সোমবার, ১ নভেম্বর, ২০২১

রোধ

কাল না একটা কাণ্ড করেছি ! 
.
হাসান কাকু গত বছর বাবাকে যে মোটা ডাইরিটা দিয়েছিল, বাবা, এতদিন হল, তার মধ্যে একটা শব্দও লেখেনি ! আচ্ছা, ডাইরিটার বুঝি কষ্ট হয় না, কেউ সারাদিনে একবারও তার দিকে মনযোগ না দিলে ? আমি না, তাই ওকে নিয়ে চলে এসেছি আমার বইয়ের তাকে ! বাবা তো খেয়ালও করে না ! আর আমিও তো এখন ক্লাস সিক্স এ ! দ্যাখ, সব কথা এখন কেমন নিজে লিখতে পারি !
.
আমি তো জানি, আমি আগে পেনসিল নিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে শুরু করলেই তুই যেমন এক লাফে আমার পাশে এসে দাঁড়াতি, এখনও তেমনই করবি ! ব্যাস ! তাহলেই আমি আবার যখন যা মনে আসবে - বলতে পারব তোকে !
.
গত বছর মা যখন মরে গেল, আমার না কান্না পায় নি ! সবাই বলছিল প্রেশার বেশি ছিল বলে এত অল্প বয়েসে হার্টফেল করে গেল ! আমি ভাবছিলাম যতবারই নিয়ে যাক না কেন, যেখানেই হোক, সেরে গেলে আবার ঠিক ফেরৎ দিয়ে যাবে ! বাবা কিন্তু খুব কেঁদেছিল শ্মশান থেকে আসার পরে ! আমাকে নিয়ে যায় নি ! তবে শ্রাদ্ধের আগের দিন ন্যাড়া করে দিয়েছিল - আমাকে !
.
তার কয়েক দিন পরে ফারুক কাকু, পরেশ কাকু আর মদন কাকু সন্ধ্যাবেলা বাবাকে বড় ঘরে নিয়ে গিয়ে, অনেক ক্ষণ ধরে কী যেন বোঝালো ! বার বার আমার নাম করছিল, - এটা শুনতে পেয়েছিলাম ছোট ঘর থেকে ! আর তার দুই মাস পরে বাবা একদিন, আচমকা আমাকে না বলেই, সেই, আমাদের দূর সম্পর্কের সন্ধ্যা মাসিকে সাথে করে নিয়ে এলো সন্ধ্যাবেলা ! সন্ধ্যা মাসির মাথায় দেখি মায়ের মত সিঁদুর ! তারপর থেকে সন্ধ্যা মাসি আমাদের সাথেই থাকে !
.
সুহাসিনী জ্যেঠিমা আমার বালিশটা ছোটঘরের তক্তায় এনে ফেলে আমাকে বলেছিল, - "প্রতীক, সোনা বাবা আমার ! তুমি তো বড় হয়ে গেছ এখন ! আরও বড় হতে গেলে আর মা বাবার সাথে শুতে নেই !  তুমি এখন থেকে এই ঘরে শোবে !"
.
তখন থেকে আমি ছোট ঘরে শুই - একা ! তাই কত সুবিধা হয়েছে দেখ, সবাই ঘুমাচ্ছে আর আমি এখন কি করছি !

তোকে না, চুপি চুপি একটা কথা বলি ! আমি তার দুদিন পরে, খুব ভোরে, একটু আলো ফুটতে, লুকিয়ে লুকিয়ে বড় ঘরে গেছিলাম ! মায়ের বালিশে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিল সন্ধ্যা মাসি ! মুখটা, কেমন যেন হাসি হাসি !
.
আমার তখন মায়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রে ! খুউব ! আমি তারপরেই মায়ের নতুন ছবিটাতে, চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে, অনেকবার বলেছি, "মা তুমি কেঁদো না, একদম কষ্ট পেয়ো না ! কেমন ! আজ থেকে আমি আমার বালিশের দেওয়ালের দিকের অর্ধেক টা তে শোব ৷ আমার ওতেই হয়ে যাবে ৷ বাইরের দিকের অর্ধেকটাতে তুমি মাথা রেখে শুয়ো ! আর, এখন থেকে আমার কাছে ছোটো ঘরেই থেকো ! যারা বেশি কাঁদে তারা বোধহয় পারেও - তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে !"
.
তারপর মুস্কিলও হয়েছিল একটা ! মাঝে মাঝেই, কেউ না কেউ খপ করে ধরে ফেলে - আমাকে ৷ তারপর চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করে আমি সন্ধ্যা মাসিকে মা বলে ডাকি কিনা ! আমাকে তখন কোনও রকমে ওদের হাত ছাড়িয়ে পালাতে হয় !
.
ওরাও কিছুতেই ছাড়তে চায় না আমাকে ৷ আচ্ছা তুই-ই বল কেমন বোকা ওরা ! আমি নিজের মাকে নিজেই আরও কষ্ট দিতে পারি ? মা কখন, কেন কষ্ট পায় - সেটা ওরা কেন যে একজনও বোঝে না ?
.
সেদিন অবশ্য আমিও বুঝতে পারি নি কিছু - রাতের অন্ধকারে ! খালি সবাই যখন "কি হয়েছিল বল ! কি হয়েছিল বল !" - বলে, বার বার, জোর করছিল - বাবাকে, তখন বাবা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে তাকাতে বলেছিল - বাবার মুখের ভিতরে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে রেখে, ওরা প্রথমে মা আর তোর হাত দুটো পিছমোড়া করে বেঁধে দিয়েছিল ৷ তারপর তোদের মুখে আর চোখে ডাক্তার বাবুদের চিটিং প্লাস্টার আটকে দিয়েছিল ! তারপর একটা বোরখা বের করে পরিয়ে দিয়ে, ওদের একজন তোকে কাঁধে তুলে নিতেই সবাই একসাথে চলে গেছিল !
.
সবাই যখন মায়ের হাতের বাঁধন খুলে, চিটিং প্লাষ্টারগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলল মুখ আর চোখ থেকে, তখন মায়ের দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে - সে কী কান্না ! কেউ থামাতেই পারছিল না ! মা খালি বলছিল - " চোদ্দ বছরের মেয়েটাকে ওরা কী কষ্টই না দেবে ! মেয়েটা খালি গোঙাবে আর মা মা বলে ডাকবে ! আর তাতে সবার আরও নেশা বেড়ে যাবে ! কেউ একটুও বাঁচাতে তো আসবেই না ! বরং কাঁদলেই ওরা আরও মারধোর করবে ! কোথায় কোথায় নরম জায়গাগুলোতে, খুঁজে খুঁজে, জোরে জোরে মারবে ! খামচে রক্ত বের করবে, - যার যেমন ইচ্ছা ! কী অত্যাচারই না করবে ! মেয়েটা হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাবে - যন্ত্রণায় ! তবুও ছাড়বে না ওরা, তারপরও, অচেতন শরীরটাকে ! কতগুণ বেশি নিষ্ঠুর হতে পারে মানুষ - হায়নার থেকে !
.
আমি কি করব এখন ? কত ভরসা করত মাকে ! কত শ্রদ্ধা করত বাবাকে ! কী ভালটাই না বাসত সবাইকে ! কী পেল করে ? আসলামের বৌটা কবেই বলেছিল - দিদি, বাঁচতে চাও তো পলায়ে যাও এ দ্যাশ ছেড়ে ! সুখের মায়ায় পড়ে তখন কান দিই নি সুপরামর্শে ! হায় ! কী পাপের পাপী ! এখন পারলাম না বাঁচাতে ফুলের মত সন্তানটারে !"
.
আমি না, এখন বড় হয়ে গেছি, জানিস ! অনেকটা বেশি ! অনেক নতুন নতুন কায়দা করতে পারি ! যেমন, ইস্কুলের পম্পা দিদিমনি কাল বলছিল, - স্বামী বিবেকানন্দ নাকি দেওয়ালে একটা পেন্সিলের ফোঁটা দিয়ে, তার দিকে তাকিয়ে ধ্যান করতেন ! ব্যাস, আমিও বাড়িতে ফিরে ছোটঘরে এসে, সুইচ বোর্ডের ঠিক পাশে চুনকামের যে সরু লম্বা লম্বা নীল দাগগুলো ছিল, ওগুলোতে নজরে পড়তেই, দেখতে পেলাম -  তোর চুলগুলো যেন ! তারপরই ব্যাস ! বিবেকানন্দের মত বেশ কিছুক্ষণ সোজা তাকিয়ে থাকতেই, একটু একটু করে দেখতে পেলাম চুলের নীচে কপাল ! তার নীচে - তোর চোখদুটো, নাক, ঠোঁট, থুতনি - তোর মুখের সবটা ! আর আমি পুরোটা চিনতে পেরেছি যেই, ওমনি, তোর মুখে সেই - খুব মিষ্টি হাসিটাও ! 
.
তারপর থেকে কতবার দেখেছি ! পরশু, সন্ধ্যামাসি দানাদার কিনে নিয়ে এসেছিল অনেকগুলো ! আমি আজ সকালে ফ্রিজ খুলে দেখে এসেছি - দুটো দানাদার এখনও পড়ে আছে প্যাকেটে ! আর, সেই জন্যই তো বলছি - একটা কাজ করবি ? না ! তোকে তেমন কিচ্ছুটি করতে হবে না ! সব আমিই করব, শুনেই দ্যাখ ! অতটাও ছোট নেই এখন !
.
চান করে নিয়েছি আজ কাউকে না বলে, ভোর হওয়ার আগেই ! সন্ধ্যামাসির সকালের পূজো হয়ে যাওয়ার পরে, চুপিচুপি বাতাসা নকুলদানা দেওয়ার ঠাকুরের ছোট্ট থালাটা গেঞ্জির মধ্যে লুকিয়ে এনে, তাতে, ফ্রিজ থেকে দানাদার দুটো দিয়ে, - তোর পাশে, পড়ার টেবিলে রাখব ! আর চট করে তুলে আনব কয়েকটা দুব্বো ঘাস - বাগান থেকে ! 
.
এরপর, পাশে, আশুতোষদের বাড়িতে আশুতোষের দিদি যখন ভাইফোঁটা দেবে, তখন ওদের মা শাঁখ তো বাজাবেই ! আর যেই না বাজাবে, ওমনি আমি চট করে আমার কপালটা নিয়ে এসে আলতো করে ঠেকাব দেওয়ালে -ওই খানে, যেখানে হাসছিস তুই ! ব্যাস, তখন তোর তিন বার ফোঁটা দিয়ে দিতে আর কী অসুবিধা থাকবে - বল ! দ্যাখ, বড়দের মত বুদ্ধি হয় নি ?
.
আর একটা কথা আছে ! বলি ? তুই আমাকে ফোঁটা দেওয়ার পরে অনেকক্ষণ যে আলতো করে ধরে থাকতিস, তখন আমার কি মনে হত জানিস ? সেটা তোকে কখনও বলি নি কিন্তু ! 
.
মনে হত - দুটো ইয়াব্বড় ডানা তুই কাউকে জানতে না দিয়ে লুকিয়ে রাখিস পিঠে ! আমাকে ফোঁটা দেওয়ার পরে যখন অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকিস, একমাত্র তখনই - আসলে, তুই সত্যি সত্যি পরী হয়ে যাস ! কত কত দূরের আকাশে ঘুরিয়ে নিয়ে আসিস - আমাকে ! আর আমার কী দারুণ লাগে রে, - তখন !
.
এই দিদি ! বল না ! তোর তো মনে আছে ! ধরবি ? আমাকে আজকে আবার অমন করে জড়িয়ে ? শুধু একবার ! ব্যাস ! তাহলেই হবে !
.
আমার খুব ইচ্ছে করে !
.
01.01.2016