড়ে।

পরে ভাবলাম, তারা নিশ্চয়ই ক্ষমতাবান।

তারপর দেখলাম, রাজাদের ঘুমের ভেতরেও ভয়ের ইঁদুর কাগজ কেটে কেটে খায়।

পরে ভাবলাম, তারা নিশ্চয়ই জ্ঞানী।

কিন্তু জ্ঞানীরাও কখনও কখনও অতিরিক্ত চিন্তার মরুভূমিতে নিজেদের পদচিহ্ন হারিয়ে ফেলে।

তখন একদিন, স্বপ্ন আর জাগরণের মাঝখানে,

আমি পৌঁছে গেলাম এক অদ্ভুত রাজ্যে।

সেখানে মানুষদের পিঠে কোনও বোঝা নেই।

তাদের চোখে অমীমাংসিত কাজের কুয়াশা নেই।

তাদের মাথার উপর অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির শকুন উড়ে বেড়ায় না।

আমি বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম—

“তোমরা কারা?”

তারা হেসে বলল,

“আমরা সমাপ্তকারীরা।”

আমি বললাম,

“সমাপ্তকারীরা?”

তারা বলল,

“হ্যাঁ। যা করার, তা আমরা করি।

যখন করার, তখনই করি।

আগামীকালের কাছে আমরা কিছু জমা রাখি না।”

তখন আমি দেখলাম এক অলৌকিক দৃশ্য।

পৃথিবীর সমস্ত উদ্বেগ আসলে ছোট ছোট বীজ।

যে মানুষ আজকের কাজ আগামীকালের মাটিতে পুঁতে রাখে,

সেই বীজগুলো রাতারাতি দানবে পরিণত হয়।

একটি ফোনকল হয়ে যায় পাহাড়।

একটি সিদ্ধান্ত হয়ে যায় মরুভূমি।

একটি ছোট বিল হয়ে যায় অগ্নিগিরি।

একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন হয়ে যায় শিকল।

এভাবেই মানুষ নিজের হাতে নিজের কারাগার নির্মাণ করে।

কিন্তু এই রাজ্যের মানুষরা বীজকে বীজ অবস্থাতেই তুলে ফেলে।

তাই তাদের ঘরে দানব জন্মায় না।

তাদের বিছানার নিচে উদ্বেগ বাসা বাঁধে না।

তাদের ছায়া তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় না।

তারা জানে,

সময় এক অদ্ভুত প্রাণী।

তুমি যদি তাকে সম্মান করো, সে তোমাকে স্বাধীনতা দেয়।

তুমি যদি তাকে অবহেলা করো, সে তোমার বিরুদ্ধে সুদে-আসলে প্রতিশোধ নেয়।

তখন আমি দেখলাম,

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ আসলে কাজে ক্লান্ত নয়।

তারা ক্লান্ত অসমাপ্ততার ভারে।

তারা অবসন্ন অপেক্ষমাণ সিদ্ধান্তের জঞ্জালে।

তারা বিধ্বস্ত নিজেদের স্থগিত জীবনের নিচে চাপা পড়ে।

আর যারা সত্যিকারের সুখী,

তারা অতিমানব নয়।

তারা ভাগ্যের প্রিয়পাত্রও নয়।

তারা কেবল একটি গোপন বিদ্যা আয়ত্ত করেছে—

যা করতে হবে, তা এখনই করো।

কারণ “পরে” একটি বিপজ্জনক জাদুকর।

সে প্রায়শই “কখনও নয়”-এ রূপান্তরিত হয়।

আর “এখন” একটি স্বর্ণতরবারি।

যে তাকে হাতে তুলে নেয়,

সে একে একে কেটে ফেলে উদ্বেগের মাথা, দুশ্চিন্তার লতা, বিলম্বের শিকল, এবং অপূর্ণতার অন্ধকার।

অবশেষে সে বুঝতে পারে—

সুখ কোনও অনুভূতি নয়।

সুখ কোনও পুরস্কারও নয়।

সুখ হলো প্রতিদিনের অসমাপ্ততাকে প্রতিদিনই হত্যা করার শিল্প।

এবং পৃথিবীর সবচেয়ে হালকা মানুষরা

সেইসব মানুষ,

যারা তাদের আগামীকালকে আজকের ভেতরেই সমাপ্ত করে ফেলে।

প্রাপ্যের রসায়ন

তোমার বন্ধুরা আসবে তাদের পকেট ভরে নিজস্ব আবহাওয়া নিয়ে।

কেউ নিয়ে আসবে বৃষ্টি— তার নিজের অপূর্ণ দুঃখের মেঘ থেকে সংগৃহীত।

কেউ এনে দেবে একটি প্রদীপ, যা জ্বলছে তার শেষ সাহসের শেষ দেশলাই কাঠিতে।

তোমার প্রেমিক বা প্রেমিকা আসবে এক ঝুড়ি চাঁদ নিয়ে।

কিছু পূর্ণ, কিছু পুরোনো বেদনার দাঁতে কাটা, কিছু এখনও রূপালি রস ঝরাচ্ছে অপ্রকাশিত স্বপ্নের ক্ষত থেকে।

তারা তোমাকে দেবে তাদের যা কিছু আছে।

এবং অনেক সময় সেটা তারা দেবে অপূর্ব সৌন্দর্যে।

তারা তাদের স্নেহ ঢেলে দেবে তোমার শূন্য পাত্রে।

তারা তাদের বোঝাপড়ার কাপড় দিয়ে বেঁধে দেবে তোমার ক্ষত।

তারা বসে থাকবে তোমার নিঃসঙ্গতার পাশে এবং তাকে বন্ধুত্ব বলে ডাকবে।

তবু অস্তিত্বের মেঝের নিচে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত নিয়ম—

কেউ কখনও দিতে পারে না সেই সম্পদ, যা তার নিজের রাজ্যেই নেই।

অন্ধ মানুষ তোমাকে সূর্যোদয় উপহার দিতে পারে না।

তৃষ্ণার্ত মানুষ তোমার হাতে সমুদ্র তুলে দিতে পারে না।

বন্দী মানুষ তোমাকে এমন চাবি দিতে পারে না যা সে নিজেই কখনও খুঁজে পায়নি।

সুতরাং,

যারা তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে, তারাও দিতে পারে শুধু সেই মুদ্রা যা তাদের নিজের ভাণ্ডারে আছে।

কী বেদনাময় সত্য।

আবার কী মহিমান্বিত।

কারণ অসংখ্য মানুষ সারা জীবন ঘুরে বেড়ায় অদৃশ্য ভিক্ষার বাটি হাতে।

তারা পৃথিবীর দিকে বাড়িয়ে দেয় তা, আর প্রত্যাশা করে যে অন্য কেউ এসে তাদের পূর্ণ করবে।

তারা মুকুট চায় ভিখারির কাছ থেকে।

মুক্তি চায় ডুবন্ত মানুষের কাছ থেকে।

পথ চায় তাদের কাছ থেকে, যারা নিজেরাই মরুভূমিতে হারিয়ে আছে।

বছর কেটে যায়।

নক্ষত্র বুড়ো হয়ে যায়।

গ্যালাক্সি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

তবু তারা অপেক্ষা করে।

অভিযোগ করে।

বিশ্বাস করে জীবন তাদের ঠকিয়েছে।

এদিকে,

তাদেরই পাঁজরের গভীরে

ঘুমিয়ে থাকে এক সম্রাট।

ধুলোর নিচে চাপা পড়ে থাকে সে।

তার চারপাশে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকে অখোলা ভাণ্ডার, অজানা মানচিত্র, আর অমূল্য সম্পদের পাহাড়।

একদিন,

যথেষ্ট প্রত্যাখ্যানের পরে,

যথেষ্ট ভাঙনের পরে,

যথেষ্ট দীর্ঘ রাতের পরে,

যখন ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ক্লান্ত হয়ে আসে,

সম্রাটটি জেগে ওঠে।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে।

তার সঙ্গে কেঁপে ওঠে অন্তর্জগতের প্রাসাদ।

এক এক করে খুলতে থাকে বন্ধ দরজাগুলি।

প্রথম কক্ষে সে খুঁজে পায় আত্মসম্মান।

দ্বিতীয় কক্ষে ক্ষমা।

তৃতীয় কক্ষে ইস্পাতের মতো ধারালো সাহস।

আর সবচেয়ে গভীর কক্ষে,

হাড় আর নক্ষত্রের আলো দিয়ে তৈরি এক অলৌকিক দরজার ওপারে,

সে আবিষ্কার করে সেই বস্তুটি,

যা সে সারা জীবন পৃথিবীর কাছে ভিক্ষা চেয়েছে—

নিজের অনুমোদন।

নিজের স্বীকৃতি।

সেই মুহূর্তে

আকাশ হঠাৎ নীরব হয়ে যায়।

বন্ধুরা তখনও আছে।

প্রেম তখনও আছে।

পৃথিবীও ঠিক আগের মতোই আছে।

তবু সবকিছু বদলে যায়।

কারণ সে আর একজন ভিখারি হিসেবে বাঁচে না।

সে বাঁচে একজন সার্বভৌম রাজাধিরাজ হিসেবে।

এখন বন্ধুত্ব প্রয়োজন নয়, উপহার।

ভালবাসা উদ্ধার নয়, উৎসব।

এখন প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি সহানুভূতি, প্রতিটি মমতা হয়ে ওঠে অতিরিক্ত প্রাপ্তি, মরিয়া প্রয়োজন নয়।

কারণ সে অবশেষে বুঝতে পারে নক্ষত্রের চেয়েও প্রাচীন এক গোপন সত্য—

অন্যেরা তোমাকে ভালবাসতে পারে।

অন্যেরা তোমাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

অন্যেরা তোমার পাশে হাঁটতে পারে ঝড়ের মধ্যেও।

কিন্তু তোমাকে তোমার প্রকৃত প্রাপ্য দেওয়ার চূড়ান্ত দায়িত্ব

কখনও কোনও প্রেমিকের ছিল না,

কখনও কোনও বন্ধুর ছিল না,

এমনকি কোনও দেবতারও ছিল না।

সৃষ্টির প্রথম প্রভাতেই

সেই দায়িত্ব নিঃশব্দে তুলে দেওয়া হয়েছিল

তোমার নিজের কাঁপতে থাকা দু'হাতের মধ্যে।

যদি আর একবার

আজ যদি দেখা হতো আর একবার আমার সেই নিষ্পাপ ষোলো বছর বয়সের সাথে—

আহা, কী আশ্চর্য এক সন্ধ্যা হতো তা!

সময়ের পুরোনো স্টেশনে হয়তো একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকত, যার কোনো গন্তব্য নেই, শুধু ফিরে যায় অর্ধলিখিত দিনগুলোর দিকে।

আমি নামতাম ধীরে, চুলে জমে থাকা অসংখ্য শীতের ধুলো নিয়ে, আর দূরে দেখতে পেতাম তাকে—

একটি ছেলেকে।

চারপাশে মানুষের ভিড়, হাসি, বন্ধুত্বের কোলাহল, অসংখ্য কাঁধ, অসংখ্য নাম, অসংখ্য প্রতিশ্রুতি—

তবু সে দাঁড়িয়ে আছে একটি নির্জন দ্বীপের মতো, নিজেরই ভেতরে নির্বাসিত।

তার চোখে তখনও ভবিষ্যতের সমস্ত ঝড় ঘুমিয়ে আছে বীজের মতো।

সে জানে না, যাদের বন্ধু ভেবে বুক খুলে দিয়েছে, তাদের অনেকেই কেবল পথের ধুলো।

সে জানে না, তার সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলো মানুষের বিরুদ্ধে নয়, নিজের দ্বিধার বিরুদ্ধে।

আমি এগিয়ে যেতাম।

তার হাত ধরতাম।

হয়তো প্রথমে সে ভয় পেত, কারণ আমি তারই মুখ বহন করছি, কিন্তু বহু ঝড়ে ক্ষয়প্রাপ্ত।

আমি মৃদু হেসে বলতাম—

"আমাকে বন্ধু করে নেবে তোমার?

আমি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি।

আমি সেই মানুষ যে তোমার প্রতিটি কান্নার হিসাব জানে, প্রতিটি অপমানের স্বাদ চেনে, প্রতিটি ভুলের কবরের উপর একদিন ফুল ফুটতে দেখেছে।"

তারপর তাকে নিয়ে বসতাম একটি বিশাল লাটাইয়ের পাশে, যার সুতো তৈরি অপূর্ণ স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া সুযোগ, অযথা বিশ্বাস, এবং কিছু দুর্মূল্য সাহস দিয়ে।

বলতাম—

"দেখো, সব ঘুড়ি ধরে রাখা যায় না।

কিছু ঘুড়ি কাটা যাবে।

কিছু আকাশ তোমার জন্য নয়।

কিছু মানুষ শুধু তোমাকে শেখাতে আসবে কাকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

কিন্তু তাই বলে তুমি আর সুতো ছাড়বে না।

কখনও না।

লাটাই ভরতে থাকবে।

দিনের পর দিন।

বছরের পর বছর।

কারণ একদিন তোমার হাতে এমন সুতো জমবে যে তুমি নিজের ভাগ্যকেও ঘুড়ির মতো উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবে।"

চারপাশে তখন আকাশ ভরে যাবে অদ্ভুত সব ঘুড়িতে।

কেউ উড়ছে টাকার বাতাসে, কেউ প্রেমের, কেউ খ্যাতির, কেউ অহংকারের।

আর আমাদের ঘুড়ি?

সে উড়বে আরও ওপরে।

মেঘেরও ওপরে।

যেখানে ব্যর্থতা শুধু বাতাসের আরেকটি নাম, আর প্রত্যাখ্যান দিক পরিবর্তনের একটি সংকেতমাত্র।

আমি তাকে বলতাম—

"ভুল করবে।

অবশ্যই করবে।

মানুষ ভুল ছাড়া বড় হয় না।

কিন্তু কোনো ভুলকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলো না।

কোনো হারকে চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নিও না।

আর কখনও, কখনও নিজেকে একা ভাববে না।

কারণ দেখো—

ছেষট্টি বছরের এক বৃদ্ধ সময়ের সমস্ত মরুভূমি পেরিয়ে আজও তোমার কাছে ফিরে এসেছে শুধু এই কথা বলার জন্য—

তুমি হারিয়ে যাওনি।

তুমি কেবল পথ শিখছিলে।"

তারপর সন্ধ্যা নামত।

সময়ের ট্রেনটি আবার বাঁশি বাজাত।

আমি ফিরে আসতাম।

আর ষোলো বছরের সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে থাকত প্ল্যাটফর্মে, হাতে নতুন করে ধরা লাটাই।

তার চোখে তখন প্রথমবারের মতো ভবিষ্যৎ নয়—

নিজের উপর বিশ্বাসের আলো।

আর দূরে, অসীম আকাশে,

একটি ঘুড়ি

ক্রমশই অদৃশ্য হয়ে যেত তার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে।