বিষণ্নতা কোনো অনুভূতি নয়।
সে এক অন্ধ উদ্যানপালক, যে মধ্যরাতে তোমার খুলির ভেতর কালো গাছ রোপণ করে।
সকালে ঘুম ভাঙলে তুমি ভাবো— পৃথিবী বদলে গেছে।
আসলে তোমার জানালার ওপাশে নয়,
আকাশটাই তোমার চোখের ভেতরে এসে বাসা বেঁধেছে।
একদিন,
যখন তোমার শিরাগুলো ধীরে ধীরে কালির নদীতে পরিণত হচ্ছিল,
ঠিক তখনই
শৃঙ্খলা এসে দাঁড়াল।
সে কোনো মানুষ নয়।
সে এক মুখহীন ঘড়ি, যার কাঁটাগুলো শুকনো বজ্রপাত দিয়ে তৈরি।
সে সময় গোনে না।
সে মৃত দিনগুলোর হাড় গুনে রাখে।
সে কিছুই বলল না।
শুধু তোমার কপালে একটি সূর্যবীজ রেখে দিল।
তুমি উঠে দাঁড়ালে।
সেই মুহূর্তে
দিগন্তের ওপারে একটি ঘুমন্ত পর্বত তার পাথরের ফুসফুসে প্রথমবারের মতো শ্বাস নিল।
তুমি বিছানা গুছিয়ে নিলে।
দেখলে—
বালিশের নিচে গত জন্মের অসমাপ্ত সকালগুলো ছোট ছোট পাখির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে।
তুমি জল খেলে।
জলটি তোমার শরীরে ঢুকল না।
বরং তোমার ভেতরে বহুদিন ধরে মরে পড়ে থাকা একটি নদী জলটিকে পান করল।
তুমি জুতোর ফিতা বাঁধলে।
ফিতা দুটি হঠাৎ দুটি সাপ হয়ে তোমার পায়ের চারদিকে একটি নক্ষত্রমণ্ডল জড়িয়ে দিল।
তুমি হাঁটতে শুরু করলে।
পৃথিবী তোমার নিচে ঘুরছিল না।
বরং তোমার প্রতিটি পদক্ষেপের নিচে এক একটি নতুন পৃথিবী জন্ম নিচ্ছিল।
তোমার ছায়া পিছনে আসছিল না।
সে এগিয়ে যাচ্ছিল,
ভবিষ্যতের ভাঙা আয়নাগুলো এক এক করে সেলাই করতে করতে।
দিনগুলো নিজেদের চামড়া বদলাতে লাগল।
সোমবারের গায়ে মাছের আঁশ জন্মাল।
মঙ্গলবার একটি কাচের জিরাফ হয়ে মেঘের ভেতর ঘাস খেতে লাগল।
বুধবার নিজেরই স্বপ্ন খেয়ে একটি নীল পাখিতে পরিণত হলো।
আর তুমি—
প্রতিদিন একই সময়ে উঠে পড়তে থাকলে।
বিষণ্নতা হাসল।
তার দাঁতগুলো শুকনো গ্রহণ দিয়ে তৈরি।
সে বলল—
"একদিন ক্লান্ত হবেই।"
কিন্তু শৃঙ্খলা কখনও উত্তর দেয় না।
সে শুধু তোমার হৃদয়ের ভেতরে একটি অদৃশ্য তাঁত বসিয়ে
প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ দিয়ে বুনতে থাকে
একটি নতুন মহাবিশ্ব।
যেখানে
দৌড়ানো মানে নিজের ছায়াকে পেছনে ফেলে আসা নয়,
বরং অদেখা সূর্যদের ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়া।
যেখানে
বই পড়া মানে অক্ষর নয়,
নিজের করোটির ভেতর অজানা নক্ষত্র জন্মাতে দেখা।
যেখানে
ঘাম লবণ নয়,
গলতে থাকা পুরনো ভাগ্যের গলিত ধাতু।
ধীরে ধীরে
তোমার বিষণ্নতা নিজের শরীর হারাতে লাগল।
সে আর মানুষ রইল না।
সে এক কুয়াশার হাতি,
যে ভুল করে সূর্যের মরুভূমিতে প্রবেশ করেছে।
একদিন সে জেগে উঠে দেখল—
তোমার ভেতরের ঘড়িগুলো
আর সময় মাপে না।
তারা আলো ফলায়।
তোমার হাড়গুলো
আর ক্যালসিয়ামের নয়।
তারা চাঁদের শিকড় দিয়ে তৈরি।
তোমার শ্বাস
আর বাতাস নয়।
সে অদৃশ্য নক্ষত্রদের পরাগ।
তখন
বিষণ্নতা তার কালো মুখোশ খুলে
দেখল—
তার নিজেরই কোনো মুখ নেই।
সে ছিল শুধু অব্যবহৃত সকালের জমে থাকা ছায়া।
আর শৃঙ্খলা?
সে কোনো অভ্যাস ছিল না।
সে ছিল
ঈশ্বরের নিঃশব্দ হাতের লেখা,
যা প্রতিটি ভোরে
তোমার আত্মার শূন্য পাতায়
ছন্দের দৃপ্ত অলঙ্কারে
এক একটি নতুন সূর্য
এঁকে যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন