বিয়ের পরে বয়ে গেছে একে একে আঠাশটি বছর । কিংশুকের মন বয়সের ভারে আজও হিংসুক হতে তো শেখেইনি, বরং রস ঘন হতেই চলেছে যৌবন পেরোলেও । আজ বিবাহবার্ষিকীর ভোরে রমলা ঘুম থেকে ওঠার আগেই মেসেঞ্জারে একটি দুষ্টূ মেসেজ লিখে, হাসতে হাসতে, সেন্ড করে রেখেছিল, সময়মত রমলা ঠিক পড়ে নেবে ব'লে ।
আজ রবিবার । বিকেলে কিংশুকের ঘুম থেকে ওঠার আগেই রমলা বাইরে বেরিয়েছিল । গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রবল ব্যস্ত সে, টুটুনের বিয়ের বাজার নিয়ে । টুটুন ওরফে সমর্পিতা ওদের একমাত্র কন্যা । এম ফিল ক'রে, গতবছরে লেকচারারের চাকরি বাগিয়ে নিয়েছে শহরের ভাল কলেজে । টুটুনের উড-বি বিপ্রতীপ ছয় বছর হলো ভাল চাকরি করে সফ্টঅয়ার কোম্পানিতে । আর ঠিক আট দিন পরে বিয়ে ওদের ।
রমলা ফিরলো রাত সাড়ে আটটা নাগাদ । দরজা খুলতেই তার মুখে উজ্জ্বল হাসি । হাতে একটি সুদৃশ্য মোড়কে ঢাকা লম্বামত একটি উপহার । কিংশুকের দিকে সেটা বাড়িয়ে দিয়ে, তারপর আবেগঘন স্বরে ব'লে উঠলো "শুভ বিবাহবার্ষিকী, মিস্টার কিংশুক মিত্র ।"
কিংশুক কিন্তু খুব জোর থতমত খেয়ে গেল । রমলা জানলো কি করে তার মনের গভীরতম ইচ্ছাটি ? প্রবল সখে, ষোলো বছর বয়েস থেকে, যত্ন করে এসরাজ বাজাতে শিখেছেলো সে । তার এই সখের ভালোবাসাটিকে সে প্রথম জানতে দিয়েছিলো রমলাকে ফুলশয্যার রাতে, প্রথম আদরের পরে । গভীর সে রাতে রমলা তন্ময় হয়ে শুনেছিল বাজানো তার । বাজানো শেষ হলে অনেকক্ষণ বেড়ালের মত মুখ ঘষেছিল কিংশুকের বুকে । চাইছিলো হয়তো নির্ভরতাকে আরও বেশি ভাল ক'রে বুঝে নিতে ।
এসরাজটি তারপরেও বেজেছিল আরও দীর্ঘ বাইশ বছর । তারপরের বর্ষায় আচমকা একদিন কিংশুক আবিষ্কার করলো যে তার সখের যন্ত্রটি বেদখল হয়ে গেছে । দুটি ইঁদুর এসরাজের বাক্স কেটে, এসরাজের কাঠ বিসদৃশ ভাবে অনেকটা খেয়ে ফেলে, তার মধ্যে প্রভূত সন্তান-সন্ততি সহ সুখের বাসা ফেঁদেছে । কভার সামান্য ফাঁক করে, ভিতরের সুখের সংসারকে নেচে উঠতে দেখেই, আর বিরক্ত না করে, একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, পুরো এসরাজটিকে আলতো করে নামিয়ে রেখে এসেছিল গ্যারেজের এক কোণে ।
তারপরে বহুবার ভেবেছে কিনবে নূতন আর একটা, কিন্তু ইতিমধ্যে দাম বেড়েছে প্রায় বারো গুণ । ইচ্ছা থাকলেও সখ পূরণ তাই হয়ে ওঠেনি আর নতুন করে ।
আজ এত বছর পরে, মেঘ না চাইতেই জল দেখে, জল আর বাঁধ মানলো না কিংশুকের চোখের কোণে । রমলা অবশ্য আগেই পাশের ঘরে চলে গেছিল ব'লে খেয়াল করেনি সে আনন্দাশ্রু তার ।
আবেগের বিহ্বলতা কেটে গেলে, কিংশুক আর অপেক্ষা করতে না পেরে, একটা একটা করে খুলতে শুরু করলো মোড়কের সেলোটেপ । পুরোটা খোলা হয়ে গেলে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো এসরাজের নূতন বাক্সটি । চামড়ার খাপের উপরে পালিশের গন্ধ বুক ভরে টানলো কিংশুক । একটু হালকা লাগছে যেন ওজনে । ঢাকনাটি খুলতেই পাথর হয়ে গেল কিংশুকের চোখ, অপ্রত্যাশিত অপমানে । প্রথম দৃষ্টিতেই চিনতে পারলো বাথরুমের পাশে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মুড়ো ঝ্যাঁটাটিকে ।
কিংশুক ভোরে যে ম্যাসেজ টি করেছিল, সেটি হলো -
"তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে রমলা, তোমার যখন সাত বছর বয়েস, তখন রাখীপূর্ণিমার সকালে মায়ের হাত ধরে এসে রাখী পরিয়ে গেছিলে তিন বছরের বড় কিংশুক দাদাকে । আমার মা কোলে টেনে নিয়ে লাড্ডু খাইয়ে দিয়েছিল তোমাকে ।
সেই তুমি সতেরো বছর বয়সে আমাকে হতবাক করে, একদিন বিকেলে, আমার পায়ের কাছে প্রথম প্রেমপত্র ছুঁড়ে দিয়ে একছুটে পালিয়ে গেলে । তুমি ভিতরে ভিতরে কতটা বড় হয়ে গেছো মাঝখানে, সেদিনই প্রথম জানলাম আমি । তার আবার ঠিক পাঁচ বছরের মাথায়, হৈ হৈ করে ঘরে ঢুকে পড়ে, দিল্লী কা লাড্ডু আশ মিটিয়ে খেতে, আমাকে এযাবৎ বগলদাবা করে নিলে ।
অথচ কি পবিত্র চিত্তে আমাকে প্রথম রাখীটি পরিয়েছিলে ! বলছিলাম কি, আমাদের টুটুনও তো চললো এবার দিল্লী কা লাড্ডু খেতে । আমাদের তো অনেকই হলো । সামনের রাখীপূর্ণিমায় আমাকে আবার রাখী পরিয়ে এ জীবনের মত লাড্ডু খেয়ে পস্তানোর ঝামেলা মিটিয়ে নেবে ? অতঃপর পবিত্র জীবন কাটাবো দুজনে !"
~~~~~~~~~~~~~~~
না । কিংশুকের হাতে উপহারটি ধরিয়ে দিয়ে রমলা পাশের ঘরে যায়নি । কিংশুকের বিহ্বলতার সুযোগের সার্থক সদ্ব্যবহার করে, টেবিল থেকে কিংশুকের সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে আর ঠাকুরের আসন থেকে দেশলাইটি নিয়ে, নিঃশব্দে এসে বসেছিল বারান্দার স্ল্যাবে, ঠিক সেইখানে, যেখান থেকে পর্দার ফাঁক দিয়ে কিংশুকের প্রতিটি অভিব্যক্তি অনুসরণ করা যায় ।
রাখী চেয়ে, এসরাজের বাক্সে মুড়ো ঝ্যাঁটা পেয়ে, কিংশুকের পাথর হয়ে দীর্ঘ দাঁড়িয়ে থাকা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলো সে দম বন্ধ করে । আত্মবিশ্বাসের হাসি ক্রমশঃ চওড়া হলো ঠোঁটে তার । এবার সিগারেটটি ধরিয়ে সুখের দীর্ঘ টান দিল রমলা, আকাশের তারাদের দিকে দৃপ্ত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে । অপারেশন সাকসেসফুল ।
সে জানে, আর একটিও কথা বেরোবে না কিংশুকের মুখ থেকে । যত কথা বেরোবে না, তত বেশি পাথর হতে থাকবে পুরুষের পৌরুষ, নিঃশব্দে ভিতরে ভিতরে । তারপর রাতের আলো ঘরে নিভলেই, গুলি খাওয়া বাঘ অবধারিত ঝাঁপিয়ে পড়বে প্রতিশোধ নিতে । আর পুরুষ যত প্রবলতর ভাবে প্রতিশোধ নিতে যাবে, নারী ততই উঠে যাবে, তল হারাতে হারাতে, সুখের মাতাল করা উত্যুঙ্গে, এমনকি ফুলশয্যার প্রথম অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে, অবশ্যই তীব্রতায় আরও বেশ অনেকটা উপরে ।
রমলার মুখ থেকে, বারংবার বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার রিং রা, আকাশের অন্ধকারে হারানোর ফাঁকে, ফিসফিসিয়ে, একে অপরকে বলতে বলতে গেল - "যে নারীরা, পুরুষকে, আপন ইচ্ছানুসারে হুবহু পরিচালিত ক'রে, জীবনের ব্যাকুল অভীষ্টদের সিদ্ধ করে নিতে অপারগ, সে হতভাগিনীদের আর গ্রহীতা-জন্ম সার্থক কি প্রকারে ?"
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন