মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

সাধনা

আমার জীবনে একটাই স্বপ্ন—
একদিন তোমার হাত ধরে
উঠে যাব পাহাড়ের সেই চূড়ায়
যেখানে পৃথিবীর সমস্ত শব্দ
নিচে পড়ে থাকবে মৃত শহরের মতো,
আর শুধু বাতাস জানবে
দুটি মানুষের গোপন ইতিহাস।

আমরা হাঁটবো ধীরে—
মেঘের ভেতর দিয়ে,
সূর্যের ক্লান্ত সোনালি রক্ত
পাথরের গায়ে লেগে থাকবে তখনও।

তোমার আঙুলের ভেতরে
আমি অনুভব করবো
এক আদিম নিশ্চয়তা—
যেন বহু জন্ম আগে
এই পথেই আমরা একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম।

তারপর খুঁজে নেবো
একটি নির্জন গাছতলা—
যেখানে সময় থেমে থাকে
ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীর মতো।

আমি বসবো তোমার কোলের উপর
ঠিক যেমন চাঁদ বসে
অন্ধকার পাহাড়ের কাঁধে।

তোমার বুকে কান রাখলে
শুনতে পাবো
শিবের ডমরুর মতো
এক গভীর মহাজাগতিক শব্দ—
যা সৃষ্টি ও ধ্বংসকে
একই নিঃশ্বাসে বহন করে।

তখন পৃথিবী আর পৃথিবী থাকবে না।

চারপাশের বন
ধীরে ধীরে পরিণত হবে
অগ্নিময় কোনও মন্দিরে,
আর আমাদের শরীর
দুটি পৃথক দেহ নয়—
বরং একই আগুনের
দুটি শিখা হয়ে উঠবে।

আমি তোমার পৌরুষের মধ্যে
খুঁজবো না শুধু কামনা—
খুঁজবো মহাবিশ্বের কেন্দ্র,
যেখানে পুরুষ ও নারী
আর আলাদা থাকে না।

আর যখন আনন্দ
ধীরে ধীরে সীমা ভেঙে উঠবে
জলোচ্ছ্বাসের মতো,
তখন মনে হবে
কৈলাসের বরফ গলছে
আমাদের নিশ্বাসের উত্তাপে।

তোমার চোখ বন্ধ হয়ে আসবে।
আমার শরীর কাঁপবে।
আর সেই শীর্ষসুখের শীৎকারে
মনে হবে যেন
স্বয়ং শিব স্নান করছেন
তারকার দুধসাদা আলোয়।

তারপর—

দুজনেই চুপ হয়ে যাবো।

শুধু বাতাস বয়ে যাবে
আমাদের উন্মাদ চুলের ভেতর দিয়ে,
আর পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকবে নীরব সাক্ষীর মতো—
যেন সে জানে,
ভালবাসার সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলো
কখনও পাপ নয়,
বরং মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা
ঈশ্বরেরই ক্ষণিক জাগরণ।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামবে
পাহাড়ের কাঁধ বেয়ে,
যেন কোনও বিশাল নীল জন্তু
তার ক্লান্ত ডানা মুড়ে বসছে
আমাদের চারপাশে।

দূরের উপত্যকাগুলো
ডুবে যাবে কুয়াশার ভিতর,
আর পৃথিবীর সমস্ত শহর
মনে হবে বহু দূরের
অচেনা ভুল।

তুমি তখনও আমাকে ধরে রাখবে
অদ্ভুত এক নীরবতায়—
যেখানে কথার আর কোনও দরকার নেই।

আমার এলোমেলো চুলে
তোমার আঙুল ঘুরবে ধীরে,
যেন তুমি পড়ে নিচ্ছ
কোনও প্রাচীন মন্ত্রের অক্ষর।

আমাদের উষ্ণ শরীরের চারপাশে
ঠান্ডা বাতাস জমাট বাঁধবে,
তবু ভিতরে ভিতরে
জ্বলতে থাকবে এক অদৃশ্য অগ্নিকুণ্ড—
যা কামনার থেকেও পুরোনো,
আর মৃত্যুর থেকেও দীর্ঘজীবী।

আমি তখন তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে
ভাববো—
সম্ভবত মানুষ স্বর্গে যায় না কখনও।

সম্ভবত
মানুষ কেবল কিছু বিরল মুহূর্তে
স্বর্গকে নামিয়ে আনে নিজের শরীরে।

উপরে আকাশে
এক এক করে জেগে উঠবে তারা।

তারা যেন দূরবর্তী দেবতাদের চোখ—
নিঃশব্দে দেখছে
দুটি ক্ষুদ্র প্রাণী
কীভাবে পরস্পরের মধ্যে
অনন্তের দরজা খুঁজে পায়।

তুমি আমার ঠোঁটে চুম্বন রাখবে
এত ধীরে
যেন সময় নিজেই থেমে গেছে
সে স্পর্শের ভেতরে।

আর আমি অনুভব করবো—
এই পাহাড়,
এই গাছ,
এই রাত,
এই কাঁপতে থাকা শরীর,
এই শ্বাস,
এই উন্মাদ সুখ—

সবকিছু মিলিয়ে
এক বিশাল মহাজাগতিক যজ্ঞ চলছে,
যেখানে আমরা দুজনেই
একই সঙ্গে পূজারী, অগ্নি ও আহুতি।

রাত আরও গভীর হবে।

আমাদের নিঃশ্বাস
ধীরে ধীরে এক হয়ে যাবে।

আর দূরে কোথাও
অদৃশ্য কোনও মন্দিরে
ঘণ্টা বাজবে—
যেন শিব নিজেই
হেসে উঠেছেন অন্ধকারের ভিতর,
দুটি প্রেমিক আত্মার
এই গোপন আরাধনা দেখে।