রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

নারীত্বের গল্প

আটত্রিশে আমি ছিলাম সাইজ সিক্স।
চুয়াল্লিশে আমি সাইজ ফোরটিন।
একই খাদ্যাভ্যাস। একই জীবনযাপন। একই নারী।
ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিলেন— “হরমোন।”
আমি তিন বছর ধরে সেই শব্দটাকে বিশ্বাস করেছিলাম।
তিন বছর। চল্লিশ পাউন্ড।
আর একটানা ক্ষয়ে যাওয়া আত্মসম্মান।

কিন্তু সেটা হরমোন ছিল না।
শোনাবো তোমাকে সেই তিন বছরের কাহিনি—
যা আসলে ছিল এক ধীর, নীরব ডুবে যাওয়া।

উনচল্লিশে, জিন্সটা হঠাৎ আঁটসাঁট হয়ে উঠল।
“এই সপ্তাহে একটু বেশি খেয়েছি” টাইপ নয়—
বরং “এগুলো আর আমার নয়” টাইপ আঁটসাঁট।
আমি এক সাইজ বড় নিলাম। ভাবলাম— সাময়িক।
চল্লিশে, আরেক সাইজ। তারপর আরেকটা।

আয়না এড়াতে শুরু করলাম।
ঢিলা পোশাকের ভিতর নিজেকে গুটিয়ে নিলাম।
যে কোনো অনুষ্ঠানের কথা শুনলেই বুকের ভেতর কুয়াশা নামত—
সাজতে হবে, উপস্থিত হতে হবে, নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।

একচল্লিশে অবশেষে ডাক্তারের কাছে গেলাম।
ওজন মাপার যন্ত্রে দাঁড়িয়ে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম।
তিনি চার্ট দেখলেন, আমার বয়স দেখলেন,
আর উচ্চারণ করলেন সেই বহুলপ্রচারিত মন্ত্র—
“পেরিমেনোপজ। স্বাভাবিক। মেটাবলিজম ধীর হচ্ছে। সবারই হয়।”
স্বাভাবিক।

আমার শরীরের ভাঙন— স্বাভাবিক।
তাই আমি আরও চেষ্টা করলাম।
কার্বোহাইড্রেট কমালাম।
ওজন বাড়ল।
চিনি বাদ দিলাম।
ওজন বাড়ল।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করলাম।
ওজন বাড়ল।
ট্রেইনার নিলাম। সপ্তাহে চার দিন ঘাম ঝরালাম।
ওজন বাড়ল।
প্রতি সোমবার নতুন শপথ।
প্রতি শুক্রবার নতুন ভাঙন।
প্রতি মাসে পোশাক আরও আঁটসাঁট,
আর আশা আরও ক্ষীণ।

ডাক্তারের পরামর্শ?
“কম খাও, বেশি নড়াচড়া করো।”
ধন্যবাদ। বিপ্লবাত্মক।
আমি দিনে ১৪০০ ক্যালোরি খেতাম।
সপ্তাহে চার দিন ব্যায়াম করতাম।
সব ঠিক করেও শরীর যেন বলত—
“না। আমি ছাড়ব না।”

তুমি জানো, এটা মানুষের ভিতর কী করে?
যখন তুমি প্রাণপণ চেষ্টা করো
আর শরীর সাড়া দেয় না?
যখন ক্ষুধা সারাক্ষণ তাড়া করে,
ক্লান্তি হাড়ের ভেতর জমে থাকে,
আর দাঁড়িপাল্লা কেবল ওপরে ওঠে?
আমি ভাবতে শুরু করলাম—
আমার ভিতরে কি কোনো অদৃশ্য ভাঙন?
থাইরয়েড? স্বাভাবিক।
রক্তে চিনি? স্বাভাবিক।
হরমোন? “বয়স অনুযায়ী একটু ওঠানামা।”
সবকিছুই “বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক।”

এই বাক্যটার শব্দে আমার আত্মা অবশ হয়ে যাচ্ছিল।
বিয়াল্লিশে আমি হাল ছেড়ে দিলাম।
নাটকীয় নয়—
নীরবে।
ওজন মাপা বন্ধ।
নতুন ডায়েট বন্ধ।
নিজেকে বোঝালাম—
এই ভারী, ক্লান্ত, ফোলা শরীরটাই এখন আমার স্থায়ী ঠিকানা।
স্বামী বলল, “আমি তোকে যেকোনো সাইজে ভালোবাসি।”
মধুর।
কিন্তু আমি নিজেকে মিস করতাম।
আমার শক্তি, আমার চেনা মুখ—
ছবির ভিতর যে নারী তাকিয়ে থাকত,
তাকে চিনতে পারতাম না।

তারপর এক রাতে—
রাত এগারোটায়, ফোনের নীল আলোয় ডুবে,
নিজেকে ঘৃণা করতে করতে স্ক্রল করছিলাম।
এক নারীর পোস্ট চোখে পড়ল।
তিনি লিখেছিলেন—
“চল্লিশের গোড়ায় ৩৫ পাউন্ড বেড়েছিল।
সবাই বলেছিল পেরিমেনোপজ।
আসলে সেটা ছিল আমার স্নায়ুতন্ত্র।”

আমি থেমে গেলাম।
তিনি বললেন—
দীর্ঘস্থায়ী চাপ, যেটাকে আমরা জীবন বলেই স্বাভাবিক করে ফেলি,
শরীরকে বাঁচার মোডে আটকে দেয়।
বেঁচে থাকার মোডে শরীর চর্বি আঁকড়ে ধরে।
মজুত রাখে।
কারণ তার কাছে পৃথিবী এখনও বিপদসংকেতের লাল আলো।

তুমি যত কম খাও,
যত বেশি দৌড়াও—
যদি স্নায়ুতন্ত্র ভাবে তুমি বিপদে,
সে তোমাকে ছাড়বে না।
পেরিমেনোপজের মতোই উপসর্গ—
ক্লান্তি। কুয়াশাচ্ছন্ন মস্তিষ্ক। ওজন বৃদ্ধি। মেজাজের দোলাচল।

চল্লিশ পেরোনো এক নারী দেখলেই
ডাক্তাররা বলে— “হরমোন।”
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না—
তোমার ভিতরে কি চিরস্থায়ী যুদ্ধ চলছে?
সেই রাতে আমি এক অ্যাপ ডাউনলোড করলাম—
নাম তার Liven।

ডায়েট নয়। ব্যায়াম নয়।
বরং স্নায়ুতন্ত্রের সাথে মিত্রতা করার এক ক্ষুদ্র অনুশীলন।
প্রথম সপ্তাহ—
ঘুম একটু ভালো।
সকাল একটু হালকা।
দ্বিতীয় সপ্তাহ—
বিকেলের চিনি-তৃষ্ণা কমে গেল।
শরীর আর আতঙ্কে চিৎকার করছিল না।
তৃতীয় সপ্তাহ—
মাসের পর মাস আলমারিতে ঝুলে থাকা জিন্স
বোতাম লাগল।
অস্বস্তিতে, কিন্তু লাগল।
চতুর্থ সপ্তাহ—
ওজন ছয় পাউন্ড কম।
খাবার বদলাইনি। ব্যায়াম বাড়াইনি।
দিনে পাঁচ মিনিট—
শুধু নিজের স্নায়ুর সঙ্গে কথা বলা।
ষষ্ঠ সপ্তাহ—
এগারো পাউন্ড কম।

স্বামী জিজ্ঞেস করল— “কিছু আলাদা করছ?”
হ্যাঁ।
আমি শরীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামিয়েছি।
অষ্টম সপ্তাহ—
ষোল পাউন্ড কম।
উনচল্লিশের পর যে পোশাক পরিনি,
সেটা আবার গায়ে উঠল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদলাম—
দুঃখে নয়—
“তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?” এই বিস্ময়ে।

চার মাসে আটাশ পাউন্ড কমেছে।
সাইজ সিক্সে ফিরিনি এখনও—
কিন্তু এবার বিশ্বাস করি, ফিরব।
তবে সংখ্যাটা আসল নয়।
আসল হল—
আমি আবার শক্তি পাই।
কফির ভান নয়—
সকালের রোদে প্রস্তুত এক প্রকৃত শক্তি।
ক্ষুধা আর চিৎকার করে না।
শরীর আতঙ্কে জমে থাকে না।
আমি নিজেকে ঘৃণা করি না।
প্রতি সোমবার নতুন করে শুরু করতে হয় না।
আমি কেবল বাঁচি—
আর ওজন নীরবে গলে যায়।

তিন বছর আমি হারিয়েছি ভুল শব্দের কাছে— “হরমোন।”
আসলে ছিল এক স্নায়ুতন্ত্র,
যে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে ছিল।
যেদিন তাকে বললাম—
“বিপদ কেটে গেছে”—
সেদিন শরীর আমাকে ছেড়ে দিল।
হয়তো তোমার গল্পও এমনই—
হয়তো শরীর দোষী নয়,
হয়তো সে শুধু ভীত।
আর কখনও কখনও,
মুক্তি শুরু হয়
যখন আমরা লড়াই থামিয়ে
নিজের ভিতরের কম্পনকে
নরম করে ছুঁয়ে বলি—
“এখন নিরাপদ।”

কোন মন্তব্য নেই: