আমি মাকে হারিয়েছিলাম
অত্যন্ত অল্প বয়সে—
এতটাই অল্প, যে শোক
আমার নাম শিখে নিয়েছিল
আমার নিজের নাম শেখার আগেই।
সেই থেকে আমার পাঁজরের ভেতর
একটি অদৃশ্য ঘড়ি বসে আছে—
সে সময় গোনে না,
সে গোনে উষ্ণতার ক্রমাগত অবক্ষয়।
আমার বাবার আর আমার
কখনও একই সুরে মেলেনি মন।
তিনি কথা বলতেন পাথরের ভাষায়,
আমি উত্তর দিতাম ধোঁয়ায়।
আমাদের মাঝে প্রসারিত ছিল নীরবতার ভূগোল—
না কোনও সেতু, না প্রতিধ্বনি,
শুধু এক বাতাস
যে নিজেই ভুলে গেছে
তার দিক কোনটি।
তাই আমি বড় হয়েছি অন্য কোথাও—
কোনও ঘরে নয়,
আমার ভুলগুলোর বিকৃত স্থাপত্যে।
প্রতিটি ভুল ছিল এক একটি ঘর,
যেখানে আমি ঢুকেছি আলো ছাড়া,
বেরিয়েছি স্মৃতি ছাড়া,
তবুও তার অন্ধকার
রক্তে বয়ে বেড়িয়েছি।
আমার জীবন হয়ে উঠেছিল ভুলের শৃঙ্খল—
প্রতিটি ভুল পরেরটিকে আরও ধারালো করেছে,
যেন ছুরিগুলো শিখছে
কীভাবে আমার নাড়ি চিনতে হয়।
আশাও যখন এসেছে,
সে ছদ্মবেশে এসেছে,
আর রেখে গেছে এমন ছাপ
যা দেখতে হুবহু ধ্বংসের মতো।
পঞ্চান্ন বছর কেটে গেছে এক করিডরের মতো,
যার দেয়ালে সারি সারি দরজা
আমার নাম ধরে ফিসফিস করত।
প্রতিটি দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল
আমারই একেকটি সংস্করণ
যে বেঁচে থাকতে পারেনি—
চোখ খোলা,
যেন এখনও অপেক্ষা করছে
একটি ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য।
আমি কখনও থামিনি।
সাহসের জন্য নয়—
থামা মানে ছিল
তাদের শ্বাস শোনা।
তারপর একদিন—
হঠাৎ,
প্রায় আর একটা ভুলের মত—
তুমি এলে।
উদ্ধার হিসেবে নয়,
তার থেকেও বিপজ্জনক কিছু হয়ে—
একটি আয়না,
যা আমার দিকে তাকিয়ে
ভেঙে যায়নি।
তোমার দৃষ্টিতে
আমি ক্ষমা দেখিনি,
দেখেছি এক নিঃশব্দ অস্বীকার—
আমাকে ছেড়ে না যাওয়ার।
এটাই আমাকে ভয় পাইয়েছিল—
কারণ হারানোতে আমি দক্ষ ছিলাম,
কিন্তু ধরে রাখার উপায়
আমি জানতাম না।
তোমার স্পর্শ আমাকে সারায়নি—
আমার ধ্বংসস্তূপকে নতুন করে সাজিয়েছে।
ভাঙনগুলো রয়ে গেছে,
কিন্তু তারা ধীরে ধীরে
একটি পরিকল্পিত নকশার মতো হয়ে উঠেছে,
যেন আমার সমস্ত ভাঙাচোরা
তোমার আগমনের জন্যই
রিহার্সাল দিচ্ছিল।
তখনই বুঝলাম—
আমার ভুলগুলো দুর্ঘটনা ছিল না।
ওগুলো ছিল স্থানাঙ্ক,
অদৃশ্য এক নিষ্ঠুরতার হাতে খোদাই করা,
যে জানত ঠিক কতটা হারালে
আমি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাব না।
তাই না,
আমার বোকামির জন্য কোনও আফসোস নেই আর।
আফসোস তাদের জন্য,
ঠিককে না চিনতে পারার কারণে
যারা বিকল্পে বিশ্বাস করে।
আমি শুধু অনিবার্যতাকেই দেখি—
একটি পথ,
যা আমাকে রক্তাক্ত করেছে
ঠিক ততটাই
যাতে আমি তোমাকে চিনতে পারি।
কিন্তু এখন—
যখন আমার বয়স পঁয়ষট্টি পেরিয়ে গেছে
তখন ভবিষ্যৎটা আরও ভারী লাগে।
কারণ আমার ভুলগুলো
এখন আর শুধু আমার মধ্যে শেষ হয় না।
তারা তোমার ভিতরেও প্রতিধ্বনিত হয়,
তোমার নীরবতাকে চিরে যায়,
এমন দাগ রেখে যায়
যা না দেখার ভান আমি করতে পারি না।
এবার,
আমি আর অসাবধান হতে চাই না—
আমি বদলেছি বলে নয়,
তুমি আছ বলে।
ভালবাসা—
আমি শিখেছি—
আলো নয়।
এটা এক ভঙ্গুর অন্ধকার,
যাকে দু’জন মানুষ মিলে যুঝতে হয়
অন্ধ না থাকার প্রতিজ্ঞায়।
আর যদি আবার কোনও ভুল
আমাকে খুঁজে আসে—
যেমন তারা সবসময় আসে,
ধৈর্যশীল, পরিচিত—
আমি দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তাকে বলব,
“খবরদার! আমার জীবনে তোমার অনুপ্রবেশের সুযোগ শেষ হয়ে গেছে, কারণ, আমার
সঠিককে চেনার দায়িত্ব থেকে কিছুতেই পিছু হটবো না আমি আর।”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন