একটি রাজ্য আছে, যার অস্তিত্ব শুরু হয় ঠিক তখনই, যখন আশার চোখে ঘুম নামে।
সেখানে রাস্তা বাঁধানো অসমাপ্ত কথোপকথন দিয়ে। নদীগুলো উল্টো দিকে বয়ে চলে—গতকালকে বহন করে নিয়ে যায় আগামীকালের দিকে। আর সেই নিস্তব্ধ রাজ্যের আকাশে ঝুলে থাকে এক কালো সূর্য—যে আলো দেয় না, কেবল প্রশ্ন ছড়িয়ে দেয়।
প্রত্যেক পথিক একদিন না একদিন সেখানে পৌঁছায়।
কেউ তার নাম দেয় ব্যর্থতা।
কেউ বলে শোক।
আর অধিকাংশ মানুষ শুধু ফিসফিস করে বলে—
"আজ আমার দিনটা খুব খারাপ যাচ্ছে।"
কিন্তু সেই রাজ্য মৃদু হেসে ওঠে। কারণ সে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রতারিত করেছে এই বিশ্বাস করিয়ে যে একটি ঋতুই যেন সমগ্র জলবায়ু।
সেই রাজ্যের সবচেয়ে প্রবীণ বাসিন্দার নাম সন্দেহ।
ভাষারও আগে যার জন্ম।
তার গায়ে এমন এক আলখাল্লা, যা বোনা হয়েছে ভুলে যাওয়া অপমান দিয়ে। তার হাতে এক আয়না—জমাট বাঁধা অশ্রু কেটে বানানো।
সে আয়নার একটিই অলৌকিক ক্ষমতা—
তোমার প্রতিটি ভুলকে পাহাড়ের মতো বড় করে দেখানো, আর তোমার প্রতিটি বিজয়কে ধুলোর দানায় পরিণত করা।
তুমি যখন তার দিকে তাকাও—
তোমার ক্ষুদ্রতম ব্যর্থতাও পর্বত হয়ে দাঁড়ায়।
তোমার শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলো বাতাসে মিলিয়ে যায়।
আয়নাটি ফিসফিস করে বলে—
"এটাই তুমি।"
আর তুমি বিশ্বাস করে ফেলো।
এভাবেই সেই রাজ্য টিকে থাকে।
«"সবচেয়ে বড় মিথ্যা কখনো উচ্চস্বরে বলা হয় না; একই ফিসফিসানি বারবার শুনতে শুনতে একসময় সেটাই স্মৃতি বলে মনে হয়।"»
হঠাৎ তোমার পায়ের নিচের মাটি নিঃশ্বাস নিতে শুরু করে।
মাটির বুক চিরে উঠে আসে অসংখ্য শহর—
ইট-পাথরের নয়,
বরং তোমারই ফেলে আসা পরিচয়গুলোর শহর।
সেখানে হাঁটছে সেই শিশু, যে বিশ্বাস করত কৌতূহলের মূল্য করতালির চেয়ে বেশি।
সেখানে হাঁটছে সেই কিশোর, যে অসম্ভব স্বপ্নকে সাধারণ ঠিকানা মনে করত।
সেখানে হাঁটছে সেই ক্লান্ত প্রাপ্তবয়স্ক, যে বিস্ময়ের বদলে তুলনাকেই জীবন বানিয়ে ফেলেছিল।
তারা একে অপরকে চিনতে পারে না।
কী আশ্চর্য ট্র্যাজেডি!
যেখানে তারা সবাই একই বইয়ের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।
অথচ সেই রাজ্য তোমাকে বিশ্বাস করাতে চায়—
একটি মাত্র পাতাই যেন পুরো বই।
আর আমরা অবলীলায় তা মেনে নিই।
আকাশের অনেক ওপরে বিশাল কালো কাকেরা ঘুরে বেড়ায়।
তাদের প্রত্যেকের ঠোঁটে মানুষের মন থেকে চুরি করা কিছু বাক্য—
"আমি যথেষ্ট ভালো নই।"
"সবাই আমার থেকে অনেক এগিয়ে।"
"অনেক দেরি হয়ে গেছে।"
"হয়তো আমার মধ্যে কখনোই সেই যোগ্যতা ছিল না।"
কাকগুলো এসব চিন্তা সৃষ্টি করে না।
তারা কেবল সেই ভাবনাগুলোই ফিরিয়ে ফিরিয়ে আনে, যেগুলোকে মানুষ প্রশ্ন করতে শেখেনি।
তুমি যদি তাদের বিশ্বাস খাওয়াও,
তারা তোমার আকাশ দখল করবে।
তুমি যদি সত্য দিয়ে তাদের উপবাসী রাখো,
তারা একদিন অদৃশ্য হয়ে যাবে।
«"প্রতিটি ভয়ই বেঁচে থাকে ধার করা বিশ্বাসের ওপর।"»
শহরের পরেই এক মরুভূমি।
সেখানে কাঁটাঝোপের মতো জন্মায় ঘড়ি।
প্রতিটি ঘড়ির সময় আলাদা।
একটি বলে—
"তোমার অনেক দেরি হয়ে গেছে।"
আরেকটি বলে—
"এখনও সময় আসেনি।"
তৃতীয়টি একেবারেই থেমে আছে।
মানুষ সারাজীবন এই ঘড়িগুলোর সঙ্গে তর্ক করতেই কাটিয়ে দেয়।
শুধু এক বৃদ্ধ পথিক হেঁটে চলে।
তুমি জিজ্ঞেস করো—
"কোন ঘড়িটা ঠিক?"
বৃদ্ধটি এমন হেসে ওঠে যে তার দাড়ি থেকে বালু ঝরে পড়ে।
সে বলে—
"কোনোটাই নয়।"
"আত্মা কোনোদিন হাতঘড়ি পরে না।"
তারপর সে তোমার হাতে একটি বালুঘড়ি তুলে দেয়।
সেখানে বালু নয়—
ঝরে পড়ছে সিদ্ধান্ত।
প্রতিটি কণা হলো অনিশ্চয়তার মাঝেও এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
প্রতিটি পতিত কণা ধীরে ধীরে গড়ে তোলে—
সাফল্য নয়—
চরিত্র।
কারণ সাফল্য ধার করা যায়।
চরিত্র নয়।
«"সময় প্রথমে প্রতিভাকে পুরস্কৃত করে না; সে পুরস্কৃত করে অধ্যবসায়কে।"»
রাত আরও গভীর হয়।
তুমি পৌঁছাও এমন এক অরণ্যে, যেখানে গাছগুলো ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে তৈরি।
ডালপালাগুলো নিচের দিকে বাড়ে।
শিকড়গুলো ফুল হয়ে আকাশের দিকে ফুটে ওঠে।
সবকিছুই যুক্তির বিরুদ্ধে।
এটাই হয়ে ওঠার অরণ্য।
এখানে প্রতিটি পরাজয় নিজের পেশা বদলে ফেলে।
ব্যর্থতা হয়ে যায় উর্বর মাটি।
অপমান হয়ে যায় বিনয়।
নিঃসঙ্গতা হয়ে ওঠে এক মঠ, যেখানে প্রজ্ঞা আস্তে কথা বলতে শেখে।
হৃদয়ভঙ্গও এখানে এক ভাস্কর—যে ভালোবাসাকে মালিকানা নয়, মুক্তি হিসেবে চিনতে শেখায়।
অরণ্য কোনো প্রশ্ন করে না।
সে কেবল রূপান্তর ঘটায়।
কেবল মানুষই মৃত পরিচয় আঁকড়ে ধরে থাকে।
গাছেরা তা করে না।
প্রতিটি শরতে তারা নিজেদের ছেড়ে দেয়।
প্রতিটি বসন্তে তারা আবার ফিরে আসে—
কোনো লজ্জা ছাড়াই।
কোনো গাছ কোনোদিন শীতের কাছে ক্ষমা চায় না।
«"ঋতুরা কখনো বিশ্রামকে দুর্বলতা ভাবে না। তবে মানুষ কেন ভাবে?"»
