শুতে কার না ভালো লাগে! তাবলে
মানুষ কি শুধুই শরীরের ক্ষুধা নিয়ে জন্মায়?
না।
তার ভিতরে আরও কত গোপন সমুদ্র থাকে, যেখানে আদর এসে ঢেউ হয়ে ভাঙে, আর একাকীত্ব মাছরাঙার মতো বসে থাকে ভাঙা বিকেলের তারের উপর।
কেউ কেউ ভালোবাসাকে শুধু আগুন বলে ভুল করে, কিন্তু আমি দেখেছি— আগুনেরও পরে থাকে ছাই, আর ছাইয়েরও পরে থাকে এক অদ্ভুত নীরব উষ্ণতা, যেখানে দুটি ক্লান্ত প্রাণ কেবল একে অপরের পাশে শুয়ে থাকলেই মহাবিশ্ব একটু শান্ত হয়ে যায়।
শরীরের উৎসব ক্ষণিক, যেন বজ্রপাতের আলোয় হঠাৎ আলোকিত হয়ে ওঠা কোনো পর্বতশৃঙ্গ।
কিন্তু আত্মার সঙ্গ— সে তো ধীর নদী, যে বছরের পর বছর একই পাথরকে স্পর্শ করতে করতে তাকে মসৃণ করে তোলে।
তাই, মন্থন কার না ভালো লাগে! তাবলে সবকিছুকে কি শুধুই বিছানার ভাষায় অনুবাদ করা যায়?
সব ফুল কি সুগন্ধের জন্য ফোটে? সব গান কি নাচের জন্য জন্মায়? সব চাঁদ কি জোয়ারের জন্যই আকাশে ওঠে?
না।
কিছু কিছু স্পর্শের কাজ শুধু মানুষকে মানুষ করে তোলা।
আর কিছু ভালোবাসা আছে, যারা শরীরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেও শেষ পর্যন্ত এসে বসে হৃদয়ের সবচেয়ে নির্জন ঘরে—
যেখানে কামনা ধীরে ধীরে নিজের পোশাক খুলে পরিণত হয় নিঃশব্দ মমতায়।
আর তখন—
বিস্মিত হয়ে দেখা যায়, যে কামনা ছিল একসময় বুনো ঘোড়া, সে এখন সন্ধ্যার মাঠে ঘাস খায় শান্ত হয়ে।
দুটি মানুষের মাঝখানে আর কোনো যুদ্ধ থাকে না। থাকে না জয়ের অহংকার, থাকে না পরাজয়ের লজ্জা।
থাকে শুধু একটি দীর্ঘ শ্বাসের মতো সহাবস্থান, যেন দুইটি নক্ষত্র অসংখ্য আলোকবর্ষ দূরে থেকেও পরস্পরের টানে একই মহাজাগতিক নৃত্যে অংশ নিচ্ছে।
আমি দেখেছি, যারা কেবল শরীর খোঁজে তারা প্রায়ই ফিরে আসে শূন্য হাতে।
কারণ শরীরের দরজা খুলে দেওয়া সহজ, কিন্তু আত্মার জানালাগুলো বহু জন্মের ধৈর্য চায়।
একদিন বার্ধক্য আসবে।
চামড়ার উপর সময়ের ভাঁজ পড়বে, চোখের নিচে জমবে ক্লান্তির অর্ধচন্দ্র, আর একসময়ের উন্মত্ত রক্ত ধীরে ধীরে নদী থেকে হ্রদে পরিণত হবে।
সেদিন, যে মানুষটি তোমার পাশে বসে চুপচাপ এক কাপ চা এগিয়ে দেবে, তোমার অসুখের ওষুধের সময় মনে রাখবে, তোমার পুরনো গল্প শতবার শুনেও বিরক্ত হবে না—
জেনো, ভালোবাসার প্রকৃত অলৌকিকতা সেখানেই লুকিয়ে ছিল।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষা শুধু ভোগ নয়।
সে চায় আশ্রয়।
সে চায় এমন একটি হৃদয়, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে ফিরে এসে নিঃশব্দে মাথা রাখা যায়।
আর তখন, সমস্ত কামনা, সমস্ত অহংকার, সমস্ত ক্ষণস্থায়ী উন্মাদনা
ধীরে ধীরে গলে গিয়ে
দুইটি মানুষের মাঝখানে একটি ছোট্ট প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠে—
যার নাম,
ঘর।
আর সেই ঘর—
ইট-পাথরের নয়।
সে তৈরি হয় অসময়ে পাঠানো খোঁজখবর দিয়ে, অকারণে রেখে দেওয়া শেষ লুচিখানা দিয়ে, রাত তিনটের জ্বরের পাশে ঘুমকে নির্বাসন দেওয়ার অদ্ভুত রাজনীতি দিয়ে।
আমি দেখেছি, অনেক প্রাসাদ ভেঙে পড়েছে কারণ তাদের ভিতরে ঘর ছিল না।
আবার, অনেক ভাড়া-বাড়ির ছোট্ট বারান্দায় বসে থেকেছে স্বর্গ, কারণ সেখানে দুটি মানুষ একটি কম্বলের নিচে নিজেদের অসম্পূর্ণতাকে ক্ষমা করতে শিখেছিল।
বাইরে তখন পৃথিবী অর্থ, প্রতিযোগিতা, অহংকার আর অসংখ্য বিজ্ঞাপনের শব্দে নিজেকে ছিঁড়ে ফেলছে।
কিন্তু তাদের ঘরের ভিতরে একটি পুরনো ঘড়ি ধীরে ধীরে সময়কে চা খাওয়াচ্ছে।
বৃষ্টির শব্দ এসে জানালায় বসে গল্প বলছে।
অন্ধকারও সেখানে ভয়ংকর নয়— কারণ অন্ধকারেরও তো ইচ্ছে করে কোথাও একটু নিরাপদে বসতে।
আর যখন একদিন দুজনের একজন অপরজনের আগে চলে যাবে—
হ্যাঁ, সেই অনিবার্য বিদায়, যার জন্য কোনো মানুষ কখনোই যথেষ্ট প্রস্তুত হতে পারে না—
তখন যে মানুষটি থেকে যাবে, সে হঠাৎ বুঝবে,
ভালোবাসা আসলে কাউকে অধিকার করার নাম ছিল না।
ভালোবাসা ছিল নিজের ভিতরে আর-একটি হৃদয়ের জন্য একটি স্থায়ী আসন নির্মাণ করা।
তাই মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু পদচিহ্ন রয়ে যায় বালিশের ভাঁজে, কিছু হাসি আটকে থাকে পর্দার কাপড়ে, কিছু ডাকনাম চিরকাল ঘুরে বেড়ায় ঘরের বাতাসে।
আর গভীর রাতে, যখন সমস্ত পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে,
তখন মনে হয়—
কোথাও কোনো নক্ষত্রের আড়ালে সে এখনও বসে আছে,
এবং মহাবিশ্বের বিশাল নীরবতার মধ্যেও খুব আস্তে, খুব পরিচিত স্বরে বলছে—
“আমি আছি। তুমি একা নও।”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন