তোমার বন্ধুরা আসবে তাদের পকেট ভরে নিজস্ব আবহাওয়া নিয়ে।
কেউ নিয়ে আসবে বৃষ্টি— তার নিজের অপূর্ণ দুঃখের মেঘ থেকে সংগৃহীত।
কেউ এনে দেবে একটি প্রদীপ, যা জ্বলছে তার শেষ সাহসের শেষ দেশলাই কাঠিতে।
তোমার প্রেমিক বা প্রেমিকা আসবে এক ঝুড়ি চাঁদ নিয়ে।
কিছু পূর্ণ, কিছু পুরোনো বেদনার দাঁতে কাটা, কিছু এখনও রূপালি রস ঝরাচ্ছে অপ্রকাশিত স্বপ্নের ক্ষত থেকে।
তারা তোমাকে দেবে তাদের যা কিছু আছে।
এবং অনেক সময় সেটা তারা দেবে অপূর্ব সৌন্দর্যে।
তারা তাদের স্নেহ ঢেলে দেবে তোমার শূন্য পাত্রে।
তারা তাদের বোঝাপড়ার কাপড় দিয়ে বেঁধে দেবে তোমার ক্ষত।
তারা বসে থাকবে তোমার নিঃসঙ্গতার পাশে এবং তাকে বন্ধুত্ব বলে ডাকবে।
তবু অস্তিত্বের মেঝের নিচে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত নিয়ম—
কেউ কখনও দিতে পারে না সেই সম্পদ, যা তার নিজের রাজ্যেই নেই।
অন্ধ মানুষ তোমাকে সূর্যোদয় উপহার দিতে পারে না।
তৃষ্ণার্ত মানুষ তোমার হাতে সমুদ্র তুলে দিতে পারে না।
বন্দী মানুষ তোমাকে এমন চাবি দিতে পারে না যা সে নিজেই কখনও খুঁজে পায়নি।
সুতরাং,
যারা তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে, তারাও দিতে পারে শুধু সেই মুদ্রা যা তাদের নিজের ভাণ্ডারে আছে।
কী বেদনাময় সত্য।
আবার কী মহিমান্বিত।
কারণ অসংখ্য মানুষ সারা জীবন ঘুরে বেড়ায় অদৃশ্য ভিক্ষার বাটি হাতে।
তারা পৃথিবীর দিকে বাড়িয়ে দেয় তা, আর প্রত্যাশা করে যে অন্য কেউ এসে তাদের পূর্ণ করবে।
তারা মুকুট চায় ভিখারির কাছ থেকে।
মুক্তি চায় ডুবন্ত মানুষের কাছ থেকে।
পথ চায় তাদের কাছ থেকে, যারা নিজেরাই মরুভূমিতে হারিয়ে আছে।
বছর কেটে যায়।
নক্ষত্র বুড়ো হয়ে যায়।
গ্যালাক্সি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
তবু তারা অপেক্ষা করে।
অভিযোগ করে।
বিশ্বাস করে জীবন তাদের ঠকিয়েছে।
এদিকে,
তাদেরই পাঁজরের গভীরে
ঘুমিয়ে থাকে এক সম্রাট।
ধুলোর নিচে চাপা পড়ে থাকে সে।
তার চারপাশে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকে অখোলা ভাণ্ডার, অজানা মানচিত্র, আর অমূল্য সম্পদের পাহাড়।
একদিন,
যথেষ্ট প্রত্যাখ্যানের পরে,
যথেষ্ট ভাঙনের পরে,
যথেষ্ট দীর্ঘ রাতের পরে,
যখন ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ক্লান্ত হয়ে আসে,
সম্রাটটি জেগে ওঠে।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে।
তার সঙ্গে কেঁপে ওঠে অন্তর্জগতের প্রাসাদ।
এক এক করে খুলতে থাকে বন্ধ দরজাগুলি।
প্রথম কক্ষে সে খুঁজে পায় আত্মসম্মান।
দ্বিতীয় কক্ষে ক্ষমা।
তৃতীয় কক্ষে ইস্পাতের মতো ধারালো সাহস।
আর সবচেয়ে গভীর কক্ষে,
হাড় আর নক্ষত্রের আলো দিয়ে তৈরি এক অলৌকিক দরজার ওপারে,
সে আবিষ্কার করে সেই বস্তুটি,
যা সে সারা জীবন পৃথিবীর কাছে ভিক্ষা চেয়েছে—
নিজের অনুমোদন।
নিজের স্বীকৃতি।
সেই মুহূর্তে
আকাশ হঠাৎ নীরব হয়ে যায়।
বন্ধুরা তখনও আছে।
প্রেম তখনও আছে।
পৃথিবীও ঠিক আগের মতোই আছে।
তবু সবকিছু বদলে যায়।
কারণ সে আর একজন ভিখারি হিসেবে বাঁচে না।
সে বাঁচে একজন সার্বভৌম রাজাধিরাজ হিসেবে।
এখন বন্ধুত্ব প্রয়োজন নয়, উপহার।
ভালবাসা উদ্ধার নয়, উৎসব।
এখন প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি সহানুভূতি, প্রতিটি মমতা হয়ে ওঠে অতিরিক্ত প্রাপ্তি, মরিয়া প্রয়োজন নয়।
কারণ সে অবশেষে বুঝতে পারে নক্ষত্রের চেয়েও প্রাচীন এক গোপন সত্য—
অন্যেরা তোমাকে ভালবাসতে পারে।
অন্যেরা তোমাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
অন্যেরা তোমার পাশে হাঁটতে পারে ঝড়ের মধ্যেও।
কিন্তু তোমাকে তোমার প্রকৃত প্রাপ্য দেওয়ার চূড়ান্ত দায়িত্ব
কখনও কোনও প্রেমিকের ছিল না,
কখনও কোনও বন্ধুর ছিল না,
এমনকি কোনও দেবতারও ছিল না।
সৃষ্টির প্রথম প্রভাতেই
সেই দায়িত্ব নিঃশব্দে তুলে দেওয়া হয়েছিল
তোমার নিজের কাঁপতে থাকা দু'হাতের মধ্যে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন