সে আমার ছিল না, আমিও তার না— আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতির সিঁদুর ছিল না, ছিল না ভবিষ্যতের নীলনকশা, ছিল না সমাজের সিলমোহর, এমনকি একে অপরের নামও সম্পূর্ণভাবে উচ্চারণ করা হয়নি কখনও।
তবু দেখা হওয়ার পর থেকে
সে নিঃশব্দে আমাকে অনুসরণ করছিল— যেন সন্ধ্যার পরে একটি গোপন ছায়া রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট বদলাতে বদলাতে কারও ক্লান্ত আত্মাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
প্রথম দিন ভেবেছিলাম কাকতালীয়। দ্বিতীয় দিন মনে হলো সম্ভবত পৃথিবীর পথগুলোই ছোট। তৃতীয় দিন বুঝলাম— না, কিছু কিছু প্রাণ অজান্তেই অন্য প্রাণের চারপাশে মাধ্যাকর্ষণ হয়ে জন্মায়।
সে হাঁটতো দূরে দূরে, কিন্তু তার নীরবতা আমার শ্বাসের খুব কাছে এসে বসতো। কখনও কিছু চাইতো না, কখনও প্রশ্ন করতো না, শুধু এমনভাবে পাশে থাকতো যেন বহু জন্ম আগে আমার সমস্ত একাকীত্বের দায়িত্ব তাকে গোপনে দিয়ে রাখা হয়েছিল।
তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক অপেক্ষার আলো— যেন সে জানতো আমার জীবন একটি ট্রেন, যার কোনো স্টেশনেই স্থায়ীভাবে নামা সম্ভব নয়।
তারপর ফেরার দিন এলো।
বিদায় জানিয়ে বাসে উঠলাম আমি। বাস ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো— লোহার শরীর কেঁপে উঠলো, চাকা ঘুরলো, রাস্তার ধুলো বাতাসে উড়লো, আর পৃথিবী যেন হঠাৎ একটি বিশাল বিচ্ছেদের যন্ত্রে পরিণত হলো।
সে তখনও অনুসরণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। বাসের পাশে পাশে হাঁটছিল কিছুদূর, তারপর দৌড়াতে শুরু করলো— যেন কোনো অসমাপ্ত অনুভূতি সময়ের বিরুদ্ধে আপিল করছে।
আমি পিছন ফিরে তাকাচ্ছিলাম বারবার।
দেখলাম, তার চুল বাতাসে এলোমেলো, চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক— যেন সে কাউকে হারাচ্ছে যে কোনোদিন আর ফিরবে না।
আর তখনই বুঝলাম, সবচেয়ে গভীর সম্পর্কগুলো প্রায়শই নামহীন হয়।
সবচেয়ে তীব্র বিদায়গুলো তাদের সাথেই ঘটে যাদের আমরা কখনও স্পর্শ পর্যন্ত করিনি ঠিকমতো।
কারণ মানুষ শুধু সম্পর্ক দিয়ে ভালোবাসে না— কখনও কখনও দুটি নিঃসঙ্গতা অল্প কয়েকদিনের জন্য একে অপরের মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পায়।
তারপর নিয়তি এসে নিষ্ঠুর কণ্ঠে বলে— “এবার আলাদা হও।”
সে আমার কেউ ছিল না, আমিও তার কেউ না।
তবু কেন বিদায় এত দুঃখের হলো?
কারণ আত্মা মাঝে মাঝে খুব অল্প সময়ের জন্যও আরেকটি আত্মার নিঃসঙ্গতাকে চিনে ফেলে— আর চিনে ফেলার পর বিচ্ছেদ সবসময়ই মৃত্যুর ছোট ভাইয়ের মতো লাগে।