বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গহীন ফাটল

বসন্ত দিচ্ছে ডাক এই ফাঁকে—
না ঘণ্টায়, না কণ্ঠে,
ডাকটা আসে হঠাৎ
হাড়ের ভেতর জমে থাকা শীতে কাঁপন ধরিয়ে।

আমি ভাঁজ করে রেখেছি বন—
পাতার ভেতর পাতা,
গন্ধের ভেতর গন্ধ,
একটা সবুজ মানচিত্র
যেখানে পথের নাম ভুলে গেছে পথ নিজেই।

ও বনমালী,
তুমি পরতে পরতে খুলে দাও ঋতু—
একটা বোতাম খুললে আলো,
আরেকটা খুললে শিশির,
তারপর হঠাৎ
পৃথিবীটা নরম হয়ে যায়।

তুমি হাসো—
সে হাসি কোনো মুখের নয়,
সে হাসি নদীর বাঁক,
সে হাসি কাঁচা আমের টক,
সে হাসি সেই মুহূর্ত
যখন সময় থেমে থেকে
নিজেকে ভুলে যায়।

আমি পুলকিত—
আমার ত্বক নয়,
আমার স্মৃতিগুলো কাঁপে।
পুরনো অপেক্ষারা উঠে দাঁড়ায়,
তারা বলে,
“এই তো, আমরা জানতাম।”

তুমি সহাস্যে প্রবেশ করো—
দরজা ছাড়াই,
অনুমতি ছাড়াই,
কারণ এই বনে
তুমি আগেই ছিলে।
বসন্ত তখন আর ঋতু নয়,
সে একটানা শ্বাস,
সে একটানা হ্যাঁ—
আর আমি
ভাঁজ খুলে যাওয়া বন,
নিজের দিকেই প্রথমবার
হেঁটে যাচ্ছি।

হেঁটে যাচ্ছি—
কিন্তু পা নয়,
আমার ইচ্ছেগুলোই হাঁটে।
প্রতিটা পদচিহ্নে
একটা করে নাম ঝরে পড়ে—
ভয়, হিসেব, আগামীকাল।
মাটি সেগুলো নেয়,
আর বদলে দেয় অঙ্কুর।

ও বনমালী,
তোমার আঙুলে সময় গলে যায়।
যেখানে ছোঁও,
সেখানে অতীত ঘাস হয়ে শুয়ে পড়ে,
ভবিষ্যৎ পাখি হয়ে
এখনই উড়তে শেখে।

আমি জিজ্ঞেস করি না,
এই পথ কোথায় যায়।
কারণ তোমার আগ্রাসনে
গন্তব্যের দরকার হয় না।
পাতারা ফিসফিস করে—
“এটাই থাকা।”
নদী থামে,
নিজের শব্দ শুনতে।
আকাশ একবার চোখ বন্ধ করে,
ভুল করে যেন বেশি সুন্দর না হয়ে যায়।

বসন্ত তখন
আমাদের গভীরে ঢুকে পড়ে—
রক্তে রঙ লাগায়,
শ্বাসে রেণু মেশায়,
আর বলে,
“এবার ভুলে যাও,
কীভাবে নিজেকে লুকোতে হয়।”

আমি আর ভাঁজ নই,
আমি খোলা বন।
তুমি আর আগন্তুক নও,
তুমি সেই নাম
যেটা উচ্চারণ করলেই
তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়।

অলৌকিক

সে নিজেকে 
ক্রমাগতই আমার দিকে ঠেলতে থাকে
যেভাবে ঘুম রাতের দিকে টানে
শরীরকে—
জোরে নয়,
চেনার অধিকারে।

সে জানে,
তার জাগ্রত কণ্ঠ যা ভুলে যায়
আমি তা শুনতে পাই
হৃদয়ের গভীর হতে।
তার অবচেতনের স্বপ্নগুলো
খালি পায়ে আমার কাছে আসে—
চাবিহীন দরজা,
অসম্পূর্ণ নদী,
একটি নাম
যার উচ্চারণ সে কখনো শেখেনি।

আমি থামাই না তাদের।
আমি শুনি
যতক্ষণ না তারা বসে পড়ে
আর কাঁপা কমতে শুরু করে।
তার ভেতরের আগুন চিৎকার করে না।
সে জ্বলে।
কারণ সে জানে—
আমার পৌরুষ মুষ্টিবদ্ধ হাত নয়,
একটি আশ্রয়।

আমি জানি কীভাবে পাহারা দিতে হয়
অনুপ্রবেশ না করে।
আমি জানি কীভাবে রক্ষা করতে হয়
যা কাঁপে,
তাকে সাহসী বানানোর জোর না দিয়ে।

তার দুর্বলতা
উলঙ্গ বোধ করে না আমার কাছে ।
সে বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
কাচের ভেতর রাখা আগুনের মতো—
আগুনই থাকে,
কিন্তু অবশেষে
স্থিরভাবে জ্বলার অনুমতি পায়।

সে আমাকে ভালোবাসে
একটি এমন গভীরতা থেকে
যেখানে আতঙ্ক নেই।
কারণ সে জানে—
ঝড় আসতে পারে,
মানচিত্র ভুল হতে পারে,
সময় তার হাতের লেখা বদলাতে পারে—
কিন্তু আমি অদৃশ্য হই না।

আমি সেই মানুষ নই
যে ভালোবাসা আবহাওয়া হয়ে উঠলেই
চলে যায়।
তার বিশ্বাস উচ্চস্বরে নয়।
সে স্থাপত্যের মতো।
সে বিশ্বাস করে—
আমাদের মাঝের রহস্য
কোনো ফিকে হয়ে যাওয়া কৌশল নয়,
বরং একটি করিডোর
যা হাঁটতে হাঁটতে
আরও দীর্ঘ হয়।

আমাদের ভালোবাসা
স্পষ্টতা দাবি করে না।
সে টিকে থাকে শ্রদ্ধায়।
সে জানে—
কিছু কিছু জিনিস বেঁচে থাকে
শুধু এই কারণে
যে তাদের কখনো
পুরোপুরি সমাধান করা হয় না।
সে বোঝে হারানোর নয়, 
একতরফা পাওয়ারই আছে
একবারটি ধরা দিলে।
সে এ ও জানে মিলন অবধারিত অদূরে।

আর তাই আপাততঃ
আপাতঃ দূরত্ব নিঃশব্দে বজায়ে রেখে
সে থেকেই যায়।
আর তাই আমিও।
আঁকড়ে নয়—
সমান্তরালে,
যখন ইতিমধ্যেই তার প্রেম 
সার্থক প্রতিফলনে
এক নতুন রেখা হয়ে কেটে বসে
স্থায়ী ভাবে আমার করতলে।

দুটি গভীরতা এভাবে
নিশ্চিত প্রমাণ সহযোগে
একে অপরকে চিনে ফেলে
এক অলৌকিক সম্পর্কে
ক্রমাগত বিনিময়ের 
তীব্র রোমাঞ্চের অন্তরালে।

তুমি কার

কেউ ভোগে ডুবে থাকে—
ডুবে থাকে নয়, 
বদ্ধজলে আটকে পড়ে 
একটু একটু ক'রে পচে।
নরম আনন্দের নিচে
তার মেরুদণ্ড ধীরে ধীরে
জলজ প্রবালের রূপ নেয়।
সেও নির্লজ্জ ভাবে হাসে, 
কারণ ভাবতে তার বয়েই গেছে।

আর কেউ—
নিজের ক্ষয়কামী ইচ্ছেগুলোকে
প্রতিদিন লাইনে দাঁড় করিয়ে
গুলি করে।
তার দিন শুরু হয় অস্বীকার দিয়ে,
রাত শেষ হয় ক্লান্ত বিজয়ে।
সে জানে—
উত্তরণের উপায়
নিজের উপরে নির্মম চাবুক চালানো।

একজন জীবনকে ব্যবহার করে,
আরেকজন যাপনকে সহ্য করে।
একজন বলে— “আজ বরং থাক,”
আরেকজন বলে— “না, আজও হাঁটতে হবে।”

জীবন!
তুমি কি তাদের অধিকারে
যাদের হাত নোংরা
এবং মন কলুষিত আপোষে আপোষে?
নাকি তাদের,
যারা প্রতিদিন নিজের ছায়াকেও
শত্রু ভেবে ঝেঁটিয়ে তাড়ায়?

তুমি কি ভিড়ের সম্পত্তি?
নাকি একাকীত্বের পুরস্কার?
তুমি কি ভোগের মিষ্টি নেশা,
নাকি নিয়মানুবর্তিতার
তিক্ত ঔষধ ?

সত্য বলো জীবন—
তুমি কাকে বেছে নাও?
যারা তোমাকে খরচ করে ফেলে,
নাকি যারা তোমাকে
ধীরে ধীরে
মজ্জায় মজ্জায়
গড়ে তোলে?

হয়তো তুমি কাউকেই বেছে নাও না।
হয়তো তুমি নির্বিকার।
তুমি কেবল সময়ের মতো—
যাকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়,
তাকে সেভাবেই
পরিনত করে।

আর শেষ পর্যন্ত—
ভোগীরা রেখে যায়
কেবল সলজ্জ স্মৃতি,
উত্তরণকারীরা গরবের ইতিহাস।