এসেছিল বাসন মাজতে, ঘর ঝাড়ু দিতে রোগা, শুকানো চেহারা,
কালোই গায়ের রঙ, তিন সন্তানের জননী - যেমন
মাঝে মাঝে বাড়ির কাজের লোক পাল্টায় ।
আমাকে চোখ তুলে প্রথম তাকাতে হল
যেদিন মাসের শেষে মাইনের টাকা হাতে নিয়ে
বলল - "কাজের পরিমাণের চেয়ে পয়সা দিলে বেশি ।"
আমি তো ধূর্ত, জানি - জানবে না তৃতীয় বিশ্বের শোষণকে
যুঝতে শ্রমের মূল্য কত ভাগ কম পায় দৈনন্দিন ।
তিনতলার ঘরে আর একতলার অফিসে বুলার কাজ রোজ
তালা খুলে প্রায়ই ফাঁকা ঘরে একাই নিজের মত সেরে
ঘর বন্ধ করে চাবি দারোয়ানের কাছে দিয়ে যাওয়া ।
বিকেলে অফিস-শেষে টেবিলে টেবিলে অবিন্যস্ত ফাইল,
এঁটো কাপ, জলের গেলাস, ফাঁকা বোতল, এলোমেলো
ছড়ানো ডাইরি, ডকুমেন্ট, ভর্তি ছাইদানি - সব
সকালে পাল্টে যায় ঝকঝকে সাজানো আমন্ত্রণে, পরিষ্কার
গ্লাসে জল ভরে ঢাকা, নিপাট গুছানো টেবিলে শুরু হতে
যত ব্যস্ততার কাজ আবার আগমনী সুরে আর টাটকা সুবাসে ।
এরকমই, বাসি বিছানার কোঁচকানো চাদর সকাল সাতটায়
টানটান রোজ - যার রঙও পাল্টায় নিয়ম করে সপ্তাহান্তে,
বালিশেরা নিয়মিত আবার ডিভানে, পুরানো খবরের কাগজ
পরিপাটি যথারীতি রাখা বাকিদের সাথে, শুধু নূতন কাগজ-দুটি
বসার ঘরে অতি আগ্রহে পাঠকের অপেক্ষায় আধ খোলা তিরতির কাঁপে।
ব্যবহারের নিয়মিত নরক গুলজার প্রতি সকালে উপাসনার বেদীতে
পাল্টে দেওয়ার এই এক আশ্চর্য নিত্য-পদ্ধতি নিঃশব্দে চলে
বুলা নামের যাদুকাঠির ছোঁয়ায় । বাড়িতে কেউ নেই আর ।
এতদূর পর্যন্তও ঠিক ছিল না হয় ! যেদিন সকালে ঘরে ঢুকে
দেখি - বুলা খাটের উপর দাঁড়িয়ে বুড়ো আঙুলে ভর, আর
গোড়ালি তুলে ছুঁয়ে ফেলেছে ফ্যানের ব্লেড একে একে
পরিষ্কারের চেষ্টায় - মনে হল হেরে চলেছি রোজ মনুষ্যত্বের
সংজ্ঞায় আর দরদের সরল বিচারে । কর্মযোগ আর কাকেই বা বলে !
আরও একদিন খেতে দেরী দেখে, এসে দেখি যত্ন সহকারে
খাবার, চা সব সাজিয়ে ফ্রিজে রেখে গেছে এমন - মনে হল
আকাশ থেকে হটাত অবসরে ফিরে এসেছিল মা অভ্যস্ত ঘরে ।
এরপরও, বেলায় ফিরে যেদিন দেখি গতদিনের জামার পকেটের
ট্রেনের টিকিট, ডেবিট কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স আর সতের
হাজার সাতশো বাষট্টি টাকা পরিপাটি রাখা কম্পিউটার টেবিলে,
আর জামাটি সদ্য ধোওয়া, দুলছে দুষ্টুমির অমল খেয়ালে বারান্দায় -
বহুদিনের জমা দীর্ঘশ্বাস-পরাজিতের বাঁধন মানেনি আর ।
ক্রমশ মানিয়ে নিয়েছি হীনমন্যতার সাথে নিত্য সহবাস ।
শিক্ষা, আভিজাত্য আর সাফল্যের যেটুকু সুখ-সঞ্চয় আমার,
জানি মূল্যহীন হবে রোজ ওই নিরক্ষর মেয়েটার হৃদয়ের অমোঘের কাছে ।
মাঝে মাঝে মনে হয় মুক্তি কিছুটা হয়তো হোতো যদি একবার পারতাম
- পা ছুঁয়ে প্রণাম ! মাঝখানে আমার চেয়েও উঁচু 'আমি'-র দেওয়াল,
শিক্ষা আর অর্থের অহংকার ।
তবুও লোভ হয় - বড় লোভ, যদি একবার পারতাম ! মহাসমুদ্রও জানি
ভালোবাসে মাসে একবার পূর্ণিমার চাঁদের কাছে স্বেচ্ছায় নতজানু হতে !
হায় আমার অসহায় ক্ষুদ্রতা, তাচ্ছিল্যের মানব-যাপন !
--------------------------------------------
.

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন