প্রতিটি মানব-জন্ম একে অপরের থেকে পৃথক, সাথে করে আনা সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কারণে । এ জগতে কার্য-কারণের বাইরে কোনও ঘটনার অস্তিত্ব থাকা যেহেতু অসম্ভব, হিন্দু শাস্ত্র-মতে, এই সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কারণকে নির্দেশ করা হয় 'পূর্বজন্ম-অর্জিত ভাগ্য' তথা 'প্রারব্ধ' ব'লে ।
এ বিষয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে । তবে, আপন শারীরিক গঠনে এবং মাতা-পিতার উত্তরাধিকারে, প্রতিটি মানবজন্ম যে একে অপরের থেকে পৃথক, - এ সত্যে তর্কের অবকাশ নেই । এই পার্থক্যকে আমাদের মানুষের ভাগ্য বলে মেনেও নিতে হয়, বাধ্য হয়ে ।
সুখবরটি হলো - ভাগ্য মানবজীবনে একমাত্র চালিকাশক্তি নয় । ক্ষুদ্র হোক অথবা বৃহৎ, মানুষ যখনই কোনও বিশেষ একটি কাজ সম্পূর্ণ করবে ব'লে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হয়, তখনই তার সুপ্ত ইচ্ছা, শক্তির সহযোগ লাভ করে ও তার পুরুষকার, যে কোনও প্রকার বাধাকে অতিক্রম করে, বাস্তবকে পাল্টে দিতে প্রয়াসী হয় । এই পুরুষকার যতদূর অপ্রতিরোধ্যতা অর্জন করে, তার সাফল্যের হার ততোধিক সাক্ষ্য রাখতে সক্ষম হয় বাস্তবের মুহুর্মুহু রণক্ষেত্রে ।
এর কিছু প্রত্যক্ষ নমুনা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার কৈশোরকালেই । অতিরিক্ত পেছন-পাকা হওয়ার কারণে, বাজারে লভ্য যাবতীয় পামিস্ট্রি, নিউমেরোলজি ও অ্যাস্ট্রোলজির বই পড়া হয়ে গেছিল সতেরো বছর বয়সেই । পাকামী করে, অপেক্ষাকৃত বয়সে-বড়দের হাত দেখে ভাগ্য বলে দেওয়ার সুযোগও এসেছিল বেশ কিছু, সেই সুবাদে । আর সেই সুযোগে একটি দুর্লভ সত্যকে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিলাম একদম সামনে থেকে । সে হলো "এমন কিছু হাত, যেখানে ভাগ্য-রেখা দূর্বল অথবা নেই বললেই চলে, অথচ তেমন হাতের অধিকারী মানুষটি আপন কর্মজীবনে দূর্দান্ত সফল, কী শিক্ষার ক্ষেত্রে, কী উপার্জনের নিরিখে ।"
তাহলে, সত্য এক্ষেত্রে যে যে রূপে প্রতিভাত হলো, সে হলো -
১) ভাগ্য একটি গর্ভ মাত্র, যা সুস্বাস্থ্য অথবা কুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারে, কিন্তু পুরুষকার-প্রদত্ত কর্মের বীজটি রোপিত না হওয়া অবধি সে সুসন্তান-হীন বা নেহাৎই বাঁজা, অনিয়ন্ত্রিত ও বৈশ্যপ্রবণ ।
২) পুরুষকারের অভাবে, দুর্বল "আরব্ধ" হওয়ার কারণে, মানুষ, দুর্ভাগ্য তথা অনিয়ন্ত্রিত 'প্রারব্ধের' অসহায় শিকার হয়ে থাকে, জীবনের পদে পদে ।
৩) পুরুষকারের স্থান ভাগ্যের ঊর্ধ্বে, কারণ ভাগ্য পুরুষকারের বশ, কিন্তু তেজোদৃপ্ত পুরুষকার ভাগ্যের বশ কদাপি নয় ।
৪) "যে শুইয়া থাকে, তাহার ভাগ্যও শুইয়া থাকে ।"
৫) ইচ্ছা দুই প্রকারের, স্থিতিশীল ও গতিশীল ।
স্থিতিশীল ইচ্ছা হলো সে, যে ইচ্ছা মূলতঃ সক্রিয় হয় পরিস্থিতির ধাক্কায়, তা ছাড়া চট করে নড়ে না ।
গতিশীল ইচ্ছা হলো সে, যে ইচ্ছা নির্দিষ্ট কর্মে স্থিরলক্ষ্য এবং যার অগ্রগতির অপ্রতিরোধ্যতার কাছে সব বাধাকে একে একে হার মানতে হয় । এমন গতিশীল ইচ্ছাকে নিজেকে অবশ্যই বেঁধে রাখতে হয় প্রখর পার্থিব বাস্তবে, কার্য-কারণ তত্ত্বের আপোষহীন পরিসরে । আধ্যাত্মবাদের পরাবাস্তবের সাথে যোগাযোগ রাখার বা অপেক্ষায় থাকার দায় অথবা প্রয়োজন পড়ে না যার ।
গতিশীল ইচ্ছার অধিকারীকে হিন্দুধর্মে যদিও কর্মযোগী বলে বহুযুগ আগে থেকে, তবে, বর্তমানের বাস্তবে প্রত্যক্ষে, কর্মযোগের প্রকৃত চর্চা ও কর্মযোগীদের সামগ্রিক আধিপত্য, ভারতবর্ষের তুলনায় ইয়োরোপ, অ্যামেরিকা, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি বহু দেশে প্রভূতরূপে অধিক ও সফল
এবং এটাই আধ্যাত্মবাদের অলীক সংস্কারে ও আবেগে, ভাববাদে-ভ্রমিত ভারতবর্ষের তুলনামূলক দৈন্য ও দূর্দশার অন্তর্নিহিত কারণ ।