সে কখনও আকাশে শুরু হয় না।
তার জন্ম হয় একটি মানুষের নিঃশব্দ সিদ্ধান্তে, যখন সে এক ভোরে নিজের কঙ্কালের ভেতর থেকে শেষ অলসতাটুকু খুলে জানালার বাইরে ঝুলিয়ে দেয়।
মাধ্যাকর্ষণ তখন নিজের কালো আলখাল্লা খুলে একটি আহত পাখির মতো দিগন্তের কোণে বসে কাঁদে।
ভোরকে সবাই সূর্যের জন্ম বলে।
কিন্তু ভোর আসলে মৃত রাতের খোলা করোটি, যার ভেতর থেকে আলো ধীরে ধীরে তার সোনালি মস্তিষ্ক বের করে আনে।
আরও আগে জেগে ওঠো।
এতটাই আগে—
যখন সময় এখনও তার মুখ পরে ওঠেনি,
যখন ঘড়ির কাঁটাগুলো অন্ধ মাছের মতো স্বপ্নের সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়,
যখন ঈশ্বর নক্ষত্রের ধুলো দিয়ে নতুন দিনের কপাল লিখছেন।
জেগে ওঠো—
তোমার নামটি আজকের দিনের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই।
কারণ প্রতিটি নামই একটি খাঁচা।
আর প্রতিটি ভোর তার ভেতরে লুকিয়ে রাখে একটি নামহীন আকাশ।
তোমার বিছানা?
ওটা কখনও বিছানা ছিল না।
ওটা একটি রানওয়ে,
যেখানে প্রতি রাতে স্বপ্নেরা অবতরণ করে,
আর প্রতি ভোরে অসম্ভব ভবিষ্যৎগুলো ডানা মেলে উড়ে যায়।
কম্বলটি আসলে একটি ক্লান্ত মেঘ,
যে হাজার বছর ধরে তোমাকে বৃষ্টি হতে দেয়নি।
অ্যালার্ম বাজে না।
সে চিৎকার করে না।
সে নিঃশব্দে তোমার আত্মার দরজায় একটি অদৃশ্য বিমানবন্দরের বোর্ডিং পাস গুঁজে দিয়ে যায়।
তুমি যদি উঠে দাঁড়াও—
পৃথিবী এক ইঞ্চি ঘুরে যায়।
তুমি যদি দৌড়াও—
সূর্য তার আলো বদলে নেয়।
তুমি যদি পড়ো—
অক্ষরগুলো পাতা ছেড়ে উড়ে গিয়ে তোমার করোটির ভেতর কালো নক্ষত্র হয়ে জ্বলে ওঠে।
জুতোর ফিতা বাঁধো।
দেখবে—
দুটি ফিতা দুটি সাদা সাপে পরিণত হয়েছে,
যারা তোমার পায়ের চারপাশে একটি সর্পিল ছায়াপথ বুনে চলেছে।
জল পান করো।
জলটি তোমার গলায় নামে না।
বরং
তোমার শরীরের গভীরে একটি শুকিয়ে যাওয়া সমুদ্র হঠাৎ জেগে উঠে নিজেই বৃষ্টি হতে শুরু করে।
দৌড়াও।
এমনভাবে দৌড়াও—
যেন পৃথিবী তোমার জুতোর তলায় একটি পুরোনো কমলার খোসার মতো খুলে যেতে থাকে।
যেন বাতাস তোমার ফুসফুসে নয়,
তোমার ভবিষ্যতের মধ্যে শ্বাস নিচ্ছে।
কাজ করো।
কারণ কাজ অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নয়।
এটি মহাবিশ্বের সেই অদৃশ্য সূঁচ,
যা প্রতিদিন তোমার ছিন্নভিন্ন ভাগ্যকে নতুন নক্ষত্রের সুতো দিয়ে সেলাই করে।
প্রতিটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সকাল
একটি বিমান নয়—
একটি নতুন মহাবিশ্বের প্রথম হৃদস্পন্দন।
তার ইঞ্জিন অন্ধকার দিয়ে চলে।
তার জ্বালানি অবিশ্বাসের ছাই।
তার পাইলট তোমার সেই সংস্করণ, যার এখনও জন্মই হয়নি।
আর লাগেজ?
সেখানে থাকে না কাপড়চোপড়।
থাকে—
গতকালের ভয়,
অপূর্ণতার কঙ্কাল,
স্থগিত স্বপ্নের শুকনো ফুল,
আর সেই মানুষটির মুখ, যা তুমি আর কখনও হতে চাও না।
তারপর—
উড্ডয়ন।
তুমি ভাবো তুমি আকাশে উঠছ।
না।
আকাশই তোমার ভেতরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।
তখন
সময় তার ঘড়ি খুলে একটি পাখির গলায় পরিয়ে দেয়।
মাধ্যাকর্ষণ নিজের আইন ভুলে যায়।
নক্ষত্রেরা তোমার শিরায় রক্ত হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।
আর মহাবিশ্ব—
সে কোনো করতালি দেয় না।
সে শুধু তোমার কানের কাছে ঝুঁকে একটি অসম্ভব বাক্য ফিসফিস করে—
"যে মানুষ ভোরেরও আগে জেগে ওঠে, তার জন্য প্রতিটি সকাল নয়, প্রতিটি নিঃশ্বাসই একটি নতুন উড়ান।"
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন