মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

অস্তিত্ব বনাম বিভ্রম

কী অদ্ভুত সময়ে আমরা বাস করছি—

দু’টি মানুষ মুখোমুখি বসে,
কিন্তু প্রাণ প্রাণের কাছে নয়,
চোখ চোখের গভীরতা পড়ে না।
তাদের আঙুল ঘুরে বেড়ায়
এক অদৃশ্য কাচের জগতে,
যেখানে স্ক্রীনের আলো
বাস্তবের সম্পর্ককে ছাপিয়ে যায়।

এ কি সভ্যতার বিজয়,
না আত্মার পরাজয়?
কারণ, যে মুহূর্তে
আমরা সামনের মানুষটিকে ভুলে যাই,
সে মুহূর্তেই আমরা অস্বীকার করি
মানবিকতার প্রধানতম সত্য—
“আমি আছি, তুমি আছো,
তাই সম্পর্কও আছে।”

তবু আধুনিক মানুষ ভুলে গেছে
মানুষ আসলে এক গ্রহমালা,
যার ভেতরে লুকানো থাকে
অনেক অচেনা নক্ষত্র,
অসংখ্য সঙ্গীতহীন সুর,
অকথিত স্বপ্নের ঢেউ।
একটি আত্মাকে বুঝতে
হাজার বছরের ধ্যান চাই,
কিন্তু মানুষরা এখন
সেই ধ্যান ভেঙে দেয়
এক ক্ষণস্থায়ী স্ক্রোলের আগ্রহে।

অবহেলা এখানে কেবল
চোখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়—
এ এক দার্শনিক অপমান,
যা বলে দেয়:
“তুমি আমার কাছে অপেক্ষমাণ বার্তারও কম মূল্যবান।”
এই অপমান অন্যকে আঘাত করে,
কিন্তু আসলে নিজেকেই শূন্য করে তোলে,
কারণ যার ভেতর শুনতে পারে না
সামনের আত্মার সুর,
সে কেমন করে জাগাবে আপন সুর?

আমাদের জীবন, অবশ্য, আলাদা।
আমরা জানি,
সত্যিকারের উপস্থিতি
যেকোনো যন্ত্রের চেয়ে অসীম।
তাই একসাথে বসে
আমরা প্রথমেই নামিয়ে রাখি
দুটো মোবাইল, মুখোমুখি করে—
যেন তাদেরও শিখিয়ে দিই,
মানুষের সময়ে যন্ত্রের প্রবেশ নেই।

এরপর শুরু হয় আমাদের আসল উৎসব—
কথা, হাসি, নীরবতা,
যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত
হয়ে ওঠে মুক্তোর মতো বিরল।
আমাদের সংলাপ
কোনো সার্ভারের মধ্যে ভেসে যায় না,
বরং গেঁথে যায়
হৃদয়ের নিভৃত আকাশে।
ভিড়ের মাঝেও তখন
আমরা খুঁজে পাই আশ্রমের প্রশান্তি।

হ্যাঁ, প্রকৃত সম্পর্ক
কখনো ওয়াই-ফাইতে বাঁধা নয়,
কখনো নেটওয়ার্কের সংকেতের উপর নির্ভর করে না।
এটি টিকে থাকে
মনোযোগের ধৈর্যে,
উপস্থিতির উষ্ণতায়,
এবং সেই দৃষ্টিতে
যেখানে মানুষ মানুষকে চিনে নেয়
নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে।

তাহলে প্রশ্নটি অনিবার্য—
আমরা কাকে বেছে নিচ্ছি প্রতিদিন?
জীবন্ত মহাবিশ্বকে,
যা বসে আছে আমাদের চোখের সামনেই?
না কি এক ক্ষণস্থায়ী বিভ্রমকে,
যা নিভে যায় স্ক্রিনের আলোর সাথে সাথে?

প্রেম কখনো বিজ্ঞপ্তি নয়,
না কোনো আপডেট।
প্রেম হলো সেই চিরন্তন বার্তা,
যা অন্তরে জন্ম নেয়,
এবং অফলাইনেই বাড়তে পারে।

কোন মন্তব্য নেই: