মানবতাই শেষ ধর্ম ?
তাহলে বলো—
যে বেদীতে বিবেককে বহু আগেই প্রশ্নহীন নিশ্চিততার সাথে দেবতার উদ্দেশে বলি দেওয়া হয়েছে, তার সামনে কীভাবে নতজানু হবে মানুষ?
কীভাবে তুমি একটি প্রসারিত হাত বাড়াবে সেই ছায়ার দিকে, যে নিজের আত্মাকেই কেটে ফেলে দিয়েছে এবং এখন গ্রহণের ধাতু দিয়ে গড়া মুকুটের মতো নিজের অন্ধ বিশ্বাস মাথায় পরে হাঁটে?
সে আসে—
পদধ্বনি ছাড়া।
ক্রোধ ছাড়া।
যুক্তি ছাড়া।
শুধু একটি ছুরির নিষ্কলুষ নীরবতা নিয়ে—যে ছুরি তোমার নাম জানার বহু আগেই তোমার মৃত্যুর মহড়া দিয়ে রেখেছে হালাল আড়াই প্যাঁচে।
তুমি তাকে আসতে শুনতে পাও না।
অন্ধকার কখনো নিজের আগমনের ঘোষণা দেয় না।
সে কেবল দিনের আলোর ছদ্মবেশ ধার করে, যতক্ষণ না তোমার মেরুদণ্ড আবিষ্কার করে সেই সত্য, যা তোমার চোখ কোনোদিন দেখতে পারেনি।
ততক্ষণে ছুরিটি তোমার দ্বিতীয় হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়েছে।
যে আয়নায় আর কোনো মুখের প্রতিবিম্ব নেই, আছে শুধু একটিমাত্র মতবাদের মুখোশ—তার সামনে করুণার চেহারা কেমন হয়?
যে বিবেক স্বেচ্ছায় নিজেকে পবিত্র নিশ্চিততার তুষারধসে কবর দিয়েছে—যেখানে প্রতিটি প্রশ্নকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে এবং প্রতিটি সন্দেহকে পাথরের সমাধিতে সিলমোহর দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে—তাকে কীভাবে উদ্ধার করবে?
এমন কারাগার আছে, যার কোনো দেয়াল নেই।
এমন কবর আছে, যেখানে মৃতেরা হেঁটেই বেড়ায়।
এমন মন্দির আছে, যার ঘণ্টাধ্বনি কেবল চিন্তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেই বাজে।
আর এমন মানুষও আছে, যারা নিজেদের নিশ্চিততার নেশায় এতটাই মত্ত যে বিবেকের হত্যাকেই স্বর্গের কণ্ঠস্বর বলে ভুল করে।
মহাবিশ্ব সেখানে উচ্চারিত প্রার্থনার হিসাব রাখে না।
সে শুধু প্রার্থনার পর নেমে আসা নীরবতার হিসাব রাখে।
হয়তো নরক পৃথিবীর নিচে কোথাও নয়।
হয়তো নরক সেই মুহূর্ত, যখন একজন মানুষ আর আরেকজন মানুষের আর্তনাদ শুনতে পায় না—আর সেই বধিরতাকেই পুণ্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
নেকড়ে অন্তত জানে যে সে নেকড়ে।
ঝড় জানে, সে কেবল বাতাস।
অতল গহ্বর কখনো নিজেকে ফুলের বাগান বলে পরিচয় দেয় না।
শুধু অন্ধ গোঁড়ামিতে গ্রাস করা বিবেকই মুক্তির মুখোশ পরে নীরবে তোমার পিঠের পেছনে অদৃশ্য ছুরিটিকে শান দেয়।
তাই বলো—
যখন মানবতা এমন এক আত্মার সামনে দাঁড়ায়, যে স্বেচ্ছায় নিজের মানবিকতাকেই নির্বাসনে পাঠিয়েছে—
তখন কি মানবতাকে জল্লাদকেই আলিঙ্গন করতে হবে?
নাকি আগে রক্ষা করতে হবে সেই ক্ষুদ্র, কাঁপতে থাকা শিখাটিকে, যার নামই মানবতা?
কারণ আলোও একটি আদেশ মানে—যে আদেশ নক্ষত্রেরা কোনোদিন অমান্য করেনি—
আলো জন্মেছে জীবিতদের পথ আলোকিত করার জন্য;
নিজের অস্তিত্বই নিভিয়ে ফেলতে বেছে নেওয়া অন্ধকারের সঙ্গে আপস করার জন্য নয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন