শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

জাগরণ

তুমি অলস নও—
কোনও দিনই ছিলে না।
তোমার ভেতরে
একটি নদী বহুদিন ধরে থেমে আছে,
শুকিয়ে যায়নি,
শুধু নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে
পাথরের নিচে।

তুমি ছিলে বিশ্রামে—
সুদীর্ঘ, নীরব এক বিশ্রামে—
যেন ঝড়ের আগে সমুদ্র
নিজের ঢেউ গুনে গুনে
শান্ত থাকার অভিনয় করে।
এই বিশ্রাম
কখনও কখনও প্রতারণা।
সে আসে মখমলের পোশাকে,
তোমার কাঁধে হাত রেখে বলে—
“আরেকটু বসে থাকো…
আরেকটু পরে শুরু করো…”
ক্লান্তি
এক চতুর জাদুকরের মতো
তোমার সময়কে
ধীরে ধীরে রুমালের ভিতর লুকিয়ে ফেলে।

কিন্তু তোমার অস্থির ভেতরে
আরেকটি প্রাণী বাস করে—
সে স্থির থাকতে জানে না।
সে ঘোড়া নয়,
সে বাতাস নয়,
সে আগুনের একটি অদৃশ্য প্রাণী—
যে শুধু এগোতে জানে।
তাই আজ
একটি শব্দ উচ্চারণ করো।
না।

না বল বিশ্রামকে—
যে তোমাকে অতিরিক্ত নরম করে তুলেছে।
না বল ক্লান্তিকে—
যে তোমার স্বপ্নের হাঁটুতে
অদৃশ্য শিকল বেঁধে রাখে।
তারপর
নীরবে উঠে দাঁড়াও।
পৃথিবী তখনও জানবে না
একটি জাগরণ শুরু হয়েছে।

প্রথমে হাঁটো।
তোমার পা
ধুলোয় লেখা পুরোনো পথগুলো
আবার পড়তে শিখুক।
হাঁটতে হাঁটতে
তোমার শ্বাস বদলে যাক—
ধীর নদী থেকে
উন্মত্ত স্রোতে।
তারপর
হাঁটা নিজেই আর সন্তুষ্ট থাকবে না।
সে ভেঙে যাবে
দ্রুততর ছন্দে—
পেশীর ভিতর বজ্রপাতের মতো।
আর একসময়
তুমি বুঝতেই পারবে না
কখন হাঁটা বদলে গেছে
এক বিরামহীন দৌড়ে।

পৃথিবী পিছনে সরে যাবে,
দিগন্ত তোমার দিকে এগিয়ে আসবে,
সময় তোমার পায়ের নিচে
একটি উড়ন্ত কার্পেটের মতো খুলে যাবে।
তখন তুমি বুঝবে—
তুমি অলস ছিলে না।
তুমি ছিলে
এক দীর্ঘ প্রস্তুতির ভিতরে,
এক গভীর নিঃশ্বাসের মধ্যে
যেখানে ভবিষ্যৎ
নিজের ফুসফুস ভরছিল।
এবং এখন—
তোমার পদচিহ্নের আগুনে
পৃথিবীর পথগুলো
আবার জেগে উঠছে। 🔥

অবচেতন প্রবৃত্তি

প্রতিটি রাত
যখন তোমার অস্থিগুলো
নরম বালিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে
আর যুক্তির প্রহরীরা
ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে,
তখন তোমার মনের গুহাগুলোর গভীরে
নিঃশব্দে জেগে ওঠে
একটি গোপন বাজার।
সেখানে স্বপ্নেরা জড়ো হয়
ম্লান লণ্ঠনের নিচে দাঁড়ানো বণিকদের মতো—
প্রত্যেকে
ভিন্ন এক ভবিষ্যৎ বিক্রি করতে আসে।

কিছু স্বপ্ন
ক্ষুধার্ত মুখ।
তারা গিলে খায় আরাম,
গিলে খায় করতালি,
সহজ জয়ের মিষ্টি চিনিও
লোভে লোভে চেটে খায়।
তারা ধার করা আনন্দে ভোজ বসায়,
চকচকে বিভ্রান্তিগুলোকে
অবিরাম চিবিয়ে চলে—
ভোগে মোটা,
সৃষ্টিতে শীর্ণ।
এই স্বপ্নেরা ভালোবাসে
নরম চেয়ার,
ভুলে যাওয়ার অলস বিকেল,
আর এমন আয়না
যারা তোমাকে প্রশংসা করে
কোনো পরিশ্রম দাবি না করেই।

কিন্তু কিছু স্বপ্ন
নির্মাতা।
তারা তাদের ফুসফুসে বহন করে
অদৃশ্য নকশা,
তারা নীরবতার পাঁজরে
ছেনি ধার দেয়।
তাদের হাতে মাটির গন্ধ,
তাদের চোখে জ্বলে ধীর আগুন—
যেন ধৈর্য শিখছে এমন তারারা।
তারা পৃথিবীকে ভোগ করে না—
তারা তাকে
নতুন করে গড়ে তোলে।

তাই সতর্ক হয়ে তাকাও
তোমার ঘুমের ঘন্টার সেই গোপন সিনেমায়।
কেমন স্বপ্ন
দেখতে ভালোবাসে তোমার অবচেতন মন?
তারা কি কেবল দর্শক—
মধুর ভ্রমে পেট ভরে খাওয়া
নিষ্ক্রিয় দর্শক?
নাকি তারা স্থপতি—
সন্দেহের নদীগুলোর উপর
অসম্ভব সেতুর নকশা আঁকে?

আর তাদের জিজ্ঞেস করো
আরও কঠিন একটি প্রশ্ন—
তারা কি হাঁটে
তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশে?
তারা কি শ্বাস নেয়
তোমার বিশ্বাসের একই বাতাসে?
তারা কি সোজা দাঁড়ায়
তোমার সততার নির্মল আলোয়?

কারণ স্বপ্ন নির্দোষ নয়।
রাতের পর রাত
তারা অনুশীলন করে
সেই নৃত্যভঙ্গি
যা একদিন তোমার জীবন
বাস্তবে অভিনয় করবে।

ভোগী স্বপ্ন
ধীরে ধীরে আত্মাকে বসতে শেখায়।
সৃজনশীল স্বপ্ন
মেরুদণ্ডকে দাঁড়াতে শেখায়।
সাবধান হও।

অবচেতন মন
এক নীরব লেখক—
যে অদৃশ্য কালি দিয়ে লিখে চলে
নিয়তির পাণ্ডুলিপিতে।
তুমি যদি তার হাতকে
পথ না দেখাও,
সে গল্প শেষ করে ফেলবে
তোমার অনুমতি ছাড়াই।

তাই হয়ে ওঠো
এক সতর্ক প্রহরী।
ঘুমের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াও
সচেতনতার একটি লণ্ঠন হাতে।
লোভী স্বপ্নগুলোকে
হারিয়ে যেতে দাও
ভুলে যাওয়া সকালের কুয়াশায়।
কিন্তু আমন্ত্রণ জানাও
সৃষ্টিশীল স্বপ্নদের—
অস্থির স্থপতিদের,
যারা পকেটে সূর্য নিয়ে হাঁটে।
তাদের খাওয়াও।
তাদের শাসন করো।
তাদের শেখাও
তোমার সর্বোচ্চ সত্তার দিকনির্দেশ।
কারণ একদিন
যখন তোমার জীবনের দীর্ঘ পাণ্ডুলিপি খুলে যাবে,
তুমি দেখবে—
নিয়তি লেখা হয়নি কেবল ভাগ্যের হাতে,
বরং লেখা হয়েছে
সেই স্বপ্নগুলোর দ্বারা
যাদের তুমি বারবার অনুমতি দিয়েছ
তোমার ঘুমের ভেতরে
বিচরণ করতে।