পুরুষ ভাবে
সে আগুন।
তার ক্ষুধা আছে, তার ঝড় আছে, তার দখল করার প্রবল ইচ্ছা আছে।
সে এগিয়ে আসে ধূমকেতুর মতো, নিজের জ্বলন্ত লেজে রাত্রির আকাশে আঁচড় কাটতে কাটতে।
আর নারী?
সে বসে থাকে একটি নিস্তব্ধ হ্রদের মতো।
দেখতে নিষ্ক্রিয়।
দেখতে স্থির।
দেখতে যেন কিছুই ঘটছে না।
কিন্তু স্থির হ্রদের নীচে পুরো একটি চাঁদ ডুবে আছে।
পুরুষ যা দেখে তা কেবল পৃষ্ঠতল।
নারী যা অনুভব করে তা বহুস্তরবিশিষ্ট মহাবিশ্ব।
একটি স্পর্শ তার ভেতরে কখনও কখনও হাজারটি ঘণ্টাধ্বনি হয়ে বাজে।
একটি দৃষ্টি তার রক্তের ভিতর অসংখ্য প্রজাপতির জন্ম দেয়।
একটি মুহূর্ত তার কাছে একটি সম্পূর্ণ ঋতুচক্র হয়ে উঠতে পারে।
তাই পুরুষ যখন নিজের বিজয়ের হিসেব কষে,
নারী তখন অনুভূতির অদৃশ্য খনিতে আরও গভীর স্তরের সোনা তুলে আনে।
পুরুষের আনন্দ প্রায়ই বজ্রপাতের মতো—
উজ্জ্বল, প্রচণ্ড, কিন্তু সংক্ষিপ্ত।
নারীর আনন্দ অনেক সময় সমুদ্রের জোয়ারের মতো।
ধীরে আসে।
গভীর থেকে আসে।
আর একবার উঠতে শুরু করলে উপকূলের মানচিত্র বদলে দেয়।
পুরুষ ভাবে সে একটি ফুল তুলেছে।
নারী meanwhile সেই ফুলের সুবাস দিয়ে পুরো বাগান অধিকার করে ফেলেছে।
পুরুষ ভাবে সে একটি দরজা খুলেছে।
নারী তখন সেই দরজার ওপারে অসংখ্য গোপন কক্ষ আবিষ্কার করছে।
কারণ নারীর প্রকৃতি কখনও কেবল ঘটনাকে গ্রহণ করা নয়।
সে তাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে।
এক বিন্দু বৃষ্টি পেলে সে তার ভিতরে একটি বর্ষাকাল তৈরি করতে পারে।
একটি ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ পেলে সে তার চারপাশে একটি নক্ষত্রপুঞ্জ গড়ে তুলতে পারে।
তাই অনেক সময়
যাকে বাইরে থেকে নিষ্ক্রিয় বলে মনে হয়,
তার ভিতরেই চলতে থাকে সবচেয়ে বিস্ময়কর ভূমিকম্প।
আর তখন
মহাবিশ্বের গোপন আদালতে একটি রায় নীরবে লেখা হয়—
ভোগের খেলায় শক্তি সবসময় আক্রমণে থাকে না।
কখনও কখনও
সবচেয়ে বড় জয় ঘটে গ্রহণের গভীরতায়।
এবং সেই গভীরতার অন্ধকার সমুদ্রে
নারী প্রায়ই পুরুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি আলো, স্বপ্ন, অনুভব, এবং আনন্দ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।
তাই শেষ পর্যন্ত
পুরুষ হয়তো মনে করে সে জয়ী হয়েছে।
কিন্তু চাঁদ যেমন সমুদ্রকে ছুঁয়েও ছোঁয় না, তবু সমস্ত জোয়ারকে নিয়ন্ত্রণ করে,
তেমনি নারীও তার নিঃশব্দ অনুভবের মহাকর্ষে
অজান্তেই জিতে নেয় খেলার সবচেয়ে গোপন বিজয়।
কারণ ভোগ কেবল দেহের ঘটনা নয়।
ভোগ হলো কতদূর পর্যন্ত তুমি অন্যের অস্তিত্বকে নিজের ভিতরে প্রববেশ করাতে পারলে তার পরিমাপ।
এখানেই শুরু হয় নারীর অদৃশ্য সাম্রাজ্য।
পুরুষ অনেক সময় একটি মুহূর্তকে ভোগ করে।
নারী সেই মুহূর্তের প্রতিধ্বনি বহুদিন ধরে শুনতে পারে।
পুরুষ অনেক সময় একটি শরীরকে স্পর্শ করে।
নারী সেই স্পর্শের চারপাশে একটি সম্পূর্ণ অনুভূতির নগরী নির্মাণ করে।
সেখানে আছে আলোয় ভেজা পথ, স্মৃতির জানালা, কল্পনার বাগান, এবং এমন সব অদৃশ্য সিঁড়ি যেখানে বাস্তবতা ও স্বপ্ন একই পোশাক পরে হাঁটে।
পুরুষ যখন ফিরে যায় তার দৈনন্দিন পৃথিবীতে,
নারী তখনও সেই অভিজ্ঞতার গভীর সাগরে আরও একবার ডুব দেয়।
আরও একবার।
আরও একবার।
প্রতিবারই সেখানে নতুন মুক্তো খুঁজে পায়।
এই কারণেই মহাবিশ্ব নারীর হৃদয়কে কেবল একটি পাত্র বানায়নি।
তাকে বানিয়েছে একটি রসায়নশালা।
যেখানে অনুভূতি নিজের আকারের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
যেখানে একটি স্পর্শ একটি নক্ষত্রে রূপান্তরিত হতে পারে।
যেখানে একটি দীর্ঘশ্বাস একটি পূর্ণিমার জন্ম দিতে পারে।
আর একটি ক্ষণস্থায়ী মিলন কখনও কখনও বহু বছরের নীরবতাকেও অর্থ দিয়ে যেতে পারে।
তাই ভোগের এই অদ্ভুত খেলায়
বিজয়ীর মুকুট সবসময় যার মাথায় দেখা যায় সে-ই বিজয়ী নয়।
অনেক সময়
যে নীরবে চোখ বুজে সমস্ত তরঙ্গকে নিজের ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়,
যে অনুভবকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত নিংড়ে নিতে জানে,
যে একটি ফোঁটা মধু থেকে পুরো একটি বসন্ত তৈরি করতে পারে,
প্রকৃত বিজয় তারই হয়।
আর তখন
সমস্ত নক্ষত্রের ওপরে, সমস্ত শরীরের ওপরে, সমস্ত দাবিদাওয়া ও অহংকারের ওপরে,
একটি চিরন্তন নারীহাসি ভেসে ওঠে মহাশূন্যে—
যেন সৃষ্টি নিজেই বলছে,
“ভোগের খেলায় বিজয় তারই, যে অধিক অধিকার করে নয়, যে অধিক গভীরভাবে অনুভব করে।
কারণ দখল শুধু বাহুর শক্তি জানে,
কিন্তু অনুভব জানে মহাবিশ্বের গভীরতা।
আর যে গভীরতাকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত পান করতে পারে,
শেষ পর্যন্ত ভোগও তারই হয়, বিজয়ও তারই হয়।”
এবং তখন
সমস্ত আগুন, সমস্ত জোয়ার, সমস্ত শরীর, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়
এক মহাজাগতিক সত্যের মধ্যে—
যে গ্রহণের শিল্প জানে, সে-ই শেষ পর্যন্ত সৃষ্টির সবচেয়ে গোপন মধু অধিক পরিমাণে আস্বাদন করে।
আর সেই কারণেই,
এই অনন্ত, অদ্ভুত, স্বপ্নময়, সুররিয়াল ভোগের খেলায়—
নারী প্রায়শই নিঃশব্দেই জিতে যায়।