আজ যদি দেখা হতো আর একবার আমার সেই নিষ্পাপ ষোলো বছর বয়সের সাথে—
আহা, কী আশ্চর্য এক সন্ধ্যা হতো তা!
সময়ের পুরোনো স্টেশনে হয়তো একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকত, যার কোনো গন্তব্য নেই, শুধু ফিরে যায় অর্ধলিখিত দিনগুলোর দিকে।
আমি নামতাম ধীরে, চুলে জমে থাকা অসংখ্য শীতের ধুলো নিয়ে, আর দূরে দেখতে পেতাম তাকে—
একটি ছেলেকে।
চারপাশে মানুষের ভিড়, হাসি, বন্ধুত্বের কোলাহল, অসংখ্য কাঁধ, অসংখ্য নাম, অসংখ্য প্রতিশ্রুতি—
তবু সে দাঁড়িয়ে আছে একটি নির্জন দ্বীপের মতো, নিজেরই ভেতরে নির্বাসিত।
তার চোখে তখনও ভবিষ্যতের সমস্ত ঝড় ঘুমিয়ে আছে বীজের মতো।
সে জানে না, যাদের বন্ধু ভেবে বুক খুলে দিয়েছে, তাদের অনেকেই কেবল পথের ধুলো।
সে জানে না, তার সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলো মানুষের বিরুদ্ধে নয়, নিজের দ্বিধার বিরুদ্ধে।
আমি এগিয়ে যেতাম।
তার হাত ধরতাম।
হয়তো প্রথমে সে ভয় পেত, কারণ আমি তারই মুখ বহন করছি, কিন্তু বহু ঝড়ে ক্ষয়প্রাপ্ত।
আমি মৃদু হেসে বলতাম—
"আমাকে বন্ধু করে নেবে তোমার?
আমি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি।
আমি সেই মানুষ যে তোমার প্রতিটি কান্নার হিসাব জানে, প্রতিটি অপমানের স্বাদ চেনে, প্রতিটি ভুলের কবরের উপর একদিন ফুল ফুটতে দেখেছে।"
তারপর তাকে নিয়ে বসতাম একটি বিশাল লাটাইয়ের পাশে, যার সুতো তৈরি অপূর্ণ স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া সুযোগ, অযথা বিশ্বাস, এবং কিছু দুর্মূল্য সাহস দিয়ে।
বলতাম—
"দেখো, সব ঘুড়ি ধরে রাখা যায় না।
কিছু ঘুড়ি কাটা যাবে।
কিছু আকাশ তোমার জন্য নয়।
কিছু মানুষ শুধু তোমাকে শেখাতে আসবে কাকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
কিন্তু তাই বলে তুমি আর সুতো ছাড়বে না।
কখনও না।
লাটাই ভরতে থাকবে।
দিনের পর দিন।
বছরের পর বছর।
কারণ একদিন তোমার হাতে এমন সুতো জমবে যে তুমি নিজের ভাগ্যকেও ঘুড়ির মতো উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবে।"
চারপাশে তখন আকাশ ভরে যাবে অদ্ভুত সব ঘুড়িতে।
কেউ উড়ছে টাকার বাতাসে, কেউ প্রেমের, কেউ খ্যাতির, কেউ অহংকারের।
আর আমাদের ঘুড়ি?
সে উড়বে আরও ওপরে।
মেঘেরও ওপরে।
যেখানে ব্যর্থতা শুধু বাতাসের আরেকটি নাম, আর প্রত্যাখ্যান দিক পরিবর্তনের একটি সংকেতমাত্র।
আমি তাকে বলতাম—
"ভুল করবে।
অবশ্যই করবে।
মানুষ ভুল ছাড়া বড় হয় না।
কিন্তু কোনো ভুলকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলো না।
কোনো হারকে চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নিও না।
আর কখনও, কখনও নিজেকে একা ভাববে না।
কারণ দেখো—
ছেষট্টি বছরের এক বৃদ্ধ সময়ের সমস্ত মরুভূমি পেরিয়ে আজও তোমার কাছে ফিরে এসেছে শুধু এই কথা বলার জন্য—
তুমি হারিয়ে যাওনি।
তুমি কেবল পথ শিখছিলে।"
তারপর সন্ধ্যা নামত।
সময়ের ট্রেনটি আবার বাঁশি বাজাত।
আমি ফিরে আসতাম।
আর ষোলো বছরের সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে থাকত প্ল্যাটফর্মে, হাতে নতুন করে ধরা লাটাই।
তার চোখে তখন প্রথমবারের মতো ভবিষ্যৎ নয়—
নিজের উপর বিশ্বাসের আলো।
আর দূরে, অসীম আকাশে,
একটি ঘুড়ি
ক্রমশই অদৃশ্য হয়ে যেত তার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন