একজন মানুষ জন্মায় তার পাঁজরের ভেতর সিল করা এক কুঠুরি নিয়ে—
ফাঁকা নয়,
বরং ভিড় করা এক ঘন, শ্বাস-নেওয়া অন্ধকারে ভরা,
যে তার নাম জানে,
সে কথা বলতে শেখার আগেই।
ওটা নীরবে খায়।
স্থগিত সিদ্ধান্তের ওপর,
ধার করা বিশ্বাসের ওপর,
দেখে না-দেখে বেঁচে থাকার নরম পচনে।
সে একে বলে বেঁচে থাকা।
ওটা তাকে ডাকে—ঘর।
বছর কেটে যায় অন্ধ করিডরের মতো।
সে হাঁটে,
অভ্যাসের দেয়াল ছুঁয়ে,
যন্ত্রণার অনুপস্থিতিকেই
শান্তির উপস্থিতি ভেবে ভুল করে।
তারপর এক রাতে—
তার ভেতরে কিছু ভেঙে পড়ে।
কোনো বজ্রপাত নয়।
কোনো ঈশ্বরীয় হস্তক্ষেপ নয়।
শুধু এক ধীর, অসহনীয় বোধ—
অন্ধকারটা বাইরে নয়,
ভেতর থেকে তাকে খেয়ে ফেলছে,
কোষে কোষে,
পছন্দে পছন্দে।
সে খুঁজে পায় না কোনো মশাল,
কোনো শাস্ত্র,
কোনো উদ্ধারকারী হাত—
শুধু এক নিষ্ঠুর স্ফুলিঙ্গ,
তার ইচ্ছাশক্তির অস্থিমজ্জায় লুকোনো।
যখন সে সেটাকে জ্বালায়,
তা আলো দেয় না—
তা অভিযোগ তোলে।
আগুন উঠে দাঁড়ায় রায়ের মতো।
তা তাকে উষ্ণ করে না,
তা তাকে জেরা করে।
সে যত মিথ্যে রিহার্সাল করেছে,
যত আরামে নিজেকে বেঁধে রেখেছে,
নিজের হয়ে ওঠাকে যতবার ছোট করেছে—
সব একে একে ভেসে ওঠে,
দাফন হতে অস্বীকার করা মৃতদেহের মতো।
আর আগুন বলে—
পুড়িয়ে দাও।
নরম করে নয়।
প্রতীকীভাবে নয়।
সম্পূর্ণ।
তাই সে শুরু করে।
সে তার অজুহাতগুলো দেয়—
ওগুলোই সবচেয়ে জোরে চিৎকার করে।
সে তার নির্ভরশীলতাগুলো দেয়—
ওগুলো ভেজা কাপড়ের মতো লেগে থাকে।
সে তার ভ্রমগুলো দেয়—
ওগুলো ধীরে পুড়ে,
ধোঁয়া ছাড়ে,
যা তাকে অন্ধ করে
ছেড়ে যাওয়ার সময়েও।
সবচেয়ে ভয়ংকরটা শেষে আসে—
নিজের সেই অংশগুলো,
যেগুলোকে সে একসময় পরিচয় ভেবেছিল।
ওগুলো সহজে পুড়ে না।
অনুনয় করে।
দরকষাকষি করে।
তাকে মনে করিয়ে দেয়—
সে আগে কে ছিল।
আগুন শোনে না।
এবং সেও আর পারে না।
যা থাকে তা বিজয় নয়—
বরং ক্ষয়।
কম মানুষ।
বেশি আগুন।
তার ছায়া মুছে যায়,
কারণ তা জয় করা হয়নি,
বরং আর কোনো কঠিন সত্তা নেই
যে ছায়া ফেলবে।
তার কাছে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে ওঠে—
পবিত্র বলে নয়,
উজ্জ্বল বলে নয়—
বরং নির্মমভাবে নির্ভুল বলে।
এক চলমান উন্মোচন—
যেখানে অন্যরা যা লুকিয়েছে,
সব প্রকাশ পেতে থাকে।
সে শেখায় না।
সে সংক্রমিত করে।
মানুষ তার কাছ থেকে ফিরে যায় অস্বস্তি নিয়ে,
তাদের আরামের ভিত নড়ে যায়,
তাদের যত্নে সাজানো অন্ধকার
কাঁপতে শুরু করে।
কেউ তাকে অভিশাপ দেয়।
কেউ এড়িয়ে চলে।
কেউ ভেতরে কিছু জ্বলে উঠতে দেখে
আর সারাজীবন চেষ্টা করে
তা নিভিয়ে দিতে।
কয়েকজন—
খুবই অল্প—
মূল্যটা বোঝে।
তারা দেখে সে কী হয়েছে:
আলোকিত নয়,
বরং ভস্মীভূত।
একজন মানুষ,
যে আগুনকে বেছে নিয়েছে
আর শান্তিতে মানুষ থাকার অধিকার হারিয়েছে।
তবুও—
সে থামে না।
কারণ একবার জেগে ওঠা আগুন
বিশ্রাম মানে না।
তা খায় যা বাকি,
তারপর যা থাকতে পারত,
তারপর সেই ধারণাকেও
যে কিছু থাকার কথা।
যতক্ষণ না আলো নিজেই
আর কোমল থাকে না—
বরং এক নির্মম, অন্তহীন দহন,
যেখানে কিছুই টিকে থাকে না
শুধু পুড়ে যাওয়ার ঘটনাটা ছাড়া।
আর সেই ভয়াবহ উজ্জ্বলতায়
মুক্তি নেই—
শুধু এই চূড়ান্ত প্রতিধ্বনি:
চরৈবেতি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন