সুখ সর্বদাই ঘরে তৈরি—
যদি তুমি একজন ভালো রাঁধুনি হও,
যদি তোমার হাত এখনো মনে রাখে
কীভাবে দুঃখকে ময়দার মতো মেখে
রুটিতে পরিণত করতে হয়।
আত্মার রান্নাঘরে
কালিতে লেখা কোনো রেসিপি নেই।
আছে কেবল প্রাচীন আঙুলের ছাপ
আটার মতো সাদা সকালের গায়ে,
আছে চাঁদের আলো দিয়ে গড়া দিদিমারা
যারা ফিসফিসিয়ে বলে যায়
ভুলে যাওয়া গ্রীষ্মের গোপন কথা,
কাচের বয়ামে ভরে রাখা স্মৃতির ভিতর থেকে।
আমি দেখেছি মানুষ
সোনার চামচ কিনে সুখ খেতে চেয়েছে,
তবুও তাদের মুখ মরুভূমিই রয়ে গেছে।
আমি দেখেছি নারী
তাদের এপ্রোনে নক্ষত্র সেলাই করেছে,
আর ঝড় বয়ে আনা অতিথিদের
চিড় ধরা মাটির বাটিতে
হাসি পরিবেশন করেছে।
কারণ সুখ এক লাজুক উপাদান।
সে লুকিয়ে থাকে
পুড়ে যাওয়া ভুলের মধ্যে,
পেঁয়াজ কাটার অশ্রুর মধ্যে,
সেই দীর্ঘ বিকেলগুলোর মধ্যে
যখন ভাত উথলে পড়ে
আর স্বপ্নগুলো ফুলতে চায় না।
তাকে কেনা যায় না
প্রশংসার বাজার থেকে।
তাকে উত্তরাধিকারেও পাওয়া যায় না
মার্বেলের অট্টালিকার মতো।
সে বুনো ফুলের মতো জন্মায়
অভ্যাসের ছোট্ট বাগানে—
একটি তৃষ্ণার্ত গাছে জল দেওয়ায়,
একটি সত্য বাক্য লেখায়,
একটি কাঁপতে থাকা হাত ধরে রাখায়
চিরকালের প্রতিশ্রুতি না দিয়েও।
আহা, কী অদ্ভুত এই পৃথিবীর রান্নাঘর!
এখানে ছাদের সঙ্গে ঝুলে আছে
উল্টো হয়ে থাকা নক্ষত্রমণ্ডলী।
ঘড়ি ধীরে ধীরে গলে যায়
জাফরানি সময়ের এক হাঁড়িতে।
স্মৃতি বসে থাকে কোণায়,
অদৃশ্য আঙুলে কমলার খোসা ছাড়ায়।
আর অনুতাপ—
কালো কাকের ছদ্মবেশী এক বৃদ্ধ পরিবেশক—
বারবার লবণ ফেলে দেয়
গতকালের স্যুপের মধ্যে।
কিন্তু ভালো রাঁধুনি হাসে।
সে জানে—
এক চিমটি ক্ষমা
তিক্ততাকে মিষ্টি করে দিতে পারে।
সে জানে—
নিঃসঙ্গতা,
ধীরে ধীরে সিদ্ধ হতে হতে
একসময় একাকিত্বে রূপ নেয়—
যা সুগন্ধময়,
যা আত্মাকে পুষ্ট করে।
সে জানে—
শোক আসলে সুখই,
যে কালো দস্তানা পরে আছে,
এবং ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে
সেগুলো খুলে ফেলার জন্য।
তাই প্রতিটি ভোরে
সে সাহসের চুলা জ্বালায়।
ক্ষতচিহ্নের তৈরি হামানদিস্তায়
সে আশা পিষে নেয়।
তারপর সাধারণ দিনের ঝোলে
সে নাড়তে থাকে বিস্ময়ের চামচ,
যতক্ষণ না অলৌকিকতা
বাষ্পের মতো উড়ে ওঠে—
ছোট্ট,
স্বচ্ছ,
তবু একটি সমগ্র জীবনকে
উষ্ণ রাখার জন্য যথেষ্ট।
আর মধ্যরাতে,
যখন মহাবিশ্ব
নিজেকে নীরবতার এক ন্যাপকিনে মুড়ে ফেলে,
সে আর-একজন অতিথির জন্য
টেবিল সাজায়—
নিজের জন্য।
কোনো লজ্জা নয়।
কোনো তাড়া নয়।
শুধু বুকের ভিতরে
একটি মোমবাতি নরম আলোয় জ্বলে,
শুধু শান্তির সুগন্ধ
ফেটে যাওয়া জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে,
আর থাকে এক গভীর, নীরব বিশ্বাস—
সুখ কখনোই দূরদেশের কোনো রাজ্যে ছিল না,
সে তো বরাবর অপেক্ষা করে ছিল
এই অসম্ভব রান্নাঘরেই,
যেখানে হৃদয়—
ধুলোমাখা অথচ অলৌকিক—
বারবার শিখে নেয়,
যা কিছু অবশিষ্ট আছে,
তা দিয়েই
কীভাবে
সুখ রান্না করতে হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন