বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬

পশ্চাতে

ক্ষণিক এই জীবনের মানে
নারী-পুরুষের শরীরে আলাদা আলাদা করে লেখা নয়—
একই কালি,
একই ভঙ্গুর কাগজে
সময় তার দাঁত বসিয়ে রাখে।

মানুষ প্রায়শই বোঝে না—
জীবন আসলে হাঁটে না,
সে পিছলে যায়।
প্রতিটি সকাল
একটা সাবানের ফেনা,
হাতে ধরলেই
মুহূর্তে উধাও।

নারী ভাবে—
চুলে সময়ের ধুলো পড়ে,
পুরুষ ভাবে—
কাঁধে পড়ে দায়িত্বের ভার।
কিন্তু ঘড়ি কারও লিঙ্গ চেনে না,
সে শুধু কেটে নেয়—
নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে।

শৈশব একদিন
খেলনার বাক্সে নিজেই ঢুকে পড়ে,
যৌবন দাঁড়িয়ে থাকে
আয়নার সামনে—
নিজেকে বিশ্বাস করতে করতে
হঠাৎ বুড়িয়ে যায়।

আমরা বলি, “পরে হবে,”
“আরো সময় আছে,”
এই বাক্যগুলোই
সময়ের প্রিয় খাবার।
সে খেয়ে নেয় আমাদের আগামীকাল,
আর বদলে দেয়
একটা ক্লান্ত আজ।

এই ক্ষণস্থায়ী জীবন
কোনো লিঙ্গের প্রতি পক্ষপাতী নয়—
সে সবার পায়ের নিচে
একই রকম পিচ্ছিল।
তবু মানুষ বোঝে না,
জীবন সততই পলায়নপর—
সে থামে না,
সে ধরা দেয় না,
সে শুধু ফসকে পড়ে
আমাদের আত্মবিশ্বাসের ফাঁক দিয়ে।
ফাঁক দিয়ে
সে নেমে যায় অদৃশ্য সিঁড়িতে,
যেখানে কোনো হাতল নেই,
কোনো ফিরে তাকানোর সুযোগও না।

মানুষ তখনো তর্ক করে—
কে বেশি পেয়েছে,
কে কম হেরেছে,
নারী না পুরুষ,
শক্তি না সৌন্দর্য—
অথচ সময় ইতিমধ্যেই
খেলা গুটিয়ে নিয়েছে।

জীবন আমাদের অনুমতির অপেক্ষা করে না।
সে আসে না ঘোষণা দিয়ে,
সে যায় না বিদায় জানিয়ে।
হঠাৎ এক বিকেলে
শ্বাস একটু ভারী লাগে,
সূর্যটা অকারণে নরম হয়ে আসে,
আর আমরা বুঝি—
কিছু একটা চুপিচুপি শেষ হয়ে গেছে।

তখন আয়নায় দাঁড়িয়ে
নিজেকে প্রশ্ন করি—
আমি কি বেঁচেছিলাম,
নাকি শুধু টিকে ছিলাম?

এই ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বে
ভালবাসা দিয়েছিলাম তো,
নাকি হিসাব মিলিয়েই
সময় কাটিয়ে দিয়েছিলাম?

জীবন তখন হেসে ওঠে—
নিষ্ঠুর নয়,
কেবল নির্লিপ্ত।
সে বলে,
“আমি তো সব সময়ই বলেছি—
আমি ক্ষণস্থায়ী।
তোমরাই ভেবেছিলে
আমি চিরস্থায়ী কোনো অজুহাত।”

আর শেষে
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে
আমরা সবাই দাঁড়িয়ে থাকি
একই প্রান্তে—
খালি হাতে,
খোলা চোখে,
এই উপলব্ধি নিয়ে
যে জীবন আসলে
কখনোই আমাদের ছিল না—
আমরাই ছিলাম
তার ক্ষণিকের অতিথি।
অতিথি হয়ে এসে
আমরা ঘর সাজাতে চেয়েছিলাম,
দেয়ালে নাম লিখে
স্থায়িত্বের ভান ধরেছিলাম।
কিন্তু জীবন তো হোটেলের ঘর—
চাবি বদলায় প্রতিদিন,
পরিচারিকা এসে মুছে দেয়
আমাদের উপস্থিতির চিহ্ন।

শেষ পর্যন্ত
কিছুই সঙ্গে যায় না—
না লিঙ্গের অহংকার,
না সাফল্যের পদক,
না অপূর্ণ অভিযোগ।
যায় শুধু
যে মুহূর্তগুলো আমরা সত্যিই ছিলাম—
যেখানে হাসি মিথ্যে ছিল না,
ভালবাসা দরকষাকষি শেখেনি,
আর নীরবতা ভয় পায়নি।

তখন বোঝা যায়—
জীবন কখনো আমাদের শত্রু ছিল না,
আমরাই তাকে ভুল বুঝেছি।
তার ক্ষণস্থায়িত্ব ছিল
একটা দয়া,
যাতে আমরা দেরি না করি
ভালবাসতে,
ক্ষমা করতে,
নিজের দিকে ফিরে তাকাতে।

শুনতে ভালো না লাগলেও,
এই জন্যই 
প্রেম ও জীবন আসলে 
সুযোগ খোঁজে মানুষের পোদে—
পলায়নপর হয়,
ক্ষণস্থায়ী ও অস্থির হয়—
যাতে আমরা ঘুমিয়ে না পড়ি
মিথ্যে স্থায়িত্বের কোলে।
যাতে প্রতিটি মুহূর্ত
আগুনের মতো জ্বলে ওঠে
হাতের ভেতর।
আর যখন সব শেষ,
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে
আমরা হালকা হয়ে যাই—
সময়ের কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখি
নিজেদের ভার।

তখন জীবন
শেষবারের মতো ফিসফিস করে—
“আমি ক্ষণিক ছিলাম ঠিকই,
কিন্তু যদি আমাকে বুঝে থাকো,
আমি যথেষ্ট ছিলাম।”

কোন মন্তব্য নেই: