বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

আর নয়

সে প্রেমে পড়েছে—
প্রথমে ছিল শুধু হালকা জ্বর,
চোখের ভেতর নোনা আলো,
কণ্ঠে অচেনা জোয়ার।

তারপর ধীরে ধীরে
তার চারপাশের পৃথিবী জল হয়ে উঠল—
চেয়ারগুলো ভাসতে লাগল,
দেয়ালগুলো সাঁতরে গেল দূরে,
ঘড়ির কাঁটা ডুবে গেল সময়ের তলায়
এক নিঃশব্দ বুদবুদের মতো।

সে ভালবাসায় ডুবে গেছে—
এমনভাবে,
যেন নিজের নামটাও আর তার নয়,
যেন তার শ্বাস এখন অন্য কারও
ফুসফুসে জমা রাখা এক ধার।

ডুবে গিয়ে মারা গেছে—
কোনো মৃত্যু-সনদ নেই,
কোনো শোকবার্তা নেই,
শুধু তার ছায়া একদিন
নিজের শরীর ছেড়ে
নদীর দিকে হেঁটে গেছে,
ফিরে তাকায়নি।

মৃত ব্যক্তিটি
অপরের কোনো উপকারে লাগেনি—
কারণ মৃতরা কিছু দেয় না,
তারা শুধু নীরবতা রেখে যায়,
একটা ঠান্ডা, ব্যবহারহীন গভীরতা
যেখানে ডুবে যাওয়া শেখা যায়,
কিন্তু বাঁচা নয়।

সে এখন এক সমুদ্রের অংশ—
কেউ তার নাম জানে না,
কেউ তার মুখ মনে রাখে না,
শুধু মাঝে মাঝে
জোয়ারের ভেতর একটা অদ্ভুত ক্লান্তি
উঠে আসে—
সেটাই হয়তো তার অবশিষ্ট।

আর তুমি—

তুমি যেন ভুলেও এই ভুল করো না।

যখন প্রেম তোমাকে ডাকবে
তার নীল, ভেজা কণ্ঠে,
তুমি কাছে যাবে,
কিন্তু নিজের পায়ের নিচের মাটি
ভুলে যাবে না।

মনে রাখবে—
ডুবে যাওয়া সহজ,
নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে ভালোবাসা
এক অদ্ভুত, প্রায় অসম্ভব শিল্প।

তুমি সমুদ্রের কাছে দাঁড়াবে,
জল ছুঁবে,
তার ঠান্ডা সত্য অনুভব করবে,
কিন্তু নিজের বুকের ভেতর
একটা তীর লুকিয়ে রাখবে—
যেখানে তুমি এখনও সম্পূর্ণ,
অবিভাজ্য,
জীবিত।

কারণ প্রেম যদি তোমাকে মেরে ফেলে—
সে প্রেম নয়,
সে এক সুন্দর দুর্ঘটনা
যার কোনো পুনর্জন্ম নেই।

আর তুমি—
তুমি দুর্ঘটনা নও।

তুমি সেই ব্যক্তি
যে জলের ভেতর তাকিয়ে
নিজের প্রতিচ্ছবি চিনতে পারে,
এবং ঠিক সময়ে
ফিরে আসতে জানে।

অসম্মানগুলো প্রথমে খুব ছোট ছিল—মশার ডানার মতো,শব্দও করে না প্রায়,শুধু হালকা এক চুলকানিমন নামের চামড়ার নিচে।তুমি সেগুলো গিলতে শুরু করলে—একটা, দুটো, তারপর অগণিত—যেন ওগুলো খাবার নয়,বরং প্রার্থনা,যা না গিললে প্রেম রাগ করে চলে যাবে।প্রতিবার তুমি উঠতে পারতে—নিজেকে ডেকে বলতে পারতে, “থামো,”কিন্তু তুমি উঠোনি,তুমি নেমে গেলে—এক অদ্ভুত নিচের দিকে পতনে,যাকে তুমি নাম দিলে “ভালবাসা।”সেখানে মাধ্যাকর্ষণ আলাদা—সেখানে মাথা নিচে, পা উপরে,আর অসম্মানগুলোজোনাকির মতো জ্বলে ওঠেএবং তুমি ভাবো—এগুলোই আলো।তুমি অভ্যস্ত হয়ে গেলে—কেউ তোমার বাক্য কেটে দিলে,তুমি চুপ করে গেলে।কেউ তোমার নাম ভুল উচ্চারণ করলে,তুমি সেটাকেই নিজের নতুন নাম মেনে নিলে।ধীরে ধীরেতোমার ভিতরের মানুষটাএকটা অ্যাকোয়ারিয়ামে বন্দি মাছ হয়ে গেল—বাইরের হাতগুলো কাচে ঠুকে বলে,“দেখো, কী সুন্দর সহনশীলতা,”আর তুমি ভেতর থেকেজলকেই আকাশ ভেবে নিলে।অসম্মানগুলো তখন আর ছোট থাকে না—তারা বড় হয়,শিকড় গজায় তোমার হাড়ে,তোমার শিরায় ঘাসের মতো জন্মায়,আর তুমি হাঁটতে হাঁটতেনিজেরই ভিতরে আটকে পড়ো।একদিনতুমি আয়নায় তাকিয়ে দেখবে—তোমার মুখ আছে,কিন্তু সম্মান নেই;তোমার চোখ আছে,কিন্তু সেগুলো অন্য কারও অনুমতিতে খোলে।তখন বুঝবে—প্রেমে পড়া আর নিচে পড়াএক জিনিস নয়।প্রেম তোমাকে তোলে—আর তুমি যে পতনকে প্রেম ভেবেছিলে,সে শুধু এক দীর্ঘ অভ্যাসনিজেকে অল্প অল্প করেহারিয়ে ফেলার।তাই—যখন প্রথম অসম্মানটাতোমার দরজায় কড়া নাড়বে,তাকে অতিথি বানিও না।দাঁড়াও।নিজেকে ডাকো নিজের নামে।মনে করো—তুমি কোনো অভ্যাস নও,তুমি কোনো ছাড় দেওয়া নীরবতা নও।ভালোবাসো—কিন্তু এমনভাবে,যেন প্রতিটি স্পর্শের নিচেতোমার মাটি শক্ত থাকে,যেন প্রতিটি “হ্যাঁ”-র ভেতরএকটা অবিচল “আমি” বেঁচে থাকে।কারণ—যে প্রেমে তুমি বারবারনিজেকে গিলে ফেলো,সে প্রেম নয়,সে এক ধীরে ধীরে লেখাঅদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কবিতা।আর সেই কবিতাএকদিন নিজেই নিজেকে পড়ে—দেখে যে শব্দগুলোসবই ছিল তোমার,কিন্তু বাক্যগুলো ছিল অন্য কারও।সেই দিনতোমার ভিতরের নীরবতাহঠাৎ করে ভাষা পাবে—সে বলবে,“আমি ছিলাম, আমি আছি,আমি আর মুছে যাব না।”তখন তুমি প্রথমবারনিজের দিকে হাঁটবে—কোনো সমুদ্রের দিকে নয়,কোনো পতনের দিকে নয়—বরং এক অদৃশ্য উঁচু ভূমির দিকেযেখানে দাঁড়ালেতোমার ছায়াও সোজা হয়ে যায়।আর যদি আবার প্রেম আসে—(সে আসবেই,কারণ হৃদয় কখনও শেখে নাভালোবাসা ছাড়া বাঁচতে)তুমি তাকে দরজা খুলে দেবে,কিন্তু ঘরের চাবি নয়।তুমি তাকে আলো দেবে,কিন্তু নিজের আকাশ নয়।কারণ এবার তুমি জানো—ভালোবাসা মানেনিজেকে হারানো নয়,বরং নিজেকে ধরে রেখেআরেকজনকে স্পর্শ করা।এবং সেই স্পর্শেকোনো অসম্মান থাকবে না—থাকবে শুধু দুইটি সম্পূর্ণ মানুষ,যারা একে অপরের দিকে ঝুঁকে পড়ে,কিন্তু ভেঙে পড়ে না।সেখানেই শুরু হয়সত্যিকারের প্রেম—যেখানে তুমি বাঁচো,আর ভালোবাসাও বেঁচে থাকেতোমার সাথে।

উন্নীত নিয়ন্ত্রণ

সে প্রেমে পড়েছে—
প্রথমে ছিল শুধু হালকা জ্বর,
চোখের ভেতর নোনা আলো,
কণ্ঠে অচেনা জোয়ার।

তারপর ধীরে ধীরে
তার চারপাশের পৃথিবী জল হয়ে উঠল—
চেয়ারগুলো ভাসতে লাগল,
দেয়ালগুলো সাঁতরে গেল দূরে,
ঘড়ির কাঁটা ডুবে গেল সময়ের তলায়
এক নিঃশব্দ বুদবুদের মতো।

সে ভালবাসায় ডুবে গেছে—
এমনভাবে,
যেন নিজের নামটাও আর তার নয়,
যেন তার শ্বাস এখন অন্য কারও
ফুসফুসে জমা রাখা এক ধার।

ডুবে গিয়ে মারা গেছে—
কোনো মৃত্যু-সনদ নেই,
কোনো শোকবার্তা নেই,
শুধু তার ছায়া একদিন
নিজের শরীর ছেড়ে
নদীর দিকে হেঁটে গেছে,
ফিরে তাকায়নি।

মৃত ব্যক্তিটি
অপরের কোনো উপকারে লাগেনি—
কারণ মৃতরা কিছু দেয় না,
তারা শুধু নীরবতা রেখে যায়,
একটা ঠান্ডা, ব্যবহারহীন গভীরতা
যেখানে ডুবে যাওয়া শেখা যায়,
কিন্তু বাঁচা নয়।

সে এখন এক সমুদ্রের অংশ—
কেউ তার নাম জানে না,
কেউ তার মুখ মনে রাখে না,
শুধু মাঝে মাঝে
জোয়ারের ভেতর একটা অদ্ভুত ক্লান্তি
উঠে আসে—
সেটাই হয়তো তার অবশিষ্ট।

আর তুমি—

তুমি যেন ভুলেও এই ভুল করো না।

যখন প্রেম তোমাকে ডাকবে
তার নীল, ভেজা কণ্ঠে,
তুমি কাছে যাবে,
কিন্তু নিজের পায়ের নিচের মাটি
ভুলে যাবে না।

মনে রাখবে—
ডুবে যাওয়া সহজ,
নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে ভালোবাসা
এক অদ্ভুত, প্রায় অসম্ভব শিল্প।

তুমি সমুদ্রের কাছে দাঁড়াবে,
জল ছুঁবে,
তার ঠান্ডা সত্য অনুভব করবে,
কিন্তু নিজের বুকের ভেতর
একটা তীর লুকিয়ে রাখবে—
যেখানে তুমি এখনও সম্পূর্ণ,
অবিভাজ্য,
জীবিত।

কারণ প্রেম যদি তোমাকে মেরে ফেলে—
সে প্রেম নয়,
সে এক সুন্দর দুর্ঘটনা
যার কোনো পুনর্জন্ম নেই।

আর তুমি—
তুমি দুর্ঘটনা নও।

তুমি সেই ব্যক্তি
যে জলের ভেতর তাকিয়ে
নিজের প্রতিচ্ছবি চিনতে পারে,
এবং ঠিক সময়ে সঠিক দিশায়
ফিরে আসতে জানে।