শনিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২১

সেয়ানে-সেয়ানে

তোমাকে বলিনি কখনো
মানুষ অন্য ভাষাতেও কথা বলে
যার সব শব্দার্থ জানতেই হবে
এমন দিব্যি কেউ দেয়নি তোমায়,
এমনকি তোমারই বিষয় হলেও নয় !

তেমন সময়ে, ভুল বুঝে, ধৈর্য হারিয়ে
একা এগিয়ে যেতে যেতে
মোড়ের মাথায় পৌঁছে গেলেও
পিছু না ফিরে
মৃদু হেসে অপেক্ষা কোর ।

রাস্তা যেখান থেকে 
চিরতরে ভাগ হতে চায়
সে পানে পা আর বাড়িও না ।
এরপরও এগিয়ে গেলে
অধীরকে বধিরে পাবে,
আকুল পিছুডাক 
শেষ অবধি প্রাণে পৌঁছাবে না ।

শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২১

Conservation

Is there a relation between Energy and Time ?

We are generally used to accept 'Time' as a constantly flowing entity, abundantly available as life, though every such mere chance called life, must finish only within a few decades. Well, may Time be conserved, drop by drop, as personal assets ? Yes it may, through individual outputs or achievements, converted as worth.

Well then, why we often fail to conserve Time ?  Its due to our frivolous indulgence to voluntary wastage of Energy. Its due to the absence of a volitional learning of how energy may be conserved only for ( one at a time ) single central purpose.

The most powerful dialect of the two principal volatilities that we have as life are Energy and Time. Conservation is, thus, a higher sense that we need to miserly develop as a habit, for the best utilisation of both. 

The hardcore truth of life is that, its only the 'Sense of Strict Conservation' that may permanently preserve both Energy and Time as personal assets through a longer series of unabated and individual productive outputs.

সোমবার, ২২ নভেম্বর, ২০২১

ইনফেকশন

মোটা-মাসি অনেকক্ষণ থামছে না ৷ 
থেবড়ে বসে মাজছে ঘেমো শরীর
রাস্তার ধারের কলতলায়
সান্ধ্য কলকাতায় ৷
ব্যাস, মূল দৃশ্যটি
এর অধিক আর কিছুই না ৷

তুমি ঝাঁজিয়ে উঠলে তখনি
"আরে থামবে ?
এটাকে মোটেই কবিতা বলবো না ৷"

লো-কাট ব্লাউজের স্বভাবসিদ্ধ কারুণ্যে
কালো পাথরের উদ্ধত বিভাজিকা বেয়ে
নামতে থাকা মসৃণ জলে
মাঝে মাঝেই কেমন ছলকে উঠছে
চতুর্দশীর চাঁদের অবাধ্য যুবতী প্রভা,
পথচলতি কারোর 
চোখের লালা না ঝরা কে 
সে দৃশ্য
যে একটিবারও রেয়াত করছে না,
সে কথা মাসি নিজে আদপে বুঝছে না -
তেমনটি কিন্তু ভুলেও ভেবো না ৷

নারীর কোন অবলীলার লীলা
পৌরুষের অগতিতে 
কখন যে কি পরিমানে বাড়াতে পারে -
"যেমনি নধর - ওমনি গতির প্রেরণা",
মোটা-মাসির পাকা লোম বেয়ে
ভেসে যাওয়া 
অতীতের প্রসন্ন শ্রাবণের কল্যানে
সে খবর 
বহু আগেই শতাধিক বার কেনা ৷

শব্দের শয়তানি শেষ হলে পরে
তুমি প্রায় বাকরুদ্ধ এবার 
এবং চোখে পাক্কা কবিতার মত হাসিও
কিছুতেই লুকানো গেল না !

প্রতিবাদরা প্রতিস্থাপিত,
প্রতিস্থাপক - যথারীতি প্রচ্ছন্ন ঘামে বোনা !
শ্বাসের ঘনত্বে 
জ্বরের পুনরাবর্তনের পূর্বাভাস !
তার একটু পরেই অন্যমনস্ক প্রতিবেদন - 
"ল্যাঠাটা চুকেছে কাল রাত থেকেই, 
সর্বাঙ্গে তবুও নাছোড় ব্যথা,
একটু টিপে দিও তো জোড়া হাতে,
উপরে চড়ে, মাখো মাখো করে !

রাত হলো, চল শোবে না ?"
.

সোমবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২১

ভাগ্যের ভাগিদার

দীর্ঘশ্বাস আর হা-হুতাশ দের একটু বেশি কাছাকাছি গেলে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হতে হয় ৷ 

মনস্তত্ত্বের সাথে দর্শন নিয়ে অধ্যয়নের গভীরে যাদের নিয়মিত যাতায়াত আছে, তারা হামেশা জানতেই পারে যে, মানুষের ভাগ্যের উদ্ভব ঘটে আপন চরিত্রের গভীর হতে, অর্থাৎ বিশেষ বিশেষ দুর্ভাগ্যের কারণ লুকিয়ে থাকে মানুষের বিশেষ বিশেষ চিন্তার প্রবৃত্তিতে এবং তদনুযায়ী বিশেষ কিছু stereo-typed action ও reaction এর অভ্যাসে ৷ এই বিশেষ প্রবৃত্তিরা তার প্রারব্ধ আসক্তিও হতে পারে, অথবা এ জনমের বিভ্রান্ত অর্জনও হতে পারে ৷

বিশেষ দুর্ভাগ্যটি হতে মুক্তির উপায় হলো, নিমিত্ত অভ্যাসটিতে সচতন নির্লিপ্তি তথা প্রশ্রয়হীনতা এবং বিপরীতমুখী অভ্যাসের নব সংযোজন - আপন চরিত্রে ৷

এবারে মজার কথাটি হলো, মানুষটিকে এই কথাটি ধরে কথা বোঝাতে গেলে, সে আপনাকে তেড়ে মারতে আসতে পারে, কারণ ঐ বিশেষ কু-অভ্যাসটিকে সে যেহেতু আপন ব্যক্তিত্বের গর্বিত ভাগীদার হিসেবে লালন ও পরিচর্যা করে এসেছে এতদিন, সুতরাং তার পক্ষে মেনে নেওয়া সমূহ কঠিন, যে ঐ বিশেষে দুর্ভাগ্য-সূচক কু-অভ্যাসটি ছাড়াও, সে, এই পৃথিবীতে, অতি সহজে, সুন্দরতর রূপে দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে ৷

আপনাকে বরং হতাশ হয়ে তাই দেখতে হবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, যে - দুই হাজার টাকা fees দিয়ে, সে psychiatric medicine খেয়ে ঝিমাতে পারে, দিনের পর দিন, কিন্তু ওষুধ বিনি পয়সায় হাতের কাছে পেলেও, কোনওমতেই তাকে গ্রহণ না করে, বরং নির্দ্বিধায় আপন বিষের জ্বালায় বাকি জীবন জ্বলতে অধিক প্রবৃত্ত হতে পারে ৷

মানুষের অজ্ঞতা এই উপায়ে আপন ভাগ্য বা কপালকে না পাল্টানোর চেষ্টা ক'রে, অসহায় রূপে মেনে নিয়ে, দিনের পর দিন বরং অধিকতর reinforce করার চেষ্টা করে ৷

রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২১

ত্বরণ

যখন খুঁজতে, খুঁজতে, খুঁজতে,
ক্লান্ত হয়ে, আর বিভ্রান্ত না হতে,
অবশেষে ডুব দাও আপন গভীরে,
পাগলের মত খুঁড়তে শুরু কর নিজেকে

তখন আমার মৌনতার অবসর !
তখন আর তোমার কাছে গিয়ে
জানান দিতে চাই না আপন উপস্থিতির !
বলি না - "পাশেই আছি তোমার" !
বিরক্ত করি না যেচে,

কারণ - সব মানুষেরই সৌভাগ্যে
বিশেষ বিশেষ সময়ে
রইতে হয় কিছু পথ একলা হাঁটবার ৷

শুক্রবার, ১২ নভেম্বর, ২০২১

নেশা


বয়সের সাথে সাথে মানুষের পরিনতি বা পরিপক্কতা বৃদ্ধি পায় ৷ আমরা তাকে ইংরেজিতে ম্যাচিওরিটি বলে থাকি ৷ কোনও কোনও বালক, বালিকার মধ্যে এমন অদ্ভুত ম্যাচিওরিটি দেখা যায়, যা তার বয়সের সাথে আদৌ খাপ খায় না ৷ 

এরা খুব অল্প বয়স থেকে প্রতিটি ক্ষনস্থায়ী, অদূর ও ক্ষুদ্র স্বার্থকে অবাক নির্লিপ্তিতে পাশ কাটিয়ে যেতে থাকে, এক এর পর এক, কোনও এক সুদূরের প্রতি স্থির লক্ষ্যে, অন্য সকল সমবয়সীদের থেকে একদিন অনেক বেশি বড় হয়ে, ধরা ছোঁওয়ার ঈর্ষণীয় বাইরে চলে যেতে যেতে ৷

মানব হতে মহামানবের প্রকাশ-সম্ভাবনা জাগরিত হতে পারে কেবল জাগতিক প্রলোভনের বিরুদ্ধে শক্তির সংরক্ষণের দ্বারা, অপচয় প্রতিরোধে - কঠিনতম সংযম-ক্ষমতার উপরে আপোষহীন নির্ভরে ৷ 

অপরপক্ষে, প্রতিটি সুখের দিশা - মধ্য-চিত্তের করুণ বিবশতার বহমান নিত্যে লঘুত্বের নেশাই হয়েছে কেবল, তেজোদ্দীপ্ত শক্তির প্রণম্য দিশা হতে পারে নি কোনওদিন ৷
.

সোমবার, ৮ নভেম্বর, ২০২১

শুদ্ধম স্মরণম

প্রেম যদিও স্বভাবে আপাদমস্তক চোর,
প্রতিটি প্রেমের মাঝে
কিছু না কিছু ভালবাসার শুদ্ধতার বাস,
বাঁশির সুরে প্রণতি যেমন
সারস্বত বীণার অনুনাদ-প্রয়াস ৷

প্রাণ ঢেলে ভালবাসলেও
মানুষটিকে প্রেমের টানে
শিকড়-সমেত উপড়ে ফেলা
শেষ অবধি পারে না অভীষ্ট হতে ৷
যথার্থ আত্মশ্রদ্ধাবোধ
একটিই মূলকে অনুমতি দেয়
জীবনের সুগভীরে স্থিরতা ও স্থায়িত্বকে
প্রত্যয়ী সম্মান জানাতে ৷

শনিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২১

অভ্যর্থনা

দরজা খোলাই ছিল ৷
জাঁকজমক খুব বেশি ছিল না হয়তো,
তবে, পর্যাপ্ত পরিমাণ আন্তরিকতা ছিল
পরাণের আরাম কেদারার আহ্বাণে ৷

তুমি পারোনি 
অহমিকা আর অধিকারবোধের
বিশাল ওই অস্বচ্ছ বপুকে দরজার বাইরে 
জুতোর মতন খুলে রেখে আসতে ৷
দক্ষ কৌশলীর
ঢুকতে গিয়ে তাই এক্সিডেন্ট হলো ৷

আটকে পড়ার পরমুহূর্তে, সচেতন হয়ে,
অভ্যাসকে বর্ষতির মত
ঘরের বাইরে টাঙিয়ে আসলেও হতো ৷
কিন্তু আসক্তি এতটাই তীব্র, যে -
তোমাকে সর্ব-সমেতই ঢুকতে হবে ৷
প্রবেশ-দ্বারে অপরিমিত প্রশস্তি 
খুঁজে না পেয়ে পেয়ে, অবশেষে,
ইচ্ছার তীব্রতার 
বিনাশ-কাল সমাগত হতে হলো ৷

সেই কারণে নির্দোষকে "মৃতদেহ" ব'লে
অভিশাপ দিয়ে চলা অবধারিত - নিয়তির ৷
"গতিকে যতির অভিশাপ হতে মুক্ত করতে
দৃষ্টি স্বচ্ছতর হোক" - এই মৌন প্রার্থনা
তারপরও
অসহযোগী ছিল না কখনও 
চিরহরিৎ-প্রবণ অভিকর্ষ-প্রান্তরে ৷
অভিমানী অবান্তরের যদিও কোনও
উপায় ছিল না আর সে কথাটি জানার ৷
.

বুধবার, ৩ নভেম্বর, ২০২১

উড়াল

সজ্ঞানে টানতে থাকা
তোমার বিবশ হাত দুটি ধরে

তবে আমার কাছে নয়
জীবনের সত্য-সমূহের নিকটতরে
যেন ঘর্ষণে চোখের ছানি 
ক্রমশ ফিকে হতে বাধ্য হয়
একটু একটু করে

যেন প্রবৃত্তি-তাড়িত দাসত্বের
ক্রমাগত আবর্তন হতে
মুক্তির দিশাটি একটিবার চিনতে পেরে
ক্রমশঃ কমে আসে ভুলের গড্ডলিকা আর
যাপন-পথটি সরলরৈখিক হতে পারে

যেন অবদমিত রোমাঞ্চের বাঁধা ছকে
ভোগের ভোগান্তিতে 
নতুন ক'রে আর না ফেঁসে 
বারংবার হতাশায় পৌঁছানোর 
অবধারিত নিয়তি
অস্তিত্ব হারায় চিরতরে 

যেন হাসতে পার দিল খুলে, উচ্চ-স্বরে,
খোদ আপন উত্তরণের সুবাদে
জয়ীর পতাকা অনেকটা উঁচুতে তুলে ধ'রে

যেন শিকল-ভাঙা পরী 
সুন্দরের অন্বেষণে
মুক্তাকাশে 
ভালবাসার জোড়া-ডানা মেলে
স্বাধীনতার নির্বিবাদে
ফের যেমন খুশি 
নিশ্চিন্তে উড়ে যেতে পারে 
.

সোমবার, ১ নভেম্বর, ২০২১

রোধ

কাল না একটা কাণ্ড করেছি ! 
.
হাসান কাকু গত বছর বাবাকে যে মোটা ডাইরিটা দিয়েছিল, বাবা, এতদিন হল, তার মধ্যে একটা শব্দও লেখেনি ! আচ্ছা, ডাইরিটার বুঝি কষ্ট হয় না, কেউ সারাদিনে একবারও তার দিকে মনযোগ না দিলে ? আমি না, তাই ওকে নিয়ে চলে এসেছি আমার বইয়ের তাকে ! বাবা তো খেয়ালও করে না ! আর আমিও তো এখন ক্লাস সিক্স এ ! দ্যাখ, সব কথা এখন কেমন নিজে লিখতে পারি !
.
আমি তো জানি, আমি আগে পেনসিল নিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে শুরু করলেই তুই যেমন এক লাফে আমার পাশে এসে দাঁড়াতি, এখনও তেমনই করবি ! ব্যাস ! তাহলেই আমি আবার যখন যা মনে আসবে - বলতে পারব তোকে !
.
গত বছর মা যখন মরে গেল, আমার না কান্না পায় নি ! সবাই বলছিল প্রেশার বেশি ছিল বলে এত অল্প বয়েসে হার্টফেল করে গেল ! আমি ভাবছিলাম যতবারই নিয়ে যাক না কেন, যেখানেই হোক, সেরে গেলে আবার ঠিক ফেরৎ দিয়ে যাবে ! বাবা কিন্তু খুব কেঁদেছিল শ্মশান থেকে আসার পরে ! আমাকে নিয়ে যায় নি ! তবে শ্রাদ্ধের আগের দিন ন্যাড়া করে দিয়েছিল - আমাকে !
.
তার কয়েক দিন পরে ফারুক কাকু, পরেশ কাকু আর মদন কাকু সন্ধ্যাবেলা বাবাকে বড় ঘরে নিয়ে গিয়ে, অনেক ক্ষণ ধরে কী যেন বোঝালো ! বার বার আমার নাম করছিল, - এটা শুনতে পেয়েছিলাম ছোট ঘর থেকে ! আর তার দুই মাস পরে বাবা একদিন, আচমকা আমাকে না বলেই, সেই, আমাদের দূর সম্পর্কের সন্ধ্যা মাসিকে সাথে করে নিয়ে এলো সন্ধ্যাবেলা ! সন্ধ্যা মাসির মাথায় দেখি মায়ের মত সিঁদুর ! তারপর থেকে সন্ধ্যা মাসি আমাদের সাথেই থাকে !
.
সুহাসিনী জ্যেঠিমা আমার বালিশটা ছোটঘরের তক্তায় এনে ফেলে আমাকে বলেছিল, - "প্রতীক, সোনা বাবা আমার ! তুমি তো বড় হয়ে গেছ এখন ! আরও বড় হতে গেলে আর মা বাবার সাথে শুতে নেই !  তুমি এখন থেকে এই ঘরে শোবে !"
.
তখন থেকে আমি ছোট ঘরে শুই - একা ! তাই কত সুবিধা হয়েছে দেখ, সবাই ঘুমাচ্ছে আর আমি এখন কি করছি !

তোকে না, চুপি চুপি একটা কথা বলি ! আমি তার দুদিন পরে, খুব ভোরে, একটু আলো ফুটতে, লুকিয়ে লুকিয়ে বড় ঘরে গেছিলাম ! মায়ের বালিশে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিল সন্ধ্যা মাসি ! মুখটা, কেমন যেন হাসি হাসি !
.
আমার তখন মায়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রে ! খুউব ! আমি তারপরেই মায়ের নতুন ছবিটাতে, চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে, অনেকবার বলেছি, "মা তুমি কেঁদো না, একদম কষ্ট পেয়ো না ! কেমন ! আজ থেকে আমি আমার বালিশের দেওয়ালের দিকের অর্ধেক টা তে শোব ৷ আমার ওতেই হয়ে যাবে ৷ বাইরের দিকের অর্ধেকটাতে তুমি মাথা রেখে শুয়ো ! আর, এখন থেকে আমার কাছে ছোটো ঘরেই থেকো ! যারা বেশি কাঁদে তারা বোধহয় পারেও - তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে !"
.
তারপর মুস্কিলও হয়েছিল একটা ! মাঝে মাঝেই, কেউ না কেউ খপ করে ধরে ফেলে - আমাকে ৷ তারপর চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করে আমি সন্ধ্যা মাসিকে মা বলে ডাকি কিনা ! আমাকে তখন কোনও রকমে ওদের হাত ছাড়িয়ে পালাতে হয় !
.
ওরাও কিছুতেই ছাড়তে চায় না আমাকে ৷ আচ্ছা তুই-ই বল কেমন বোকা ওরা ! আমি নিজের মাকে নিজেই আরও কষ্ট দিতে পারি ? মা কখন, কেন কষ্ট পায় - সেটা ওরা কেন যে একজনও বোঝে না ?
.
সেদিন অবশ্য আমিও বুঝতে পারি নি কিছু - রাতের অন্ধকারে ! খালি সবাই যখন "কি হয়েছিল বল ! কি হয়েছিল বল !" - বলে, বার বার, জোর করছিল - বাবাকে, তখন বাবা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে তাকাতে বলেছিল - বাবার মুখের ভিতরে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে রেখে, ওরা প্রথমে মা আর তোর হাত দুটো পিছমোড়া করে বেঁধে দিয়েছিল ৷ তারপর তোদের মুখে আর চোখে ডাক্তার বাবুদের চিটিং প্লাস্টার আটকে দিয়েছিল ! তারপর একটা বোরখা বের করে পরিয়ে দিয়ে, ওদের একজন তোকে কাঁধে তুলে নিতেই সবাই একসাথে চলে গেছিল !
.
সবাই যখন মায়ের হাতের বাঁধন খুলে, চিটিং প্লাষ্টারগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলল মুখ আর চোখ থেকে, তখন মায়ের দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে - সে কী কান্না ! কেউ থামাতেই পারছিল না ! মা খালি বলছিল - " চোদ্দ বছরের মেয়েটাকে ওরা কী কষ্টই না দেবে ! মেয়েটা খালি গোঙাবে আর মা মা বলে ডাকবে ! আর তাতে সবার আরও নেশা বেড়ে যাবে ! কেউ একটুও বাঁচাতে তো আসবেই না ! বরং কাঁদলেই ওরা আরও মারধোর করবে ! কোথায় কোথায় নরম জায়গাগুলোতে, খুঁজে খুঁজে, জোরে জোরে মারবে ! খামচে রক্ত বের করবে, - যার যেমন ইচ্ছা ! কী অত্যাচারই না করবে ! মেয়েটা হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাবে - যন্ত্রণায় ! তবুও ছাড়বে না ওরা, তারপরও, অচেতন শরীরটাকে ! কতগুণ বেশি নিষ্ঠুর হতে পারে মানুষ - হায়নার থেকে !
.
আমি কি করব এখন ? কত ভরসা করত মাকে ! কত শ্রদ্ধা করত বাবাকে ! কী ভালটাই না বাসত সবাইকে ! কী পেল করে ? আসলামের বৌটা কবেই বলেছিল - দিদি, বাঁচতে চাও তো পলায়ে যাও এ দ্যাশ ছেড়ে ! সুখের মায়ায় পড়ে তখন কান দিই নি সুপরামর্শে ! হায় ! কী পাপের পাপী ! এখন পারলাম না বাঁচাতে ফুলের মত সন্তানটারে !"
.
আমি না, এখন বড় হয়ে গেছি, জানিস ! অনেকটা বেশি ! অনেক নতুন নতুন কায়দা করতে পারি ! যেমন, ইস্কুলের পম্পা দিদিমনি কাল বলছিল, - স্বামী বিবেকানন্দ নাকি দেওয়ালে একটা পেন্সিলের ফোঁটা দিয়ে, তার দিকে তাকিয়ে ধ্যান করতেন ! ব্যাস, আমিও বাড়িতে ফিরে ছোটঘরে এসে, সুইচ বোর্ডের ঠিক পাশে চুনকামের যে সরু লম্বা লম্বা নীল দাগগুলো ছিল, ওগুলোতে নজরে পড়তেই, দেখতে পেলাম -  তোর চুলগুলো যেন ! তারপরই ব্যাস ! বিবেকানন্দের মত বেশ কিছুক্ষণ সোজা তাকিয়ে থাকতেই, একটু একটু করে দেখতে পেলাম চুলের নীচে কপাল ! তার নীচে - তোর চোখদুটো, নাক, ঠোঁট, থুতনি - তোর মুখের সবটা ! আর আমি পুরোটা চিনতে পেরেছি যেই, ওমনি, তোর মুখে সেই - খুব মিষ্টি হাসিটাও ! 
.
তারপর থেকে কতবার দেখেছি ! পরশু, সন্ধ্যামাসি দানাদার কিনে নিয়ে এসেছিল অনেকগুলো ! আমি আজ সকালে ফ্রিজ খুলে দেখে এসেছি - দুটো দানাদার এখনও পড়ে আছে প্যাকেটে ! আর, সেই জন্যই তো বলছি - একটা কাজ করবি ? না ! তোকে তেমন কিচ্ছুটি করতে হবে না ! সব আমিই করব, শুনেই দ্যাখ ! অতটাও ছোট নেই এখন !
.
চান করে নিয়েছি আজ কাউকে না বলে, ভোর হওয়ার আগেই ! সন্ধ্যামাসির সকালের পূজো হয়ে যাওয়ার পরে, চুপিচুপি বাতাসা নকুলদানা দেওয়ার ঠাকুরের ছোট্ট থালাটা গেঞ্জির মধ্যে লুকিয়ে এনে, তাতে, ফ্রিজ থেকে দানাদার দুটো দিয়ে, - তোর পাশে, পড়ার টেবিলে রাখব ! আর চট করে তুলে আনব কয়েকটা দুব্বো ঘাস - বাগান থেকে ! 
.
এরপর, পাশে, আশুতোষদের বাড়িতে আশুতোষের দিদি যখন ভাইফোঁটা দেবে, তখন ওদের মা শাঁখ তো বাজাবেই ! আর যেই না বাজাবে, ওমনি আমি চট করে আমার কপালটা নিয়ে এসে আলতো করে ঠেকাব দেওয়ালে -ওই খানে, যেখানে হাসছিস তুই ! ব্যাস, তখন তোর তিন বার ফোঁটা দিয়ে দিতে আর কী অসুবিধা থাকবে - বল ! দ্যাখ, বড়দের মত বুদ্ধি হয় নি ?
.
আর একটা কথা আছে ! বলি ? তুই আমাকে ফোঁটা দেওয়ার পরে অনেকক্ষণ যে আলতো করে ধরে থাকতিস, তখন আমার কি মনে হত জানিস ? সেটা তোকে কখনও বলি নি কিন্তু ! 
.
মনে হত - দুটো ইয়াব্বড় ডানা তুই কাউকে জানতে না দিয়ে লুকিয়ে রাখিস পিঠে ! আমাকে ফোঁটা দেওয়ার পরে যখন অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকিস, একমাত্র তখনই - আসলে, তুই সত্যি সত্যি পরী হয়ে যাস ! কত কত দূরের আকাশে ঘুরিয়ে নিয়ে আসিস - আমাকে ! আর আমার কী দারুণ লাগে রে, - তখন !
.
এই দিদি ! বল না ! তোর তো মনে আছে ! ধরবি ? আমাকে আজকে আবার অমন করে জড়িয়ে ? শুধু একবার ! ব্যাস ! তাহলেই হবে !
.
আমার খুব ইচ্ছে করে !
.
01.01.2016