বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

অবাধ

স্মৃতিরা মৌন হয় কালের নিয়মে—
তাদের জিভে জমে ধুলো,
অক্ষরগুলো ঝরে পড়ে
ভাঙা ঘড়ির কাঁটার মতো
অকারণে, অচল, অনুপস্থিতির দিকে।

তবে সব নয়।
কিছু স্মৃতি থাকে—
জেগে ওঠা জ্বরের মতো,
চোখের ভেতর নোনাজল হয়ে
নিজেকে নিজেই বারবার উচ্চারণ করে।

রাত দুটোর পরে,
যখন শহর তার নাম ভুলে যায়
আর কুকুরেরা স্বপ্ন দেখে মানুষের,
তখন আমাদের বারান্দা
একটা অস্থায়ী মহাবিশ্ব হয়ে উঠেছিল—
আবছায়া আলো-আঁধারিতে
দেয়ালগুলো শ্বাস নিচ্ছিল ধীরে,
আর বাতাসের ভেতর
অদৃশ্য কোনো সাগর দুলছিল।
আমাদের আকস্মিক মিলন—
না কোনো পূর্বাভাস,
না কোনো ভাষা,
শুধু দুটি সময়ের রেখা
হঠাৎ একে অপরকে চিনে নেওয়া
একটা অজানা জ্যামিতিতে।

তোমার হাত ছুঁয়ে
আমি বুঝেছিলাম—
ত্বকও কখনো দরজা হতে পারে,
আর তার ওপারে
অসীম সমর্পণের এক নিঃশব্দ গ্রহ
ঘুরে বেড়ায়,
যেখানে নামের প্রয়োজন হয় না।
সেই তীব্রতা—
যেন বিদ্যুৎ নিজেই নিজের শরীরে আগুন ধরিয়েছে,
যেন অন্ধকার হঠাৎ শিখে ফেলেছে
কীভাবে জ্বলে উঠতে হয়।

সময় অনেক কিছু মুছে দেয়—
মুখের রেখা, কথার মানে,
স্বপ্নের মানচিত্র—
কিন্তু সেই রাত,
সেই বারান্দা,
সেই অবাধ আত্মসমর্পণ—
ওগুলো সময়ের নাগালের বাইরে
একটা গোপন কক্ষে লুকিয়ে আছে।
যেখানে এখনও
রাত দুটো বাজে,
বাতাস দুলে ওঠে,
আর আমরা—
চিরকাল
প্রথমবারের মতো
একজন আরেকজনকে ছুঁয়ে যাই।

যেন সেই স্পর্শের পর
সময় নিজের দিক হারিয়ে ফেলেছিল—
ঘড়ির কাঁটা ঘুরছিল ঠিকই,
কিন্তু কোনো ভবিষ্যৎ জন্ম নিচ্ছিল না আর,
কোনো অতীতও ফিরে যাচ্ছিল না নিজের ঘরে।
আমাদের চারপাশে
অদৃশ্য কাচের দেয়াল গড়ে উঠেছিল,
যার বাইরে পৃথিবী ছিল নিস্তব্ধ, স্থির,
আর ভেতরে—
শুধু হৃদস্পন্দনের অতিরিক্ত শব্দ,
যেন দুটি বুকে
একই হৃদয় ভুল করে বসানো হয়েছে।

তুমি যখন চোখ তুলেছিলে,
আমি দেখেছিলাম—
সেখানে কোনো মানুষ নেই,
কোনো নাম নেই,
শুধু এক অচেনা আকাশ
নিজের গভীরতায় আমাকে ডুবিয়ে দিতে চায়।
আর আমি—
কোনো যুক্তি ছাড়া,
কোনো প্রতিরোধ ছাড়া,
নিজেকে ছেড়ে দিয়েছিলাম
সেই নিমগ্নতার কাছে,
যেন পতনও একধরনের মুক্তি।

তারপর—
আর নতুন কিছুই ঘটেনি।
না কোনো বিদায়,
না কোনো প্রতিশ্রুতি,
না কোনো গল্পের শেষ লাইন।
শুধু ভোর এসে
আমাদের আলাদা করে দিয়েছিল
একটা অদৃশ্য ছুরির মতো,
আর আমরা
নিজ নিজ জীবনের ভিড়ে ফিরে গিয়ে
ভুলে যাওয়ার অভিনয় শিখেছিলাম।

কিন্তু সময়—
সে তো কেবল বাহ্যিক জিনিস মুছে দেয়,
ভিতরের গোপন স্থাপত্যে
তার কোনো অধিকার নেই।
তাই আজও,
যখন রাত দুটো পেরিয়ে যায়
আর বাতাসে হালকা ঠান্ডা নামে,
আমি হঠাৎ শুনতে পাই—
বারান্দার সেই পুরোনো দরজা
আস্তে করে খুলে যাচ্ছে।
আর আমি জানি,
সেখানে তুমি নেই—
তবুও আছো।

কারণ কিছু মিলন
শেষ হয়ে যায় না কখনো,
তারা কেবল সময়ের ভেতর
নিজেদের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে—
যতক্ষণ না
আমরা দুজনেই
স্মৃতির মতো মৌন হয়ে যাই,
আর সেই এক রাত
আমাদের হয়ে
চিরকাল কথা বলতে থাকে।

কোন মন্তব্য নেই: