মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

নিরাপদ

দুইটি আহত মানুষ
যখন পরস্পরের প্রেমে পড়ে,
তখন পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম
তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়
ভাঙবার জন্য।

তারা আর সাধারণ প্রেমিক থাকে না—
তারা হয়ে ওঠে
দুইটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতা
যারা নিজেদের ভাঙা ইট দিয়ে
নতুন এক মহাবিশ্ব নির্মাণ করতে বসেছে।

পুরুষটির চোখে তখনও শুকিয়ে না যাওয়া যুদ্ধ ছিল।
সে বহু বছর ধরে মানুষের ভেতর
গোপনে বসবাস করা নিষ্ঠুরতা দেখেছে।
বিশ্বাসঘাতকতার দাঁত
কীভাবে ধীরে ধীরে আত্মাকে কুরে খায়
সে জানতো।
তাই প্রথম প্রথম
সে কারও চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারতো না।
কারণ দীর্ঘক্ষণ তাকালে
সে মানুষের মুখের উপর
লুকিয়ে থাকা নেকড়েটাকে দেখতে পেত।

আর নারীটি—
সে যেন ছিল
পুড়ে যাওয়া কোনও গির্জার শেষ জানালা।
তার ভেতরেও বহু মৃত পাখি জমে ছিল।
কেউ তাকে ভালোবেসে ফেলে যায়নি—
বরং ব্যবহার করেছে
একটি অস্থায়ী আশ্রয়স্থলের মতো।
তার হাসির নিচে
একটি কবরখানা ছিল
যেখানে অসংখ্য অসমাপ্ত স্পর্শ
রাতের বেলায় উঠে দাঁড়াতো।

তারপর একদিন
তাদের দেখা হলো।

না—
এটা দেখা হওয়া ছিল না।
এটা ছিল
দুইটি আহত নক্ষত্রের
অদৃশ্য মহাকর্ষে
পরস্পরের দিকে ধীরে ধীরে টেনে যাওয়া।

তারা প্রথম দিন থেকেই বুঝেছিল
এখানে খেলা নেই।
এখানে অভিনয় নেই।
এখানে ‘কুল’ থাকার কোনও প্রয়োজন নেই।
কারণ তারা উভয়েই জানতো
জীবন খুব ছোট
এবং মৃত্যু
অপেক্ষা করতে জানে না।

তাই তাদের ভালোবাসায়
লাগাম ছিল না কোনও।

পুরুষটি নারীর কণ্ঠ শুনলে
মনে করতো
কেউ যেন তার বুকের মধ্যে
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জানালাগুলো খুলে দিয়েছে।
নারীটি পুরুষটির ক্লান্ত মুখ দেখলে
মনে করতো
এমন একজন মানুষকে সে পেয়েছে
যার পাশে বসে
নিজের সমস্ত যুদ্ধ নামিয়ে রাখা যায়।

তারা একে অপরকে
অসভ্য রকমের গভীরতায় ভালোবাসতো।

যেভাবে ডুবে যাওয়া মানুষ
শেষ বাতাসকে আঁকড়ে ধরে।
যেভাবে মরুভূমি
এক ফোঁটা জলের জন্য
সম্পূর্ণ আকাশের কাছে মাথা নত করে।
যেভাবে বহুদিন অন্ধকারে থাকা ঘর
হঠাৎ সূর্যের দিকে দরজা খুলে দেয়।

এবং আশ্চর্য ব্যাপার হলো—
তাদের এই প্রেম
তাদের কামুক করেনি,
বরং নির্মল করেছে।

কারণ যারা সত্যিই
ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়,
তারা প্রায়শই
মানুষের শরীরের ভেতর
একটি ক্লান্ত আত্মাকে দেখতে শেখে।

তাই সেই পুরুষটির পক্ষে
একজন নারীকে
শুধু শরীর হিসেবে ভাবা আর সম্ভব ছিল না।
সে নারীদের মধ্যে
ক্ষত, ইতিহাস, ভয়, অসমাপ্ত শৈশব
এবং অদৃশ্য কান্না দেখতে পেত।

নারীটির ক্ষেত্রেও
একই সত্য ছিল।
সে বুঝতো—
বেশিরভাগ পুরুষের রূঢ়তার পেছনেও
একটি আহত বালক বসে থাকে
যে কোনওদিন
ঠিকমতো ভালোবাসা পায়নি।

এই কারণেই
তারা বিপরীত লিঙ্গের মানুষের
অসাধারণ বন্ধু হতে পারতো।

কারণ তাদের চোখে
মানুষ আর শিকার ছিল না।
ছিল না কোনও গোপন শিকারি ক্ষুধা।
ছিল না প্রলোভনের দাঁত।

তারা জানতো—
ভালবাসা মানে শুধু অধিকার নয়।
ভালবাসা মানে কখনও কখনও
কারও পাশে এমনভাবে বসা
যেন তার আত্মা
তোমার উপস্থিতিতে নিরাপদ বোধ করে।

এবং পৃথিবীতে
এর চেয়ে বিরল সৌন্দর্য
খুব বেশি নেই।

কারণ অধিকাংশ মানুষ
ভালবাসার ভেতরেও
ক্ষমতা খোঁজে।
অধিকার খোঁজে।
গোপন বিজয় খোঁজে।

কিন্তু দুইটি সত্যিকারের আহত মানুষ—
যারা একে অপরের অন্ধকারে
নিজেদের পুরনো রক্তের গন্ধ চিনে ফেলে—
তারা প্রায়শই
প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে:

মানুষকে ছুঁয়ে দেওয়ার
সবচেয়ে পবিত্র উপায়
হলো তাকে নিরাপদ অনুভব করানো।

কোন মন্তব্য নেই: