শ্বেতার কথা মোটেও ছিলনা শাশ্বতর প্রেমে পড়ার, এমনকি কথা বলারও আগ্রহ থাকতে পারে এরকমও ভাবেনি মানুষ ! অথচ এমনটাই ঘটল । শাশ্বত উচ্চশিক্ষিত, বিদেশী সংস্থায় কোম্পানি সেক্রেটারি আর চিরকালের অনুভবী, স্বল্প-বাক ছেলে । কিছুটা মায়ের আলু-ভাতে সন্তান বললেও অত্যুক্তি হয় না ।
এদিকে শ্বেতা প্রবল মুখরা । চলনে, পোশাকে আর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে গড়পড়তা যুবককে হীনমন্যতায় ভোগাতে সিদ্ধহস্ত । পড়াশুনা প্রথম বিভাগে বরাবর শেষ করে কলেজে পড়ানোর চাকরী জোগাড় করে নিয়েছে সব সহপাঠীর আগে ! এ হেন শ্বেতা বন্ধুর বিয়েতে শুধু কথার উজ্জ্বল ফুলঝুরিতে পাত্রপক্ষকে আলাপের প্রথম ছয় সাত ঘণ্টা চূড়ান্ত নাস্তানাবুদ করে বাসরের শেষ-যামে আবেগের রক্তিমে মৌনতর হোল লাজুক শাশ্বতর প্রেমে । চৌম্বকীয় বিপরীত মেরু তত্ত্বের দোহাই যদিও দিল উপস্থিত প্রৌঢ়বর্গ, অবাক গুঞ্জনে অবশিষ্ট রইল না কেউ । আকর্ষণের আধিক্য নিদ্রাহীন চারচোখকে ভিন্ন দুই শহর থেকে টেনে নিয়ে এসে আবার এক করে দিল গঙ্গার ঘাটে পরদিন দুপুরের মধ্যেই । সময় পাওয়া গেল প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বাধাহীন প্রাথমিক ভাব বিনিময়ের - হাতে হাত রেখে । দ্বান্দ্বিকতার সুখ নিশ্চিন্তে রওনা দিল একাকীত্বের শেষ জংশন ছেড়ে ।
শ্বেতার তথাকথিত বং বৈবাহিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় তীব্র অবিশ্বাস ছিল তার সম্রাজ্ঞী-সুলভ স্বাধীনতা উদযাপনের উপযুক্ত জীবন-সংজ্ঞার পরিপন্থী বলে । আর আশ্চর্যের বিষয় হল যে শাশ্বতর এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সম্মত হতে সমস্যা হল না এতটুকু । প্রেমে সান্নিধ্যের দাবীও অথচ পূরণ হতে শুরু করল কালে কালে । গঙ্গার ধারের একবেলা দ্রুত পাল্টে গেল সপ্তাহান্তে লেকে সারা দিন এ । সান্নিধ্যের হ্রস্ব প্রয়োজনকে একদিন পাল্টাতেই হয় বিনিময়ের
দীর্ঘতর নিরুদ্বিগ্নতায় । এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হল না । কাজেই ডায়মন্ড
হারবার, শঙ্করপুরও ক্রমশ অগম্য রইল না । একের দৃষ্টিতে নিহিত আবেদন অপরের ব্যবহারে অনুদিত হতে গিয়ে সুর ও ছন্দের যুগলবন্দী ব্যহত হল না বড় বিশেষ, ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের নিগূঢ় পর্যাপ্ততায় তৃপ্তির রেশ ধরা থাকতে লাগল বাকি সপ্তাহ-ভর - উপর্যুপরি সুযোগসন্ধানী মোবাইল ফোনের ব্যবহারে । পূর্ণযৌবনসিক্ত শরীর আর মন একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় রত হল ঊজ্জ্বলতরতার অভিযানে । সহকর্মী ও আপাত: বন্ধুরা যথারীতি বিক্ষিপ্তভাবে আক্রান্ত হল অসহায় অসূয়ায় ।
স্বাধীনতার মূল্য যৌবন যত বেশি বুঝছিল জীবন ততো দুরন্ত আর উচ্ছল হচ্ছিল দিন দিন ! জ্যৈষ্ঠের প্রখর গরমে পুড়তে পুড়তেও শাশ্বত খেয়ালে রেখেছিল ছাব্বিশে জানুয়ারি এবার সোমবার পড়ছে আর শনিবার সরস্বতী পূজো । সুতরাং টানা তিন দিন দোতারায় কেদার কালাঙ্গার এমন সুযোগের কথা পাড়া মাত্রই স্পষ্টবক্তা শ্বেতার অভিমত ছিল 'দূরে কোথাও যাওয়া অর্থ সময়ের নিদারুণ অপচয়' । সুতরাং এবারের গন্তব্য ঠিক হয়েছিল শান্তিনিকেতন !
অশান্তি দেখা দিল ফেরার দিন ! টানা তিনঘণ্টা প্ল্যাটফর্মে বসে অথচ ওভারহেড পাওয়ার লাইনে ডিসরাপশন এর কারণে ট্রেন নেই কোনও । অবশেষে অ্যানায়ুন্সমেন্ট হল - "শতাব্দী ঢুকছে আর কিছুক্ষণের মধ্যে"। তড়িঘড়ি প্রায় ছয় গুন দাম দিয়ে টিকিট কাটার তাড়া ! প্ল্যাটফর্মের উপচে পড়া ভিড় অবশ্য আগ্রহ দেখাল না খুব একটা । সি-ফোর কম্পার্টমেন্টে ছাব্বিশ সাতাশ । ট্রেন ঢুকতে নির্বিঘ্নে ওঠাও হল । পঁচিশ জানলার ধারে, - গেরুয়া ধুতি, কাঁধে গেরুয়া চাদর ফেলা আদুর গা মধ্যবয়সী সাধুবাবার দখলে । ব্যাগ বাঙ্কে তুলে শাশ্বত পাশের সিটটি দখল করল আর শ্বেতা প্যাসেজের ধারে সাতাশ !
গত তিন দিন সুখ অঝোরে ঢেলেছে জীবন - চাওয়ার ঢের বেশি । অভিজ্ঞতার পাপড়ি সংখ্যায় ক্রমশই বাড়ার সাথে সাথে নূতনতর সুবাসের ধারণা এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পেরেছে অনায়াসে - 'যৌবন কত বেশি বৈচিত্র্যে রঙিন আর টইটম্বুর করতে পারে জীবনকে' - এই বিষয়ে ।
পাওয়ারও অভ্যাস তৈরি হতে সময় বেশি লাগে না । আজ সকাল থেকে সবকিছু হঠাৎ একেবারে অন্যরকম । শ্বেতা বিরক্ত, কিছুটা বিব্রতও । শাশ্বত ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে সাত সকালে স্নান-প্রসাধনের পাট চুকিয়ে আবার টাটকার সুবাসে ভরে টানটান হয়ে উঠবে - এমনটাই ভেবে রেখেছিল । বালিশের তলে মোবাইলের কম্পন বিশ্বসীও ছিল ভোরে । তবে প্রথম বাধ সাধল গিজার । জল গরম হল না । অগত্যা পাখির স্নান ! এরপর সবচয়ে পছন্দের সালোয়ারটি পরতে গিয়ে খেয়াল করল কামিজে মেখে বসে আছে ক্লিনজিং মিল্ক - শিশির গতকালের ঢিলা ছিপি উলটে । এক্সট্রা পোশাক আঁটেনি সুটকেসে । অগত্যা ব্যাজার মুখে আসার দিনের শার্ট প্যান্ট পরা আর তার সাথে শাশ্বতকে চমকে দেওয়ার পুরো প্ল্যানটাই একেবারে মাটি । শাশ্বত যদিও সকাল সাতটায় চতুর্থ বারের ঠেলায় রক্তচক্ষু মেলেই শ্বেতাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল "কি করে পার শ্বেতা রাত সাড়ে চারটে পর্যন্ত জেগে এর মধ্যে এমন ফ্রেশ হয়ে যেতে যেন এখনও কিচ্ছুটি হয় নি, এবারেই বরং শুরু হবার আছে ?" শ্বেতা হেসেছিল চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে নিজের অস্বস্তি নিখুঁত গোপন করে ।
গেস্ট হাউস থেকে বের হওয়ার সময় শ্বেতা নিজের কাছে জীবনে যা আশা করতে পারেনি - তাই ঘটল । দোতলা থেকে একতলাতে নামার শেষ সিঁড়িতে শাশ্বত ধরে ফেলার আগেই অন্যমনস্ক গোড়ালি মচকে পড়েই গেল । দুঃসময়ের একা আসতে নেই । রিক্সায় আসার সময় তাই টায়ার পাংচার আর সারানোর বিরক্তিও সইতেই হল আরও আধ ঘণ্টা ! স্টেশনে পৌঁছে ট্রেন বিভ্রাটে যদিও দাঁড়াতে হয়নি বেশিক্ষণ, প্রথম বার শতাব্দীতে চাপার সুযোগে লোভটা একটু বেশিই হয়েছিল শ্বেতার জানলার ধারের সিট এর । এক অর্ধ-নগ্ন সাধু সেই ইচ্ছাতেও বাধ সাধায় পিত্তিতে চাপ একটু বেশিই পড়ে গেল । ভোর থেকে জমে থাকা যাবতীয় বিরক্তি ক্রোধ এর রূপ নিল এবার । শ্বেতার মুখ খুলল । -" এই ভণ্ডামিগুলো সহ্য হয়না আমার ! পোশাক দেখে মনে হবে কপর্দকহীন, অথচ চলেছে শতাব্দীতে
চড়ে !"
শাশ্বত চমকে তাকাল সাধুর দিকে । না: ! চোখ বন্ধ, শুনতে পায় নি মনে হয় - যথেষ্ট জোরে বললেও ! এবার শ্বেতার দিকে তাকিয়ে আঙুলের ইশারায় চুপ করতে বলল ! শ্বেতার আত্মবিশ্বাসের ধরণ অবশ্য আলাদা ! সম্মুখ সমরে একবার নামলে সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী সে নয় । শাশ্বত বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি বলল -" নিশ্চয়ই কোনও শিষ্য কেটে দিয়েছে টিকিট" !
-"হ্যাঁ, তা ছাড়া আর কিই-বা হতে পারে ? দুবেলার আপন অন্নসংস্থানটুকুরও দায়িত্বও যে নেয় না, ভিক্ষাবৃত্তি যার গর্বের উদযাপন, সে-ই তো জ্ঞান বিতরণের অধিকারী আমাদের সমাজে ! আর আমাদেরও সকাল থেকে স্নান সেরে মুগ্ধ-নেত্রে তার বানী শুনে ধন্য হতে হবে, দশ বার করে পেন্নাম ঠুকতে হবে আর জয়ধ্বনি দিতে হবে ! সরল মানুষের অন্ধবিশ্বাসের সুযোগসন্ধানী যত !"
নির্লিপ্তি সাধুর স্বভাবসিদ্ধ হতে পারে কিন্তু দায়ীত্বহীণতাও ? সাধু মুখ ফেরালেন, দৃষ্টিতে অপ্রসন্নতা যদিও নেই তবে তা শাশ্বতকে পেরিয়ে সোজা শ্বেতার দিকে ! শান্ত অথচ স্পষ্ট উচ্চারণ হল -" একবেলার ভাগ্যের অসহযোগে মেজাজ সপ্তমে আর তিন দিনের স্বর্গসুখের কি করুণ পরিসমাপ্তি ! অথচ আবার পড়িমরি করে ছুটবি এই সুখেরই পিছনে, ছুটতে থাকবি একদিন শরীর ক্ষয়ে গেলেও, আর, কিছুই সঞ্চয়ে থাকবে না জেনেও, তাই তো !
গাছ, পশু, পাখির যে নিয়মে খাবার জোটে আমারও তাই ।
এবার বল কে বেশি ভিখারি" !
শ্বেতা বাকরুদ্ধ ! বিহ্বলতা কি একেই বলে ? তবে শাশ্বত কিন্তু এরকমই কিছু একটা ঘটতে পারে আশা করে বার বার চাপ দিচ্ছিল শ্বেতার হাতে, শ্বেতা থামেনি । শাশ্বত নিজের সিট এ বসার সময় সাধুর বাহুতে নিজের বাহুর স্পর্শে চমকে উঠেছিল, একটা ঠাণ্ডা পাথরের গায়ে আচমকা ত্বকের স্পর্শে মানুষ যেভাবে চমকায় তেমন অনুভূতিতে । শাশ্বতর বারবার মনে হচ্ছিল যে ব্রহ্মচর্যকে চিরকাল অপ্রয়োজনীয় বাগাড়ম্বর ভেবেছে তাই যেন হঠাৎ একদম কাছ থেকে অনুভবের সুযোগ এলো ! স্বামীজী, নেতাজীর ক্ষেত্রেও কি একই রকম হত ? হয়তো তাই !
সাধুর দৃষ্টি শ্বেতার মুখ থেকে জানলার বাইরে সরে গেছে ইতিমধ্যে ! শাশ্বতর মনে হল সুযোগ বারবার আসে না, যখন আসে তখন দ্বিধা বোকামো ছাড়া কিছু নয় । সাধুর দিকে তাকিয়ে তড়িঘড়ি জিজ্ঞাসা করে বসল -" দাদা, জীবনে সুখী হতে চাওয়া কি অন্যায় ?
সাধু ফিরলেন, মৃদু হাসি যেন মুখে ! -" কেন ? ভোজন কি অন্যায় ? কিন্তু উপার্জন কই ? "
-" ঠিক বুঝতে পারলাম না, যদি দয়া করে আর একটু বুঝিয়ে বলেন !"
" কথাটা শোনোনি - বসে খেলে কুবেরের ধনও শেষ হয়ে যায় ! শুধু অধিকার-বোধের বাসি ফুলে ভালোবাসার পূজো চলে না বেশি দিন, প্রেম শুকাতে শুরু করে তারপর ক্রমশ মরে যায় !
-"তাহলে কি ঠিক উপার্জন করতে হবে ?
-" আগে পরম মমতায় ভালোবাসার জল ঢাল নিজের গোড়ায় । ভিতরের মানুষটার যত্ন যদি ঠিকঠাক নিতে শেখো - যেমন মা নিত আগে, দেখবে নূতন ফুল পাতা আবার গজাতে শুরু করবে 'আমি'তে ছেলেবেলার মত ! নূতনের অভাব যদি না থাকে নিজের অন্তরে - আজকের সাতাশ বাহাত্তরে গিয়ে বেশি উজ্জ্বল হবে, প্রেমও নিত্য নবীনতর পরিণয়ে, বাসি হওয়ার সুযোগ পাবে না কোনদিন, ........যৌবন অনন্ত হবে ।"
-" তাহলে ভিখারীর কাছেও ভিক্ষা থাকতে পারে নেওয়ার মত!" এই বলে স্মিতহাস্যে উঠে দাঁড়ালেন তিনি । হতভম্ব ওরা খেয়াল করেনি নিঃশব্দে হাওড়ার প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে শতাব্দী, ব্যস্ত উঠে দাঁড়িয়ে বেরোবার রাস্তা ছেড়ে দিল । উনি প্যাসেজ ধরে এগিয়ে গেলেন
দরজার দিকে । ওরা লাগেজ নামানোয় মন দিল । শ্বেতার সুটকেস নামিয়ে নিজের চামড়ার ব্যাগটা নামানোর জন্য হাত বাড়িয়েও হঠাৎ ঘুরে সোজা শ্বেতার চোখে তাকাল শাশ্বত । মনের মিল ঠিকমত হলে এরকম হতে শুরু করে, দুজনের একই সময়ে একই কথা মনে পড়ে যায় । শ্বেতারও মনে পড়ল গতকাল রাতে শাশ্বত প্রশ্ন করেছিল " কবি গভীরতম ভালোবাসার বোধের গানগুলো প্রেম পর্যায়ে না রেখে পূজা পর্যায়ে রেখেছেন কেন গীতবিতানে ?" উত্তর দুজনেরই অজানা নেই আর !
প্ল্যাটফর্মে পা দিয়ে শ্বেতার খুব হালকা লাগতে লাগল নিজেকে, মনে হল আকাশের ডাক শুনতে পাচ্ছে পাখি হয়ে যেতে ! শাশ্বত তখন গুনগুন করছে -"প্রভাতে পথিক ডেকে যায়, অবসর পাই নে আমি হায়- !"
একটা হকার তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে " আর খবরের কাগজে নয়, এবার এসে গেছে হাতে হাতে জাপানী তেল - মাত্র দশ টাকায় !"
ওরা এগিয়ে চলল আপন খেয়ালে মেন গেটের দিকে ।
.
-------------------------------------------
এই রচনাটি আমার সেই সোনার চাঁদদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত যারা দিনের আলোর অভিমানে মৌন বা বিরূপ হতে চায় !
-------------------------------------------
.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন