সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

অবাঞ্ছিত

শিল্পী প্রথমে ভাবে—
প্রেমই সুন্দরতম।
সব রঙের উৎস,
সব রেখার জন্মভূমি।
কোথাও যদি সামান্য প্রতারণা
ছায়ার মতো লেগে থাকে,
তাতে ক্ষতি কী—
আলো তো ছায়া ছাড়াই
চেনা যায় না।
তখন শিল্পী
একটি চাকেই থামে।
ধীরে ধীরে মধু তোলে,
জিভে নয়—
সময়ে।
ফুলের নাম জানে,
ফুলও তাকে চেনে।
প্রেম তখন সাধনা,
শিল্প তখন অপেক্ষা।
কিন্তু দিন যায়।
চাক পাল্টে পাল্টে
মধু খাওয়ার অভ্যাস
জিভকে অধৈর্য করে তোলে।
স্বাদ চাই দ্রুত,
গভীর নয়—
নতুন,
আরও নতুন।
মন তখন
ফুলের দিকে তাকায় না,
রঙের দিকে তাকায়।
একটি চাক শেষ হওয়ার আগেই
আরেকটির ঘ্রাণে
শিল্পীর পা সরে যায়।
প্রেম ভারী লাগে,
দায়ের মতো।
শিল্পী তখন ভাবে—
প্রতারণাতেই শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চ।
কারণ এখানে
ধরা পড়ার ভয় আছে,
দ্বৈত মুখের উত্তাপ আছে,
নিজেকে আয়নায়
চেনা না-চেনার
মাদকতা আছে।
প্রেম না থাকলেও চলে—
যদি কাঁপুনি থাকে,
যদি গোপনতা থাকে,
যদি পাপের ভিতর
একটি উল্লাসী হৃদস্পন্দন
শোনা যায়।
এভাবেই প্রেম
চুপচাপ সরে যায়।
কোনো দরজা ভাঙে না,
কোনো অভিযোগ তোলে না।
সে শুধু
রঙ গুটিয়ে নেয়,
ক্যানভাস ছেড়ে চলে যায়।
আর পাপী রোমাঞ্চ—
সে একা বেঁচে থাকে।
উজ্জ্বল,
চকচকে,
কিন্তু বন্ধ্যা।
তার কোনো স্মৃতি নেই,
কোনো ভবিষ্যৎ নেই—
শুধু বর্তমানের
একটানা চিৎকার।
শেষে শিল্পী
একটি ফাঁকা ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ায়।
হাতে রং আছে,
কিন্তু কেন্দ্র নেই।
সে তখন বুঝতে পারে—
প্রেম হারালে
শিল্প থাকে,
কিন্তু সৃষ্টি থাকে না।
আর রোমাঞ্চ—
পাপী হলেও—
সে একাই বাঁচে,
নিজেরই প্রতিধ্বনি হয়ে।

বিরতি

প্রায় দেড় বছর
তুমি বন্ধ করে রেখেছিলে
ফেসবুকে ভাসিয়ে দেওয়া প্রেম—
নীল পর্দার জলে আর ভাসেনি
তোমার অর্ধেক বাক্য,
হৃদয়ের ইমোজি,
রাতদুপুরের হালকা স্পর্শ।
কারণ তোমার শরীরের ভেতর
ইতিমধ্যেই অন্য এক সময়
নীরবে ক্যালেন্ডার খুলে বসেছিল—
স্বামীর ঔরসে
একটি ভ্রূণ
নিজস্ব ঘড়ি হাতে
দিন গুনছিল।
প্রেম তখন
লজ্জা পেয়ে নয়,
ভয় পেয়ে নয়—
বরং বাস্তবের সামনে
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল।
সে জানত,
এই মুহূর্তে সে হলে
অপরাধী হবে,
ডিজিটাল সাক্ষী,
অযথা উত্তেজনার প্ররোচনা।
তাই প্রেম
সাময়িকভাবে
দিক বদল করেছিল।
খোলা সমুদ্র ছেড়ে
ঢুকে পড়েছিল
গোপন খালে—
যেখানে ঢেউ নেই,
শুধু স্রোত,
শুধু অপেক্ষা।
ফেসবুক তখন
একটি বন্ধ জানালা,
যার ওপারে
তুমি আর আমি
দু’জনেই জানতাম—
হাওয়া এখনও আছে,
কিন্তু পর্দা টানা।
রাত্রে
যখন ভ্রূণ নড়ে উঠত
তোমার পেটের ভেতর,
প্রেম চুপচাপ
পাশ ফিরে শুত—
নিজেকে সংযত রেখে,
নিজেকে স্থগিত করে।
নীরবতার ভেতর
প্রেম তখন নিজেকে
শ্বাস নিতে শেখায়—
যেন ডুবে থাকা কোনো ডুবুরি
অক্সিজেন বাঁচিয়ে রাখে
অজানা গভীরতার জন্য।
দেড় বছর মানে
কেবল সময় নয়,
একটি দীর্ঘ গর্ভাবস্থা—
যেখানে প্রেমও
নিজস্ব ভ্রূণ নিয়ে
অদৃশ্য জরায়ুতে
ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
তুমি মা হচ্ছিলে,
আর প্রেম হচ্ছিল
অপ্রকাশিত প্রাপ্তবয়স্ক।
দু’জনেরই শরীর বদলাচ্ছিল,
কিন্তু কেবল একটির
নাম ছিল সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
ফেসবুকের দেওয়ালে
অন্যদের সুখ
রঙিন ফ্রেমে ঝুলত,
আর তোমার প্রেম
হেঁটে বেড়াত
অ্যালগরিদমের অন্ধকার গলি দিয়ে—
যেখানে লাইক নেই,
কমেন্ট নেই,
শুধু স্মৃতির ছায়া।
কখনও হঠাৎ
ভুল করে কোনো নোটিফিকেশন
কাঁপিয়ে দিত ফোন—
প্রেম তখন
হৃদয়ের আঙুলে
চুপচাপ চাপ দিত ঠোঁট,
বলত— “এখন নয়।”
কারণ সন্তান আসছিল
রক্ত, দায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে।
প্রেম জানত,
এ সময়ে সে সামনে এলে
শব্দ হবে,
ভাঙচুর হবে,
অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন জন্ম নেবে।
তাই সে বেছে নিয়েছিল
অদৃশ্য থাকা—
সবচেয়ে কঠিন উপস্থিতি।
আর যখন
শিশুটি প্রথম কেঁদেছিল,
প্রেম দূর থেকে
শুনেছিল সেই শব্দ—
একটি নতুন কেন্দ্র,
যার চারপাশে
তোমার পৃথিবী ঘুরবে।
প্রেম তখন
নিজেকে আর কেন্দ্র ভাবেনি।
সে হয়ে উঠেছিল
একটি নক্ষত্র—
দূরে থেকেও
আলো পাঠায়।
কারণ কিছু প্রেম
ভাঙে না,
মরে না—
তারা দিক বদলায়,
নাম বদলায়,
ঠিকানাও বদলায়।
বাস্তবের মানচিত্রে
তারা আরও জটিল,
আরও মানবিক হয়ে ওঠে—
নীরবতার ভেতর
বেঁচে থাকা
একটি অসমাপ্ত
কিন্তু সত্য
ভালোবাসা।