অরণ্যের শেষে এক অসম্ভব সমুদ্র।
তার ঢেউগুলো তৈরি হয় এখনও-না-লেখা ভবিষ্যৎ দিয়ে।
প্রতিটি ঢেউয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে তোমারই এক ভবিষ্যৎ রূপ—
যে ধৈর্য শিখেছে।
যে ক্ষমা করতে পেরেছে।
যে শৃঙ্খলাকে বন্ধু বানিয়েছে।
যে করতালির ওপর নির্ভর না করেও আনন্দ খুঁজে পেয়েছে।
তারা তোমার দিকে হাত নাড়ে।
কিন্তু তারা তোমার কাছে আসতে পারে না।
তোমাকেই তাদের হয়ে উঠতে হবে।
সমুদ্র কোনো শর্টকাট চেনে না।
সে কেবল একটাই মূল্য চায়—
এগিয়ে চলো।
ভয় নিয়েও।
বিশেষ করে ভয় নিয়েই।
«"ঝড় তোমার সহ্যশক্তি মাপে; তোমার মূল্য নয়।"»
অবশেষে ভোর হয়।
কালো সূর্যের বুক ফেটে বেরিয়ে আসে এক সাধারণ সূর্যোদয়।
অলৌকিক কিছু নয়।
শুধু বিশ্বস্ত।
শুধু ধৈর্যশীল।
শুধু আরেকটি পদক্ষেপ নেওয়ার মতো আলো।
তখন তুমি বুঝতে পারো—
আলো কোনোদিন অন্ধকারের সঙ্গে তর্ক করে তাকে হারায়নি।
সে কেবল নিজের অস্তিত্ব দিয়ে অন্ধকারকে অতিক্রম করেছে।
রাজ্যটি মিলিয়ে যেতে থাকে।
কাকেরা উড়ে যায়।
ঘড়িগুলো বালিতে ভেঙে পড়ে।
আয়নাটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।
মরুভূমিতে ফুল ফোটে।
অরণ্য পাতার শব্দে হাসে।
আর সন্দেহ—সেই প্রাচীন রাজা—নিজের মুকুট খুলে নতজানু হয় সত্যের সামনে।
সত্যটি আশ্চর্য রকমের সরল।
একটি খারাপ দিন তোমার শরীরকে ক্লান্ত করতে পারে।
তোমার আত্মবিশ্বাসে আঘাত করতে পারে।
তোমার দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দিতে পারে।
কিছু সময়ের জন্য আশাকেও নীরব করে দিতে পারে।
কিন্তু—
সে কখনো তোমার সত্তাকে নতুন করে লিখতে পারে না।
তোমার বছরের পর বছর ধরে অর্জিত শিক্ষা কেড়ে নিতে পারে না।
তোমার ক্লান্তির নিচে লুকিয়ে থাকা শৃঙ্খলাকে মুছে দিতে পারে না।
চব্বিশ ঘণ্টার একটি কঠিন দিন কখনোই একটি মানুষের অসীম মূল্যকে মাপতে পারে না।
সেই ক্ষমতা তুমি নিজেই তাকে দাও।
তাই দিও না।
দাঁড়াও।
কারণ দাঁড়িয়ে থাকা সহজ বলে নয়—
বরং পাহাড়কে তার ওপর আছড়ে পড়া ঝড় দিয়ে নয়,
বরং যে ঝড় তাকে নড়াতে পারেনি, তা দিয়েই বিচার করা হয়।
«"একটি ক্ষণিক ছায়াকে কখনো পাহাড়ের প্রকৃত আকৃতি নির্ধারণ করতে দিও না।"»
যখন আবার কোনো কঠিন দিন তোমার দরজায় কড়া নাড়বে—আর সে আসবেই—
তাকে সর্বজ্ঞ বিচারক নয়,
একজন অনিচ্ছুক শিক্ষক হিসেবে স্বাগত জানাও।
তার কাছ থেকে শিক্ষা নাও।
তার অভিযোগ ফিরিয়ে দাও।
তার পাঠ রেখে দাও।
তার মিথ্যা বাতাসে ছেড়ে দাও।
তারপর আবার হাঁটতে শুরু করো।
কারণ একটি খারাপ দিন কোনোদিন তোমার সমগ্র জীবনকে পুনর্লিখন করতে পারে না।
সেটি কেবল সেই বিশাল ক্যানভাসের একটি তুলির আঁচড়—যার পূর্ণ ছবি দেখার মতো দূরে তুমি এখনও পৌঁছাওনি।
«"তুমি নিজের মূল্য অর্জন করছ না; তুমি কেবল আবিষ্কার করছ যে সেই মূল্য সবসময়ই তোমার মধ্যে ছিল।"»
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন