ভবিষ্যৎ তাদের নয়
যারা জন্মগত প্রতিভার দীপ্তিতে
মুঠো ভরে নক্ষত্র কুড়িয়ে আনে
আর তাদের করতালিতে মত্ত হয়ে ওঠে।
ভবিষ্যৎ তাদেরও নয়
যারা সৌভাগ্যের অদৃশ্য হাত ধরে
হঠাৎ একদিন খুঁজে পায়
ঘুমন্ত কোনো রাজ্যের গোপন দ্বার।
না—
ভবিষ্যৎ তাদের,
যারা ফিরে আসে।
বারবার।
আবার।
আরও একবার।
যেন চাঁদ,
যে তার রুপালি ক্ষত বয়ে নিয়ে
অন্ধকার সময়ের সমুদ্র পেরিয়ে যায়,
কখনো জিজ্ঞেস করে না—
কেউ তাকে দেখছে কি না।
একদিন আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম
এক অদ্ভুত নগরী।
সেখানে প্রতিভা ছিল
বিদ্যুতের পোশাক পরা এক রাজপুত্র,
তার চোখে জ্বলত উল্কার আগুন।
আর সৌভাগ্য—
এক উন্মত্ত বিদূষক,
খালি পায়ে নাচতে নাচতে
আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছিল
সোনালি মাছ,
হেসে উড়িয়ে দিচ্ছিল
মহাকর্ষের সমস্ত নিয়ম।
মানুষ তাদের পূজা করত।
ভবিষ্যদ্বাণী আর প্রশংসা দিয়ে
তাদের জন্য গড়ে তুলত
মহিমান্বিত গির্জা।
কিন্তু শতাব্দী পেরিয়ে,
সেই গির্জাগুলো পরিত্যক্ত হয়ে গেল।
জানালায় জমল ধুলো,
দেয়ালে জড়িয়ে ধরল লতা।
আর বাতাস ফিসফিস করে বলল—
"তারা এসেছিল দারুণ দীপ্তি নিয়ে,
কিন্তু তারা টিকে থাকেনি।"
তারপর,
অনন্তের প্রান্তদেশ থেকে
এসে দাঁড়াল এক নামহীন মানুষ।
তার মাথায় কোনো মুকুট নেই।
তার হাতে কোনো অলৌকিক শক্তি নেই।
আছে শুধু—
পদচিহ্ন।
ধীর।
স্থির।
অবিচল।
নক্ষত্রেরা তাকে উপেক্ষা করল।
বাতাস তাকে বিদ্রূপ করল।
এমনকি সময়ও
তাকে দেখে হেসে উঠল।
তবু সে
প্রতিদিন
আরও একটি ইট বসাল
এক অদৃশ্য সেতুর গায়ে,
যে সেতু
অতল শূন্যতার উপর দিয়ে
দূরে কোথাও এগিয়ে যাচ্ছে।
ঝড় যখন তা ভেঙে দিল—
সে আবার গড়ল।
সমুদ্র যখন তা গ্রাস করল—
সে আবার গড়ল।
নিজের হৃদয় যখন
নিজেকেই বিশ্বাসঘাতকতা করল—
তখনও
সে আবার গড়ল।
বছর কেটে গেল।
তার পদচিহ্ন
রাস্তা হয়ে উঠল।
রাস্তা
নদী হয়ে গেল।
নদী
সভ্যতার জন্ম দিল।
আর একদিন ভোরবেলায়,
ভবিষ্যৎ নিজেই—
যার ডানা গড়া
অজাত দিনের আলো দিয়ে,
সে এসে
নতজানু হলো
সেই সাধারণ মানুষের সামনে।
কারণ সে অসাধারণ ছিল না।
বরং
সে অনন্তকে শিখিয়ে দিয়েছিল
সবচেয়ে ভয়ংকর জাদু—
চলতে থাকা,
যখন প্রতিভা ম্লান হয়ে যায়।
চলতে থাকা,
যখন সৌভাগ্য মুখ ফিরিয়ে নেয়।
চলতে থাকা,
যখন নিজের আত্মাটাও
এক পরিত্যক্ত বাড়ির মতো
নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
কারণ প্রতিভা
একটি ফুল—
অপূর্ব,
কিন্তু ঋতুর হাতে বন্দী।
সৌভাগ্য
একটি প্রজাপতি—
মোহময়,
কিন্তু চিরকাল অধরা।
আর অবিচলতা—
অবিচলতা হলো
এক বিশাল বৃক্ষ,
যার শিকড়
ব্যর্থতার অস্থি থেকে
রস টেনে নেয়,
যার কাণ্ডে
ঝড়ের নখর কেবল
আরও গভীর ইতিহাস লিখে যায়।
আর যার শাখাগুলো
উঁচুতে উঠতেই থাকে,
এমনকি
যখন শীত ঘোষণা করে—
সবকিছু শেষ।
আর মহাবিশ্বের সেই প্রান্তে,
যেখানে আগামীকাল
পুনরাবৃত্তির অগ্নিকুণ্ডে
গড়ে তোলা হয়,
সেখানে
নীরব অধ্যবসায়ীরা
নতুন নতুন পৃথিবী নির্মাণ করছে।
তারা সবচেয়ে প্রতিভাবান নয়।
তারা সবচেয়ে সৌভাগ্যবানও নয়।
তারা শুধু—
জেগে ওঠে,
কাজ করে,
স্বপ্ন দেখে,
আবার ফিরে আসে।
এভাবেই,
একদিন
নিয়তিও ভুলে যায়—
তারা কোনোদিন
সাধারণ ছিল।