কারা সবসময় সুখী?
কারা এমনভাবে হাঁটে যেন তাদের কাঁধে কোনও অদৃশ্য পাথর নেই, যেন আগামীকাল নামের বাঘটি তাদের পিছু ধাওয়া করছে না, যেন ঋণ, আফসোস, অপূর্ণতা তাদের বালিশের নিচে বাসা বাঁধেনি?
আমি বহুদিন ধরে খুঁজেছি তাদের।
শহরের কোলাহলে, অফিসের ধূসর খাঁচায়, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির ভেতর, এমনকি নিজের মাথার গোলকধাঁধাতেও।
প্রথমে ভেবেছিলাম, তারা নিশ্চয়ই ধনী।
তারপর দেখলাম, অনেক ধনীর বুকের ভেতরে চিন্তার কারখানা দিনরাত ধোঁয়া ছাড়ে।
পরে ভাবলাম, তারা নিশ্চয়ই ক্ষমতাবান।
তারপর দেখলাম, রাজাদের ঘুমের ভেতরেও ভয়ের ইঁদুর কাগজ কেটে কেটে খায়।
পরে ভাবলাম, তারা নিশ্চয়ই জ্ঞানী।
কিন্তু জ্ঞানীরাও কখনও কখনও অতিরিক্ত চিন্তার মরুভূমিতে নিজেদের পদচিহ্ন হারিয়ে ফেলে।
তখন একদিন, স্বপ্ন আর জাগরণের মাঝখানে,
আমি পৌঁছে গেলাম এক অদ্ভুত রাজ্যে।
সেখানে মানুষদের পিঠে কোনও বোঝা নেই।
তাদের চোখে অমীমাংসিত কাজের কুয়াশা নেই।
তাদের মাথার উপর অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির শকুন উড়ে বেড়ায় না।
আমি বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম—
“তোমরা কারা?”
তারা হেসে বলল,
“আমরা সমাপ্তকারীরা।”
আমি বললাম,
“সমাপ্তকারীরা?”
তারা বলল,
“হ্যাঁ। যা করার, তা আমরা করি।
যখন করার, তখনই করি।
আগামীকালের কাছে আমরা কিছু জমা রাখি না।”
তখন আমি দেখলাম এক অলৌকিক দৃশ্য।
পৃথিবীর সমস্ত উদ্বেগ আসলে ছোট ছোট বীজ।
যে মানুষ আজকের কাজ আগামীকালের মাটিতে পুঁতে রাখে,
সেই বীজগুলো রাতারাতি দানবে পরিণত হয়।
একটি ফোনকল হয়ে যায় পাহাড়।
একটি সিদ্ধান্ত হয়ে যায় মরুভূমি।
একটি ছোট বিল হয়ে যায় অগ্নিগিরি।
একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন হয়ে যায় শিকল।
এভাবেই মানুষ নিজের হাতে নিজের কারাগার নির্মাণ করে।
কিন্তু এই রাজ্যের মানুষরা বীজকে বীজ অবস্থাতেই তুলে ফেলে।
তাই তাদের ঘরে দানব জন্মায় না।
তাদের বিছানার নিচে উদ্বেগ বাসা বাঁধে না।
তাদের ছায়া তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় না।
তারা জানে,
সময় এক অদ্ভুত প্রাণী।
তুমি যদি তাকে সম্মান করো, সে তোমাকে স্বাধীনতা দেয়।
তুমি যদি তাকে অবহেলা করো, সে তোমার বিরুদ্ধে সুদে-আসলে প্রতিশোধ নেয়।
তখন আমি দেখলাম,
পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ আসলে কাজে ক্লান্ত নয়।
তারা ক্লান্ত অসমাপ্ততার ভারে।
তারা অবসন্ন অপেক্ষমাণ সিদ্ধান্তের জঞ্জালে।
তারা বিধ্বস্ত নিজেদের স্থগিত জীবনের নিচে চাপা পড়ে।
আর যারা সত্যিকারের সুখী,
তারা অতিমানব নয়।
তারা ভাগ্যের প্রিয়পাত্রও নয়।
তারা কেবল একটি গোপন বিদ্যা আয়ত্ত করেছে—
যা করতে হবে, তা এখনই করো।
কারণ “পরে” একটি বিপজ্জনক জাদুকর।
সে প্রায়শই “কখনও নয়”-এ রূপান্তরিত হয়।
আর “এখন” একটি স্বর্ণতরবারি।
যে তাকে হাতে তুলে নেয়,
সে একে একে কেটে ফেলে উদ্বেগের মাথা, দুশ্চিন্তার লতা, বিলম্বের শিকল, এবং অপূর্ণতার অন্ধকার।
অবশেষে সে বুঝতে পারে—
সুখ কোনও অনুভূতি নয়।
সুখ কোনও পুরস্কারও নয়।
সুখ হলো প্রতিদিনের অসমাপ্ততাকে প্রতিদিনই হত্যা করার শিল্প।
এবং পৃথিবীর সবচেয়ে হালকা মানুষরা
সেইসব মানুষ,
যারা তাদের আগামীকালকে আজকের ভেতরেই সমাপ্ত করে ফেলে।