শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

গোপন বিজয়

পুরুষ ভাবে

সে আগুন।

তার ক্ষুধা আছে, তার ঝড় আছে, তার দখল করার প্রবল ইচ্ছা আছে।

সে এগিয়ে আসে ধূমকেতুর মতো, নিজের জ্বলন্ত লেজে রাত্রির আকাশে আঁচড় কাটতে কাটতে।

আর নারী?

সে বসে থাকে একটি নিস্তব্ধ হ্রদের মতো।

দেখতে নিষ্ক্রিয়।

দেখতে স্থির।

দেখতে যেন কিছুই ঘটছে না।

কিন্তু স্থির হ্রদের নীচে পুরো একটি চাঁদ ডুবে আছে।

পুরুষ যা দেখে তা কেবল পৃষ্ঠতল।

নারী যা অনুভব করে তা বহুস্তরবিশিষ্ট মহাবিশ্ব।

একটি স্পর্শ তার ভেতরে কখনও কখনও হাজারটি ঘণ্টাধ্বনি হয়ে বাজে।

একটি দৃষ্টি তার রক্তের ভিতর অসংখ্য প্রজাপতির জন্ম দেয়।

একটি মুহূর্ত তার কাছে একটি সম্পূর্ণ ঋতুচক্র হয়ে উঠতে পারে।

তাই পুরুষ যখন নিজের বিজয়ের হিসেব কষে,

নারী তখন অনুভূতির অদৃশ্য খনিতে আরও গভীর স্তরের সোনা তুলে আনে।

পুরুষের আনন্দ প্রায়ই বজ্রপাতের মতো—

উজ্জ্বল, প্রচণ্ড, কিন্তু সংক্ষিপ্ত।

নারীর আনন্দ অনেক সময় সমুদ্রের জোয়ারের মতো।

ধীরে আসে।

গভীর থেকে আসে।

আর একবার উঠতে শুরু করলে উপকূলের মানচিত্র বদলে দেয়।

পুরুষ ভাবে সে একটি ফুল তুলেছে।

নারী meanwhile সেই ফুলের সুবাস দিয়ে পুরো বাগান অধিকার করে ফেলেছে।

পুরুষ ভাবে সে একটি দরজা খুলেছে।

নারী তখন সেই দরজার ওপারে অসংখ্য গোপন কক্ষ আবিষ্কার করছে।

কারণ নারীর প্রকৃতি কখনও কেবল ঘটনাকে গ্রহণ করা নয়।

সে তাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে।

এক বিন্দু বৃষ্টি পেলে সে তার ভিতরে একটি বর্ষাকাল তৈরি করতে পারে।

একটি ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ পেলে সে তার চারপাশে একটি নক্ষত্রপুঞ্জ গড়ে তুলতে পারে।

তাই অনেক সময়

যাকে বাইরে থেকে নিষ্ক্রিয় বলে মনে হয়,

তার ভিতরেই চলতে থাকে সবচেয়ে বিস্ময়কর ভূমিকম্প।

আর তখন

মহাবিশ্বের গোপন আদালতে একটি রায় নীরবে লেখা হয়—

ভোগের খেলায় শক্তি সবসময় আক্রমণে থাকে না।

কখনও কখনও

সবচেয়ে বড় জয় ঘটে গ্রহণের গভীরতায়।

এবং সেই গভীরতার অন্ধকার সমুদ্রে

নারী প্রায়ই পুরুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি আলো, স্বপ্ন, অনুভব, এবং আনন্দ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।

তাই শেষ পর্যন্ত

পুরুষ হয়তো মনে করে সে জয়ী হয়েছে।

কিন্তু চাঁদ যেমন সমুদ্রকে ছুঁয়েও ছোঁয় না, তবু সমস্ত জোয়ারকে নিয়ন্ত্রণ করে,

তেমনি নারীও তার নিঃশব্দ অনুভবের মহাকর্ষে

অজান্তেই জিতে নেয় খেলার সবচেয়ে গোপন বিজয়।

কারণ ভোগ কেবল দেহের ঘটনা নয়।

ভোগ হলো কতদূর পর্যন্ত তুমি অন্যের অস্তিত্বকে নিজের ভিতরে প্রববেশ করাতে পারলে তার পরিমাপ।

এখানেই শুরু হয় নারীর অদৃশ্য সাম্রাজ্য।

পুরুষ অনেক সময় একটি মুহূর্তকে ভোগ করে।

নারী সেই মুহূর্তের প্রতিধ্বনি বহুদিন ধরে শুনতে পারে।

পুরুষ অনেক সময় একটি শরীরকে স্পর্শ করে।

নারী সেই স্পর্শের চারপাশে একটি সম্পূর্ণ অনুভূতির নগরী নির্মাণ করে।

সেখানে আছে আলোয় ভেজা পথ, স্মৃতির জানালা, কল্পনার বাগান, এবং এমন সব অদৃশ্য সিঁড়ি যেখানে বাস্তবতা ও স্বপ্ন একই পোশাক পরে হাঁটে।

পুরুষ যখন ফিরে যায় তার দৈনন্দিন পৃথিবীতে,

নারী তখনও সেই অভিজ্ঞতার গভীর সাগরে আরও একবার ডুব দেয়।

আরও একবার।

আরও একবার।

প্রতিবারই সেখানে নতুন মুক্তো খুঁজে পায়।

এই কারণেই মহাবিশ্ব নারীর হৃদয়কে কেবল একটি পাত্র বানায়নি।

তাকে বানিয়েছে একটি রসায়নশালা।

যেখানে অনুভূতি নিজের আকারের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

যেখানে একটি স্পর্শ একটি নক্ষত্রে রূপান্তরিত হতে পারে।

যেখানে একটি দীর্ঘশ্বাস একটি পূর্ণিমার জন্ম দিতে পারে।

আর একটি ক্ষণস্থায়ী মিলন কখনও কখনও বহু বছরের নীরবতাকেও অর্থ দিয়ে যেতে পারে।

তাই ভোগের এই অদ্ভুত খেলায়

বিজয়ীর মুকুট সবসময় যার মাথায় দেখা যায় সে-ই বিজয়ী নয়।

অনেক সময়

যে নীরবে চোখ বুজে সমস্ত তরঙ্গকে নিজের ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়,

যে অনুভবকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত নিংড়ে নিতে জানে,

যে একটি ফোঁটা মধু থেকে পুরো একটি বসন্ত তৈরি করতে পারে,

প্রকৃত বিজয় তারই হয়।

আর তখন

সমস্ত নক্ষত্রের ওপরে, সমস্ত শরীরের ওপরে, সমস্ত দাবিদাওয়া ও অহংকারের ওপরে,

একটি চিরন্তন নারীহাসি ভেসে ওঠে মহাশূন্যে—

যেন সৃষ্টি নিজেই বলছে,

“ভোগের খেলায় বিজয় তারই, যে অধিক অধিকার করে নয়, যে অধিক গভীরভাবে অনুভব করে।

কারণ দখল শুধু বাহুর শক্তি জানে,

কিন্তু অনুভব জানে মহাবিশ্বের গভীরতা।

আর যে গভীরতাকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত পান করতে পারে,

শেষ পর্যন্ত ভোগও তারই হয়, বিজয়ও তারই হয়।”

এবং তখন

সমস্ত আগুন, সমস্ত জোয়ার, সমস্ত শরীর, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা

ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়

এক মহাজাগতিক সত্যের মধ্যে—

যে গ্রহণের শিল্প জানে, সে-ই শেষ পর্যন্ত সৃষ্টির সবচেয়ে গোপন মধু অধিক পরিমাণে আস্বাদন করে।

আর সেই কারণেই,

এই অনন্ত, অদ্ভুত, স্বপ্নময়, সুররিয়াল ভোগের খেলায়—

নারী প্রায়শই নিঃশব্দেই জিতে যায়।

শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

উড়ানের জ্বালানি

বিমান জানে—

আকাশে পৌঁছানোর আগে
তাকে পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।
মাধ্যাকর্ষণ কখনও
স্বেচ্ছায় কাউকে মুক্তি দেয় না।
তাই উড্ডয়নের প্রথম কয়েক মিনিটে
সে তার জ্বালানির বিরাট অংশ
পুড়িয়ে ফেলে।
অসংযত আগুনে।
অবিরাম গর্জনে।
প্রচণ্ড প্রতিরোধের বিরুদ্ধে।

রানওয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ
প্রায়ই ভাবে,
“কী অপচয়!”

কিন্তু বিমান জানে—
এ অপচয় নয়।
এ বিনিয়োগ।
কারণ মাটি থেকে
মাত্র এক ফুট ওপরে ওঠাও
কখনও কখনও
পাঁচ হাজার মাইল ভ্রমণের চেয়েও কঠিন।

মহান মানুষদের জীবনেও
একই নিয়ম কাজ করে।
যারা নিজেদের সীমা ভেঙে
অন্য এক মানদণ্ডে পৌঁছাতে চায়,
তাদেরও প্রথমে
এক ধরনের নির্মম ত্বরণ সহ্য করতে হয়।
সেই সময়
তাদের অধিকাংশ শক্তি
বাহ্যিক ফলাফলে নয়,
অভ্যন্তরীণ রূপান্তরে ব্যয় হয়।

অন্যেরা দেখে—
কিছুই ঘটছে না।
কোনো পদক নেই।
কোনো করতালি নেই।
কোনো দৃশ্যমান সাফল্য নেই।
কিন্তু অদৃশ্যের ভেতরে
ইঞ্জিনগুলো জ্বলছে।
অভ্যাস বদলাচ্ছে।
চিন্তার কাঠামো বদলাচ্ছে।
আত্ম-শৃঙ্খলার নতুন স্নায়ুতন্ত্র
গড়ে উঠছে।
পুরোনো দুর্বলতাগুলো
এক এক করে পুড়ে ছাই হচ্ছে।
বাইরে থেকে
মানুষটি একই রকম দেখায়।
কিন্তু তার ভিতরে
একটি নতুন বিমানবন্দর নির্মিত হচ্ছে।

সুপার হিউম্যানরা
সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি শক্তিশালী বলে
মহান হয় না।
বরং তারা জানে
কখন সমস্ত শক্তি
একটি নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত করতে হয়।
তারা জানে,
জীবনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মুহূর্ত
সাধারণত শুরুতেই আসে।
যখন তুমি ভোরে ওঠা শুরু করো।
যখন তুমি অলসতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো।
যখন তুমি ব্যবসা শুরু করো।
যখন তুমি শরীর বদলাতে চাও।
যখন তুমি নিজের চরিত্রকে
পুনর্গঠন করতে চাও।
সেই সময়
তোমার পুরোনো পরিচয়
তোমাকে নিচে টেনে ধরে
মাধ্যাকর্ষণের মতো।
বন্ধুরা বুঝতে পারে না।
পরিবার সন্দেহ করে।
সমাজ উপহাস করে।
আর তোমার নিজের মনও
অসংখ্যবার ফিরে যেতে বলে।
কারণ রানওয়ের উপর
ঘর্ষণ সবচেয়ে বেশি।
আকাশে নয়।

অনেকেই তাই থেমে যায়।
তারা গতি পায়,
কিন্তু উড্ডয়ন পায় না।
তারা উত্তপ্ত হয়,
কিন্তু প্রজ্জ্বলিত হয় না।
তারা শুরু করে,
কিন্তু যথেষ্ট জ্বালানি পোড়াতে রাজি হয় না।
ফলে তাদের জীবন
চিরকাল ট্যাক্সিওয়েতে ঘুরতে থাকে—
ইঞ্জিন চালু,
স্বপ্ন জাগ্রত,
কিন্তু চাকা এখনও মাটিতে।

আর যারা শেষ পর্যন্ত
নিজেদের আগুনকে ভয় পায় না,
তারা একদিন
অদৃশ্য এক সীমারেখা অতিক্রম করে।
হঠাৎ নয়।
ধীরে ধীরে।
যেন পৃথিবীর হাত
তাদের গা থেকে সরে যাচ্ছে।

তারপর একদিন
তারা আবিষ্কার করে—
যে শক্তি একসময়
উড্ডয়নের জন্য ব্যয় হচ্ছিল,
এখন তা দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট।
যে সংগ্রাম একসময়
অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ছিল,
এখন তা উৎকর্ষের পক্ষে কাজ করছে।
আর তখনই তারা বোঝে—
মহত্ত্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অংশ
শিখরে নয়,
শুরুর কয়েক মিনিটে।

কারণ প্রতিটি বিমান
প্রথমে পৃথিবীকে পরাজিত করে,
তারপর আকাশ জয় করে।
এবং প্রতিটি অসাধারণ মানুষও
প্রথমে নিজের অভ্যন্তরীণ মাধ্যাকর্ষণকে পরাজিত করে,
তারপর পৃথিবী তাকে
“অসাধারণ” বলে ডাকতে শুরু করে।

সম্পদ সৃষ্টির শিল্প

সম্পদ সৃষ্টির শিল্প

সম্পদ সৃষ্টি করা
টাকা জমা করার কৌশল নয়।
তা অনেক গভীর।
অনেক অদ্ভুত।
অনেকটা এমন—
যেন একজন মানুষ
নিজের ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা সূর্যকে
ধীরে ধীরে আবিষ্কার করছে।

অনেকেই অর্থ চায়,
কিন্তু খুব কম মানুষ বোঝে
অর্থ সত্যিই কোথা থেকে আসে।
তারা ফল দেখতে পায়,
কিন্তু শিকড় দেখে না।
তারা নদী দেখে,
কিন্তু হিমবাহ দেখে না।
তারা সোনার মুদ্রা দেখে,
কিন্তু সেই অদৃশ্য মস্তিষ্কটিকে দেখে না
যেখানে প্রথম তার জন্ম হয়েছিল।

প্রত্যেক প্রকৃত সম্পদ
দুইবার সৃষ্টি হয়।
প্রথমে কল্পনায়।
তারপর বাস্তবে।
প্রথম জন্মটি অদৃশ্য।
দ্বিতীয়টি দৃশ্যমান।

আর অধিকাংশ মানুষ
প্রথম জন্মটিকে উপেক্ষা করে,
আর সেই কারণেই
দ্বিতীয় জন্মটি
কখনও ঘটে না।

সম্পদ হলো
ঘনীভূত মূল্যের এক রূপ।
এটি সৃষ্টি হয় তখন,
যখন তুমি অন্য মানুষের সমস্যাগুলোকে
নিজের চিন্তার ভাটিতে গলিয়ে
সমাধানের সোনায় রূপান্তরিত করো।

তোমার উপস্থিতির কারণে
যত বেশি মানুষের জীবন উন্নত হয়,
তত বেশি সম্পদ
তোমার দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে।

মহাবিশ্ব যেন এক বিশাল বাজার—
যেখানে অর্থ
আসলে কৃতজ্ঞতার দৃশ্যমান রূপ মাত্র।
একটি বই,
একটি ব্যবসা,
একটি আবিষ্কার,
একটি দক্ষতা,
একটি সৎ পরামর্শ,
একটি সাধারণ সমস্যার
অসাধারণ সমাধান—
এসবই সম্পদের বীজ।

কিন্তু প্রতিটি বীজকে
মাটির নিচে
দীর্ঘ অন্ধকার সহ্য করতে হয়।
সেই অন্ধকারের নাম—
অধ্যবসায়।
অনিশ্চয়তা।
উপহাস।
অপেক্ষা।

অনেক মানুষ বীজ বপন করে,
কিন্তু বারবার তা খুঁড়ে দেখে
অঙ্কুর বেরিয়েছে কিনা।
আর তাই
তাদের বাগান
কখনও বন হয়ে ওঠে না।

ধনী মানুষরা প্রায়ই
সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে।
গরিব মানুষরা প্রায়ই
সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
একজন অপেক্ষা করে।
অন্যজন অধৈর্য হয়ে ওঠে।
একজন গাছ লাগায়।
অন্যজন ফল খোঁজে।
একজন সম্পদ সৃষ্টি করে।
অন্যজন শুধু আয় খোঁজে।
আর দশ বছর পরে,
এই দুই পথের ব্যবধান
একটি নদী থেকে
একটি মহাসাগরে পরিণত হয়।

তবু সম্পদ সৃষ্টির শিল্পের
সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায়
অর্থ নয়।
তা হলো চরিত্র।
কারণ চরিত্র হলো
সেই অদৃশ্য কারখানা
যেখানে ভবিষ্যতের সম্পদ
প্রতিদিন উৎপাদিত হয়।

শৃঙ্খলা তার ইঞ্জিন।
সততা তার ভিত্তি।
শেখার ক্ষমতা তার জ্বালানি।
দূরদর্শিতা তার মানচিত্র।
আর সাহস—
সাহস হলো সেই বিদ্যুৎ
যা পুরো ব্যবস্থাটিকে জীবিত রাখে।

তুমি যত সম্পদই সৃষ্টি করো না কেন,
যদি তোমার চরিত্র দুর্বল হয়,
তবে একদিন ভাগ্য এসে
তোমার প্রাসাদের স্তম্ভে
ঘুণপোকা ছেড়ে দেবে।
কিন্তু যদি তোমার চরিত্র শক্তিশালী হয়,
তবে বিপর্যয়ও
তোমার শিক্ষক হয়ে উঠবে।
ক্ষতি ফিরে আসবে প্রজ্ঞা হয়ে।
ব্যর্থতা ফিরে আসবে পুঁজি হয়ে।
অভিজ্ঞতা চক্রবৃদ্ধি সুদের মতো বৃদ্ধি পাবে।
এবং সময় নিজেই
তোমার পক্ষে কাজ করতে শুরু করবে।

অবশেষে তুমি উপলব্ধি করবে—
সম্পদ সৃষ্টি করা
টাকাকে ধরে ফেলার বিষয় নয়।
এটি নিজের ভেতরে
একটি সূর্য সৃষ্টি করার বিষয়,
যার আলো থেকে
অগণিত মূল্যের জন্ম হতে পারে।
কারণ প্রকৃত ধনী মানুষ
সে নয় যার কাছে অনেক অর্থ আছে।
প্রকৃত ধনী মানুষ সে,
যে শূন্য থেকে আবার শুরু করতে পারে
এবং প্রয়োজন হলে
নতুন সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে।

সে কেবল একজন মানুষ নয়।

সে এক চলমান খনি।

এক জীবন্ত কারখানা।

একটি নক্ষত্র—

যার অন্তরে নিরন্তর জ্বলছে

মূল্য সৃষ্টির

মহাজাগতিক অগ্নি।

মূল্যবানতম

সময় হলো

অদ্ভুত এক মুদ্রা—
যত খরচ করো
তত কমে যায়,
আবার যত সঞ্চয় করো
তত বেড়ে যায়।

পৃথিবীর কোনো ব্যাংক
এমন নিয়ম জানে না।

সোনা অপেক্ষা করতে পারে,
টাকা ঘুমিয়ে থাকতে পারে,
জমি শতাব্দী ধরে
একই জায়গায় শুয়ে থাকতে পারে—

কিন্তু সময়?

সময় হলো
আগুনের তৈরি এক অশ্ব,
স্থির দাঁড়িয়ে থেকেও
সে ছুটে চলে।

তুমি ব্যবহার করো বা না করো,
সে তোমার জীবন থেকে
নিজের অংশ নিয়ে চলে যায়।

তাই জ্ঞানীরা
সময়কে ব্যয় করে না—
তারা তাকে পুনর্বিনিয়োগ করে।

একটি শেখা দক্ষতায়,
একটি কঠিন অভ্যাসে,
একটি শৃঙ্খলিত প্রভাতে,
একটি অতিরিক্ত অধ্যয়নের ঘণ্টায়,
একটি অদৃশ্য আত্ম-রূপান্তরে।

তারা জানে,

আজকের একটি সুশাসিত ঘণ্টা
আগামী দশ বছরের ভাগ্যের মধ্যে
চক্রবৃদ্ধি সুদে বৃদ্ধি পাবে।

অলস মানুষ
সময়কে হত্যা করে।

বুদ্ধিমান মানুষ
সময়কে কাজে লাগায়।

কিন্তু বিরল মানুষ—

সে সময়কে সন্তান জন্ম দিতে শেখায়।
এক ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা,
দুই ঘণ্টা থেকে দক্ষতা,
দক্ষতা থেকে প্রভাব,
প্রভাব থেকে স্বাধীনতা,
স্বাধীনতা থেকে সৃষ্টি হয়
এক নতুন জীবন।

এভাবেই চরিত্র গড়ে ওঠে।
যে চরিত্র কোনো বক্তৃতা নয়।
কোনো সনদ নয়।
কোনো সামাজিক পরিচয় নয়।

চরিত্র হলো
হাজার হাজার ক্ষুদ্র সময়-নির্ধারিত সিদ্ধান্তের
অদৃশ্য সমষ্টি।
প্রতিদিনের ছোট জয়,
অদেখা আত্মসংযম,
অপ্রকাশিত অধ্যবসায়,
নীরব প্রস্তুতি,
এবং একাকী সংগ্রামের
স্তর স্তর পলিমাটি।

একদিন হঠাৎ
মানুষটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে—
তার মুখ একই আছে,
কিন্তু তার ভিতরে
একটি সাম্রাজ্য জন্ম নিয়েছে।
কারণ সে সময়কে
খরচ করেনি।
সে সময়কে
বপন করেছিল।

আর সময়,
সকল সম্পদের মধ্যে
সর্বোচ্চ পরিবর্তনশীল মূল্যবান সম্পদ,
তার প্রতি বিশ্বস্তদের
অকল্পনীয় সুদে পুরস্কৃত করে।

তখন চরিত্র
ধীরে ধীরে পরিণত হয় সম্পদে,
সম্পদ পরিণত হয় শক্তিতে,
শক্তি পরিণত হয় স্বাধীনতায়,

আর স্বাধীনতা পরিণত হয়
এক নক্ষত্রে—
যার আলো দেখে
অন্যান্য পথহারা মানুষও
নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজে পায়।

কারণ শেষ পর্যন্ত,
মানুষের প্রকৃত ধন
তার ব্যাংক-হিসাবে নয়,
বরং সেই অদৃশ্য চরিত্র
যা সে নির্মাণ করেছে
সময়ের প্রতিটি বাঁচানো কণাকে
অবিরাম পুনর্বিনিয়োগ করে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

চেতনা

এমন মানুষ আছে
যারা প্রতিটি বিপর্যয়কে
“দুর্ভাগ্য” বলে ডাকে,
অথচ গোপনে
নিজেরই অবিন্যস্ত হাতে
তাকে প্রতিদিন আহার জোগায়।

তারা বছরের পর বছর
ধসে পড়া ছাদের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে,
দেখে একই ঝড়
আবারও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
তাদের অস্তিত্বের একই আসবাব—
সঞ্চয়,
স্বাস্থ্য,
সময়,
সম্মান—
তবু তারা শেখে না
প্রতিরোধের স্থাপত্য।

বিপর্যয়
একবার এসে সন্তুষ্ট হয় না।

সে তোমাকে অধ্যয়ন করে।

তোমার অভ্যাসের দুর্বল কব্জাগুলো,
তোমার অসতর্ক জানালাগুলো,
তোমার চরিত্রের ভেতরের
অরক্ষিত দরজাগুলো
সে মুখস্থ করে ফেলে।

তারপর সে ফিরে আসে—
বজ্র দিয়ে গড়া এক পাওনাদারের মতো।

আবার।
আবার।
আবার।

এবং প্রতিটি পুনরাবৃত্তি
কেবল দুর্ভাগ্য নয়—
এ এক পরীক্ষা
যেখানে তুমি বারবার ব্যর্থ হচ্ছো,
কারণ তুমি প্রস্তুতির চেয়ে
আরামকে বেশি ভালোবেসেছো।

শৃঙ্খলাহীন মানুষ
দাবানলের মরসুমে
শুকনো পাতায় গড়া এক গ্রামের মতো।

সে বলে,
“আমি জানতাম না আগুন আবার ফিরবে,”
অথচ নিজের শোবার ঘরেই
পেট্রোল জমিয়ে রেখেছিল।

সে আশা আর কৌশলকে
এক জিনিস ভেবে বসে।
আবেগ আর সহনশীলতাকে
একই মুদ্রার দুই পিঠ মনে করে।

আর জীবন—
জীবন এই বিভ্রান্তির প্রতি
ভীষণ নির্মম।

মহাবিশ্ব
ইচ্ছাকে পুরস্কার দেয় না।
সে পুরস্কৃত করে
সেই কাঠামোকে
যা সংঘর্ষের মধ্যেও টিকে থাকতে পারে।

প্রতিরোধ
স্বাভাবিকভাবে জন্মায় না।

তাকে গড়ে তুলতে হয়।

অসম্ভব আগুনে
বারবার নিক্ষিপ্ত লোহার মতো,
যতক্ষণ না যন্ত্রণাও
তার রসায়নের অংশ হয়ে যায়।

প্রশিক্ষণ হলো
ভবিষ্যতের নিজের প্রতি ভালবাসা।

শৃঙ্খলা হলো
গোপন আত্মসম্মান।

প্রস্তুতি হলো সেই নীরব ভাষা
যার মাধ্যমে একজন মানুষ বলে—

“আমি অস্বীকার করছি
একই অন্ধকারের
দ্বিতীয়বার শিকার হতে।”

কিন্তু অধিকাংশ মানুষ
প্রতিদিন নিজেদেরই বিশ্বাসঘাতকতা করে।

তারা বেপরোয়াভাবে জীবনযাপন করে
এবং অসুখকে ভাগ্য বলে।

বছরের পর বছর অপচয় করে
তারপর দারিদ্র্যকে
শুধু সমাজের দোষ বলে।

সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে,
কাজ পিছিয়ে দেয়,
শেখা বিলম্বিত করে,
ধারাবাহিকতাকে হত্যা করে—
তারপর ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে
আকাশকে প্রশ্ন করে,
“বিপর্যয় বারবার
আমার ঠিকানাই খুঁজে পায় কেন?”

সত্যটা ভয়ঙ্কর:

পুনরাবৃত্ত ধ্বংস
প্রায়শই বোঝায়
আত্মা এখনও শেখেনি
পরিস্থিতির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে।

কারণ আত্মসম্মান
কখনও উচ্চকণ্ঠ নয়।

তা মোটিভেশনের চিৎকার নয়।
রাতের মাতাল উচ্চাকাঙ্ক্ষাও নয়।

আত্মসম্মান হলো
কেউ না দেখলেও
ভোরে উঠে দাঁড়ানো।

আক্রমণ আসার আগেই
অন্তরের দুর্গ নির্মাণ করা।

বিশৃঙ্খলা দরজায় আঁচড়ালেও
মস্তিষ্ককে স্থির থাকতে শেখানো।

অর্থনৈতিক শীত,
বিশ্বাসঘাতকতা,
অসুখ,
নিঃসঙ্গতা,
বাজার ধস,
এবং অস্তিত্বের আকস্মিক নিষ্ঠুরতার মধ্যেও
আত্মাকে সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে শেখানো।

পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে
সে ধীরে ধীরে
এমন এক বিপুল সৌভাগ্যের ভাণ্ডার
নিজের ভেতরে সঞ্চয় করে বসে থাকে,
যে নতুন দুর্ভাগ্য এসে
তার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে গেলেও
নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

কারণ সৌভাগ্য
সবসময় আকাশ থেকে পড়ে না—
অনেক সময় তা জন্ম নেয়
অসংখ্য নিয়ন্ত্রিত অভ্যাসের
অদৃশ্য গর্ভে।

শৃঙ্খলাবদ্ধ মানুষ
অবিনাশী হয়ে ওঠে না।

না।

পর্বতও ভেঙে যায়।

কিন্তু তাকে সমাধিস্থ করা কঠিন হয়ে ওঠে।

এবং যথেষ্ট সচেতন প্রতিরোধের পর
এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে:

বিপর্যয়
তাকে আর চিনতে পারে না।

কারণ যে মানুষটি
একসময় বারবার ভেঙে পড়তো,
সে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়েছে
আংশিকভাবে বিপর্যয় দিয়েই গঠিত
এক নতুন সত্তায়—

আরও অন্ধকার,
আরও প্রাজ্ঞ আগুন,
এমন এক আত্মা
যাকে এত কঠোরভাবে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে
যে দুর্ভাগ্য নিজেই
তার দরজায় প্রবেশের আগে
ক্ষণিক কেঁপে ওঠে।

মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

অসহনীয়

এমন কিছু রাত আছে
যখন ভালবাসা আসে না
যুদ্ধের মতো।

কোনো সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে না।
কোনো দেহ
আহত জন্তুর মতো
আধিপত্যের জন্য লড়াই করে না
পৃথিবীর বিছানার উপর
শতাব্দীজুড়ে জমে থাকা ক্ষুধা
টেনে নিয়ে যেতে নিয়ে যেতে।

বরং—

সে উঠে আসে তার উপর
যেন নিদ্রিত সমুদ্রের বুকে
নিঃশব্দে উঠে আসছে চাঁদের আলো।

আর হঠাৎই
ঘরটি ভুলে যায়
সহিংসতা বলতে কিছু ছিল কখনও।

ছন্দ ভাঙে না।
কিছুই বিচ্ছিন্ন হয় না।
অহংকারের কোনো মরিয়া যন্ত্র
তার লোহার দাঁত ঘষে না
দুই আত্মার মাঝখানের
পবিত্র নীরবতার ভিতরে।

এমনকি বিছানাটিও
ভাসতে থাকে যেন।

বাতাস ধীর হয়ে যায়
তাদের দেখবার জন্য।

পর্দাগুলো ধীরে শ্বাস নেয়
অদৃশ্য দেবদূতদের ফুসফুসের মতো।
দেয়ালগুলো হারিয়ে ফেলে
তাদের জ্যামিতি।
সময় নিজেই
নিজের হাতঘড়ি খুলে রেখে দেয়
ল্যাম্পের পাশে।

সে নড়ে ওঠে
জয়ের মতো নয়,
বরং যেন সংগীত
নিজের আদি যন্ত্রকে
পুনরায় চিনে ফেলেছে।

আর তার নিচের মানুষটি—

সে আর শুধুই মানুষ থাকে না।

সে হয়ে ওঠে এক ভূদৃশ্য।
বৃষ্টির পরের মাঠ।
এক অন্ধকার নদী
যে নিজেকে সমর্পণ করছে
চাঁদের মহাকর্ষের কাছে।

সেখানে কোনো বিষাক্ত নড়াচড়া নেই।
কোনো মালিকানার অহংকার নেই।
কোনো তীক্ষ্ণ সংঘর্ষ নেই
দুই নিঃসঙ্গ অহংকারের
যারা একে অপরকে গ্রাস করতে চায়
কিছুক্ষণ স্বস্তির জন্য।

শুধুই তরঙ্গ।

শুধুই আবেগের আবহাওয়া
ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে
ত্বক ও নিঃশ্বাসের ভিতর দিয়ে।

তার চুল নেমে আসে তার উপর
যেন মধ্যরাত্রির বনভূমি
ভেঙে পড়ছে
প্রাচীন মন্দিরের গায়ে।
তার হৃদস্পন্দন গড়িয়ে পড়ে
তার বুকের ভেতর থেকে
নিচে—
তার পাঁজরের ভিতরে,
যতক্ষণ না দুই শরীর
এক অদৃশ্য অর্কেস্ট্রা
ভাগ করে নিতে শুরু করে।

বাইরে
শহরগুলো তখনও
তাদের ধাতব আতঙ্কে ব্যস্ত।
লিফট উঠছে নামছে।
মুদ্রার মান বদলাচ্ছে।
সরকারেরা নিজেদের মিথ্যা
পুনরাবৃত্তি করছে।
লক্ষ লক্ষ মানুষ
অবিরাম স্ক্রল করছে
আলোকিত বিভ্রান্তির কবরস্থানে।

কিন্তু সেই আধো-অন্ধকার ঘরের ভিতরে
জন্ম নিচ্ছে আরেক সভ্যতা—

এক সভ্যতা
যেখানে কোমলতা শক্তির চেয়েও প্রবল,
যেখানে আত্মসমর্পণ দুর্বলতা নয়,
যেখানে সুখ আসে
নিষ্ঠুরতা ছাড়া,
অভিনয় ছাড়া,
ভয় ছাড়া।

আর ছাদের ওপারে কোথাও
তারারা নীরবে তাকিয়ে থাকে,

সম্ভবত মনে করতে থাকে
গ্যালাক্সিরাও এমন করেই জন্ম নেয়—

সহিংসতার মাধ্যমে নয়,
বরং আকর্ষণের
ধৈর্যশীল ছন্দে,
পরিক্রমায়,
এবং সেই অসহনীয় সৌন্দর্যে
যেখানে এক শরীর
সম্পূর্ণ বিশ্বাসে
নিজেকে সমর্পণ করে
আরেক শরীরের কাছে।

Discipline

There are men
who walk through life
like unlocked kingdoms.

Every appetite becomes their emperor.
Every distraction
drags them away by the throat.
Every passing pleasure
plants a flag inside their skull
and names itself god.

They call this freedom.

But look carefully.

A man without discipline
is not free—
he is merely a crowded prison
where a thousand impulses
riot without law.

His desires chain him
like golden serpents
wrapping around the pillars of his will.
He wakes hungry,
sleeps hungry,
dreams hungry—
forever kneeling before cravings
that grow fatter
while his spirit grows thin.

His fears drive him
through invisible corridors.
He changes direction
not because truth commands him,
but because terror whispers softly
behind his ribs.

He smiles when he wishes to scream.
He obeys when he longs to rebel.
He abandons his own becoming
to avoid the temporary pain
required for transformation.

And weakness—
weakness is patient.

It does not arrive with thunder.
It enters quietly,
like black water leaking beneath a door.

A postponed discipline here.
A surrendered promise there.
A wasted morning.
A distracted year.

His life turns into a conglomerate of compromises.

Until one day
the man awakens
to discover
that something inside him
has already been eaten alive.

Discipline is different.

Discipline is not punishment.
It is a sacred command against chaos.

It is the iron grip
that forces the storm
to kneel into direction.

The warrior rises before dawn
not because dawn is beautiful,
but because his future
demands blood from his comfort.

He trains when applause is absent.
He continues
when motivation dies foaming at the roadside.
He walks through boredom
like a king walking through fire—
slowly, silently,
without begging for mercy.

And over time,
something terrifying happens.

His mind sharpens
like a blade washed in cold rivers.
His body begins obeying his spirit.
His words gain weight.
His eyes become difficult to lie to.

Because discipline
is the architecture of power.

Without it,
dreams remain hallucinations.
Talent rots into tragedy.
Potential becomes a graveyard
filled with unborn empires.

Discipline crowns warriors.

It separates kings
from cowards
not by strength alone,
but by endurance.

The coward obeys emotion.
The king obeys purpose.

One seeks comfort.
The other seeks conquest
over himself.

And that—
that is the highest throne a man may reach:

To rule
the wilderness within.

For without discipline,
a human being becomes
nothing more than a slave
pretending to be free—

a marionette of appetite
dancing proudly
while invisible strings
pull his soul apart
beneath the theater lights of the world.

নিরাপদ

দুইটি আহত মানুষ
যখন পরস্পরের প্রেমে পড়ে,
তখন পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম
তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়
ভাঙবার জন্য।

তারা আর সাধারণ প্রেমিক থাকে না—
তারা হয়ে ওঠে
দুইটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতা
যারা নিজেদের ভাঙা ইট দিয়ে
নতুন এক মহাবিশ্ব নির্মাণ করতে বসেছে।

পুরুষটির চোখে তখনও শুকিয়ে না যাওয়া যুদ্ধ ছিল।
সে বহু বছর ধরে মানুষের ভেতর
গোপনে বসবাস করা নিষ্ঠুরতা দেখেছে।
বিশ্বাসঘাতকতার দাঁত
কীভাবে ধীরে ধীরে আত্মাকে কুরে খায়
সে জানতো।
তাই প্রথম প্রথম
সে কারও চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারতো না।
কারণ দীর্ঘক্ষণ তাকালে
সে মানুষের মুখের উপর
লুকিয়ে থাকা নেকড়েটাকে দেখতে পেত।

আর নারীটি—
সে যেন ছিল
পুড়ে যাওয়া কোনও গির্জার শেষ জানালা।
তার ভেতরেও বহু মৃত পাখি জমে ছিল।
কেউ তাকে ভালোবেসে ফেলে যায়নি—
বরং ব্যবহার করেছে
একটি অস্থায়ী আশ্রয়স্থলের মতো।
তার হাসির নিচে
একটি কবরখানা ছিল
যেখানে অসংখ্য অসমাপ্ত স্পর্শ
রাতের বেলায় উঠে দাঁড়াতো।

তারপর একদিন
তাদের দেখা হলো।

না—
এটা দেখা হওয়া ছিল না।
এটা ছিল
দুইটি আহত নক্ষত্রের
অদৃশ্য মহাকর্ষে
পরস্পরের দিকে ধীরে ধীরে টেনে যাওয়া।

তারা প্রথম দিন থেকেই বুঝেছিল
এখানে খেলা নেই।
এখানে অভিনয় নেই।
এখানে ‘কুল’ থাকার কোনও প্রয়োজন নেই।
কারণ তারা উভয়েই জানতো
জীবন খুব ছোট
এবং মৃত্যু
অপেক্ষা করতে জানে না।

তাই তাদের ভালোবাসায়
লাগাম ছিল না কোনও।

পুরুষটি নারীর কণ্ঠ শুনলে
মনে করতো
কেউ যেন তার বুকের মধ্যে
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জানালাগুলো খুলে দিয়েছে।
নারীটি পুরুষটির ক্লান্ত মুখ দেখলে
মনে করতো
এমন একজন মানুষকে সে পেয়েছে
যার পাশে বসে
নিজের সমস্ত যুদ্ধ নামিয়ে রাখা যায়।

তারা একে অপরকে
অসভ্য রকমের গভীরতায় ভালোবাসতো।

যেভাবে ডুবে যাওয়া মানুষ
শেষ বাতাসকে আঁকড়ে ধরে।
যেভাবে মরুভূমি
এক ফোঁটা জলের জন্য
সম্পূর্ণ আকাশের কাছে মাথা নত করে।
যেভাবে বহুদিন অন্ধকারে থাকা ঘর
হঠাৎ সূর্যের দিকে দরজা খুলে দেয়।

এবং আশ্চর্য ব্যাপার হলো—
তাদের এই প্রেম
তাদের কামুক করেনি,
বরং নির্মল করেছে।

কারণ যারা সত্যিই
ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়,
তারা প্রায়শই
মানুষের শরীরের ভেতর
একটি ক্লান্ত আত্মাকে দেখতে শেখে।

তাই সেই পুরুষটির পক্ষে
একজন নারীকে
শুধু শরীর হিসেবে ভাবা আর সম্ভব ছিল না।
সে নারীদের মধ্যে
ক্ষত, ইতিহাস, ভয়, অসমাপ্ত শৈশব
এবং অদৃশ্য কান্না দেখতে পেত।

নারীটির ক্ষেত্রেও
একই সত্য ছিল।
সে বুঝতো—
বেশিরভাগ পুরুষের রূঢ়তার পেছনেও
একটি আহত বালক বসে থাকে
যে কোনওদিন
ঠিকমতো ভালোবাসা পায়নি।

এই কারণেই
তারা বিপরীত লিঙ্গের মানুষের
অসাধারণ বন্ধু হতে পারতো।

কারণ তাদের চোখে
মানুষ আর শিকার ছিল না।
ছিল না কোনও গোপন শিকারি ক্ষুধা।
ছিল না প্রলোভনের দাঁত।

তারা জানতো—
ভালবাসা মানে শুধু অধিকার নয়।
ভালবাসা মানে কখনও কখনও
কারও পাশে এমনভাবে বসা
যেন তার আত্মা
তোমার উপস্থিতিতে নিরাপদ বোধ করে।

এবং পৃথিবীতে
এর চেয়ে বিরল সৌন্দর্য
খুব বেশি নেই।

কারণ অধিকাংশ মানুষ
ভালবাসার ভেতরেও
ক্ষমতা খোঁজে।
অধিকার খোঁজে।
গোপন বিজয় খোঁজে।

কিন্তু দুইটি সত্যিকারের আহত মানুষ—
যারা একে অপরের অন্ধকারে
নিজেদের পুরনো রক্তের গন্ধ চিনে ফেলে—
তারা প্রায়শই
প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে:

মানুষকে ছুঁয়ে দেওয়ার
সবচেয়ে পবিত্র উপায়
হলো তাকে নিরাপদ অনুভব করানো।

রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

সঠিক ধরণ

উত্তম দিন নিশ্চিতভাবেই আসছে।
কিন্তু সবার জন্য নয়।

ইতিহাস কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়।

ভবিষ্যৎ এমনভাবে আসে না
যেন বৃষ্টি
সমানভাবে ঝরে পড়ছে
প্রত্যেক ছাদের উপর।

না—
ভবিষ্যৎ বরং
একটি গোপন সাম্রাজ্যের মতো আচরণ করে,
যে তার দরজা খোলে
শুধুমাত্র তাদের জন্য
যারা ইতিমধ্যেই শুরু করেছে
নিজেদের রূপান্তর করতে
প্রবেশের উপযুক্ত কিছুর মধ্যে।

অলসেরা তাকে বলবে ভাগ্য।
তিক্ত মানুষ তাকে বলবে ষড়যন্ত্র।
ভীতুরা তাকে বলবে অসম্ভব।

আর ধূর্তরা পরকে দোষ দেবে আর দল পাকাবে আপন স্বার্থসিদ্ধির তাগিদে।

কিন্তু সত্যটি
আরও সরল
এবং আরও ভয়ংকর:

উত্তম দিন
নিজেদের সন্তানদের চিনতে পারে।

তারা আসে
শুধু তাদের জন্য
যারা বোঝে
পরিণত হওয়ার অর্থ।

তাদের জন্য
যারা অজুহাত ধারালো করার বদলে
নিজেদের মস্তিষ্ক ধারালো করে।

তাদের জন্য
যারা আরোহণ চালিয়ে যায়
যখন কোনো করতালি থাকে না,
যখন সিঁড়িটাই কুয়াশার ভিতরে
হারিয়ে যায়।

তাদের জন্য
যাদের শৃঙ্খলা এত নির্মম হয়ে উঠেছে
যে ব্যর্থতাও
তাদের বিরোধিতা করতে করতে
ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

আমি তাদের দেখেছি—

এমন পুরুষ ও নারী
যারা অদৃশ্য যুদ্ধের ভিতর দিয়ে হাঁটে
রক্তাক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে
সাধারণ পোশাকের নিচে।

কখনও তারা দরিদ্র দেখায়।
কখনও পরাজিত দেখায়।
কিন্তু তাদের ভিতরে
সম্পূর্ণ সভ্যতা নির্মাণাধীন থাকে।

প্রত্যেক প্রত্যাখ্যান
হয়ে ওঠে আরেকটি ইট।

প্রত্যেক অপমান
হয়ে ওঠে জ্বালানি।

প্রত্যেক নির্ঘুম রাত
পরিণত হয়
নিয়তির সঙ্গে
একটি নীরব দরকষাকষিতে।

এদিকে পৃথিবী হাসে।

পৃথিবী সবসময়ই হাসে
নতজানু হওয়ার আগে।

শুনে রাখো:

দুই ধরনের বিপ্লব আছে।

একটি রাস্তায় চিৎকার করে
এবং পতাকা বদলায়।

অন্যটি নীরবে ঘটে
মানুষের অন্তর্গঠনের ভিতরে
এবং বাস্তবতাকেই বদলে দেয়।

একটি ব্যর্থ প্রতিবাদ হলে অপরটি সফল প্রতিরোধ। 

প্রথম বিপ্লব
প্রায়শই একটি কারাগারের বদলে
আরেকটি কারাগার সৃষ্টি করে
শুধু রঙটা ভিন্ন হয়।

কিন্তু দ্বিতীয় বিপ্লব—

চেতনার বিপ্লব,
শৃঙ্খলার বিপ্লব,
আত্মসম্মানের বিপ্লব,
মূল্য সৃষ্টির বিপ্লব,
নিষ্ঠুর আত্মরূপান্তরের বিপ্লব—

সে বিপ্লব
এমন মানুষ তৈরি করে
যাদের আর শিকল,
প্রভু,
বা অনুমতির প্রয়োজন হয় না।

সেই বিপ্লবে যোগ দাও।

এটি মার্কসবাদের থেকে কম প্রতারক,
কিন্তু অসীম বেশি বিপজ্জনক।

কারণ এটি
সফল মানুষের প্রতি ঘৃণা দিয়ে শুরু হয় না।

এটি শুরু হয়
নিজের পচনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দিয়ে।

এটি মানুষকে শেখায়
অজুহাতের পূজা বন্ধ করতে।

এটি নারীকে শেখায়
মধ্যমতার সঙ্গে আপস বন্ধ করতে।

এটি আত্মাকে শেখায়
অর্থনৈতিকভাবে বুদ্ধিমান হতে,
শারীরিকভাবে শৃঙ্খলিত হতে,
আবেগগতভাবে স্বাধীন হতে,
এবং আধ্যাত্মিকভাবে নির্ভীক হতে।

যে মানুষ
নিজেকে শাসন করতে শিখেছে,
তাকে দীর্ঘদিন দাস বানিয়ে রাখা
প্রায় অসম্ভব।

এই কারণেই
অদৃশ্য সুবিধাবাদের সাম্রাজ্যগুলো
এই বিপ্লবকে ভয় পায়।

একজন সত্যিকারের জাগ্রত মানুষকে
দাসে পরিণত করা
প্রায় অসম্ভব।

আর কোথাও—
পুরোনো মতবাদের ভেঙে পড়া ছাদের নিচে,
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হতাশার
মরিচাধরা যন্ত্রপাতির নিচে—

নতুন এক প্রজাতির মানুষ
ইতিমধ্যেই তৈরি হচ্ছে।

তাদের সহজেই চেনা যায়।

তাদের চোখ
অন্যরকম জ্বলে।

তাদের সকাল
উদ্দেশ্যে পূর্ণ থাকে।

তাদের ব্যর্থতা
তাদের আর দুর্বল করে না।

এবং সময়—
সেই প্রাচীন শিকারি—
অদ্ভুতভাবে
তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে শুরু করে।

তাই হ্যাঁ,
উত্তম দিন নিশ্চিতভাবেই আসছে।

কিন্তু তা ঘুমিয়ে থাকা মানুষদের জন্য নয়।

তা আসছে পরিশ্রমী
নির্মাতাদের জন্য।

শিক্ষার্থীদের জন্য।

সেই শৃঙ্খলিত উন্মাদদের জন্য
যারা নিজেদের উন্নত করার সাহস করেছে
যখন বাকি পৃথিবী
দোষারোপ নিয়েই ব্যস্ত ছিল।

দরজাগুলো ইতিমধ্যেই খুলছে।

ভয় পেয়ো না। দ্বিধা বর্জন কর।

প্রস্তুত হয়ে প্রবেশ করো।

ব্যর্থতা ও যোগ্যতা

ব্যর্থতা প্রথমে আসে
একজন কসাইয়ের মতো।

তার হাতে থাকে
রক্তমাখা প্রত্যাখ্যান,
অসমাপ্ত স্বপ্নের মাথার খুলি,
এবং ভেঙে যাওয়া অহংকারের
গরম ধোঁয়া ওঠা মাংস।

অধিকাংশ মানুষ
প্রথম আঘাতেই পালিয়ে যায়।

তারা ব্যর্থতাকে দেখে
অপমান হিসেবে,
অভিশাপ হিসেবে,
নিয়তির নিষ্ঠুর উপহাস হিসেবে।

তারপর তারা ফিরে যায়
সেই নিরাপদ অন্ধকারে
যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে
অসম্পূর্ণ সম্ভাবনার কবরস্থানে।

কিন্তু কিছু মানুষ আছে—
অদ্ভুত,
ভয়ংকর,
প্রায় অতিমানবীয় কিছু মানুষ—

যারা ব্যর্থতার ভেতরে যোজ্যতার 
গোপন বিদ্যালয় খুঁজে পায়।

তারা ধ্বংসস্তূপের উপর বসে
ধৈর্যের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে
কোথায় ভেঙেছিল সেতু,
কোন দুর্বলতায় ডুবেছিল জাহাজ,
কোন ভুল সমীকরণে
অন্ধকার প্রবেশ করেছিল জীবনে।

তারা কাঁদে—
কিন্তু বিশ্লেষণও করে।
তারা রক্তাক্ত হয়—
কিন্তু নোটও নেয়।

কারণ তারা জানে
ব্যর্থতা কখনও সম্পূর্ণ শত্রু নয়।

সে এক নিষ্ঠুর শিক্ষক।

সে প্রথমে তোমার অহংকার হত্যা করে,
তারপর ধীরে ধীরে
তোমাকে তোমার প্রকৃত আকৃতি দেখায়।

দূরদর্শী মানুষরা
তা বুঝতে শেখে।

তারা জানে
আজকের পতন
হয়তো আগামী দশকের ভিত্তিপ্রস্তর।

তারা জানে
একটি ভুল
ঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে
তা ভবিষ্যতের হাজার ভুলকে হত্যা করতে পারে।

তাই তারা থামে না।

প্রত্যেক ব্যর্থতার পর
তারা নিজেদের পুনর্গঠন করে
যেন ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী
আরও শক্তিশালী প্রাচীর নিয়ে
পুনর্জন্ম নিচ্ছে।

তাদের আত্মা ধীরে ধীরে
লোহায় পরিণত হয়।

মানুষ ভাবে
তারা সৌভাগ্যবান।

কিন্তু কেউ দেখে না
রাত্রির পর রাত্রি
তারা নিজেদের ভাঙা অংশগুলো
জোড়া লাগিয়েছে
অসীম ধৈর্যের সূঁচে।

কেউ দেখে না
তারা ব্যর্থতার মৃতদেহ কেটে
তার ভিতর থেকে
সাফল্যের মানচিত্র বের করেছে।

এই মানুষগুলোই একদিন
অসম্ভবকে অভ্যাসে পরিণত করে।

কারণ তারা ব্যর্থতাকে
সমাপ্তি হিসেবে নয়—
তথ্য হিসেবে পড়ে।

তারা প্রতিটি পতন থেকে
নতুন গণিত তৈরি করে।
প্রতিটি অপমান থেকে
নতুন শৃঙ্খলা।
প্রতিটি ক্ষতি থেকে
নতুন দূরদৃষ্টি।

আর তখন—
নিয়তি নিজেই বিস্মিত হয়ে দেখে
যে মানুষটিকে সে
বারবার ধ্বংস করতে চেয়েছিল,
সেই মানুষই
নিজের ভাঙা ইট দিয়ে
শেষ পর্যন্ত নির্মাণ করেছে
একটি অমর দুর্গ।

নিয়ম

প্রেরণা হলো এক মাতাল সংগীতশিল্পী।

সে মধ্যরাতে আসে
জ্বলন্ত চোখ নিয়ে,
প্রতিশ্রুতি দেয় বিজয়ের,
প্রতিশ্রুতি দেয় রূপান্তরের,
প্রতিশ্রুতি দেয় যে আগামীকাল
তুমি অমর হয়ে উঠবে।

তারপর সকাল আসে—

এবং সে হারিয়ে যায়।

যুদ্ধক্ষেত্র তখনও রয়ে যায়।
অসমাপ্ত কাজ তখনও রয়ে যায়।
ঘুমের ভারে ক্লান্ত শরীর তখনও রয়ে যায়।
ভবিষ্যৎ তখনও অপেক্ষা করে
লোহার পাহাড়ের মতো।

প্রেরণা সুন্দর কথা বলে।
শৃঙ্খলা নীরবে নির্মাণ করে।

একটি অতি সাময়িক আতশবাজি।
অন্যটি ভূত্বকের গোপন সঞ্চালন।

আর নিয়তি—
অস্তিত্বের পর্দার আড়ালে বসে থাকা
সেই প্রাচীন জুয়াড়ি—
প্রায়শই মানুষকে দেখে
শীতল আমোদ নিয়ে।

সে এলোমেলোভাবে ঝড় ছুঁড়ে দেয়।
নিখুঁত পরিকল্পনা ভেঙে দেয়।
পুরস্কার বিলম্বিত করে।
মূর্খদের হাতে প্রতিভা তুলে দেয়
এবং স্বপ্নদর্শীদের ভাগ্যে কষ্ট লিখে দেয়।

অনেকে নিয়তির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে
যেন সেটিই চূড়ান্ত সত্য।

কিন্তু তারা ভুলে যায়
আরামের সীমা ছাড়িয়ে প্রশিক্ষিত
একটি মনের ভয়ংকর সম্ভাবনা।

কারণ শক্তিশালী মন
শুধু চিন্তার যন্ত্র নয়।

তা এক অস্ত্রসজ্জিত জলবায়ু।

যখন শৃঙ্খলিত চিন্তা
প্রতিদিন নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে,
তখন স্নায়ুতন্ত্র নিজের আকৃতি বদলাতে শুরু করে।
মস্তিষ্ক নিজের অন্ধকারকে পুনর্লিখন করে।
অভ্যাস পরিণত হয় যন্ত্রে।
ধারাবাহিকতা হয়ে ওঠে মহাকর্ষ।

তারপর এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।

মানুষটি আর অনুপ্রেরণা খোঁজে না কবিতার কাছে,
অস্থায়ী আবেগের সঙ্গে দরকষাকষি করে না।


বৃষ্টি তখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়।
মনের অবস্থা তখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়।
প্রশংসা তখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এমনকি যন্ত্রণাও
তার ক্ষমতার একাংশ হারিয়ে ফেলে।

শৃঙ্খলিত মন জেগে ওঠে
এবং চলতে থাকে।

আবার।
আবার।
আবার।

যেন এক কামার
অমরত্বকে পিটিয়ে পিটিয়ে
মেরুদণ্ডের ভিতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

যেখানে সাধারণ মানুষ
অনুপ্রেরণার অপেক্ষায় থাকে
আবহাওয়ার জন্য প্রার্থনাকারী কৃষকের মতো,
সেখানে শৃঙ্খলিত সত্তা
নিজের অন্তর্গত আবহাওয়া নিজেই তৈরি করে।

সে নিজেই হয়ে ওঠে
নিজের ঋতু।

আর নিয়তি—
ধীরে ধীরে, অনিচ্ছায়—
পিছু হটতে শুরু করে।

কারণ ভাগ্য
অসংগত মানুষকে ভয় দেখাতে পারে,
কিন্তু পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে
সে বিফল সংগ্রাম করে।

পর্বত কেটে এগিয়ে যাওয়া নদী
প্রেরণার দ্বারা তা করে না।

সে করে
অবিরাম প্রত্যাবর্তনের দ্বারা।

ফোঁটা ফোঁটা ক'রে।
বছরের পর বছর।
শতাব্দীর পর শতাব্দী।

এটাই শৃঙ্খলা।

এটি উচ্চকণ্ঠ নয়।
এটি জাঁকজমকপূর্ণ নয়।
এটি খুব কমই বীরত্বপূর্ণ অনুভূত হয়।

এটি শুধু
ভবিষ্যৎকে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করতে অস্বীকার করা।

আর যখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়
একটি শক্তিশালী মন—

তখন শৃঙ্খলা প্রায় অতিপ্রাকৃত হয়ে ওঠে।

মানুষটি যেন সম্ভাবনাকেই বাঁকাতে শুরু করে।

দুর্বলতা সংখ্যায় পরাজিত হয়।
ভয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
বিশৃঙ্খলা নিজের জমি হারাতে থাকে।

এমনকি নিয়তিও
নিজের দুর্ঘটনার সিংহাসন থেকে
উদ্বিগ্ন চোখে তাকায় ওপরে—

একজন মানুষকে
স্থির পায়ে এগিয়ে যেতে দেখে,
যার ভিতরে আছে সেই ভয়ংকর শান্তি
যে ইতিমধ্যেই
নিজের মনকে জয় করেছে।

শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

আমন্ত্রণ

ধীরে এসো।
এমনভাবে এসো
যেমন কুয়াশা প্রবেশ করে নদীর শরীরে—
কোনো শব্দ না তুলে,
কোনো অধিকার ঘোষণা না করে,
শুধু উপস্থিতির শীতলতা রেখে যায়
জলের গভীরে।

আমার জীবনে প্রবেশ করতে হলে
পায়ের শব্দ আগে হত্যা করে এসো।
কারণ আমি বহু আগে
অতিরিক্ত মানুষের ভিড় থেকে
নিজেকে প্রত্যাহার করেছি
একজন নির্বাসিত সম্রাটের মতো।

একসময় আমার ঘরে
অসংখ্য কণ্ঠস্বর ছিল—
অপ্রয়োজনীয় আলাপ,
অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি,
নকল আবেগের রঙিন আসবাব,
এবং এমন সব সম্পর্ক
যারা ভালোবাসার চেয়ে
অধিক শব্দ উৎপন্ন করত।

তারপর একদিন
আমি শিখে গেলাম বর্জনের গোপন বিদ্যা।

আমি একে একে সরিয়ে দিলাম
অতিরিক্ত বাক্য,
অতিরিক্ত ব্যাখ্যা,
অতিরিক্ত অনুনয়,
এমনকি অতিরিক্ত স্বপ্নও—
যেগুলো আত্মাকে ভারী করে তোলে
ডুবে যাওয়া জাহাজের লোহার মতো।

এখন আমার ভিতরটা
একটি প্রায় শূন্য মন্দির।
এখানে প্রতিটি জিনিসের
নিজস্ব নীরবতা আছে।
এখানে বাতাসও প্রবেশ করে
অনুমতি নিয়ে।

তাই যদি আসতেই চাও—
দরজা ভেঙে নয়,
ঝড় হয়ে নয়,
উন্মত্ত অধিকারের পতাকা নিয়ে নয়।

অপেক্ষা করো
যতক্ষণ না আমি নিজেই
আমার অন্ধকারের দরজাটি
অল্প ফাঁক করে খুলে দিই।

কারণ জোরপূর্বক প্রবেশ
ভালোবাসা নয়—
তা কেবল আরেক ধরনের দখলদারিত্ব।

আর আমি বহু আগে
আমার আত্মার সীমান্তে
সেনা বসিয়েছি।

এখন যারা আসে
তাদের আমি পরীক্ষা করি
তাদের শব্দ দিয়ে নয়,
তাদের নীরবতা দিয়ে।

যদি তোমার উপস্থিতি
আমার নিঃসঙ্গতার সৌন্দর্য নষ্ট না করে,
যদি তোমার চোখ
আমার ভাঙাচোরা নক্ষত্রগুলোকে
আরও অস্থির না করে তোলে,
যদি তুমি জানো
কিভাবে একটি মানুষের ভিতরে প্রবেশ করতে হয়
কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াই—

তবে এসো।

ধীরে এসো।
প্রায় নিঃশব্দে।
যেমন মধ্যরাত্রির পর
চাঁদ এসে বসে
একটি পরিত্যক্ত জানালার ধারে।

শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬

পরিমাপ

আমরা আলাদা।

সেই উচ্চকণ্ঠ নাটকীয় অর্থে নয়
যেভাবে মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে
অনিরাপত্তার বারান্দা থেকে।

না—
আমাদের ভিন্নতা অনেক নীরব,
অনেক বেশি বিপজ্জনক,
প্রায় স্থাপত্যের মতো সূক্ষ্ম।

আমরা খুব তাড়াতাড়িই বুঝে গিয়েছিলাম
অতিরিক্ততা প্রায়শই
অন্তর্গত বিশৃঙ্খলার ছদ্মবেশ।

তাই যখন পৃথিবী
ভীত রাজাদের মতো
জিনিসপত্র স্তূপ করতে ব্যস্ত ছিল,
আমরা ধীরে ধীরে
আরও নির্বাচনী হয়ে উঠেছিলাম
কীকে জীবনে প্রবেশ করতে দেওয়া যায় তা নিয়ে।

আমাদের বেশি কিছু দরকার নেই।

কারণ আত্মা,
যখন যথাযথভাবে পরিশীলিত হয়,
তখন বিশৃঙ্খলার প্রতি
এক ধরনের অ্যালার্জি তৈরি করে।

অতিরিক্ত জিনিসপত্র
মনে হতে শুরু করে
চেতনার ঘরের ভেতরে
ঘুমিয়ে থাকা অপরিচিত মানুষ।

অতিরিক্ত সাজসজ্জা
দেখতে লাগে
দামী সুগন্ধি মাখা আতঙ্কের মতো।

আমরা শুধু ক্লাস চাই।

আর ক্লাস—
প্রকৃত ক্লাস—
তা ঝাড়বাতির নিচে চিৎকার করা বিলাসিতা নয়।

তা হলো sleekness।

এক ভয়ংকর সরলতা।

একটি ধারালো ব্লেডের সৌন্দর্য
যেখানে অপ্রয়োজনীয় ধাতুর অস্তিত্ব নেই।

মধ্যরাতের বৃষ্টির মধ্যে
নিঃশব্দে এগিয়ে চলা কালো গাড়ির মতো,
যে রাস্তার কাছে
মনোযোগ ভিক্ষা করে না।

একটি ঘরের শৃঙ্খলা
যেখানে প্রতিটি বস্তু মনে হয়
অনুপাতের কোনো ধৈর্যশীল দেবতা
নিজ হাতে নির্বাচন করেছেন।

আমরা সেইসব জিনিস ভালোবাসি
যেগুলো সঠিকভাবে শ্বাস নেয়।

একটি ঘড়ি
যা চিৎকার না করে ফিসফিস করে।

একটি সাদা শার্ট
এত পরিষ্কার ও নিখুঁতভাবে মানানসই
যে তা প্রায় দার্শনিক বলে মনে হয়।

একটি চেয়ার
যার বাঁক
ভাষার চেয়েও ভালোভাবে
মেরুদণ্ডকে বোঝে।

একটি ফাউন্টেন পেন
যা কাগজের উপর চলে
সভ্য কোনো শিকারির মতো।

এমনকি আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোকেও
sleek হয়ে আসতে হয়।

ভালবাসাও—
আমরা তাকে উচ্চকণ্ঠ ও ভিড়ভাট্টায় ভরা চাই না
নাটকীয় আবর্জনায় পরিপূর্ণ।

আমরা তাকে চাই নিখুঁত।

দুটি আত্মা
দামী নীরবতার মধ্যে বসে আছে,
বিনা প্রয়োজনে বাতাসকে হত্যা না করেই
একজন আরেকজনকে বুঝে ফেলছে।

আমরা বিশৃঙ্খলাকে প্রশংসা করি না
শুধু তা ফ্যাশনেবল বলে।

আমরা জানি
প্রকৃত refinement হলো
অপ্রয়োজনীয়কে সরিয়ে ফেলা।

একটি sleek জিনিসের মধ্যে থাকে
এক অদ্ভুত নৈতিক কর্তৃত্ব।

একটি চিতাবাঘকে দেখো।
একটি তরবারিকে দেখো।
একটি জেট বিমানকে দেখো
যে মেঘ ভেদ করে চলে
গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণীর মতো।

তাদের কেউই
প্রশংসা ভিক্ষা করে না।

ক্ষমতা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে
যখন তা graceful ভাবে চলে।

সেটাই আমরা ভালোবাসি।

অশালীন প্রাচুর্য নয়।
প্রতিটি পৃষ্ঠে চিৎকার করা সোনা নয়।
অস্থির ব্যক্তিত্বের উপর
মরিয়া হয়ে সেলাই করা
বিশাল বিশাল logo নয়।

না।

আমরা ভালোবাসি understated জিনিস।

সেই প্রায় অদৃশ্য নিখুঁততা
যা শুধু মনোযোগী চোখই চিনতে পারে।

একটি sleek জীবন
গরিব জীবন নয়।

তা এমন এক জীবন
যেখানে প্রতিটি নির্বাচিত জিনিস
থাকার অধিকার অর্জন করেছে।

এমনকি ভাষাও—
আমরা সেই শব্দগুলো পছন্দ করি
যেগুলো পরিষ্কারভাবে কাটে,
সেসব বাক্যের বদলে
যেগুলো মৃত সাম্রাজ্যের মতো ফুলে ওঠে।

কারণ sleekness
শুধু নান্দনিকতা নয়।

তা আত্মার প্রকৌশল।

এক প্রত্যাখ্যান—
যাতে আত্মা
অপ্রয়োজনীয় ভারের নিচে
ডুবে না যায়।

আর সম্ভবত এ কারণেই
আধুনিক সভ্যতা
আমাদের প্রায়শই অদ্ভুত মনে করে।

পৃথিবী উপাসনা করে accumulation-এর।
আমরা উপাসনা করি refinement-এর।

পৃথিবী মাপে আকার।
আমরা মাপি অনুপাত।

পৃথিবী চিৎকার করে wealth।
আমরা অনুসরণ করি atmosphere।

আর atmosphere—
সেই অদৃশ্য বিলাসিতা—
সরাসরি কেনা যায় না।

তা ধীরে ধীরে জন্ম নেয়
শৃঙ্খলা,
রুচি,
নীরবতা,
আত্মসম্মান,
এবং কম চাওয়ার
সাহসী সৌন্দর্য থেকে।

আমরা আলাদা।

আমাদের বেশি কিছু দরকার নেই।

শুধু ক্লাস।

শুধু sleekness।

শুধু সেই বিরল সুন্দর জিনিসগুলো
যেগুলো অস্তিত্বের ভেতর দিয়ে চলে
এমনভাবে
যেন তাদের নকশা করেছে
স্বয়ং অনন্তকাল।

বিশ্বাসঘাতক

মানুষ
অনেক অপমান সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে।

সে দারিদ্র্য সহ্য করতে পারে
যেমন শীতের বৃক্ষ সহ্য করে তুষারপাত—
উলঙ্গ, কাঁপমান,
তবু বাকলের গভীরে
গোপনে জীবিত।

সে বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে পারে,
দেখতে পারে পরিচিত মুখগুলো
কীভাবে গলে যায়
লেনদেন আর সুবিধাবাদের মুখোশে।

সে একাকীত্বও সহ্য করতে পারে—
সেই বিশাল অদৃশ্য মরুভূমি,
যেখানে কখনও কখনও
নিজের ছায়াও
সঙ্গ দিতে অস্বীকার করে।

কিন্তু একটি আত্মসমর্পণ আছে
যেখান থেকে আত্মা
খুব কম ক্ষেত্রেই
অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসে।

নিজের স্বপ্নের সাথে আপোষ।

সেটাই—
সেটাই অস্তিত্বের প্রকৃত গৃহযুদ্ধ।

কারণ স্বপ্ন কোনো অলংকার নয়।
তা অলস যৌবনের বিলাসবস্তু নয়
যা জীবনের পোশাকে
সেলাই করে পরানো হয়।

না।

স্বপ্ন হলো সংকেতবাহী গোপন নির্দেশ,
যা মহাবিশ্ব নিজেই
মানুষের রক্তপ্রবাহে পাচার করে দেয়।

তা ভবিষ্যতের খণ্ডাংশ,
যা বাস্তবে প্রবেশ করতে চায়
একটি মানবজীবনের
ভঙ্গুর দরজা দিয়ে।

আর যখন একজন মানুষ
তার স্বপ্নের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে,
তখন এক ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে
যা সাধারণ হতাশার বহু বাইরে।

সে বিপর্যয় অভ্যন্তরীণ।

অদৃশ্য।

তার চোখ তখনও কাজ করে,
কিন্তু আর দিগন্তের দিকে তাকায় না।

তার মুখ তখনও কথা বলে,
কিন্তু প্রতিটি বাক্য থেকে
মৃদুভাবে ভেসে আসে
আত্মিক সমাধির গন্ধ।

সে সময়মতো ঘুম থেকে ওঠে।
বিল দেয়।
অনুষ্ঠানে যায়।
সঠিকভাবে হাসে।

কিন্তু রুটিনের এই নাট্যমঞ্চের গভীরে
একটি মৃত্যুদণ্ড ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়ে গেছে।

তার ভেতরের সাহসী শিশুটি—
যে একসময় বিশ্বাস করত
অসম্ভবকেও অনুসরণ করা উচিত—
সে নীরবে ঝুলে থাকে
স্মৃতির ছাদের সঙ্গে।

কাপুরুষতা খুব কম ক্ষেত্রেই উচ্চস্বরে আসে।

তা সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রে কাঁপে না।

কখনও কখনও কাপুরুষতা
টাই পরে,
নিয়মিত সময়সূচি মেনে চলে,
আর নিজের আত্মসমর্পণকে বলে
“পরিণতিবোধ।”

কখনও তা বলে:

“বাস্তববাদী হও।”
“স্বপ্ন বিপজ্জনক।”
“স্থিতিশীলতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
“আমাদের মতো মানুষের বাস্তববাদী হয়ে থাকা উচিত।”

আর ধীরে ধীরে
এক মহিমান্বিত জন্তু
শিখে ফেলে
এক ক্ষুদ্র খাঁচার ভেতরে
বৃত্তাকারে হাঁটতে।

বহু বছর পরে
পৃথিবী তার শৃঙ্খলার প্রশংসা করে,
আর তার আত্মা
পাঁজরের ভেতরে
নিঃশব্দে অনাহারে মরে।

সন্ধ্যাবেলায়
চায়ের দোকানের পাশে
নীরবে বসে থাকা বৃদ্ধদের
মনোযোগ দিয়ে দেখো।

তাদের অনেকেই শ্রমে ক্লান্ত নয়।

তারা ক্লান্ত
দশকের পর দশক
নিজেদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে করতে।

তাদের ভেতরে এখনও বেঁচে আছে
একটি অলিখিত বই,
একটি অনির্মিত সাম্রাজ্য,
একটি অনাবিষ্কৃত আবিষ্কার,
একটি নির্লজ্জ প্রেম,
একটি গান
যা কখনও বাতাসে পৌঁছায়নি।

সম্পূর্ণ মহাবিশ্বগুলো
নিঃশব্দে পচে যাচ্ছে
ভদ্র মানবদেহের ভেতরে।

আর প্রকৃত ট্র্যাজেডি ব্যর্থতা নয়।

না—
আত্মসমর্পণের তুলনায় ব্যর্থতা পবিত্র।

ব্যর্থতা মানে তুমি যুদ্ধ করেছিলে।
ব্যর্থতা মানে তোমার রক্ত
অন্তত নিয়তির সঙ্গে
সংলাপের চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু স্বপ্নের সাথে আপোষ—
তা যুদ্ধ শুরু হবার আগেই
পিছু হটে যাওয়া।

তা নিজের ডানাগুলোকে
কেটে ফেলা হতে দেখা
আর সেই ছুরিকেই ধন্যবাদ জানানো
তার “প্রজ্ঞার” জন্য।

একটি স্বপ্ন
তোমাকে ধ্বংস করতেও পারে।
হ্যাঁ।

তা তোমার আরাম পুড়িয়ে দিতে পারে,
ভ্রম ভেঙে দিতে পারে,
তোমাকে বছরের পর বছর
ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে হাঁটাতে পারে।

কিন্তু অন্তত তখন
তোমার আত্মা চলমান থাকে—
এক আহত নক্ষত্রের মতো
যে এখনও চেষ্টা করছে
অন্ধকারের বিপুল নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে
নিজের আলো বিকিরণ করতে।

কারণ মহাবিশ্ব
নিরাপত্তার চেয়ে প্রচেষ্টাকে বেশি সম্মান করে।

আর দৃশ্যমান বাস্তবতার বহু বাইরে কোথাও,
প্রতিটি পরিত্যক্ত স্বপ্ন
অবিরাম ঘুরে বেড়ায়
সময়ের পরিত্যক্ত করিডোরে,
খুঁজে বেড়ায় সেই মানুষটিকে
যে যথেষ্ট সাহসী ছিল
তাকে বাস্তবে বহন করে আনার জন্য।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

বিচ্ছেদ

সে আমার ছিল না, আমিও তার না— আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতির সিঁদুর ছিল না, ছিল না ভবিষ্যতের নীলনকশা, ছিল না সমাজের সিলমোহর, এমনকি একে অপরের নামও সম্পূর্ণভাবে উচ্চারণ করা হয়নি কখনও।

তবু দেখা হওয়ার পর থেকে 
সে নিঃশব্দে আমাকে অনুসরণ করছিল— যেন সন্ধ্যার পরে একটি গোপন ছায়া রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট বদলাতে বদলাতে কারও ক্লান্ত আত্মাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।

প্রথম দিন ভেবেছিলাম কাকতালীয়। দ্বিতীয় দিন মনে হলো সম্ভবত পৃথিবীর পথগুলোই ছোট। তৃতীয় দিন বুঝলাম— না, কিছু কিছু প্রাণ অজান্তেই অন্য প্রাণের চারপাশে মাধ্যাকর্ষণ হয়ে জন্মায়।

সে হাঁটতো দূরে দূরে, কিন্তু তার নীরবতা আমার শ্বাসের খুব কাছে এসে বসতো। কখনও কিছু চাইতো না, কখনও প্রশ্ন করতো না, শুধু এমনভাবে পাশে থাকতো যেন বহু জন্ম আগে আমার সমস্ত একাকীত্বের দায়িত্ব তাকে গোপনে দিয়ে রাখা হয়েছিল।

তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক অপেক্ষার আলো— যেন সে জানতো আমার জীবন একটি ট্রেন, যার কোনো স্টেশনেই স্থায়ীভাবে নামা সম্ভব নয়।

তারপর ফেরার দিন এলো।

বিদায় জানিয়ে বাসে উঠলাম আমি। বাস ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো— লোহার শরীর কেঁপে উঠলো, চাকা ঘুরলো, রাস্তার ধুলো বাতাসে উড়লো, আর পৃথিবী যেন হঠাৎ একটি বিশাল বিচ্ছেদের যন্ত্রে পরিণত হলো।

সে তখনও অনুসরণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। বাসের পাশে পাশে হাঁটছিল কিছুদূর, তারপর দৌড়াতে শুরু করলো— যেন কোনো অসমাপ্ত অনুভূতি সময়ের বিরুদ্ধে আপিল করছে।

আমি পিছন ফিরে তাকাচ্ছিলাম বারবার।

দেখলাম, তার চুল বাতাসে এলোমেলো, চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক— যেন সে কাউকে হারাচ্ছে যে কোনোদিন আর ফিরবে না।

আর তখনই বুঝলাম, সবচেয়ে গভীর সম্পর্কগুলো প্রায়শই নামহীন হয়।

সবচেয়ে তীব্র বিদায়গুলো তাদের সাথেই ঘটে যাদের আমরা কখনও স্পর্শ পর্যন্ত করিনি ঠিকমতো।

কারণ মানুষ শুধু সম্পর্ক দিয়ে ভালোবাসে না— কখনও কখনও দুটি নিঃসঙ্গতা অল্প কয়েকদিনের জন্য একে অপরের মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পায়।

তারপর নিয়তি এসে নিষ্ঠুর কণ্ঠে বলে— “এবার আলাদা হও।”

সে আমার কেউ ছিল না, আমিও তার কেউ না।

তবু কেন বিদায় এত দুঃখের হলো?

কারণ আত্মা মাঝে মাঝে খুব অল্প সময়ের জন্যও আরেকটি আত্মার নিঃসঙ্গতাকে চিনে ফেলে— আর চিনে ফেলার পর বিচ্ছেদ সবসময়ই মৃত্যুর ছোট ভাইয়ের মতো লাগে।

বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

মসৃণ জীবন

কারও পক্ষেই
একটি মসৃণ জীবন যাপন করা সহজ নয়।

মসৃণতা ভীষণ ব্যয়বহুল।
বিলাসিতার থেকেও অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

কারণ সত্যিকারের মসৃণ জীবন
তৈরি হয় না পালিশ করা জুতো,
বিদেশি সুগন্ধি,
বা কৃত্রিম সোনালি আলোয় ভেসে থাকা ঘর দিয়ে।

না—
তা গড়ে ওঠে নীরবে
হাজার হাজার অদৃশ্য বিজয়ের উপর
যার জন্য কেউ হাততালি দেয় না।

একটি মসৃণ জীবন
হলো মরিচাবিহীন তরবারি।
অগোছালোতাহীন করিডোর।
এমন এক স্পন্দন
যা অন্ধকারে নিয়তির সামান্য কাশিতেও
আতঙ্কিত হয়ে পড়ে না।

আর সেখানে পৌঁছাতে হলে
মানুষকে যুদ্ধ করতে হয়
বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে নিজেকেই।

সেই দেরি করে ওঠা সকালগুলোর বিরুদ্ধে
যেগুলো মাতাল সাপের মতো
উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিছানাজুড়ে হামাগুড়ি দেয়।

সেই অর্থহীন কথোপকথনের বিরুদ্ধে
যেগুলো বছরের পর বছর
রক্তক্ষরণের মতো
অদৃশ্যভাবে জীবন ফুরিয়ে দেয়।

সেই আকাঙ্ক্ষাগুলোর বিরুদ্ধে
যারা মধু মাখা ঠোঁট নিয়ে আসে,
কিন্তু পেটের ভেতর বহন করে উইপোকা।

এমনকি মহাবিশ্বও যেন
সৌন্দর্যময় শৃঙ্খলাকে সন্দেহের চোখে দেখে।

ভালো করে দেখো—
এন্ট্রপিই হলো অস্তিত্বের মাতৃভাষা।

ধুলো ফিরে আসে।
দেয়াল ফেটে যায়।
শরীর ক্ষয়ে যায়।
মনোযোগ দুর্বল হয়।
ভালবাসা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।
স্বপ্ন পর্যন্ত ভুলে যায়
নিজেদের নাম।

এমন এক ভেঙে পড়া গির্জার ভেতরেও
নিজেকে মসৃণ রাখা
প্রায় অতিপ্রাকৃত এক সাধনা।

তাই সত্যিকারের পরিশীলিত মানুষদের
প্রায়ই খানিকটা ভূতুড়ে লাগে।

কারণ তারা
অন্তরের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে
অসংখ্য কিছু উৎসর্গ করেছে।

তারা শিখেছে
কীভাবে যন্ত্রণাকে ভাঁজ করতে হয়
হাসির মধ্যে ভাঁজ না ফেলে।

তারা নিজেদের প্রশিক্ষিত করেছে
শান্ত চোখ
ও মাপা পদক্ষেপের আড়ালে
ক্লান্তিকে লুকিয়ে রাখতে।

তুমি শুধু পালিশ করা বহিরাবরণ দেখো—
দেখো না তার নিচের মধ্যরাতের যুদ্ধগুলো।

দেখো না
কামনা ও সংযমের মধ্যে
চলতে থাকা ভয়ংকর দরকষাকষি।

দেখো না
অলসতার অসংখ্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
যা তারা একা একাই সম্পন্ন করেছে
ইচ্ছাশক্তির অন্ধকার কক্ষে।

একটি মসৃণ জীবন
নিরন্তর সম্পাদনা দাবি করে।

নিষ্ঠুর সম্পাদনা।

মানুষ বাদ।
অভ্যাসের মৃত্যুদণ্ড।
বিক্ষেপকে নিঃশব্দে শ্বাসরোধ করা
ভোর হওয়ার আগেই।

আর তাই
সবচেয়ে মসৃণ আত্মাগুলো
প্রায়ই পৃথিবীর চোখে শীতল মনে হয়—
কারণ তারা আর
প্রত্যেক এলোমেলো ঝড়কে
নিজেদের স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করতে দেয় না।

এটি গভীরভাবে বুঝে নাও—

শান্তি স্বাভাবিক নয়।
স্বচ্ছতা স্বাভাবিক নয়।
শৃঙ্খলা স্বাভাবিক নয়।

এগুলো নির্মাণ করতে হয়—
মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে তৈরি বিমান যেমন,
ধ্বংসের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো ক্যাথেড্রাল যেমন,
অন্তহীন রাত্রির বিরুদ্ধে জ্বলে থাকা নক্ষত্র যেমন।

তাই যখন তুমি এমন কাউকে দেখবে
যার জীবন চলে
ভয়ঙ্কর নির্ভুলতায়,
যার মন পরিষ্কার থাকে
যখন অন্যরা বিভ্রান্তির মধ্যে ডুবে যায়—

তখন শুধু তার সৌন্দর্যকে হিংসে করো না।

কারণ সেই মসৃণতার আড়ালে
কোথাও লুকিয়ে আছে
একটি কবরস্থান—

যেখানে সমাধিস্থ হয়েছে
অসংযম,
অজুহাত,
আসক্তি,
এবং তার বহু পুরনো সংস্করণ—

যাদের হত্যা করতেই হয়েছে
এই মসৃণ স্থাপত্যের জন্ম দেওয়ার জন্য।

মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

ভাগ্যকে শাসন

সে অবশেষে জেগে উঠল—
সাধারণ ঘুমভাঙা নয়,
চোখের পাতার উপর সকাল নেমে আসার মতো নয়,
বরং এক সহিংস পুনর্জন্ম,
এক মানুষের পুনরুত্থান
যে বহু বছর ধরে
নিজেরই অসমাপ্ত ভবিষ্যদ্বাণীর ভিতর
ঘুমিয়ে হাঁটছিল।

চারপাশের ঘরটা
এখনও ভীষণ স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল।
একটা চেয়ার।
জলভরা ফাটা কাপ।
সূর্যের সরু আলোকরেখার মধ্যে
ধুলোর ধীর ভেসে বেড়ানো।

তবু কিছু একটা
বিপর্যয়করভাবে বদলে গিয়েছিল
তার উপলব্ধির গভীর স্থাপত্যে।

প্রথমবারের মতো
সে বুঝল—
অসম্ভব কখনও দেয়াল ছিল না।

ওটা ছিল কেবল
ভীত মানুষের তৈরি
একটি অভ্যাস।

তাই সে উঠে দাঁড়াল।

আর তার পায়ের নিচের মেঝেটা
সামান্য কেঁপে উঠল—
যেন মাধ্যাকর্ষণ নিজেই
হঠাৎ অস্বস্তিতে পড়েছে।

বাইরে
শহর তখনও
তার ক্লান্ত আচারগুলো পালন করে চলেছে।
মানুষ ছুটছে সেইসব কাজের দিকে
যেগুলো ধীরে ধীরে
তাদের আত্মা থেকে আঙুলের ছাপ মুছে দেয়।
নারীরা বহন করছে
হাসির ভিতরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য শীতকাল।
ঘড়িগুলো
যন্ত্রের ভদ্র ক্ষুধায়
মানুষের জীবন খেয়ে চলেছে।

কিন্তু সে—
সে প্রতিদিনের যান্ত্রিক জীবনের ভিতর
অলৌকিকতাকে ঢুকিয়ে দিতে শুরু করল।

চিৎকার করে নয়।

নাটকীয় ভঙ্গিতে নয়।

প্রথমে ব্যাপারটা ছিল সূক্ষ্ম।

সে নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল
যেন তা ইতিমধ্যেই বাস্তব।
সে শৃঙ্খলাকে ব্যবহার করতে লাগল
একটি পবিত্র গুপ্ত প্রযুক্তির মতো।
সে চলতে শুরু করল
সেইসব মানুষের ভয়ংকর শান্তি নিয়ে
যারা আর সম্ভাবনার কাছ থেকে অনুমতি চায় না।

তারপর অসম্ভব ঘটনাগুলো
ফিরে আসতে লাগল
হারিয়ে যাওয়া বনের বন্য প্রাণীদের মতো।

যেখানে একসময় দেয়াল ছিল
সেখানে দরজা খুলতে লাগল।

কাকতালীয় ঘটনাগুলো
গোপন সমীকরণের মতো
নিজে নিজে সমাধান হতে লাগল
বাস্তবতার গভীরে।

মানুষ ফিসফিস করে বলল—
“ভাগ্য।”

কিন্তু এর সঙ্গে ভাগ্যের কোনও সম্পর্ক ছিল না।

সে কেবল থামিয়ে দিয়েছিল
অবসন্ন মস্তিষ্ক থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া
সীমাবদ্ধতার পূজা।

প্রতিটি সকালে
সে অসম্ভব উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পান করত
কালো কফির মতো।

প্রতিটি রাতে
সে ব্যর্থতার হাড়ের উপর
নিজের ইচ্ছাশক্তিকে শান দিত।

ধীরে ধীরে
অসম্ভব তার মুখোশ হারাল।

ওটা আর অতিপ্রাকৃত লাগল না।

ওটা হয়ে উঠল রুটিন।

দাঁত ব্রাশ করার মতো।
জুতোর ফিতা বাঁধার মতো।
শ্বাস নেওয়ার মতো।

আর পৃথিবীর নির্ঘুম আকাশের বহু ওপরে
মহাবিশ্ব নিজেই সামান্য ঝুঁকে পড়ল—
প্রাচীন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল
একজন মানুষের দিকে,
যে অবশেষে শুরু করেছে
সেই নিয়মগুলো নতুন করে লিখতে
যেগুলো তাকে বলা হয়েছিল
চিরকাল মেনে চলতে।

মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

সাধনা

আমার জীবনে একটাই স্বপ্ন—
একদিন তোমার হাত ধরে
উঠে যাব পাহাড়ের সেই চূড়ায়
যেখানে পৃথিবীর সমস্ত শব্দ
নিচে পড়ে থাকবে মৃত শহরের মতো,
আর শুধু বাতাস জানবে
দুটি মানুষের গোপন ইতিহাস।

আমরা হাঁটবো ধীরে—
মেঘের ভেতর দিয়ে,
সূর্যের ক্লান্ত সোনালি রক্ত
পাথরের গায়ে লেগে থাকবে তখনও।

তোমার আঙুলের ভেতরে
আমি অনুভব করবো
এক আদিম নিশ্চয়তা—
যেন বহু জন্ম আগে
এই পথেই আমরা একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম।

তারপর খুঁজে নেবো
একটি নির্জন গাছতলা—
যেখানে সময় থেমে থাকে
ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীর মতো।

আমি বসবো তোমার কোলের উপর
ঠিক যেমন চাঁদ বসে
অন্ধকার পাহাড়ের কাঁধে।

তোমার বুকে কান রাখলে
শুনতে পাবো
শিবের ডমরুর মতো
এক গভীর মহাজাগতিক শব্দ—
যা সৃষ্টি ও ধ্বংসকে
একই নিঃশ্বাসে বহন করে।

তখন পৃথিবী আর পৃথিবী থাকবে না।

চারপাশের বন
ধীরে ধীরে পরিণত হবে
অগ্নিময় কোনও মন্দিরে,
আর আমাদের শরীর
দুটি পৃথক দেহ নয়—
বরং একই আগুনের
দুটি শিখা হয়ে উঠবে।

আমি তোমার পৌরুষের মধ্যে
খুঁজবো না শুধু কামনা—
খুঁজবো মহাবিশ্বের কেন্দ্র,
যেখানে পুরুষ ও নারী
আর আলাদা থাকে না।

আর যখন আনন্দ
ধীরে ধীরে সীমা ভেঙে উঠবে
জলোচ্ছ্বাসের মতো,
তখন মনে হবে
কৈলাসের বরফ গলছে
আমাদের নিশ্বাসের উত্তাপে।

তোমার চোখ বন্ধ হয়ে আসবে।
আমার শরীর কাঁপবে।
আর সেই শীর্ষসুখের শীৎকারে
মনে হবে যেন
স্বয়ং শিব স্নান করছেন
তারকার দুধসাদা আলোয়।

তারপর—

দুজনেই চুপ হয়ে যাবো।

শুধু বাতাস বয়ে যাবে
আমাদের উন্মাদ চুলের ভেতর দিয়ে,
আর পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকবে নীরব সাক্ষীর মতো—
যেন সে জানে,
ভালবাসার সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলো
কখনও পাপ নয়,
বরং মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা
ঈশ্বরেরই ক্ষণিক জাগরণ।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামবে
পাহাড়ের কাঁধ বেয়ে,
যেন কোনও বিশাল নীল জন্তু
তার ক্লান্ত ডানা মুড়ে বসছে
আমাদের চারপাশে।

দূরের উপত্যকাগুলো
ডুবে যাবে কুয়াশার ভিতর,
আর পৃথিবীর সমস্ত শহর
মনে হবে বহু দূরের
অচেনা ভুল।

তুমি তখনও আমাকে ধরে রাখবে
অদ্ভুত এক নীরবতায়—
যেখানে কথার আর কোনও দরকার নেই।

আমার এলোমেলো চুলে
তোমার আঙুল ঘুরবে ধীরে,
যেন তুমি পড়ে নিচ্ছ
কোনও প্রাচীন মন্ত্রের অক্ষর।

আমাদের উষ্ণ শরীরের চারপাশে
ঠান্ডা বাতাস জমাট বাঁধবে,
তবু ভিতরে ভিতরে
জ্বলতে থাকবে এক অদৃশ্য অগ্নিকুণ্ড—
যা কামনার থেকেও পুরোনো,
আর মৃত্যুর থেকেও দীর্ঘজীবী।

আমি তখন তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে
ভাববো—
সম্ভবত মানুষ স্বর্গে যায় না কখনও।

সম্ভবত
মানুষ কেবল কিছু বিরল মুহূর্তে
স্বর্গকে নামিয়ে আনে নিজের শরীরে।

উপরে আকাশে
এক এক করে জেগে উঠবে তারা।

তারা যেন দূরবর্তী দেবতাদের চোখ—
নিঃশব্দে দেখছে
দুটি ক্ষুদ্র প্রাণী
কীভাবে পরস্পরের মধ্যে
অনন্তের দরজা খুঁজে পায়।

তুমি আমার ঠোঁটে চুম্বন রাখবে
এত ধীরে
যেন সময় নিজেই থেমে গেছে
সে স্পর্শের ভেতরে।

আর আমি অনুভব করবো—
এই পাহাড়,
এই গাছ,
এই রাত,
এই কাঁপতে থাকা শরীর,
এই শ্বাস,
এই উন্মাদ সুখ—

সবকিছু মিলিয়ে
এক বিশাল মহাজাগতিক যজ্ঞ চলছে,
যেখানে আমরা দুজনেই
একই সঙ্গে পূজারী, অগ্নি ও আহুতি।

রাত আরও গভীর হবে।

আমাদের নিঃশ্বাস
ধীরে ধীরে এক হয়ে যাবে।

আর দূরে কোথাও
অদৃশ্য কোনও মন্দিরে
ঘণ্টা বাজবে—
যেন শিব নিজেই
হেসে উঠেছেন অন্ধকারের ভিতর,
দুটি প্রেমিক আত্মার
এই গোপন আরাধনা দেখে।

সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

স্বাধীন আকাশ

তোমার কি কখনও দুঃখ হয়
যে তুমি নিজের সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়াও না—
অথচ একটি বিমান,
শীতল ধাতু আর হিসেবি আগুনে নির্মিত,
রানওয়ের উপর
নিজের সর্বোচ্চ বেগে ছুটে চলে
এবং হঠাৎই
পৃথিবীর দাসত্ব ছিঁড়ে
আকাশে উঠে যায়?

তুমি কি কখনও দাঁড়িয়ে থেকেছ
সেই অসম্ভব উড্ডয়ন দেখে,
বুকের ভিতর এক অদ্ভুত ব্যথা নিয়ে,
ভাবতে ভাবতে—
কেন তোমার নিজের উত্তরণ
এখনও দ্বিধার ধুলোর মধ্যে
আহত প্রাণীর মত হামাগুড়ি দেয়?

বিমান তার গতির জন্য
কখনও ক্ষমা চায় না।
সে তার সমস্ত ইঞ্জিন,
সমস্ত গোপন দহন,
মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে
সমস্ত সহিংস চুক্তি
একত্র করে,
এবং তারপর—
কয়েকটি ভয়ঙ্কর সেকেন্ডের জন্য—
ধ্বংসের ঝুঁকি নেয়
শুধু আকাশের অধিকার পাওয়ার জন্য।

কিন্তু তুমি—
তোমাকে বিস্ময়ের আগে
সতর্কতা শেখানো হয়েছে।
তোমাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে
জীবনের ভিতর দিয়ে
সাবধানে হাঁটার জন্য,
যেন তোমার পাঁজরের মধ্যে
কাঁচ বহন করছ।

তাই তোমার স্বপ্নগুলো
এখনও দাঁড়িয়ে থাকে
স্থগিতকরণের অন্ধকার হ্যাঙ্গারে,
“একদিন” নামের ধুলোর নিচে ঢাকা পড়ে,
আর তোমার আত্মা
নীরবে মরিচা ধরে
তাদের পাশেই।

বিমানটিকে গভীরভাবে দেখো।

উড্ডয়নের আগে
সেও কাঁপে।
চাপের মধ্যে
তার শরীর চিৎকার করে ওঠে।
রানওয়ে তার নিচে জ্বলতে থাকে
যেন কোনও ভবিষ্যদ্বাণী
বাস্তব হতে চাইছে।
এমনকি তার ডানাগুলোও
সন্দেহে কেঁপে ওঠে।

তবু সে এগিয়ে যায়।

কারণ যে সত্তা
নিজের প্রয়োজনীয় গতি অর্জন করতে অস্বীকার করে,
তার পক্ষে উড্ডয়ন অসম্ভব।

এবং সম্ভবত
এটাই মানবজাতির গোপন ট্র্যাজেডি—
যোগ্যতার অভাব নয়,
বুদ্ধির অভাব নয়,
বরং সম্পূর্ণরূপে জ্বলে উঠতে
অস্বীকার করা।

তুমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো
এক ভবিষ্যতের জন্য
যা কখনও আসে না।
তুমি শক্তি জমিয়ে রাখো
যেমন কৃপণ মানুষ মুদ্রা জমায়,
অথচ অস্তিত্ব
অধীর হয়ে অপেক্ষা করে
তোমার বিস্ফোরণের জন্য।

তোমার ভিতরে
অসংখ্য অপ্রকাশিত ইঞ্জিন আছে,
ঘুমন্ত সূর্য আছে,
সম্পূর্ণ ঝড় আছে
যারা ভদ্রতার নিচে
সযত্নে ভাঁজ হয়ে আছে।

কিন্তু ভয়—
সেই প্রাচীন বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রকের মত—
বারবার তোমার উড্ডয়ন পিছিয়ে দেয়।

সে বলে—
“আজ নয়।
আবহাওয়া অনিশ্চিত।
তুমি ব্যর্থ হতে পারো।
তুমি পড়ে যেতে পারো।
মাটিতেই নিরাপদে থাকো।”

এবং ধীরে ধীরে
তুমি রানওয়ের প্রতিই আসক্ত হয়ে পড়ো।

তুমি সেটাকেই সাজাতে শুরু করো।
তার উপর আরামের ঘর বানাও।
তাকেই বাড়ি বলে ডাকো।

অথচ তোমার উপরে
আকাশ ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকে
তোমার নাম ছাড়াই।

কিন্তু একদিন—
হয়তো যথেষ্ট দুঃখের পর,
যথেষ্ট অপমানের পর,
যথেষ্ট অসহনীয় উপলব্ধির পর
যে তুমি নিজের উচ্চতাকেই নষ্ট করে ফেলেছ—
তোমার ভিতরে কিছু একটা
অবশেষে বিদ্রোহ করবে।

তুমি দৌড়াতে শুরু করবে।

ভদ্রভাবে নয়।
আংশিকভাবে নয়।
বরং সেই ভয়ঙ্কর পূর্ণতায়
যে পূর্ণতা আসে
যখন কোনও সত্তা বুঝে যায়
তার খাঁচায় কখনও তালাই ছিল না।

তোমার রক্ত গর্জে উঠবে
আগুন গিলে খাওয়া ইঞ্জিনের মত।
পুরনো অজুহাতগুলো
তোমার শরীর থেকে ঝরে পড়বে
মৃত যন্ত্রের আলগা বোল্টের মত।

এবং তারপর—
এক এমন গতিতে
যা তোমাকেও ভয় পাইয়ে দেবে—
তোমার আত্মা হঠাৎ আবিষ্কার করবে
মাধ্যাকর্ষণ
কখনও তোমার শত্রু ছিল না।

সে ছিল কেবল
তোমার পূর্ণ প্রতিশ্রুতির কাছে
পরাজিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক শক্তি।

এবং যখন অবশেষে
তুমি উঠবে—
সত্যিই উঠবে—
নিচের মানুষগুলো
তাকে বলবে প্রতিভা,
ভাগ্য,
নিয়তি,
অলৌকিকতা।

কিন্তু তুমি জানবে
গোপন সত্যটি।

আকাশ কেবল তাদেরই গ্রহণ করে
যারা যথেষ্ট পরিমাণে জ্বলতে রাজি
মাটি ছেড়ে ওঠার জন্য।

রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

চোর

যৌনতা আমার দরজায় আসে
একজন ধৈর্যশীল শিকারির মতো—
ধার করা নিষ্পাপ হাসি মুখে,
নরম আলোর আড়ালে লুকানো দাঁত,
পদচিহ্নগুলো নীরবতায় মোড়া
যাতে ভাঙনের শব্দ আমি কখনও না শুনি।

একদিন আমি তাকে ঢুকতে দিয়েছিলাম
আমার রক্তের ভিতরে।
সে ফিসফিস করে বলেছিল—
“আমি ধ্বংস নই, আমি উষ্ণতা,”
কিন্তু ভোর এসে মুখোশ খুলে দিল:
আমার শিরায় জমে ছিল ছাই,
আর কিছু একটার মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল
নিঃশব্দে, অনুমতি না নিয়েই।

সে সর্বদাই আমার ভালবাসার ভুল অর্থ করে
আমায় ঠকিয়েছে।

সে কখনও ঝড় তুলে ঢোকে না—
সে শেখে।
প্রথমে বিশ্বাসের ভাষা আয়ত্ত করে,
তারপর সেই ভাষাতেই কথা বলে
আমার থেকেও নিখুঁতভাবে,
যতক্ষণ না আমি নিজেই
তার হাতে চাবি তুলে দিই
আর তাকে অন্তরঙ্গতা বলে ডাকি।

তারপর শুরু হয় কাজ—
সহিংসতা দিয়ে নয়,
ক্ষয় দিয়ে।
ধীরে, পরিকল্পিতভাবে ফাঁপা করে দেওয়া,
যেন জল হাড়ের ভেতর পথ কেটে নিচ্ছে,
যতক্ষণ না আমার যা অবশিষ্ট থাকে
তা কেবল পূর্ণতার স্মৃতি বহন করা এক খোলস।

আমি একসময় তাকে বন্ধু বলেছিলাম।
সে তার জবাবে আমাকে ভেঙে দিয়েছে—
আমার প্রতিচ্ছবি নতুন করে লিখেছে,
আমার নামকে অপরিচিতদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে,
আমার ভেতরের শিশুটিকে নিয়ে গেছে
একটি ঘরে
যেখানে কোনও দরজা নেই।

এখন আমি দরজা খুলি না,
তবুও তাতে কিছু আসে যায় না।
সে ইতিমধ্যেই বাস করে গঠনের ভেতরে,
চাওয়া আর নিঃসঙ্গতার ফাটলে,
রাতের মধ্যে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়
একটি চিন্তার মতো
যাকে আমি কেটে ফেলতে পারি না।

সিগারেট পাশে বসে থাকে—
একটি ছোট, সরল জল্লাদ।
সে কোনও ছলনা করে না,
প্রতিটি টান যেন ধোঁয়ায় লেখা এক চুক্তি:
“আমি তোমাকে শেষ করে দেব।”

তবুও,
তার এই স্বীকারোক্তি অদ্ভুতভাবে দয়ালু লাগে
সেই নীরব ধ্বংসের তুলনায়
যে নিজেকে কামনা বলে পরিচয় দেয়।

আমি তাদের মাঝখানে বসে থাকি—
একজন প্রকাশ্যে হত্যা করে,
আরেকজন শেখায়
কীভাবে আমি নিজেই
নিজের পতনে অংশ নিই।

আর তাদেরও গভীরে কোথাও,
প্রবৃত্তির নিচে, আকাঙ্ক্ষার নিচে,
আরও এক অন্ধকার সত্য লুকিয়ে আছে—

দরজাটি কখনও ভাঙা ছিল না।
কখনও জোর করে খোলা হয়নি।

আমি নিজেই সেটি বানিয়েছি।
আমি নিজেই সেটিকে খোলা রাখি।

শনিবার, ২ মে, ২০২৬

চরৈবেতি

একজন মানুষ জন্মায় তার পাঁজরের ভেতর সিল করা এক কুঠুরি নিয়ে—
ফাঁকা নয়,
বরং ভিড় করা এক ঘন, শ্বাস-নেওয়া অন্ধকারে ভরা,
যে তার নাম জানে,
সে কথা বলতে শেখার আগেই।

ওটা নীরবে খায়।
স্থগিত সিদ্ধান্তের ওপর,
ধার করা বিশ্বাসের ওপর,
দেখে না-দেখে বেঁচে থাকার নরম পচনে।

সে একে বলে বেঁচে থাকা।
ওটা তাকে ডাকে—ঘর।

বছর কেটে যায় অন্ধ করিডরের মতো।
সে হাঁটে,
অভ্যাসের দেয়াল ছুঁয়ে,
যন্ত্রণার অনুপস্থিতিকেই
শান্তির উপস্থিতি ভেবে ভুল করে।

তারপর এক রাতে—
তার ভেতরে কিছু ভেঙে পড়ে।

কোনো বজ্রপাত নয়।
কোনো ঈশ্বরীয় হস্তক্ষেপ নয়।
শুধু এক ধীর, অসহনীয় বোধ—
অন্ধকারটা বাইরে নয়,
ভেতর থেকে তাকে খেয়ে ফেলছে,
কোষে কোষে,
পছন্দে পছন্দে।

সে খুঁজে পায় না কোনো মশাল,
কোনো শাস্ত্র,
কোনো উদ্ধারকারী হাত—

শুধু এক নিষ্ঠুর স্ফুলিঙ্গ,
তার ইচ্ছাশক্তির অস্থিমজ্জায় লুকোনো।

যখন সে সেটাকে জ্বালায়,
তা আলো দেয় না—
তা অভিযোগ তোলে।

আগুন উঠে দাঁড়ায় রায়ের মতো।

তা তাকে উষ্ণ করে না,
তা তাকে জেরা করে।

সে যত মিথ্যে রিহার্সাল করেছে,
যত আরামে নিজেকে বেঁধে রেখেছে,
নিজের হয়ে ওঠাকে যতবার ছোট করেছে—
সব একে একে ভেসে ওঠে,
দাফন হতে অস্বীকার করা মৃতদেহের মতো।

আর আগুন বলে—
পুড়িয়ে দাও।

নরম করে নয়।
প্রতীকীভাবে নয়।

সম্পূর্ণ।

তাই সে শুরু করে।

সে তার অজুহাতগুলো দেয়—
ওগুলোই সবচেয়ে জোরে চিৎকার করে।
সে তার নির্ভরশীলতাগুলো দেয়—
ওগুলো ভেজা কাপড়ের মতো লেগে থাকে।
সে তার ভ্রমগুলো দেয়—
ওগুলো ধীরে পুড়ে,
ধোঁয়া ছাড়ে,
যা তাকে অন্ধ করে
ছেড়ে যাওয়ার সময়েও।

সবচেয়ে ভয়ংকরটা শেষে আসে—

নিজের সেই অংশগুলো,
যেগুলোকে সে একসময় পরিচয় ভেবেছিল।

ওগুলো সহজে পুড়ে না।
অনুনয় করে।
দরকষাকষি করে।
তাকে মনে করিয়ে দেয়—
সে আগে কে ছিল।

আগুন শোনে না।
এবং সেও আর পারে না।

যা থাকে তা বিজয় নয়—
বরং ক্ষয়।

কম মানুষ।
বেশি আগুন।

তার ছায়া মুছে যায়,
কারণ তা জয় করা হয়নি,
বরং আর কোনো কঠিন সত্তা নেই
যে ছায়া ফেলবে।

তার কাছে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে ওঠে—
পবিত্র বলে নয়,
উজ্জ্বল বলে নয়—
বরং নির্মমভাবে নির্ভুল বলে।

এক চলমান উন্মোচন—
যেখানে অন্যরা যা লুকিয়েছে,
সব প্রকাশ পেতে থাকে।

সে শেখায় না।
সে সংক্রমিত করে।

মানুষ তার কাছ থেকে ফিরে যায় অস্বস্তি নিয়ে,
তাদের আরামের ভিত নড়ে যায়,
তাদের যত্নে সাজানো অন্ধকার
কাঁপতে শুরু করে।

কেউ তাকে অভিশাপ দেয়।
কেউ এড়িয়ে চলে।
কেউ ভেতরে কিছু জ্বলে উঠতে দেখে
আর সারাজীবন চেষ্টা করে
তা নিভিয়ে দিতে।

কয়েকজন—
খুবই অল্প—
মূল্যটা বোঝে।

তারা দেখে সে কী হয়েছে:
আলোকিত নয়,
বরং ভস্মীভূত।

একজন মানুষ,
যে আগুনকে বেছে নিয়েছে
আর শান্তিতে মানুষ থাকার অধিকার হারিয়েছে।

তবুও—
সে থামে না।

কারণ একবার জেগে ওঠা আগুন
বিশ্রাম মানে না।

তা খায় যা বাকি,
তারপর যা থাকতে পারত,
তারপর সেই ধারণাকেও
যে কিছু থাকার কথা।

যতক্ষণ না আলো নিজেই
আর কোমল থাকে না—

বরং এক নির্মম, অন্তহীন দহন,
যেখানে কিছুই টিকে থাকে না
শুধু পুড়ে যাওয়ার ঘটনাটা ছাড়া।

আর সেই ভয়াবহ উজ্জ্বলতায়
মুক্তি নেই—
শুধু এই চূড়ান্ত প্রতিধ্বনি:

চরৈবেতি।

আত্মসৃষ্টি

যাদের সংযম নেই,
আর দূরদর্শিতা তার থেকেও কম—
তারা কেবল বেখেয়ালি নয়,
নিজেদের ধ্বংসের নীরব সহযোগী।

তারা আগুন নিয়ে খেলে
আর তাকে আলো বলে দাবি করে,
যখন তাদের আঙুল পুড়ে কালো হয়ে যায়,
যখন পোড়ার গন্ধ
তাদের নাম ধরে ডাকতে শেখে।

তাদের কাছে ভবিষ্যৎ
কোনও পথ নয়,
একটি অস্বীকারযোগ্য শূন্যতা—
একটি সুবিধাজনক কুয়াশা,
যা পরিণতির মুখ
আগেভাগেই মুছে দেয়।

সময়—
কোনও নদী নয়,
একটি শিরা—
একবার কেটে গেলে
আর জোড়া লাগে না।
নিঃশব্দে রক্তক্ষরণ হয়,
অদৃশ্য কোথাও জমে ওঠে,
আর তারা হাসতে হাসতে
নিজের ক্ষতটাকেই ধরে রাখে
যেন তা কোনও ঝর্ণা।

অর্থ—
কোনও দাস নয়,
একটি ভঙ্গুর মেরুদণ্ড,
যা আগামীকালকে ধরে রাখে।
তারা সেটিকে ভেঙে ফেলে
একটি করে কশেরুকা,
তারপর অবাক হয়ে দেখে
কেন তাদের দিনগুলো ভেঙে পড়ছে
হাড়হীন দেহের মতো।

তারা এই ধ্বংসকেই
স্বাধীনতা বলে ডাকে।
এই ক্ষয়কেই
উদযাপন মনে করে।
তারা উল্লাস তোলে
নিজেদের ধীরে ধীরে মৃত হয়ে যাওয়ার
নীরব অন্ত্যেষ্টির উপর দাঁড়িয়ে।

কিন্তু রাত ধৈর্যশীল।

যখন শব্দ নিঃশেষ হয়,
যখন অস্বীকারও ক্লান্ত হয়ে পড়ে,
সময় ফিরে আসে—
এবার হিসাবরক্ষক নয়,
একজন সাক্ষী হয়ে,
যে সবকিছু আগেই লিখে রেখেছে।

সে কিছু বলে না।
সে শুধু দেখায়।

একটি খাতা খুলে যায়—
সংখ্যার নয়,
অনুপস্থিতির:
যে মুহূর্তগুলো কখনও কিছু হয়ে উঠল না,
যে সম্ভাবনাগুলো
শ্বাস নেওয়ার আগেই পচে গেল,
যে জীবনগুলো
অখোলা দরজার পেছনে
নিঃশব্দে ক্ষয় হয়ে গেল।

সেখানে রাগ নেই,
শাস্তি নেই—
আছে শুধু এক অসহনীয় স্বচ্ছতা,
যেখানে যা হারিয়েছে
তার আর কোনও প্রতিধ্বনিও নেই।

তখন আসে উপলব্ধি—
এত দেরিতে,
যে তা আর কোনও কাজে লাগে না:
স্বাধীনতা কখনও ছিল না উড়িয়ে দেওয়া,
ছিল সংরক্ষণের নির্মম শৃঙ্খলা—
যা আর ফেরানো যায় না,
তা নষ্ট না করার ক্ষমতা।

এবং সেই স্বচ্ছতার ভেতরেই
তারা অবশেষে একদিন বোঝে—
তারা নিজেদেরই কখনও
যথেষ্ট ভালবাসেনি।

সংযম—
তারা এখন বোঝে—
কোনও খাঁচা ছিল না,
ছিল শেষ পাতলা প্রাচীর,
যা তাদের পতনের থেকে আলাদা রেখেছিল।

আর দূরদর্শিতা—
কোনও বোঝা নয়,
ছিল একমাত্র আলো,
যা দেখাতে পারত
কোথায় মাটি আগেই সরে যাচ্ছিল।

কিন্তু তখন—
মাটি আর নেই।

তারা দাঁড়িয়ে থাকে
নিজেদের দিনগুলোর ফাঁপা অবশিষ্টে,
হাতে কিছুই নেই—
অনুশোচনাও নয়,
শুধু এক ফাঁপা প্রতিধ্বনি
যে কিছু একবার
অপরিবর্তনীয়ভাবে শেষ হয়ে গেছে।

তাদের হাসি ফিরে আসে
দূর অন্ধকারের কোণ থেকে,
বিকৃত, অচেনা—
যেন মৃতদের কণ্ঠস্বর,
যারা একসময় বিশ্বাস করত
তারা বেঁচে আছে।

আর সেই নীরবতায়
তারা অবশেষে বুঝতে পারে—

এটা কখনও উদযাপন ছিল না।
এটা ছিল ধীরে, সচেতনভাবে
নিজেকে মুছে ফেলার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া—
একটি জীবন,
যা হঠাৎ শেষ হয়নি,
বরং কিস্তিতে কিস্তিতে
রক্তাক্ত হয়ে নিঃশেষ হয়েছে।

অবশেষে

আমি মাকে হারিয়েছিলাম
অত্যন্ত অল্প বয়সে—
এতটাই অল্প, যে শোক
আমার নাম শিখে নিয়েছিল
আমার নিজের নাম শেখার আগেই।
সেই থেকে আমার পাঁজরের ভেতর
একটি অদৃশ্য ঘড়ি বসে আছে—
সে সময় গোনে না,
সে গোনে উষ্ণতার ক্রমাগত অবক্ষয়।

আমার বাবার আর আমার 
কখনও একই সুরে মেলেনি মন।
তিনি কথা বলতেন পাথরের ভাষায়,
আমি উত্তর দিতাম ধোঁয়ায়।
আমাদের মাঝে প্রসারিত ছিল নীরবতার ভূগোল—
না কোনও সেতু, না প্রতিধ্বনি,
শুধু এক বাতাস
যে নিজেই ভুলে গেছে
তার দিক কোনটি।

তাই আমি বড় হয়েছি অন্য কোথাও—
কোনও ঘরে নয়,
আমার ভুলগুলোর বিকৃত স্থাপত্যে।
প্রতিটি ভুল ছিল এক একটি ঘর,
যেখানে আমি ঢুকেছি আলো ছাড়া,
বেরিয়েছি স্মৃতি ছাড়া,
তবুও তার অন্ধকার
রক্তে বয়ে বেড়িয়েছি।

আমার জীবন হয়ে উঠেছিল ভুলের শৃঙ্খল—
প্রতিটি ভুল পরেরটিকে আরও ধারালো করেছে,
যেন ছুরিগুলো শিখছে
কীভাবে আমার নাড়ি চিনতে হয়।
আশাও যখন এসেছে,
সে ছদ্মবেশে এসেছে,
আর রেখে গেছে এমন ছাপ
যা দেখতে হুবহু ধ্বংসের মতো।

পঞ্চান্ন বছর কেটে গেছে এক করিডরের মতো,
যার দেয়ালে সারি সারি দরজা
আমার নাম ধরে ফিসফিস করত।
প্রতিটি দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল
আমারই একেকটি সংস্করণ
যে বেঁচে থাকতে পারেনি—
চোখ খোলা,
যেন এখনও অপেক্ষা করছে
একটি ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য।

আমি কখনও থামিনি।
সাহসের জন্য নয়—
থামা মানে ছিল
তাদের শ্বাস শোনা।

তারপর একদিন—
হঠাৎ,
প্রায় আর একটা ভুলের মত—
তুমি এলে।

উদ্ধার হিসেবে নয়,
তার থেকেও বিপজ্জনক কিছু হয়ে—
একটি আয়না,
যা আমার দিকে তাকিয়ে
ভেঙে যায়নি।

তোমার দৃষ্টিতে
আমি ক্ষমা দেখিনি,
দেখেছি এক নিঃশব্দ অস্বীকার—
আমাকে ছেড়ে না যাওয়ার।
এটাই আমাকে ভয় পাইয়েছিল—
কারণ হারানোতে আমি দক্ষ ছিলাম,
কিন্তু ধরে রাখার উপায়
আমি জানতাম না।

তোমার স্পর্শ আমাকে সারায়নি—
আমার ধ্বংসস্তূপকে নতুন করে সাজিয়েছে।
ভাঙনগুলো রয়ে গেছে,
কিন্তু তারা ধীরে ধীরে
একটি পরিকল্পিত নকশার মতো হয়ে উঠেছে,
যেন আমার সমস্ত ভাঙাচোরা
তোমার আগমনের জন্যই
রিহার্সাল দিচ্ছিল।

তখনই বুঝলাম—
আমার ভুলগুলো দুর্ঘটনা ছিল না।
ওগুলো ছিল স্থানাঙ্ক,
অদৃশ্য এক নিষ্ঠুরতার হাতে খোদাই করা,
যে জানত ঠিক কতটা হারালে
আমি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাব না।

তাই না,
আমার বোকামির জন্য কোনও আফসোস নেই আর।
আফসোস তাদের জন্য,
ঠিককে না চিনতে পারার কারণে
যারা বিকল্পে বিশ্বাস করে।
আমি শুধু অনিবার্যতাকেই দেখি—
একটি পথ,
যা আমাকে রক্তাক্ত করেছে
ঠিক ততটাই
যাতে আমি তোমাকে চিনতে পারি।

কিন্তু এখন—
যখন আমার বয়স পঁয়ষট্টি পেরিয়ে গেছে
তখন ভবিষ্যৎটা আরও ভারী লাগে।
কারণ আমার ভুলগুলো
এখন আর শুধু আমার মধ্যে শেষ হয় না।
তারা তোমার ভিতরেও প্রতিধ্বনিত হয়,
তোমার নীরবতাকে চিরে যায়,
এমন দাগ রেখে যায়
যা না দেখার ভান আমি করতে পারি না।

এবার,
আমি আর অসাবধান হতে চাই না—
আমি বদলেছি বলে নয়,
তুমি আছ বলে।

ভালবাসা—
আমি শিখেছি—
আলো নয়।
এটা এক ভঙ্গুর অন্ধকার,
যাকে দু’জন মানুষ মিলে যুঝতে হয়
অন্ধ না থাকার প্রতিজ্ঞায়।

আর যদি আবার কোনও ভুল
আমাকে খুঁজে আসে—
যেমন তারা সবসময় আসে,
ধৈর্যশীল, পরিচিত—
আমি দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তাকে বলব,

“খবরদার! আমার জীবনে তোমার অনুপ্রবেশের সুযোগ শেষ হয়ে গেছে, কারণ, আমার
সঠিককে চেনার দায়িত্ব থেকে কিছুতেই পিছু হটবো না আমি আর।”